hadith book logo

শামায়েলে তিরমিযী

লেখকঃ মুহাম্মাদ বিন ঈসা আত তিরমিযী (রহ.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৯

অধ্যায়-৫৬ : রাসূলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নযোগে দর্শন

স্বপ্ন এমন কিছু কল্পনা, যা আল্লাহ তা‘আলা ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের অন্তরে সৃষ্টি করে দেন। অথবা ফেরেশতার মাধ্যমে কল্পনার উদ্রেক করান। আবার কখনো শয়তানের মাধ্যমে কল্পনার উদ্রেক হয় তাকে স্বপ্ন বলে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, স্বপ্ন তিন প্রকার- ১. ভালো স্বপ্ন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে শুভ সংবাদ। ২. ভীতিকর স্বপ্ন যা শয়তানের প্রভাবে মানুষ দেখে। ৩. ঐ সমস্ত ধারণা, যা মানুষ জাগ্রত অবস্থায় করে থাকে ঘুমের ঘোরে তার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

যে নবী ﷺ কে স্বপ্নে দেখল যে বাস্তবেই নবীকে দেখল :

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ ، عَنِ النَّبِيِّ قَالَ : مَنْ رَاٰنِيْ فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَاٰنِيْ فَاِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَثَّلُ بِيْ

৩১৩. আবদুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে যেন আমাকেই দেখল। কারণ, শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। [সহীহ বুখারী, হা/৬৯৯৪; সহীহ মুসলিম, হা/৬০৫৬; ইবনে মাজাহ, হা/৩৯০১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৪১৯৩; দারেমী, হা/২১৮৫; জামেউস সগীর, হা/১১২০২।]

ব্যাখ্যা : রাসূলুল্লাহ ﷺ জাগ্রত অবস্থায় যেমন শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত, তেমনিভাবে ঘুমন্ত অবস্থাতেও তিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত। এমনকি তাঁর সুরতও শয়তানের প্রভাব থেকে সংরক্ষিত।

শয়তান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর রূপ ধারণ করতে পারে না :

عَنْ اَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  : مَنْ رَاٰنِيْ فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَاٰنِيْ فَاِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَصَوَّرُ اَوْ قَالَ : لَا يَتَشَبَّهٗ بِيْ

৩১৪. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে যেন আমাকেই দেখল। কারণ, শয়তান আমার স্বরূপ ধারণ করতে পারে না। [মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৩০৫।]

عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ يَقُوْلُ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  : مَنْ رَاٰنِيْ فِيْ الْمَنَامِ فَقَدْ رَاِٰنِيْ فَاِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَثَّلُنِيْ قَالَ اَبِيْ : فَحَدَّثْتُ بِهِ ابْنَ عَبَّاسٍ ، فَقُلْتُ : قَدْ رَاَيْتُهٗ ، فَذَكَرْتُ الْحَسَنَ بْنَ عَلِيٍّ فَقُلْتُ : شَبَّهْتُهٗ بِهٖ ، فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ : اِنَّهٗ كَانَ يُشْبِهُهٗ

৩১৫. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে যেন আমাকেই দেখল। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না।

(আসিম বর্ণনা করেন) আমার পিতা কুলায়ব বলেন, আমি এ হাদীস ইবনে আববাস (রাঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলাম এবং বললাম, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে স্বপ্নে দেখেছি। তখন হাসান ইবনে আলী (রাঃ) এর কথা আমার স্মরণ হলে আমি বললাম, স্বপ্নের আকৃতিকে হাসানের আকৃতির সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ পেলাম। ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সাদৃশই ছিলেন। [মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৪৮৯; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮১৮৬; মুসনাদে ইসহাক ইবনে রাহওয়াই, হা/২৬১।]

عَنْ يَزِيْدَ الْفَارِسِيِّ - وَكَانَ يَكْتُبُ الْمَصَاحِفَ - قَالَ : رَاَيْتُ النَّبِيَّ فِي الْمَنَامِ زَمَنَ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ : فَقُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ : اِنِّي رَاَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ فِي النَّوْمِ ، فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ : اِنَّ رَسُوْلَ اللهِ كَانَ يَقُوْلُ : اِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَسْتَطِيْعُ اَنْ يَّتَشَبَّهَ بِيْ ، فَمَنْ رَاٰنِيْ فِي النَّوْمِ فَقَدْ رَاٰنِيْ ، هَلْ تَسْتَطِيْعُ اَنْ تَنْعَتَ هٰذَا الرَّجُلَ الَّذِيْ رَاَيْتَهٗ فِي النَّوْمِ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، اَنْعَتُ لَكَ رَجُلًا بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ ، جِسْمُهٗ وَلَحْمُهٗ اَسْمَرُ اِلَى الْبَيَاضِ ، اَكْحَلُ الْعَيْنَيْنِ ، حَسَنُ الضَّحِكِ ، جَمِيْلُ دَوَائِرِ الْوَجْهِ ، مَلَاَتْ لِحْيَتُهٗ مَا بَيْنَ هٰذِهٖ اِلٰى هٰذِهٖ ، قَدْ مَلَاَتْ نَحْرَهٗ - قَالَ عَوْفٌ : وَلَا اَدْرِيْ مَا كَانَ مَعَ هٰذَا النَّعْتِ - فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ : لَوْ رَاَيْتَهٗ فِي الْيَقَظَةِ مَا اسْتَطَعْتَ اَنْ تَنْعَتَهٗ فَوْقَ هٰذَا

৩১৬. ইয়াযীদ আল ফারিসী থেকে বর্ণিত। ইয়াযীদ, যিনি কুরআন লিখতেন। তিনি বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নে দেখলাম। ইবনে আববাস (রাঃ) তখনও জীবিত ছিলেন। আমি ইবনে আববাস (রাঃ)-কে বললাম, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নে দেখেছি। ইবনে আববাস (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন, শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে সক্ষম নয়। যে আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে প্রকৃতপক্ষে আমাকেই দেখে। [ইবনে আববাস (রাঃ) বললেন], তুমি যাকে স্বপ্নে দেখেছ তাঁর কিছু বিবরণ দিতে পার? আমি বললাম, হ্যাঁ। তাঁর দেহাকৃতি মধ্যম আকারের, গায়ের রং গৌর, তাতে সাদা অংশ বেশি। সুরমা মাখা চোখ, প্রফুল্ল মুখ, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা, মুখভর্তি দাড়ি যা বুক পর্যন্ত পরিপূর্ণ ছিল। ইবনে আববাস (রাঃ) বললেন, তুমি যদি জাগ্রত অবস্থায় তাঁকে দেখতে, তাহলেও এর চেয়ে বেশি বলতে সক্ষম হতে না। [মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৪১০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হা/৩২৪৬৯।]

قَالَ اَبُو قَتَادَةَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  : مَنْ رَاٰنِي - يَعْنِي فِي النَّوْمِ - فَقَدْ رَاَى الْحَقَّ

৩১৭. আবু কাতাদা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি ঘুমের মধ্যে আমাকে দেখল, সে সত্যকেই দেখল। অর্থাৎ সে আমাকেই দেখল। [সহীহ বুখারী, হা/৬৯৯৬; সহীহ মুসলিম, হা/৬০৫৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৫৪৪; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৬০৫১; দারেমী, হা/২১৪০; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩২৮৭; জামেউস সগীর, হা/১১১৯৮।]

মুমিনের সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ৪৬ ভাগের ১ ভাগ :

عَنْ اَنَسٍ  : اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : مَنْ رَاٰنِيْ فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَاٰنِيْ ، فَاِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَخَيَّلُ بِيْ وَقَالَ : وَرُؤْيَا الْمُؤْمِنِ جُزْءٌ مِنْ سِتَّةٍ وَاَرْبَعِيْنَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ

৩১৮. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি ঘুমের অবস্থায় আমাকে দেখল, সে আমাকেই দেখল। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। তিনি আরো বলেন, মুমিনের সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ৪৬ ভাগের ১ ভাগ। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৭১৩; সহীহ বুখারী, হা/৬৯৯৪; সহীহ মুসলিম, হা/৬০৪৬; আবু দাউদ, হা/৫০২০; ইবনে মাজাহ, হা/৩৮৯৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৭৭৪; জামেউস সগীর, হা/৫৮৩৯।]

ব্যাখ্যা : এখানে স্বপ্ন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নেক্কার মুমিন-মুমিনার স্বপ্ন। সুতরাং কাফির ও ফাসিকের স্বপ্ন নবুওয়াতের অংশ নয়। নবুওয়াতের অংশ বলতে ইলমে নবুওয়াতের অংশ বুঝানো হয়েছে।

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَلِيٍّ قَالَ : سَمِعْتُ اَبِي يَقُوْلُ : قَالَ عَبْدُ اللهِ بْنُ الْمُبَارَكِ : اِذَا ابْتُلِيْتَ بِالْقَضَاءِ فَعَلَيْكَ بِالْاَثَرِ

৩১৯. মুহাম্মাদ ইবনে আলী বলেন, আমি আমার আববাকে বলতে শুনেছি, তোমাকে যখন বিচারকের পদে অভিষিক্ত করা হয়, তখন রিওয়ায়াতের অনুসরণ করার চেষ্টা করো। [আল মাজালিসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, হা/৩২৬।]

ব্যাখ্যা : যেকোন বিষয়ের সমাধানের জন্য যথাসম্ভব কুরআন হাদীস থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনদের বাণী ও জীবনাদর্শ থেকে সমাধা খুঁজতে হবে এবং তার অনুসরণ করতে হবে।

عَنِ ابْنِ سِيرِيْنَ قَالَ : هٰذَا الْحَدِيْثُ دِيْنٌ ، فَانْظُرُوْا عَمَّنْ تَاْخُذُوْنَ دِيْنَكُمْ

৩২০. ইবনে সীরীন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাদীস শিক্ষা করা দীনের অন্তর্ভুক্ত। অতএব তা শিক্ষার আগে একটি বিচার্য বিষয় হলো, তুমি দেখে নাও যে, কার কাছ থেকে এ দীন শিক্ষা করছ। [সহীহ মুসলিম, হা/২৬; দারেমী, হা/৪২৪।]

ব্যাখ্যা : দ্বীনের কোন কিছু গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, কার থেকে এই দীনী বিষয় গ্রহণ করা হচ্ছে। ফাসেক ফুজ্জার বা বিদআতীর কাছ থেকে দ্বীনের নামে বদ দ্বীনী যেন গ্রহণ করা না হয়।

ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বিখ্যাত দু’জন মুহাদ্দিসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তির দ্বারা কিতাব সমাপ্ত করেছেন।

প্রথম উক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) এর। ইবনুল মুবারাক বলেন, বিচার ও ফায়সালার ক্ষেত্রে নিজের রায় ও মতের উপর নির্ভর করবে না; হাদীস, সাহাবী বরং তাবিয়ীদের উক্তির অনুসরণ করবে। এটি একটি সাধারণ উপদেশ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আবার স্বপ্নের অনুচ্ছেদের সাথেও একে সম্পৃক্ততাও করা যেতে পারে। অর্থাৎ স্বপ্নের ব্যাখ্যাও এক ধরনের বিচার। তাই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যা মন চায়, তা বলে দেয়া ঠিক হবে না; বরং পূর্বসূরীদের ব্যাখ্যার আলোকে ব্যাখ্যা করা উচিত।

মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রহঃ) ছিলেন একজন বিখ্যাত তাবিয়ী এবং তা‘বীর শাস্ত্র তথা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ। তার এ উক্তির উদ্দেশ্য হলো, ইলমে হাদীস দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। আর দ্বীন অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা এর উপর মানুষের নীতি-আদর্শ নির্ভর করে। কারো দীন সঠিক না হলে তার পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব, দীন গ্রহণ করার পূর্বে লক্ষ্য করতে হবে, যার নিকট থেকে দীন গ্রহণ করা হচ্ছে, তিনি মুত্তাকী এবং হক্বপন্থী কি না? যে কারো থেকে দীন গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ উস্তাদের আক্বীদা, আমল ও আখলাকের প্রভাব ছাত্রের উপর পড়াটা স্বাভাবিক।