hadith book logo

আসরের সলাতের সঠিক ওয়াক্ত

লেখকঃ কামাল আহমাদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৭

সৌদি প্রবাসী হানাফী আলেম-১৩:

ইসলামি শরিআতে জামাআতের সাথে সলাত আদায় করার গুরুত্ব অপরিসীম। নবী (স)-এর বহু হাদীস থেকে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, জামাআতের সাথে সলাত- এটা কখনো একাকি সলাতের সমকক্ষ হতে পারে না। একাকি সলাত আদায় করলে তিনি কখনো জামাআতের সলাত আদায়ের সওয়াব পেতে পারেন না।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের একটি প্রসিদ্ধ আক্বীদা হলো যে, জামাআতের সাথে সলাত আদায় করতে হবে যে কোনো মূল্যে। সৌদি আরবসহ যে সমস্ত দেশে শীআরা অবস্থান করে, সেখানে দেখা যায়- শীআরা সাধারণত মাসজিদে জামাআত চলাকালীন সময়েও একাকি তারা সলাত আদায় করে, জামাআতে যোগদান করে না। [. এই বৈশিষ্ট্যটি কিছু পূর্বে হানাফী ফাতোয়া থেকে উল্লেখ করেছি।] আহলে সুন্নাতের লোকেরা কোনো অবস্থাতে জামাআত ত্যাগ করে না। যদি ইমামের কোনো আক্বীদা কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে না যায়, তাকে ইসলাম থেকে খারিজ না করে দেয়- তা হলে ইমাম ফাসেক্ব হলেও, ইমাম কোনো খারাপ মানুষ হলেও তার পিছনে হলেও সলাত আদায় করতে হবে জামাআতের সাথে, একাকি আদায় করা যাবে না। এটাই ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ)-সহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সমস্ত উলামায়ে কেরামের মত। ‘আক্বীদাতুত তাহাবিয়্যাহ’-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে যে, ইমাম যদি ফাসেক্ব হয়, বিকল্প কোনো ইমাম না থাকলে ঐ ফাসেক্ব ইমামের পিছনেই জামাআতের সাথে সলাত আদায় কারতে হবে, একাকি সলাত আদায় করা যাবে না।

পর্যালোচনা-১৩: নবী (স) আসরের সলাত সম্পর্কিত হাদীসগুলোতে প্রকৃত ওয়াক্তে একাকী হলেও তা আদায় করা এবং পরবর্তী সময়ে জামাআতের শরীক হওয়ার সুযোগ অব্যাহত রেখেছেন। এর দ্বারা প্রথম ওয়াক্তে সলাত আদায় ও জামাআতে সলাত আদায়- উভয় ফযিলত অর্জিত হয়। কিন্তু আসরের জামাআত দেরিতে আদায় করাতে তাতে শরীক হওয়াকে নফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা থেকে শরিআতে জামাআত আদায়ের গুরুত্ব থাকার সাথে সাথে আসরের সলাতের ক্ষেত্রে প্রথম ওয়াক্ত বা সঠিক ওয়াক্ত আদায়ের বিষয়টি অত্যধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। উম্মাত হিসেবে এই প্রাধান্যের বিষয়টি হাদীসের আলোকে আমাদেরকেও প্রাধান্য দিতে হবে। শরিআতে যখন সাধারণ হুকুমের পাশাপাশি ব্যতিক্রম হুকুম থাকে তখন তার উপর আমল করাতে বেশি ফযিলত অর্জন হয়। এ মর্মে সাহাবী ইবনু উমার (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُحِبُّ أَنْ يُؤتَى رُخْصَةٌ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ تُؤتَى مَعْصِيَةٌ .

‘‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর রুখসাত (ছাড়) দেয়া কাজগুলো করা পছন্দ করেন, যেমন তিনি নাফরমানী কাজ করা অপছন্দ করেন।’’ [. সহীহ ইবনু খুযায়মাহ হা/৩৫৪। মুস্তাফা আ‘যামী (রহ) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

অনুরূপ সাহাবী ইবনু আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى رُخَصُهُ كَمَا يحب أن تؤتى عزائمه .

‘‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর রুখসাত (অবকাশ) দেয়া কাজগুলো কার্যকরী হওয়া পছন্দ করেন, যেমন তিনি পছন্দ করে আযিমাত (মৌলিক) কাজগুলো কার্যকরী হওয়া পছন্দ করেন।’’ [. সহীহ ইবনু হিব্বান হা/৩৫৪। শুআয়েব আরনাউত (রহ) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

জামাআতে সলাত অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আসরের সলাতকে প্রথম বা মূল ওয়াক্তে আদায় করাকে নবী (স) বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন। তা ছাড়া ইশা ও ফজরের জামাআতে শরীক হওয়াকে মুনাফিক্বদের জন্য কষ্টদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে আসরের সলাতের ক্ষেত্রে অহেতুক দেরি করা, কিংবা সূর্য হলুদ হওয়া পর্যন্ত দেরি করাকে মুনাফিক্বদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তা-ই এক্ষেত্রে আসরের সলাতকে দেরিতে আদায়কৃত জামাআতের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। বরং একাকী আদায় করতে হবে। সম্ভব হলে দেরিতে আদায়কৃত আসরের জামাআতে শরীক হয়ে সওয়াব নিতে হবে। শর্ত হল, ইমাম বিদআতী ও সুন্নাত বিরোধী হবে না। আর এগুলো নবী (স)-এর সাধারণে নির্দেশের পাশাপাশি বিশেষ নির্দেশ। যা পালনে বেশি সওয়াব অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ।

ইমাম আবূ দাউদ (রহ) বর্ণনা করেছেন:

سَمِعْتُ أَحْمَدَ، قَالَ لَهُ رَجُلٌ " إِذَا دَخَلْتُ، وَقَدْ صَلَّيْتُ الْعَصْرَ وَأقِيمَتِ الصَّلَاةُ؟ قَالَ : صَلِّ مَعَهُمْ، قِيلَ : وَالظُّهْرُ؟ قَالَ : وَالصَّلَوَاتُ كُلُّهَا .

‘‘আমি ইমাম আহমাদ (রহ) থেকে শুনেছি, এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করল: যদি আমি আসরের সলাত আদায়ের পর (মাসজিদে) প্রবেশ করি, আর তখন সলাত (জামাআত) দাঁড়ায় (তখন কী করব)? তিনি (রহ) বললেন: তাদের সাথে সলাত পড়। জিজ্ঞাসা করা হলো: আর যোহরের সলাত হলে? তিনি (রহ) বললেন: সব সলাতই।’’ [. মাসায়েলে ইমাম আহমাদ রিওয়ায়াত আবী দাউদ সিজিস্তানী ৭১ পৃ.।]

আমরাও মনে করি যে, জামাআত ত্যাগ করা ঠিক নয়। কিন্তু কোন্ জামাআত? সেই জামাআত যা সঠিক ওয়াক্তে অনুষ্ঠিত হয়, দেরিতে অনুষ্ঠিত হয় এমন জামাআত নয়। কারণ, স্বয়ং নবী (স) দেরিতে জামা'আত হলে তা ত্যাগ করে একাকী সঠিক ওয়াক্তে সালাত আদায়ের আদেশ দিয়েছেন।

প্রবাসী বক্তা এখানে ফাসেক ইমামের সাথে দেরিতে সালাত আদায়কে ক্বিয়াস করেছেন। যা একেবারেই ফাসেদ ক্বিয়াস। কারণ, ফাসেক ইমামের গুনাহ মুসল্লির নেকিতে কোনো প্রভাব পড়ে না এবং মুসল্লি তার দায়ভার বহন করে না। কিন্তু দেরিতে সালাত আদায় করলে মুসল্লির নেকিতে তার প্রভাব পড়ে এবং মুসল্লিকে তার ভার বহন করতে হয়। অন্যথায় নবী (স) একাকী সলাত আদায় করতে বলতেন না। এমনকি একাকী সলাত আদায় করাকে كُنْتَ قَدْ أَحْرَزْتَ صَلاَتَكَ ‘তুমি তোমার সলাতকে রক্ষা করলে’ বলে উল্লেখ করেতেন না।। ]দ্র. হা/৩৮] তাই বক্তা যে ক্বিয়াস করেছেন তা ‘‘ক্বিয়াস মা‘আল ফারেক্ব’’। আর ‘‘ক্বিয়াস মা‘আল ফারেক্ব’’ মূল্যহীন ক্বিয়াস ।