hadith book logo

তাওহীদের মর্মকথা

লেখকঃ আব্দুর রহমান বিন নাসের সাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

১৪তম অধ্যায়: গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া অথবা দোয়া করা শিরক

১। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন,

وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ ﴿১০৬﴾ وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ ( يونس : ১০৬-১০৭)

‘‘আল্লাহ ছাড়া এমন কোন সত্তাকে ডেকোনা, যা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না এবং ক্ষতিও করতে পারবে না। যদি তুমি এমন কারো তাহলে নিশ্চয়ই তুমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন বিপদে ফেলেন, তাহলে একমাত্র তিনি ব্যতীত আর কেউ তা থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে পারবে না।’’ (ইউনুসঃ ১০৬, ১০৭)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ ( ألعنكبوت : ১৭)

‘‘আল্লাহর কাছে রিজিক চাও এবং তাঁরই ইবাদত করো’’।

(আনকাবুত : ১৭)

৩। আল্লাহ তাআলা অন্য এক আয়াতে এরশাদ করেছেন,

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ( الأحقاف : ৫)

‘‘তার চেয়ে অধিক ভ্রান্ত আর কে হতে পারে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছাড়া এমন সত্তাকে ডাকে যে সত্তা কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে পারবে না’’। (আহকাফ : ৫)

৪। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ ( النمل : ৬২)

‘‘বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে কে সাড়া দেয় যখন সে ডাকে ? আর কে তার কষ্ট দূর করে?’’ (নামল : ৬২)

৫। ইমাম তাবরানী বর্ণনা করেছেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে এমন একজন মুনাফেক ছিল, যে মোমিনদেরকে কষ্ট দিতো। তখন মুমিনরা পরস্পর বলতে লাগলো, চলো, আমরা এ মুনাফেকের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহায্য চাই। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন,

إنه لا يستغات بي وإنما يستغاث بالله

‘‘আমার কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।’’

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় :

১। সাহায্য চাওয়ার সাথে দোয়াকে আত্ফ্ করার ব্যাপারটি কোন عام বস্ত্তকে خاص বস্ত্তর সাথে সংযুক্ত করারই নামান্তর।

২। وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ আল্লাহর এ বাণীর তাফসীর।

ব্যাখ্যা

শিরকে আকবারের সীমারেখার ব্যাপারে ইতিপূর্বে আলোচিত মূলনীতি [অর্থাৎ যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত করল সে মুশরিক] এর মর্মার্থ যখন তুমি উপলব্ধি করতে পারবে, তখন গ্রন্থকার কর্তৃক বর্ণিত এর পরবর্তী তিনটি অধ্যায় তুমি হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে। কেননা ‘‘মান্নত’’ ইবাদতের মধ্যে গণ্য। তাই যারা ‘‘মান্নত’’ পূরণ করে আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও নেক কাজে মান্নত পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমন প্রতিটি জিনিসই ‘‘ইবাদত’’ যার প্রশংসা ‘‘শারে’’ [শরিয়তের বিধান দাতা] করেছেন অথবা যার সম্পাদনকারীর অথবা নির্দেশ কারীর প্রশংসা করেছেন।

৩। গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া বা গাইরুল্লাহকে ডাকা ‘শিরকে আকবার।’

৪। সব চেয়ে নেককার ব্যক্তিও যদি অন্যের সন্তুষ্টির জন্য গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চায় বা জিকির">দোয়া করে , তাহলেও সে জালিমদের অন্তর্ভূক্ত।

৫। এর পরবর্তী আয়াত অর্থাৎ وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ এর তাফসীর।

৬। গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করা কুফরি কাজ হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়াতে এর কোন উপকারিতা নেই। [অর্থাৎ কুফরি কাজে কোন সময় দুনিয়াতে কিছু বৈষয়িক উপকারিতা পাওয়া যায়, কিন্তু গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করার মধ্যে দুনিয়ার উপকারও নেই]

৭। ৩য় আয়াত فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ এর তাফসীর।

৮। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে রিজিক চাওয়া উচিত নয়। যেমনিভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে জান্নাত চাওয়া উচিত নয়।

৯। ৪র্থ আয়াত অর্থাৎ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ

এর তাফসীর।

১০। যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করে, তার চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট আর কেউ নয়।

তাই জাহেরী-বাতেনী কার্য-কলাপ ও কথা-বার্তার মধ্য থেকে যা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন এবং যা দ্বারা তিনি সন্তুষ্ট হন এমন সব কিছুই আল্লাহর ইবাদত। মান্নতও এর [ইবাদতের] অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা যাবতীয় অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য একমাত্র তাঁরই কাছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এমনিভাবে যাবতীয় বালা- মুসীবত ও দুঃখ-কষ্টের সময় একমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য আদেশ করেছেন। এসব বিষয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ইখলাস ও একনিষ্ঠতার নামই হচ্ছে ঈমান ও তাওহীদ। আর গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে এগুলো করার নামই হচ্ছে শিরক।

দোয়া এবং ইস্তেগাছার [সাহায্য চাওয়ার] মধ্যে পার্থক্য :

সাধারণভাবে সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার নাম হচ্ছে ‘দোয়া’। আর দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় আল্লাহর কাছে দোয়া করার নাম হচ্ছে ‘ইস্তেগাছা’।

১১। যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করে সে গাইরুল্লাহ দোয়াকারী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবচেতন থাকে, অর্থাৎ তার ব্যাপারে গাইরুল্লাহ সম্পূর্ণ অনবহিত থাকে।

১২। مدعو [মাদউ’] অর্থাৎ যাকে ডাকা হয় কিংবা যার কাছে দোয়া করা হয়, দোয়াকারীর প্রতি তার রাগ ও শত্রুতার কারণেই হচ্ছে ঐ দোয়া যা তার [গাইরুল্লাহার] কাছে করা হয়। [কারণ প্রকৃত মাদউ’] কখনো এরকম শিরকী কাজের অনুমতি কিংবা নির্দেশ দেয়নি]।

১৩। গাইরুল্লাহকে ডাকার অর্থই হচ্ছে তার ইবাদত করা।

১৪। ঐ ইবাদতের মাধ্যমেই কুফরি করা হয়।

১৫। আর এটাই তার [গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া কারীর] জন্য মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পাপী ব্যক্তি হওয়ার একমাত্র কারণ।

১৬। পঞ্চম আয়াত অর্থাৎ

أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ এর তাফসীর।

১৭। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, মূর্তি পূজারীরাও একথা স্বীকার করে যে, বিপদগ্রস্ত, অস্থির ও ব্যাকুল ব্যক্তির ডাকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সাড়া দিতে পারে না। এ কারণেই তারা যখন কঠিন মুসীবতে পতিত হয়, তখন ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে তারা আল্লাহকে ডাকে।

১৮। এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাওহীদের হেফাযত, সংরক্ষণ এবং আল্লাহ তাআলার সাথে আদব-কায়দা রক্ষা করে চলার বিষয়টি জানা গেলো।

এসব ব্যাপারে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়াই বাঞ্চনীয়। তিনিই দোয়া কারীর ডাকে সাড়া দেন। তিনিই বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। আল্লাহকে বাদ দিয়ে যে ব্যক্তি কোন নবী, ফিরিস্তা, অলী অথবা অন্য কারো নিকট দোয়া করল কিংবা গাইরুল্লাহর কাছে এমন ব্যাপারে সাহায্য চাইলো, যে ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই, সে মুশরিক, কাফির। সাথে সাথে সে দ্বীন থেকে বের হয়ে গেলো এবং জ্ঞান শূন্য উন্মাদে পরিণত হলো।

সৃষ্টি জগতের কারো কাছেই তার নিজের কিংবা অন্যের কল্যাণ সাধন অথবা মুসীবত দূর করার ক্ষমতা নেই। বরং সৃষ্টি কুলের সবাই সর্ব বিষয়ে আল্লাহর নিকট মূখাপেক্ষী।