hadith book logo

তাওহীদের মর্মকথা

লেখকঃ আব্দুর রহমান বিন নাসের সাদী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৪

৫১তম অধ্যায়: আল্লহ তাআলার আসমায়ে হুসনা [বা সুন্দরতম নামসমূহ]

১। আল্লহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ ( الأعراف : ১৮০)

‘‘আল্লহর সুন্দর সুন্দর অনেক নাম রয়েছে। তোমরা এসব নামে তাঁকে

ব্যাখ্যা

আল্লহ তাআলার বাণী .

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ

‘‘আল্লহর অনেক সুন্দর নাম রয়েছে। এ সব নামে তোরা তাঁকে ডাকো। আর যারা তাঁর নামের মধ্যে বিকৃতি ঘটায় তাদেরকে পরিত্যাগ করো।’’

তাওহীদের মূল কথা হচ্ছে, আল্লহ তাআলা নিজ সত্তার জন্য যা ঘোষণা করেছেন তাই তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা। অথবা তাঁর রাসূল তাঁর [আল্লাহর] জন্য যেসব সুন্দর সুন্দর নামের ঘোষণা দিয়েছেন সেগুলো স্বীকার করে নেয়া। সাথে সাথে এ সব সুন্দর নামের মধ্যে যে সুমহান অর্থ ও পরিচয় নিহিত আছে তা অনুধাবন করা এবং এ সব নামের দ্বারা আল্লহর ইবাদত করা ও তাঁর কাছে জিকির">দোয়া করা।

বান্দার দীন ও দুনিয়ার প্রতিটি আশা-আকাঙ্ক্ষার কথাই তাঁর রবের কাছে বলবে। এক্ষেত্রে তাঁর করণীয় হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার ‘আসমায়ে হুসনা’ থেকে যে নামটি তার প্রয়োজন মোতাবেক আল্লহর জন্য সবচেয়ে সমীচীন ও সামঞ্জস্যশীল, সে নামকে ওসীলা বানিযে তাঁকে ডাকা। যে ব্যক্তি রিজিক লাভের জন্য আল্লহকে ডাকতে চায়, তার উচিত রাযযাক নামে তাঁর কাছে প্রার্থনা করা। আর যদি বান্দা তার রবের রহমত ও মাগফিরাত লাভ করতে চায়, তাহলে তার উচিত ‘রহীম’, ‘রহমান’, ‘বারর’, ‘আফউ’, ‘গাফুর’, ‘তাওয়াব’, এসব নামে তাঁর কাছে প্রার্থনা করা।

এক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলি [আসমা ও সিফাত] এর মাধ্যমে তাঁকে ইবাদতের উদ্দেশ্যে ডাকা। তাঁকে ডাকার নিয়ম হচ্ছে,

ডাকো। আর যারা তাঁর নামগুলোকে বিকৃত করে তাদেরকে পরিহার করে চলো।’’ (আ’রাফ . ১৮০)

২। ইবনে আবি হাতিম ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ [তারা তাঁর নামগুলো বিকৃত করে] এর অর্থ হচ্ছে তারা শিরক করে।

৩। ইবনে আববাস রা. থেকে আরো বর্ণিত আছে, মুশরিকরা ‘ইলাহ’ থেকে ‘লাত’ আর ‘আজীজ’ থেকে ‘উযযা’ নামকরণ করছে।

৪। আ’মাস থেকে বর্ণিত আছে, মুশরিকরা আল্লহর

‘‘আসমায়ে হুসনা’’ [সুন্দর ও পবিত্র নাম] এর অর্থগুলোকে মানসপটে নিয়ে আসা এবং হৃদয়ঙ্গম করা, যাতে পবিত্র নামগুলোর প্রভাবে প্রয়োজন মোতাবেক বান্দার অন্তর প্রভাবিত হয় এবং মারেফাতের মহিমায় হৃদয় ভরে যায়। যেমন ‘আজমত’ ‘কিবরিয়া’ ‘মাজদ’ ‘মাজদ’ ‘জালালাত’ এবং ‘হায়বত’ নামগুলো দ্বারা আল্লাহর প্রতি সম্মান ও মহত্ত্বের আবেগ ও উচ্ছ্বাসে বান্দার হৃদয় ভরে যায়। এমনিভাবে ‘জামাল’ ‘বিরর’, ‘ইহসান’, এবং ‘জুদ’ [অর্থাৎ সৌন্দর্য, দয়া, মায়া, করুণা ও বদান্যতা ইত্যাদি] গুণাবলির দ্বারা আল্লহর ভালোবাসা, প্রেম, প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার উদ্দীপনায় বান্দার অন্তর পরিতৃপ্ত হয়। আবার ‘ইজ্জত’, ‘হেকমত’, ‘ইলম’ ও ‘কুদরত’ ইত্যাদি গুণাবলির দ্বারা আল্লহর প্রতি আনুগত্য, কাকুতি- মিনতি ও বিনয়ের প্রেরণায় বান্দার অন্তরাত্মা উজ্জীবিত হয়। আল্লহর ইলম, খিবরাহ, ইহাত্বা, ‘মুরাকাবাহ’ এবং ‘মুশাহাদাহ’ অর্থাৎ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রত্যক্ষ করার ক্ষমতা ইত্যাদি গুণাবলির দ্বারা বান্দার গতি- বিধি, চলা-ফেরা, কুচিন্তা ও খারাপ ইচ্ছা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন, এ ধারণা তাকে সাবধানি বান্দায় পরিণত করে। এমনিভাবে ‘গিনা’ [সমৃদ্ধি], ‘লুতফ’ [মমত্ব] ইত্যাদি গুণাবলির দ্বারা বান্দা তার জীবনের সকল সময় ও সর্বাবস্থায় এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে আল্লহর কাছে ধর্না দিতে পারে, তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এ আশায় তার হৃদয় আশান্বিত হয় এবং অনাবিল শান্তিতে হৃদয় ভরে যায়।

বান্দা আল্লাহ তাআলার আসমা ও সিফাত [নাম ও গুণাবলি] এবং এর দ্বারা তাঁর ইবাদতের জ্ঞান লাভের কারণে স্বীয় অন্তরে আল্লহর যে ‘মা'রেফাত’, [পরিচয়] অর্জিত হয়, তার চেয়ে মহান, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এবং পরিপূর্ণ কোন জিনিস দুনিয়াতে সে অর্জন করতে পারে না। মহান আল্লহর পক্ষ থেকে তাঁরই ইবাদতের জন্য বান্দার উপর এটাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ উপহার। এটাই তাওহীদের প্রাণ ও জীবনী শক্তি। এ উপহারের দ্বারা

নামসমূহের মধ্যে এমন কিছু [শিরকী বিষয়] ঢুকিয়েছে যার অস্তিত্ব আদৌ তাতে নেই।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। আল্লাহর নামসমূহ যথাযথ স্বীকৃতি

২। আল্লহর নামসমূহ সুন্দরতম হওয়া।

৩। সুন্দর ও পবিত্র নামে আল্লহকে ডাকার নির্দেশ।

৪। যেসব মূর্খ ও বেইমান লোকেরা আল্লহর পবিত্র নামের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদেরকে পরিহার করে চলা।

৫। আল্লাহর নামে বিকৃতি ঘটানোর ব্যাখ্যা।

যার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে তার জন্য এমন খালেস তাওহীদ ও ঈমানের দ্বারও উন্মুক্ত হয়েছে, যা পরিপূর্ণ তাওহীদবাদী মহান ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য কারো পক্ষে হাসিল করা সম্ভব নয়। আল্লহর আসমা ও সিফাতের স্বীকৃতিদান ও প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে এ মহান লক্ষ্য অর্জনের মূলমন্ত্র। পক্ষান্তরে আল্লহর আসমা ও সিফাতগুলোকে অস্বীকার করা, এ মহান উদ্দেশ্যের চরম পরিপন্থী।

আল্লাহর নাম ও গুণাবলি বিকৃতি করার বিভিন্ন ধরন .

এক . নাম ও গুণাবলি [আসমা ও সিফাত] এর অর্থগুলোকে অস্বীকার করা যেমন . ‘জাহমিয়্যাহ’ সম্প্রদায় এবং তাদের অনুসারীরা [আসমা ও সিফাতের অর্থগুলোকে অস্বীকার] করে থাকে।

দুই : আল্লাহর গুণাবলিকে মাখলুকের গুণাবলির সাথে তুলনা করা। যেমন . ‘মুশাবিবহা’, ‘রাফেযা’ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা [ আল্লাহর গুণাবলিকে মাখলুকের গুণাবলির সাথে তুলনা] করে থাকে।

তিন . আল্লাহর গুণবাচক নামে কোন মাখলুকের নামকরণ। যেমন . মুশরিকরা ‘ইলাহ’ নামের অনুকরণে ‘লাত’ নামক মূর্তির নামকরণ করেছে। এমনিভাবে আল্লাহ তা’আলার ‘আযীয’ নামের অনুকরণে ‘উয্যা’ এবং ‘মানান’ নামের অনুকরণে ‘মানাত’ নামক মূর্তির নামকরণ করেছে। তারা আল্লাহর ‘আসমায়ে হুসনা’ থেকে উপরোক্ত নামগুলো গ্রহণ করেছে। অতঃপর সেগুলোকে আল্লাহর সাথে তুলনা করে ইবাদতের এমন অধিকার মূর্তিকে প্রদান করেছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট।

আল্লাহ তা’আলার ‘আসমা’ অর্থাৎ নামের ক্ষেত্রে বিকৃতির মর্মার্থ হচ্ছে তাঁর নামগুলোকে স্বীয় উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে শব্দ, অর্থ, ঘোষণা, ব্যাখ্যা কিংবা পরিবর্তনের মাধ্যমে ভিন্ন অর্থে প্রবাহিত করা। উপরোক্ত প্রতিটি কাজই ‘তাওহীদ এবং ঈমানের পরিপন্থী।