hadith book logo

রমযানের বিষয়ভিত্তিক হাদীস শিক্ষা ও মাসায়েল

লেখকঃ ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-হাকীল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

১৪. ঋতুবতী নারীর ইফতার ও কাযা

মুয়াযাহ বিনতে আব্দুল্লাহ আল-আদাবি রহ. বলেন, আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলি: “ঋতুবতী কেন সাওম কাযা করে, সালাত কাযা করে না? তিনি বললেন: তুমি কি হারুরি? আমি বললাম: আমি হারুরি না, কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করছি, তিনি বললেন: আমাদের এমন হত, অতঃপর আমাদেরকে শুধু সাওম কাযার নির্দেশ দেওয়া হত, সালাত কাযার নির্দেশ দেওয়া হত না”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৫।]

মুয়াযাহ থেকে ইমাম তিরমিযীর এক বর্ণনায় আছে, সে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলে: “আমাদের প্রত্যেকে কি ঋতুকালীন সালাত কাযা করবে? তিনি বললেন: তুমি কি হারুরি? আমাদের কারো ঋতুস্রাব হলে, কাযার নির্দেশ দেওয়া হত না”। [তিরমিযী, হাদীস নং ১৩০।]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ঋতুবতী হতাম, অতঃপর পবিত্রতা অর্জন করতাম, তিনি আমাদেরকে সাওম কাযার নির্দেশ দিতেন, কিন্তু সিয়াম কাযার নির্দেশ দিতেন না”। এ হাদীস ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন হাদীসটি হাসান। অতঃপর তিনি বলেন, “এ হাদীস অনুযায়ী আহলে ইলমের আমল, অর্থাৎ ঋতুবতী নারী সিয়াম কাযা করবে, সালাত কাযা করবে না। এ ব্যাপারে তাদের দ্বিমত সম্পর্কে জানি না”। [তিরমিযী, হাদীস নং ৭৮৭।]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা “তুমি কি হারুরি” বলে, এ প্রশ্নের প্রতি অনীহা ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। হারুরি খারেজি সম্প্রদায়ের একটি গ্রুপ। কুফার নিকটে অবস্থিত হারুরা শহরে তাদের বসতি, এ জন্য তাদেরকে হারুরি বলা হয়, সেখান থেকে তাদের উৎপত্তি। তাদের মধ্যে ছিল দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা। [ফাতহুল বারি: (১/৪২২)।] তাদের কেউ হাদীস ও ইজমার বিপরীত ঋতুবতী নারীর উপর ঋতুকালীন সালাতের কাযার নির্দেশ দিত। [দেখুন: আল-মুগনি: (১/১৮৮); হাশিয়া সিনদি আলা সুনান নাসাঈ: (৪/১৯১); উমদাতুল কারি: (৩/৩০০)।] এ জন্য তিনি বিরক্তি প্রকাশক শব্দ দ্বারা তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তুমি কি তাদের কেউ?

শিক্ষা ও মাসায়েল:

এক. দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা হারাম। কুরআন-হাদীসের সীমারেখায় অবস্থান করা ও সে অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। আল্লাহর দেওয়া শিথিলতা বা রুখসত গ্রহণ করা। দীনের ব্যাপারে যেরূপ বাড়াবাড়ি খারাপ, অনুরূপ বাহানা তালাশ নিন্দনীয়। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উত্তম, অর্থাৎ কুরআন-হাদীসের ওপর আমল করা।

দুই. দীনের ব্যাপারে কঠোরতা আরোপকারীদের নিষেধ করা বৈধ, যেন সঠিকভাবে শরী‘আতের বাস্তবায়ন হয় এবং কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়।

তিন. কোনো প্রশ্নের কারণে প্রশ্নকারী সম্পর্কে যদি মুফতির মনে খারাপ ধারণা জন্মায় তাহলে প্রশ্নকারীর ব্যাখ্যা দেওয়া উচিৎ যে, তিনি গোড়া নন বরং জানতে ইচ্ছুক, যেমন মুয়াযাহ বলেছেন: “আমি হারুরি নই, কিন্তু প্রশ্ন করছি” তখন মুফতির কর্তব্য দলীল দ্বারা তার প্রশ্ন দূর করা, যেমন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা‎ করেছেন।

চার. শরী‘আতের মূল ভিত্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ। এ জন্য আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাওম কাযার নির্দেশ দিতেন, সালাত কাযার নির্দেশ দিতেন না। অর্থাৎ যদি সালাতের কাযা ওয়াজিব হত, তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই তাদের কাযা করার নির্দেশ দিতেন। কারণ, তিনি ছিলেন উম্মতের সবচেয়ে হিতাকাঙ্খি, তিনি উম্মতের জন্য প্রত্যেক বিষয় স্পষ্ট করে গেছেন। [উমদাতুলকারী: (৩/৩০১)।] মুসলিমের কর্তব্য আল্লাহর নির্দেশে পরিপূর্ণ সোপর্দ হওয়া, তার শরী‘আতকে সম্মান প্রদর্শন করা ও দলিলের সামনে থেমে যাওয়া। আদেশগুলো বাস্তবায়ন করা, যেহেতু শরী‘আতের আদেশ, নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকবে, যেহেতু শরী‘আতের নিষেধ, কারণ, বুঝা যাক বা না যাক।

পাঁচ. ইবন আব্দুল বার রহ. বলেছেন: “ঋতুবতী নারী সিয়াম পালন করবে না, বরং কাযা করবে, তবে সালাত কাযাও করবে না। এ বিষয়ে উম্মতের ইজমা রয়েছে। আল-হামদুলিল্লাহ। সকল মুসলিম যেখানে একমত, সেটা সঠিক ও চূড়ান্ত সত্য”। [তামহিদ: (২২/১০৭)।]

ছয়. নারীর ওপর ইসলামী শরী‘আতের ছাড় এই যে, তাদেরকে সালাত কাযার নির্দেশ দেওয়া হয় নি। কারণ, সালাত দিনে একাধিক বার, যার কাযা খুব কষ্টকর। এ জন্য নারীদের উচিৎ আল্লাহর শোকর আদায় করা।

সাত. নারী যদি ফজর উদিত হওয়ার সময় পাক হয়, তাহলে সে দিনের সাওম তার শুদ্ধ হবে না, কাযা করা জরুরি। কারণ, যখন ফজর উদিত হয়েছে, তখন সে ঋতুবতী। নারী যদি সূর্যাস্তের সামান্য আগে ঋতুবতী হয়, তাহলে তার সাওম বাতিল, কাযা করা ওয়াজিব। [ফাতাওয়া লাজনায়ে দায়েমা: (১০/১৫৫), ফাতাওয়া নং ১০৩৪৩।]

নয়. নারী যদি সূর্যাস্ত যাওয়ার সামান্য পর ঋতুবতী হয়, তাহলে সে দিনের সাওম শুদ্ধ।

দশ. নারী যদি সাওম অবস্থায় রক্ত আসা অথবা তার ব্যথা অনুভব করে, সূর্যাস্তের আগে বের না হয়, তাহলে তার সাওম শুদ্ধ। [“ফাতাওয়া আল-জামেয়াহ লিল মারআল মুসলিমাহ” লি ইবন উসাইমিন: (১/৩২৫)।]

এগার. এ হাদীস থেকে বুঝায় অসুস্থ ব্যক্তি সাওম ভঙ্গ করতে পারবে, যদিও তার সাওমের ক্ষমতা থাকে, যদি রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। কারণ, ঋতুবতী নারী একেবারে দুর্বল হয় না, বরং রক্ত বের হওয়ার কারণে তার ওপর সাওম কষ্টকর, আর রক্ত বের হওয়া একটি রোগ। [শারহু ইবন বাত্তাল আলাল বুখারী (৪/৯৭-৯৮)]