hadith book logo

রমযানের বিষয়ভিত্তিক হাদীস শিক্ষা ও মাসায়েল

লেখকঃ ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-হাকীল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২১

১৮. সাহরির ফযীলত (২)

আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«تَسَحَّرُوا فَإِنَّ في السَّحُور بَرَكَةً» .

“তোমরা সাহরি খাও। কারণ, সাহরিতে বরকত রয়েছে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮২৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৯৫, অনুরূপ হাদীস বর্ণিত আছে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ আবু সায়িদ, জাবের, আয়েশা. আমর ইবন আস, হুযায়ফা, ইরবায, আবু লাইলা, তালক, ইয়াশ ইবন তালক, উমার, উতবা ইবন আব্দ, আবু দারদা ও সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহুম‎ প্রমুখদের থেকে। দেখুন: শারহু ইবন মুলাক্কিন আলাল উমদাহ: (৫/১৮৯); মাজমাউয যাওয়ায়েদ: (৩/১৫৪)।]

আমর ইবন আস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«فَصْلُ مَا بَينَ صِيامِنَا وصِيَامِ أَهْلِ الكِتَابِ أَكَلَةُ السَّحَر» .

“আমাদের সাওম ও আহলে কিতাবিদের সাওমের পার্থক্য হচ্ছে সাহরি ভক্ষণ করা”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৬।]

ইরবায ইবন সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ বলেন,

«دَعَاني رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم إلى السَّحُور في رَمَضَانَ فقَالَ : هَلُمَّ إلى الغَدَاءِ المُباركِ»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমযানে সাহরিতে আহ্বান করে বলেন, বরকতপূর্ণ খানার জন্য আস”। [আবু দাউদ, হাদীস নং ২৩৪৪; আহমদ: (৪/১২৬); নাসাঈ: (৪/১৪৫); সহীহ ইবন খুযাইমাহ, হাদীস নং ১৯৩৮; ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৪৬৫, আলবানি সহীহ আবু দাউদে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

মিকদাদ ইবন মা‘দি কারিব রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«عَلَيْكُمْ بِغَدَاءِ السَّحُور؛ فَإِنَّهُ هُوَ الغَدَاءُ المبَارَك» رواه النسائي .

“তোমরা সাহরি অবশ্যই ভক্ষণ কর। কারণ, তা বরকতপূর্ণ খাবার”। [নাসাঈ: (৪/১৪৬); আহমদ: (৪/১৪২), আলবানি সহীহ নাসাঈতে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

শিক্ষা ও মাসায়েল:‎

এক. সাহরিতে বরকত বিদ্যমান। আল্লাহ যেখানে ইচ্ছা তার মাখলুকে বরকত রাখেন, তন্মধ্যে সাহরি।

দুই. সকল আলিম একমত যে, সাহরি মোস্তাহাব, ওয়াজিব নয়, তবে এ উম্মতের বৈশিষ্ট্য। [দেখুন: শারহু ইবনল মুলাক্কিন আলাল উমদাহ: (৫/১৮৮); যাখিরাতুল উকবা: (২০/৩৬৬)।]

তিন. সাহরির বরকতসমূহ:

(১) সাহরি খাওয়া শরী‘আতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ দিয়েছেন, এতে রয়েছে বান্দার ইহকাল ও পরকালের সফলতা। [দেখুন: ফাতুহুল বারি: (৪/১৪০); তাওযিহুল আহকাম: (৩/১৫৫)।]

(২) সাহরিতে আহলে কিতাবের বিরোধিতা রয়েছে, তারা সাহরি খায় না। [ফাতুহুল বারি: (৪/১৪০); তাওযিহুল আহকাম: (৩/১৫৫); শারহুন নববী আলা মুসলিম (৭/২০৭)।] আর তাদের বিরোধিতা আমাদের দীনের মূল নীতি। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের সাথে মিল রাখা ও তাদের আখলাক, বৈশিষ্ট্য গ্রহণ হারাম।

(৩) সাহরির ফলে সাওম ও ইবাদতের শক্তি অর্জন হয়, ক্ষুধা ও পিপাসা থেকে সৃষ্ট খারাপ অভ্যাস দূর হয়। [ফাতহুল বারি: (৪/১৪০)।]

(৪). সাহরি ভক্ষণকারী দো‘আ কবুলের মুহূর্তে ইস্তেগফার, যিকর ও দো‘আ করার সুযোগ লাভ করে, যা ঘুমন্ত ব্যক্তির নসিব হয় না। সাহরির সময় ইস্তেগফারকারীদের আল্লাহ প্রশংসা করেছেন।

(৫) সাহরি ভক্ষণকারী যথাসময়ে ফজর সালাতে হাজির হয়, অনেক সময় মসজিদে আগে এসে প্রথম কাতার ও ইমামের নিকটবর্তী দাঁড়ানোর সাওয়াব লাভ করে, আযানের জওয়াব দেয় ও ফজরের দু’রাকাত সুন্নাত আদায়ে সক্ষম হয়, হাদীসে এসেছে দুনিয়া ও তার মধ্যে বিদ্যমান সবকিছু থেকে ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত উত্তম।

(৬) সাহরি ভক্ষণকারী ক্ষুধার্তকে খাদ্যদান করে বা সাহরিতে কাউকে অংশীদার করে সদকার সাওয়াব লাভ করতে পারে। [ফাতহুল বারি: (৪/১৪০)।]

(৭) সাহরিতে রয়েছে আল্লাহর নি‘আমতের শোকর ও তার রুখসতের প্রতি সমর্থন। কারণ, আল্লাহ আমাদের জন্য সূর্যাস্ত থেকে ফজর পর্যন্ত পানাহার বৈধ করেছেন, যা পূর্বে হারাম ছিল। [আউনুল মাবুদ: (৬/৩৩৬)।]

চার. মুসলিমদের কর্তব্য সাহরিতে বাড়াবাড়ি না করা, বিশেষভাবে যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা তা ত্যাগ কর না”। নেক নিয়তে সাওয়াবের আশায় সাহরি ভক্ষণ করা, শুধু অভ্যাসে পরিণত করা নয়। [তাওযিহুল আহকাম: (৩/১৫৬); যাখিরাতুল উকবা: (২০/৩৬৬)।]

পাঁচ. সাহরির দাওয়াত দেওয়া ও দাওয়াত গ্রহণ করা বৈধ। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরবায ইবন সারিয়াকে তার সাথে সাহরি খেতে ও একত্র হতে আহ্বান করেছেন। এক হাদীসে এরূপ এসেছে: “তোমরা বরকতপূর্ণ খানার জন্য আস”। [নাসাঈ: (৪/১৪৫), আলবানি সহীহ নাসাঈতে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।]

ছয়. ইমাম খাত্তাবি রহ. বলেছেন: “এতে প্রমাণিত হয় যে, দীন সহজ, তাতে কঠোরতা নেই। কিতাবিদের বিধান ছিল, তারা ইফতার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ফজর পর্যন্ত আর সাহরি খেতে পারত না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের থেকে তা রহিত করেছেন:

﴿وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ١٨٧﴾ [ البقرة : 187]

“আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ‎ ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট ‎ হয়”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭] [মা‘আলেমুস সুনান: (২/৭৫৭); আউনুল মাবুদ: (৬/৩৩৬)।] আল্লাহর অসংখ্য নি‘আমতের জন্য আমরা তার শোকর আদায় করছি।