১
সুন্নাত
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৬
পোশাকের ক্ষেত্রে কতিপয় বিধি-নিষেধ
পোশাকের ক্ষেত্রে ইসলামের কতিপয় বিধি-নিষেধ রয়েছে। যেমন :
১. রেশমের পোশাক পরিধান করা যাবে না :
রেশমের পোশাক পরিধান করা পুরম্নষদের জন্য হারাম। হাদীসে এসেছে, হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করতে এবং খাবার পরিবেশন করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে তিনি রেশমের কাপড় পরিধান করতে এবং তার উপর বসতে নিষেধ করেছেন। [বুখারী হা/৫৮৩৭; মিশকাত হা/৪৩২১।]
২. নারী-পুরম্নষ একে অপরের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে না :
মহিলাদের জন্য নির্ধারিত অথবা তাদের পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পোশাক পুরম্নষদের জন্য পরিধান করা নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে পুরম্নষদের জন্য নির্ধারিত পোশাকও মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীদের বেশ ধারণকারী পুরম্নষদেরকে এবং পুরম্নষদের বেশ ধারণকারী নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। [বুখারী হা/৫৮৮৫; মিশকাত হা/৪৪২৮।]
৩. প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য পোশাক পরবে না :
যে পোশাক খ্যাতি বা প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য পরিধান করা হয় তা নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় খ্যাতি লাভের পোশাক পরবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন। [ইবনু মাজাহ হা/৩৬০৬; মিশকাত হা/৪৩৪৬।]
৪. ভিন্ন ধর্মের পরিচয় বহনকারী পোশাক পরা যাবে না :
যেসব পোশাক ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মের পরিচয় বহন করে যেমন- ক্রুশ অঙ্কিত পোশাক, হিন্দুদের ধূতি, খ্রিস্টানদের এক ধরনের সাদা পোশাক ইত্যাদি পরিধান করা বৈধ নয়। হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার পরিধানে দু’টি রঙিন কাপড় দেখে বললেন, এটা তো কাফেরদের কাপড়; অতএব তা পরিধান করো না। [মুসলিম, হা/২০৭৭; মিশকাত হা/৪৩২৭।]
হিন্দুদের মতো উল্কি আঁকা এবং সিঁদুর পরাও হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির অনুসরণ করবে সে সেই জাতিরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। [ফতহুল বারী, ১৩/৩০০; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৯।]
৫. টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা যাবে না :
ইচ্ছাকৃতভাবে টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা জায়েয নয়। হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দিবেন না, যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত ইযার (লুঙ্গি) ঝুলিয়ে পরিধান করে। [সহীহ বুখারী, হা/৫৭৮৮, সহীহ মুসলিম, হা/৩৭।]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, ইযারের (লুঙ্গির) যে অংশ টাখনুর নীচে থাকবে, সে অংশ জাহান্নামে যাবে। [সহীহ বুখারী, হা/৫৭৮৭।]
হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার (অপর বর্ণনায় তাঁর নিজের) নলার পশ্চাদভাগ ধরে বললেন, এই হলো লুঙ্গির (সর্বনিম্ন) স্থান। তুমি যদি তা মানতে না চাও তবে আরো নিচে, যদি তাও মানতে না চাও তবে আরো নিচে (নামাতে পারো)। যদি তুমি, তাও মানতে না চাও তবে পায়ের টাখনুর নিচে যাওয়ার অধিকার লুঙ্গির নেই। [তিরমিযী, হা/১৭৮৩; নাসায়ী, হা/৫৩২৯; মুখতাসারম্নশ শামাইল, হা/৯৯; সহীহাহ. হা/১৭৬৫, ২৬৮৩।]
৬. প্রাণীর ছবিযুক্ত পোশাক পরা যাবে না :
কাপড়ে কোনো প্রাণীর ছবি রাখা যাবে না। কোন প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা, টাঙ্গানো বা পোশাকে বহন করা ইসলামে নিষেধ। এ সকল কর্মে জড়িতদের জন্য পরলৌকিক জীবনে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, একদা তিনি অসুস্থ আবু তালহা (রাঃ)-কে দেখতে গেলেন। তিনি সেখানে সাহল ইবনে হুনায়ফ (রাঃ)-কে উপস্থিত পেলেন। তখন আবু তালহা (রাঃ) একজনকে ডেকে তার নিচে বিছানো চাদরটি সরিয়ে ফেলতে বললেন। তখন সাহল (রাঃ) বললেন, এটিকে সরিয়ে ফেলছেন কেন? তিনি বললেন, এতে তো ছবি রয়েছে। আর নবী ﷺ (ছবি সম্পর্কে) কী বলেছেন তা তো তুমি জান। [তিরমিজী হা/১৭৫০।]
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অবশ্যই কিয়ামাতের দিন মানুষের মধ্যে (কঠিন) শাস্তি ভোগ করবে ছবি তৈরিকারীরা। [সহীহ বুখারী হা/৫৬০৬।]
৭. টাইট পোশাক পরিধান করা যাবে না :
এত টাইট পোশাক পরিধান করা যাবে না, যাতে শরীরের ভাঁজ ফুটে উঠে এবং বসতে ও সালাত আদায় করতে কষ্ট হয়। কেননা এর দ্বারা পোশাক পরিধানের মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হয়ে যায়। নারীরা পাতলা পোশাক পরিধান করলে বেপর্দা থাকার গোনাহ হবে। আর এ ধরনের কাপড় পরে সালাত আদায় করলে তা সহীহ হবে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, দু’শ্রেণির জাহান্নামীকে আমি দেখিনি। (১) যাদের হাতে থাকবে গরম্নর লেজের ন্যায় ছড়ি, তা দ্বারা তারা লোকদেরকে প্রহার করবে। (২) ঐ সকল রমণী, যারা বস্ত্র পরিহিতা অথচ উলঙ্গ, পুরম্নষদেরকে নিজেদের প্রতি আকৃষ্টকারিণী এবং নিজেরাও পুরম্নষদের প্রতি আকৃষ্ট। তাদের মাথা হবে লম্বা গ্রীবাবিশিষ্ট উটের চুঁটির ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তার সুগন্ধও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুগন্ধি এত এত দূর থেকেও পাওয়া যাবে। [সহীহ মুসলিম, হা/১৬৮ , মিশকাত হা/৩৫২৪।]
এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন, এমন পোশাক পরিধান করে, যা তাকে পুরোপুরি আবৃত করে না। ফলে কাপড় পরলেও মূলত সে উলঙ্গই থেকে যায়। যেমন ওই নারী যে কি-না এমন পাতলা কাপড় পরে, যা তার কোমল ত্বক দৃশ্যমান করে অথবা এমন আঁটসাট বস্ত্র গায়ে জড়ায়, যা তার শরীরের বাহু, নিতম্ব প্রভৃতির ভাঁজগুলোকে পরিষ্কার ফুটিয়ে তোলে। নারীর পোশাক সেটিই, যা তার আপাদমস্তক ঢেকে ফেলে। দেহের কোনো অংশই প্রকাশ করে না। পুরম্ন ও প্রশস্ত হওয়ায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকারও নির্ণয় করে না। [মাজুমূ‘ ফাতাওয়া : ২২/১৪৬।]
৮. পোশাক বেশি চাকচিক্য হবে না :
পোশাক এমন হবে না যে ইবাদাতের সময় মনোযোগ আকর্ষণ করে। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ কারম্নকার্য খচিত একটি পশমী চাদর পরিহিত অবস্থায় সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বলেন, এই চাদরের কারম্নকার্য আমাকে অমনোযোগী করেছে। এটা আবু জাহমের নিকট নিয়ে যাও এবং আমার জন্য কারম্নকার্যহীন (আম্বেজানী) চাদর নিয়ে এসো। [সহীহুল বুখারী, হা/৩৭৩, ৭৫২, ৫৮১৭, মুসলিম, হা/৫৫৬।]
৯. অগোছালো ভঙ্গিতে পোষাক পরিধান করা অনুচিত :
এমন অগোছালো ভঙ্গিতে পোষাক পরিধান করা অনুচিত, যা আরামদায়ক নয় অথবা যাতে সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। লুঙ্গি পরে বিছানায় বা মাটিতে শুয়ে হাঁটুর উপর পা তুলে দিতে নবী ﷺ নিষেধ করেছেন। [জামউল ওসাইল শরহু শামায়িলিত তিরমিযী ১/১৭৯।] কেননা, এতে সতর খুলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
১০. পোশাক পরিষ্কার ও পরিপাটি হবে :
পোশাক পরিষ্কার ও পরিপাটি হওয়া চাই। জাবির (রাঃ) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের নিকট এলেন এবং এক ব্যক্তিকে ময়লা কাপড় পরিহিত দেখে বললেন, ‘এর কাছে কি এমন কিছু নেই, যা দিয়ে তার কাপড় ধৌত করবে।’ [আবু দাউদ হা/৪০৫৬।]
১১. পোশাক সাধারণ থাকা ভালো :
পোশাক সাদা-সিধে থাকা ঈমানের পরিচায়ক। মহানবী ﷺ বলেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বিনয় সহকারে সৌন্দর্যময় কাপড় পরা ত্যাগ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে কিয়ামতের দিন সৃষ্টির সামনে ডেকে এখতিয়ার দেবেন; ফলে সে ঈমানের লেবাসের মধ্যে তার যেটা ইচ্ছা সেটাই পরতে পারবে। [সহীহ জামে, হা/৬১৪৫।]
তবে সুন্দর পোশাক পরা নিষিদ্ধ নয়। কারণ, আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। বান্দাকে তিনি যে নেয়ামত দান করেছেন তার চিহ্ন (তার দেহে) দেখতে পছন্দ করেন। আর তিনি (লোকচক্ষে) দরিদ্র সাজাকে ঘৃণা করেন। [সহীহ জামে, হা/ ১৭৪২।]
মহানবী ﷺ বলেছেন, তোমরা খাও, পান করো, দান করো, পরিধান করো, তবে তাতে যেন অপচয় ও অহংকার না থাকে। [বুখারী, আহমাদ হা/৬৬৯৫, নাসাঈ হা/২৫৫৯।]
১২. শিশুদেরকেও শালীন পোশাক দেয়া জরম্নরি :
শিশুদেরকে ইসলামী আদর্শে লালন পালন করা পিতামাতার দায়িত্ব। নিষিদ্ধ খাদ্য, পানীয়, পোশাক, কথাবার্তা ইত্যাদি থেকে তাদেরকে দূরে রাখা জরম্নরি। আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযিদ বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর কাছে বসে ছিলাম। এমতাবস্থায় তাঁর একটি ছোট্ট ছেলে তাঁর কাছে এল। ছেলেটিকে তার মা একটি রেশমী কামীস (জামা) পরিয়ে দিয়েছে। জামাটি পরে ছেলেটি খুব খুশি। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) ছেলেটিকে বললেন, বেটা- কে তোমাকে এই জামাটি পরিয়েছে? এরপর বললেন, কাছে এসো। ছেলেটি কাছে আসলে তিনি জামাটি ছিড়ে ফেলেন এবং বলেন, তোমার আম্মার কাছে যেয়ে বলো, তোমাকে অন্য কাপড় পরিয়ে দিতে। [শুআবুল ঈমান হা/৬০৯১।]
১৩. মহিলাদের পোশাক সর্বাঙ্গকে ঢেকে রাখবে :**
মহিলাদের পোশাক যেন দেহের সর্বাঙ্গকে ঢেকে রাখে। দেহের কোন অঙ্গ বা সৌন্দর্য যেন কোন বেগানা পুরম্নষের সামনে প্রকাশ না পায়। মহানবী ﷺ বলেন, মেয়েদের সবটাই লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরম্নষের দৃষ্টিতে পরিশোভিত করে তোলে। [তিরমিযী, মিশকাত, হা/৩১০৯।]
মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই মাথায় স্কার্ফ ও ওড়না ব্যবহার করে আল্লাহ তা‘আলার বিধান মেনে চলাকে অভ্যাসে পরিণত করবে। এ ক্ষেত্রে মায়েদের ভূমিকা খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ। মায়েরা যদি পোশাক ব্যবহারে শালীন হয় এবং হিজাব পরে তবে তাদের মেয়েরাও সহজেই তাদের অনুসরণ করবে।
১৪. মেয়েরা সুগন্ধি লাগিয়ে পুরম্নষদের মাঝে যাবে না :
عَنْ أَبِىْ مُوْسٰى يَقُوْلُ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ ثُمَّ مَرَّتْ عَلَى الْقَوْمِ لِيَجِدُوْا رِيْحَهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ
আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে নারী সুগন্ধি লাগিয়ে কোন সম্প্রদায়ের নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে- যেন তারা তার সুঘ্রাণ পায়, তাহলে সে ব্যভিচারীণী হিসেবে গণ্য হবে। [মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৭৬২; মুস্তাদরাকে হাকেম, সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০১৯।]
১. রেশমের পোশাক পরিধান করা যাবে না :
রেশমের পোশাক পরিধান করা পুরম্নষদের জন্য হারাম। হাদীসে এসেছে, হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করতে এবং খাবার পরিবেশন করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে তিনি রেশমের কাপড় পরিধান করতে এবং তার উপর বসতে নিষেধ করেছেন। [বুখারী হা/৫৮৩৭; মিশকাত হা/৪৩২১।]
২. নারী-পুরম্নষ একে অপরের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে না :
মহিলাদের জন্য নির্ধারিত অথবা তাদের পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পোশাক পুরম্নষদের জন্য পরিধান করা নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে পুরম্নষদের জন্য নির্ধারিত পোশাকও মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীদের বেশ ধারণকারী পুরম্নষদেরকে এবং পুরম্নষদের বেশ ধারণকারী নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। [বুখারী হা/৫৮৮৫; মিশকাত হা/৪৪২৮।]
৩. প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য পোশাক পরবে না :
যে পোশাক খ্যাতি বা প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য পরিধান করা হয় তা নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় খ্যাতি লাভের পোশাক পরবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন। [ইবনু মাজাহ হা/৩৬০৬; মিশকাত হা/৪৩৪৬।]
৪. ভিন্ন ধর্মের পরিচয় বহনকারী পোশাক পরা যাবে না :
যেসব পোশাক ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মের পরিচয় বহন করে যেমন- ক্রুশ অঙ্কিত পোশাক, হিন্দুদের ধূতি, খ্রিস্টানদের এক ধরনের সাদা পোশাক ইত্যাদি পরিধান করা বৈধ নয়। হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার পরিধানে দু’টি রঙিন কাপড় দেখে বললেন, এটা তো কাফেরদের কাপড়; অতএব তা পরিধান করো না। [মুসলিম, হা/২০৭৭; মিশকাত হা/৪৩২৭।]
হিন্দুদের মতো উল্কি আঁকা এবং সিঁদুর পরাও হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির অনুসরণ করবে সে সেই জাতিরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। [ফতহুল বারী, ১৩/৩০০; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৯।]
৫. টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা যাবে না :
ইচ্ছাকৃতভাবে টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা জায়েয নয়। হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দিবেন না, যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত ইযার (লুঙ্গি) ঝুলিয়ে পরিধান করে। [সহীহ বুখারী, হা/৫৭৮৮, সহীহ মুসলিম, হা/৩৭।]
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, ইযারের (লুঙ্গির) যে অংশ টাখনুর নীচে থাকবে, সে অংশ জাহান্নামে যাবে। [সহীহ বুখারী, হা/৫৭৮৭।]
হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার (অপর বর্ণনায় তাঁর নিজের) নলার পশ্চাদভাগ ধরে বললেন, এই হলো লুঙ্গির (সর্বনিম্ন) স্থান। তুমি যদি তা মানতে না চাও তবে আরো নিচে, যদি তাও মানতে না চাও তবে আরো নিচে (নামাতে পারো)। যদি তুমি, তাও মানতে না চাও তবে পায়ের টাখনুর নিচে যাওয়ার অধিকার লুঙ্গির নেই। [তিরমিযী, হা/১৭৮৩; নাসায়ী, হা/৫৩২৯; মুখতাসারম্নশ শামাইল, হা/৯৯; সহীহাহ. হা/১৭৬৫, ২৬৮৩।]
৬. প্রাণীর ছবিযুক্ত পোশাক পরা যাবে না :
কাপড়ে কোনো প্রাণীর ছবি রাখা যাবে না। কোন প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা, টাঙ্গানো বা পোশাকে বহন করা ইসলামে নিষেধ। এ সকল কর্মে জড়িতদের জন্য পরলৌকিক জীবনে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, একদা তিনি অসুস্থ আবু তালহা (রাঃ)-কে দেখতে গেলেন। তিনি সেখানে সাহল ইবনে হুনায়ফ (রাঃ)-কে উপস্থিত পেলেন। তখন আবু তালহা (রাঃ) একজনকে ডেকে তার নিচে বিছানো চাদরটি সরিয়ে ফেলতে বললেন। তখন সাহল (রাঃ) বললেন, এটিকে সরিয়ে ফেলছেন কেন? তিনি বললেন, এতে তো ছবি রয়েছে। আর নবী ﷺ (ছবি সম্পর্কে) কী বলেছেন তা তো তুমি জান। [তিরমিজী হা/১৭৫০।]
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অবশ্যই কিয়ামাতের দিন মানুষের মধ্যে (কঠিন) শাস্তি ভোগ করবে ছবি তৈরিকারীরা। [সহীহ বুখারী হা/৫৬০৬।]
৭. টাইট পোশাক পরিধান করা যাবে না :
এত টাইট পোশাক পরিধান করা যাবে না, যাতে শরীরের ভাঁজ ফুটে উঠে এবং বসতে ও সালাত আদায় করতে কষ্ট হয়। কেননা এর দ্বারা পোশাক পরিধানের মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হয়ে যায়। নারীরা পাতলা পোশাক পরিধান করলে বেপর্দা থাকার গোনাহ হবে। আর এ ধরনের কাপড় পরে সালাত আদায় করলে তা সহীহ হবে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, দু’শ্রেণির জাহান্নামীকে আমি দেখিনি। (১) যাদের হাতে থাকবে গরম্নর লেজের ন্যায় ছড়ি, তা দ্বারা তারা লোকদেরকে প্রহার করবে। (২) ঐ সকল রমণী, যারা বস্ত্র পরিহিতা অথচ উলঙ্গ, পুরম্নষদেরকে নিজেদের প্রতি আকৃষ্টকারিণী এবং নিজেরাও পুরম্নষদের প্রতি আকৃষ্ট। তাদের মাথা হবে লম্বা গ্রীবাবিশিষ্ট উটের চুঁটির ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তার সুগন্ধও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুগন্ধি এত এত দূর থেকেও পাওয়া যাবে। [সহীহ মুসলিম, হা/১৬৮ , মিশকাত হা/৩৫২৪।]
এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন, এমন পোশাক পরিধান করে, যা তাকে পুরোপুরি আবৃত করে না। ফলে কাপড় পরলেও মূলত সে উলঙ্গই থেকে যায়। যেমন ওই নারী যে কি-না এমন পাতলা কাপড় পরে, যা তার কোমল ত্বক দৃশ্যমান করে অথবা এমন আঁটসাট বস্ত্র গায়ে জড়ায়, যা তার শরীরের বাহু, নিতম্ব প্রভৃতির ভাঁজগুলোকে পরিষ্কার ফুটিয়ে তোলে। নারীর পোশাক সেটিই, যা তার আপাদমস্তক ঢেকে ফেলে। দেহের কোনো অংশই প্রকাশ করে না। পুরম্ন ও প্রশস্ত হওয়ায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকারও নির্ণয় করে না। [মাজুমূ‘ ফাতাওয়া : ২২/১৪৬।]
৮. পোশাক বেশি চাকচিক্য হবে না :
পোশাক এমন হবে না যে ইবাদাতের সময় মনোযোগ আকর্ষণ করে। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ কারম্নকার্য খচিত একটি পশমী চাদর পরিহিত অবস্থায় সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বলেন, এই চাদরের কারম্নকার্য আমাকে অমনোযোগী করেছে। এটা আবু জাহমের নিকট নিয়ে যাও এবং আমার জন্য কারম্নকার্যহীন (আম্বেজানী) চাদর নিয়ে এসো। [সহীহুল বুখারী, হা/৩৭৩, ৭৫২, ৫৮১৭, মুসলিম, হা/৫৫৬।]
৯. অগোছালো ভঙ্গিতে পোষাক পরিধান করা অনুচিত :
এমন অগোছালো ভঙ্গিতে পোষাক পরিধান করা অনুচিত, যা আরামদায়ক নয় অথবা যাতে সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। লুঙ্গি পরে বিছানায় বা মাটিতে শুয়ে হাঁটুর উপর পা তুলে দিতে নবী ﷺ নিষেধ করেছেন। [জামউল ওসাইল শরহু শামায়িলিত তিরমিযী ১/১৭৯।] কেননা, এতে সতর খুলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
১০. পোশাক পরিষ্কার ও পরিপাটি হবে :
পোশাক পরিষ্কার ও পরিপাটি হওয়া চাই। জাবির (রাঃ) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের নিকট এলেন এবং এক ব্যক্তিকে ময়লা কাপড় পরিহিত দেখে বললেন, ‘এর কাছে কি এমন কিছু নেই, যা দিয়ে তার কাপড় ধৌত করবে।’ [আবু দাউদ হা/৪০৫৬।]
১১. পোশাক সাধারণ থাকা ভালো :
পোশাক সাদা-সিধে থাকা ঈমানের পরিচায়ক। মহানবী ﷺ বলেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বিনয় সহকারে সৌন্দর্যময় কাপড় পরা ত্যাগ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে কিয়ামতের দিন সৃষ্টির সামনে ডেকে এখতিয়ার দেবেন; ফলে সে ঈমানের লেবাসের মধ্যে তার যেটা ইচ্ছা সেটাই পরতে পারবে। [সহীহ জামে, হা/৬১৪৫।]
তবে সুন্দর পোশাক পরা নিষিদ্ধ নয়। কারণ, আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। বান্দাকে তিনি যে নেয়ামত দান করেছেন তার চিহ্ন (তার দেহে) দেখতে পছন্দ করেন। আর তিনি (লোকচক্ষে) দরিদ্র সাজাকে ঘৃণা করেন। [সহীহ জামে, হা/ ১৭৪২।]
মহানবী ﷺ বলেছেন, তোমরা খাও, পান করো, দান করো, পরিধান করো, তবে তাতে যেন অপচয় ও অহংকার না থাকে। [বুখারী, আহমাদ হা/৬৬৯৫, নাসাঈ হা/২৫৫৯।]
১২. শিশুদেরকেও শালীন পোশাক দেয়া জরম্নরি :
শিশুদেরকে ইসলামী আদর্শে লালন পালন করা পিতামাতার দায়িত্ব। নিষিদ্ধ খাদ্য, পানীয়, পোশাক, কথাবার্তা ইত্যাদি থেকে তাদেরকে দূরে রাখা জরম্নরি। আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযিদ বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর কাছে বসে ছিলাম। এমতাবস্থায় তাঁর একটি ছোট্ট ছেলে তাঁর কাছে এল। ছেলেটিকে তার মা একটি রেশমী কামীস (জামা) পরিয়ে দিয়েছে। জামাটি পরে ছেলেটি খুব খুশি। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) ছেলেটিকে বললেন, বেটা- কে তোমাকে এই জামাটি পরিয়েছে? এরপর বললেন, কাছে এসো। ছেলেটি কাছে আসলে তিনি জামাটি ছিড়ে ফেলেন এবং বলেন, তোমার আম্মার কাছে যেয়ে বলো, তোমাকে অন্য কাপড় পরিয়ে দিতে। [শুআবুল ঈমান হা/৬০৯১।]
১৩. মহিলাদের পোশাক সর্বাঙ্গকে ঢেকে রাখবে :**
মহিলাদের পোশাক যেন দেহের সর্বাঙ্গকে ঢেকে রাখে। দেহের কোন অঙ্গ বা সৌন্দর্য যেন কোন বেগানা পুরম্নষের সামনে প্রকাশ না পায়। মহানবী ﷺ বলেন, মেয়েদের সবটাই লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরম্নষের দৃষ্টিতে পরিশোভিত করে তোলে। [তিরমিযী, মিশকাত, হা/৩১০৯।]
মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই মাথায় স্কার্ফ ও ওড়না ব্যবহার করে আল্লাহ তা‘আলার বিধান মেনে চলাকে অভ্যাসে পরিণত করবে। এ ক্ষেত্রে মায়েদের ভূমিকা খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ। মায়েরা যদি পোশাক ব্যবহারে শালীন হয় এবং হিজাব পরে তবে তাদের মেয়েরাও সহজেই তাদের অনুসরণ করবে।
১৪. মেয়েরা সুগন্ধি লাগিয়ে পুরম্নষদের মাঝে যাবে না :
عَنْ أَبِىْ مُوْسٰى يَقُوْلُ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ ثُمَّ مَرَّتْ عَلَى الْقَوْمِ لِيَجِدُوْا رِيْحَهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ
আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে নারী সুগন্ধি লাগিয়ে কোন সম্প্রদায়ের নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে- যেন তারা তার সুঘ্রাণ পায়, তাহলে সে ব্যভিচারীণী হিসেবে গণ্য হবে। [মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৭৬২; মুস্তাদরাকে হাকেম, সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০১৯।]