১
চেপে রাখা ইতিহাস
লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩২
মহীয়সী জেবন্নেসার বিকৃত চরিত্রের আসল তথ্য
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজসিংহ ' বইটা পাঠ্যপুস্তক রূপে গঠিত হচ্ছে। তাতে আওরঙ্গজেবের কন্যা গুণবতী, চরিত্রবতী ও প্রতিভাবতী জেবন্নেসাকে ভ্রষ্টা ও পতিতা অপেক্ষাও চরিত্রহীনা প্রমাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ করার উপায় নেই; সেটি নাকি ইতিহাস নয়, ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস'। পৃথিবীর বুকে বহু নর-নারী দেখা যায় যারা বিশেষ কোন কারণে জীবনে বিয়ে করেননি। এঁদেরকে নিয়ে অনেকে উপন্যাস লিখেছেন। আর উপন্যাস লিখতে গিয়ে চিরকুমার আর চিরকুমারীদের চরিত্রহীন বা চরিত্রহীনা করে না লিখলে উপন্যাস সরস হবে কি করে? তাই সমস্ত কুরআন শরীফ কণ্ঠস্থকারিণী হফেযা' ও অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারিণী জেবন্নেসাকেও উপন্যাস মার্কা ইতিহাসে আঘাত থেকে রেহাই দেয়া হয়নি।
হাফেয, মাওলানা হযরত আলমগীরের চরিত্র বিকৃত করলে যেমন পরোক্ষভাবে কুরআন ও হাদীসকে অকেজো, নেশার সামগ্রী প্রতিপন্ন করে মুসলমান সমাজকে ধর্ম বিমুখ করা যাচ্ছে, ঠিক সে রকম মহীয়সী মহিলা হাফেযা জেবন্নেসাকেও যদি ভ্রষ্টা, চরিত্রহীনা প্রমাণ করা যায় তাহলে বিশেষতঃ মুসলিম নারী জাতিকেও কুরআন ও হাদীসের বিপরীত দিকে চালান সম্ভব হবে-এ চাতুর্যপূর্ণ মতলব নিয়েই ইতিহাসে বিষ প্রয়োগ করার পরিকল্পিত ব্যবস্থা।
আকীল খাকে জেবন্নেসার প্রণয়ী বলে লিখেছেন কিছু অমুসলমান লেখক। আর বঙ্কিমচন্দ্রের মতে জেবুন্নেসা নাকি মোবারক খাঁর অবৈধ প্রেমিকা ('রাজসিংহ' দ্রষ্টব্য)। আবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের বোন জাহানাকেও এ সামান্য সৈনিক মোবারক খার প্রেমিকা বলে দেখিয়েছেন সাহিত্য সম্রাটের দল। পিসি ও ভাইঝির একই ব্যক্তির সাথে ব্যভিচারের নেশার কথা বর্ণনা করে অনেকে কাগজের পাতায় ‘ইনভেনটরের খ্যাতি লাভ করেছেন। সত্য ইতিহাসের সংবাদ কিন্তু একেবারে এর বিপরীত। কুমারী জেবন্নেসার কুমারীত্বের বিশুদ্ধতা সম্বন্ধে এক ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতির অনুবাদ এখানে তুলে দিচ্ছি-“যেহেতু জেবন্নেসা দিবানিশি কাব্যানুশীলন ও পুস্তক অধ্যয়নের গবেষণায় রত থাকতেন এবং বিবাহ হলে যেহেতু স্বামী সেবা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যাবে ফলে অধ্যয়ন, গবেষণা ও কাব্য রচনার স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হবে বলে চিরজীবন কুমারী থেকে বিবাহের বর্তমান ঝাটের মধ্যে জড়াতে নিজের স্বাধীনতা সত্তাকে সায় দিতে পারেন নি।” [উর্দু গ্রন্থ ‘জেওয়ারে জেবন্নেসা' দ্রষ্টব্য)
কোন কোন লেখক জেবন্নেসাকে শিবাজীর পণয়-ভিখাররিণী বলতে বা বইয়ে লিখে নাটক ও যাত্রারূপে তা সমাজে প্রচারের উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দিতেও লজ্জানুভব করেননি। এতে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে গেছে।
আবার কোন কোন লেখক নাসীর খার সাথেও জেবন্নসার অবৈধ প্রেম ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সে সব লেখকের লেখার সময় মনে রাখা উচিত ছিল যে, তাদেরই মতে সম্রাট আওরঙ্গজেব নাকি খুবই গোঁড়া মুসলমান ছিলেন, আর গোঁড়া মুসলমানের মেয়েরা অবৈধ পুরুষ দেখতে পায়না, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। সুতরাং গোঁড়া আওরঙ্গজেবের হারেমে সংরক্ষিত রাজকন্যাদের অপর পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকতে পারে কি করে? তাই মনে হয়, ভেজাল দেয়ার উন্মাদনায় অসাবধানতামূলক কিছু গোলমাল থেকে গেছে।
হাফে জেবন্নেসা সম্বন্ধে সে যুগের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী লেখক ও কবিগণ তাদের কাব্য-কবিতায় যা লিখেছেন সেগুলো যাদের জানা আছে তারা অবশ্যই জেবন্নোসার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন সন্দেহ নেই। মির্জা সাঈদ আশরফ লিখেছন, “আল্লাহর বান্দাগণ যেমন তার উপাসনা করেন অথচ তাকে প্রত্যক্ষভাবে পান না, তেমনি জেবন্নেসার ভৃত্যগণ তার কাজ করত অথচ তাঁকে দেখতে পেতনা।"
ঐতিহাসিক নিয়ামত আলি খান লিখেছেন, “আল্লাহ নিজে অদৃশ্য থাকলেও তার গুণরাজির দ্বারা তিনি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ও প্রকাশিত। জেবন্নেসা পর্দার অন্তরালে অদৃশ্য থাকলেও দয়া দানে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ও প্রকাশিত।”
এগুলো সবই মুসলমানদের উদ্ধৃতি তাই অনেকের কাছে গ্রহণীয় নাও হতে পারে। তাই বিখ্যাত হিন্দু লেখক লক্ষ্মীরানায়ণের লেখার উদ্ধৃতি দিচ্ছি-“জেবন্নেসা তৈমুর বংশীয়া উজ্জ্বলতর আলোকবর্তিকা, এ যুগের নারীকূল মুকুটমণি! তার অধ্যবসায়, আরাধনা, কাব্য সাধনা ও ধর্মপ্রবণতা তাকে সুনামের অধিকারিণী করেছে। তার সুখ্যাতি অনেকের কাছে পবিত্র কাবা ঘরের মত। হযরত মহম্মদের পত্নী খাদেজার মত তিনি ছিলেন পাপ ও কলঙ্কশূন্য কুমারী।" জেবন্নেসা সম্পর্কে জানতে হলে বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত লক্ষ্মী নারায়ণ সংকলিত ‘গুলেরানা হস্তলিপি' যথেষ্ট হবে বলা যায়।
ভারতে সাম্প্রদায়িক মৈত্রী-মিলন স্থায়ী হলে গোড়ায় গলদ রেখে বাহ্যিক সমাধান করতে চাইলে তা হবে মূল্যহীন। বাস্তবে মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়তে হলে বিষাক্ত ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার পথ বন্ধ করতে হবে, কারণ ওটাও সাম্প্রদায়িকতার অন্যতম বীজ। আমাদের দেশে ঐতিহাসিক উপন্যাসের যিনি আবিষ্কারক অথবা প্রবর্তক তিনি হচ্ছেন শ্রীভূদেব মুখোপাধ্যায়। তার পরে আমাদের সর্ববরেণ্য সাহিত্য সম্রাট উপাধিপ্রাপ্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ইনিই ১৮৮২ খৃস্টাব্দে ‘রাজসিংহ' লিখে উপন্যাস মার্কা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
‘অঙ্গুরী বিনিময়' বইয়ে শিবাজীকে নায়ক আর ‘রোসিনারাকে নায়িকা করে ভূদেববাবু যা লিখেছেন তার স্রোতে আওরঙ্গজেবের কন্যা ‘রোসিনারা কে একেবারে পশু চরিত্রে নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ আওরঙ্গজেবের ‘রোসিনারা নামে কোন কন্যাই ছিল না। অনেকের ধারণা, ভূদেববাবুর ইতিহাসে প্রকৃত জ্ঞানের অভাবেই এত বড় ভুল হয়েছে। কিন্তু তা নয়, ভূদেববাবুর রচনায় বাচার একটা রাস্তা করা হয়েছে মাত্র। সেটা হচ্ছে এ, যদিও রোসিনারা নামে আওরঙ্গজেবের কোন কন্যা নেই তবুও এটা যে উপন্যাস। উপন্যাসে কল্পনার মিথ্যা পালিশ চড়ালে যেন অপরাধের কিছু নয়।
অতএব ঐতিহাসিক-উপন্যাসিকের মতে, প্রখ্যাত চরিত্রবতী জেবন্নেসাকেও চরিত্রহীনা বললেই বা দোষ হবে কেন? এমনিভাবে ১৯০৯ খৃস্টাব্দে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একটি বই লিখেছেন তার নাম ভারতের বিদূষী'। অবশ্য গঙ্গোপাধ্যায় মশায়ের গ্রন্থে জেবন্নেসা যে স্থান পেয়েছেন এটাই সৌভাগ্য (?) বলতে হবে। তবে তিনিও শিবাজীর প্রেম-প্রণয়ী বলে জেবন্নাসাকে চিত্রিত করেছেন। তেমনই ১৯১৮ খৃস্টাব্দে সুনীতি দেবীর "The Beautiful Princess" নামে একটি পুস্তকেও শিবাজীর প্রণয়িনী বলে জেবন্নেসার চরিত্রে কালিমা নিক্ষেপ হয়েছে। আজকাল নানা পত্র-পত্রিকায় এত বেশি উৎকট ঐতিহাসিক উপন্যাস সৃষ্টি হচ্ছে যে, নিরপেক্ষ পাঠকের সামনে যখন সেগুলো বার বার ফুটে ওঠে তখন অনেকরই মনে হয়, “একটা মিথ্যাকে বারংবার প্রচার করতে করতে তা সত্যে পরিণত হয়।
এছাড়া আমাদের বাংলা ভাষাতেও একটা প্রবাদ আছে, “যা রটে, তার কিছুও ঘটে। কিন্তু আজ প্রমাণিত সত্য হয়ত এটাই যে, “যা না ঘটে, তাও রটে।" প্রকৃতপক্ষে যাঁরা ঐতিহাসিক স্বীকৃতি লাভ করেছেন, যেমন কাফি খাঁ, মনুচি, তাভার্নিয়ের, স্যার যদুনাথ সরকার প্রভৃতি পণ্ডিতদের লিখিত ইতিহাসে এসব অভিযোগ বা অপরাধের ‘অ'ও নেই, বরং প্রশংসার প্রাচুর্য আছে। যদুনাথ সরকারের একটা পুস্তকের নাম শিবাজী' আর একটার নাম ‘ঔরঙ্গজেব'। কিন্তু এগুলোর মধ্যে এসব অলীক গল্পের কোন স্থান নেই। তবে আগামীকাল নতুন সংস্করণের বা নতুন মুদ্রণে কি হবে তা বলার স্পর্ধা আমাদের নেই।
যদুনাথ সরকার ১৯১৭ খৃস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে 'Modem Review' পত্রিকায় যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন তার শিরোনাম 'Love Affairs of Jebannessa'। তাতে তিনি জোরাল ভাষায় গুরু গম্ভীর ভঙ্গিমাতে প্রকাশ করেছেন-“এ সমস্ত কাহিনী একেবারে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।” আর একজন খ্যাতনামা চরিত্রকার শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় তাঁর মোঘল বিদূষী’ পুস্তকে এ সমস্ত প্রেম-কাহিনীকে মিথ্যা এবং কাল্পনিক বলেই শুধু লেখেননি বরং তা প্রমাণ করতেও সক্ষম হয়েছেন।
আওরঙ্গজেব নিজেই পছন্দ করে তার কন্যার নাম রেখেছিলেন জেবন্নেসা, অর্থাৎ ললনাশ্রী'। তিনি যখন কুরআন মুখস্থ করতেন তখন পুরাতন পড়া ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল কারণ তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। হাফেযা হওয়ার পর আরবী, ফারসী ও উর্দুতে তিনি উল্লেখযোগ্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এছাড়া আরও অন্যান্য ভাষায় জেবন্নেসা যথেষ্ট সুদক্ষ ছিলেন।
একবার পারস্যের বাদশা স্বপ্নের মধ্যেই কবিতার একটা ছত্র মুখস্থ করেন-“দুররে আবলাক কাসে কমদিদা মওজুদ'। বাক্যটির অর্থ হল সাদা-কাল মিশ্রিত রঙের মোতির প্রত্যক্ষদর্শী বিরল।' তিনি অনেক কাব্যবিদ ও কবিদের এ বাক্যের সাথে মিলিয়ে অর্থ, ছন্দ ও তাৎপর্যপূর্ণ আর একটি বাক্য তৈরি করতে আহ্বান করেন। অনেকেই করলেন বটে কিন্তু তা বাদশাহের পছন্দ হল না। অবশেষে তিনি সকলের পরামর্শে এ বাক্যটি হিন্দুস্তানে কবি ও কাব্যকারদের জন্য দিল্লির রাজদরবারে পাঠিয়ে দেন। দরবারের সকলেই যখন ইতস্ততঃ করেছেন তখন অন্তঃপুরে ভারত বিখ্যাত বিদূষী জেবন্নেসার কাছে তা পাঠান হল। তিনি একটু চোখ বুলিয়েই এ বাক্যের নিচে আর একটি বাক্য লিখে দিলেন- মাগার আশকে বুতানে সুরমা আলুদ-যার অর্থ হল, কিন্তু সুরমা পরা চোখের অশ্রুবিন্দুতে এ মোতির প্রাচুর্য।'
সাধারণ একটা বাক্যের সাথে জেবন্নেসা রচিত এ অসাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি বিজড়িত উচ্চ শ্রেণীর ছন্দ সৃষ্টিতে ভারতের জ্ঞানী-গুণীরা তো মুগ্ধ হয়েছিলেনই সে সাথে এ কবিতাটি যখন পারস্যে পৌছেছিল তখন পারস্যবাসী এত শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করে যে, তার জ্ঞানমুগ্ধ ও গুণমুগ্ধে অনেকে পুস্তক পুস্তিকায় তা নানাভাবে প্রকাশ করেছিলেন। পারস্যের পণ্ডিতবৃন্দ সুলতানকে অনুরোধ করেন এ বিখ্যাত নারীকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে। তাই তিনি জেবন্নেসাকে বিখ্যাত কবিকে দিয়ে লিখিত কবিতার মাধ্যমে তার মনের কথা জানালেন-তুরা এ্যায় মজেবী বে পরদা দিদান আরজু দারাম'অর্থাৎ হে চন্দ্রাপেক্ষা সুন্দরী, আমাদের ব্যবধান দূরীভূত হোক, পর্দার বাইরে আপনার দর্শনের আশা নিয়ে যেতে চাই।'
উত্তরে গোড়া (?) সম্রাটের গোড়া কন্যা লিখে পাঠালেন-বুয়ে গুলদার বারগে গুল পুশিদাহ আম দর সৌখন বিনাদ মোরা.....', অর্থাৎ পুষ্পের সুঘ্রাণের মত পুষ্পেই আমি লুকিয়ে আছি। আমায় যে কেহ দেখতে চায়, সে আমায় দেখুক আমারই লেখায়। এ রকম পর্দার পক্ষপাতিনী নারী হয়েও জেবন্নেসাকে আজ মর্মান্তিক ও ঘৃণ্য অভিযোগের শিকার হতে হয়েছে। বলাবাহুল্য জেবন্নেসা, রওশনআরা আর জাহানারা প্রভৃতি রমণীগণ পর্দা বজায় রেখে পাণ্ডিত্য অর্জনের যে ইতিহাস রেখে গেছেন তা চাপা দেয়া এবং তাদের পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক নিক্ষেপ করার প্রয়োজন এ জন্যেই যে যদি কোন শিক্ষিত নারী সমাজে প্রয়োজনীয় পর্দার পক্ষাবলম্বন করেন তাহলে উদ্দেশ্য যাদের সফল হবে না তারাই প্রমাণ করতে চান, কুরআন আর হাদীসের শিক্ষাপ্রাপ্ত পর্দায় থাকা রাজকুমারীরা পর্দায় থাকলেও বাস্তবে তাদের পর্দা ছিলনা, তাই যাকে তাকে প্রেম নিবেদন করেছেন।
সুতরাং তাদের মতে, যত দোষ যেন কুরআন আর হাদীসের শিক্ষা। অনেকের ধারণা এ ধরণের উপন্যাসের সৃষ্টি করে অনেকে চাইছেন, মুসলিম নারীকে এমন পর্যায়ে আনতে হবে যাতে তারা কুরআন-হাদীসের শিক্ষা থেকে দূরে সরে থাকেন এবং শরীয়ত প্রথা হতে মুক্তি নিয়ে অপর অসভ্য স্রোতের টানে উলঙ্গ অথবা অর্ধেলঙ্গ স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিণী এবং নকল উন্নতির শেষ সীমায় পৌছে ব্যভিচারিণী হয়ে ওঠেন। অবশ্য এ শ্রেণীর লেখকদের শ্রমের সার্থকতা আজ অনেকাংশে প্রমাণিত।
হাফেয, মাওলানা হযরত আলমগীরের চরিত্র বিকৃত করলে যেমন পরোক্ষভাবে কুরআন ও হাদীসকে অকেজো, নেশার সামগ্রী প্রতিপন্ন করে মুসলমান সমাজকে ধর্ম বিমুখ করা যাচ্ছে, ঠিক সে রকম মহীয়সী মহিলা হাফেযা জেবন্নেসাকেও যদি ভ্রষ্টা, চরিত্রহীনা প্রমাণ করা যায় তাহলে বিশেষতঃ মুসলিম নারী জাতিকেও কুরআন ও হাদীসের বিপরীত দিকে চালান সম্ভব হবে-এ চাতুর্যপূর্ণ মতলব নিয়েই ইতিহাসে বিষ প্রয়োগ করার পরিকল্পিত ব্যবস্থা।
আকীল খাকে জেবন্নেসার প্রণয়ী বলে লিখেছেন কিছু অমুসলমান লেখক। আর বঙ্কিমচন্দ্রের মতে জেবুন্নেসা নাকি মোবারক খাঁর অবৈধ প্রেমিকা ('রাজসিংহ' দ্রষ্টব্য)। আবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের বোন জাহানাকেও এ সামান্য সৈনিক মোবারক খার প্রেমিকা বলে দেখিয়েছেন সাহিত্য সম্রাটের দল। পিসি ও ভাইঝির একই ব্যক্তির সাথে ব্যভিচারের নেশার কথা বর্ণনা করে অনেকে কাগজের পাতায় ‘ইনভেনটরের খ্যাতি লাভ করেছেন। সত্য ইতিহাসের সংবাদ কিন্তু একেবারে এর বিপরীত। কুমারী জেবন্নেসার কুমারীত্বের বিশুদ্ধতা সম্বন্ধে এক ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতির অনুবাদ এখানে তুলে দিচ্ছি-“যেহেতু জেবন্নেসা দিবানিশি কাব্যানুশীলন ও পুস্তক অধ্যয়নের গবেষণায় রত থাকতেন এবং বিবাহ হলে যেহেতু স্বামী সেবা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যাবে ফলে অধ্যয়ন, গবেষণা ও কাব্য রচনার স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হবে বলে চিরজীবন কুমারী থেকে বিবাহের বর্তমান ঝাটের মধ্যে জড়াতে নিজের স্বাধীনতা সত্তাকে সায় দিতে পারেন নি।” [উর্দু গ্রন্থ ‘জেওয়ারে জেবন্নেসা' দ্রষ্টব্য)
কোন কোন লেখক জেবন্নেসাকে শিবাজীর পণয়-ভিখাররিণী বলতে বা বইয়ে লিখে নাটক ও যাত্রারূপে তা সমাজে প্রচারের উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দিতেও লজ্জানুভব করেননি। এতে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে গেছে।
আবার কোন কোন লেখক নাসীর খার সাথেও জেবন্নসার অবৈধ প্রেম ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সে সব লেখকের লেখার সময় মনে রাখা উচিত ছিল যে, তাদেরই মতে সম্রাট আওরঙ্গজেব নাকি খুবই গোঁড়া মুসলমান ছিলেন, আর গোঁড়া মুসলমানের মেয়েরা অবৈধ পুরুষ দেখতে পায়না, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। সুতরাং গোঁড়া আওরঙ্গজেবের হারেমে সংরক্ষিত রাজকন্যাদের অপর পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকতে পারে কি করে? তাই মনে হয়, ভেজাল দেয়ার উন্মাদনায় অসাবধানতামূলক কিছু গোলমাল থেকে গেছে।
হাফে জেবন্নেসা সম্বন্ধে সে যুগের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী লেখক ও কবিগণ তাদের কাব্য-কবিতায় যা লিখেছেন সেগুলো যাদের জানা আছে তারা অবশ্যই জেবন্নোসার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন সন্দেহ নেই। মির্জা সাঈদ আশরফ লিখেছন, “আল্লাহর বান্দাগণ যেমন তার উপাসনা করেন অথচ তাকে প্রত্যক্ষভাবে পান না, তেমনি জেবন্নেসার ভৃত্যগণ তার কাজ করত অথচ তাঁকে দেখতে পেতনা।"
ঐতিহাসিক নিয়ামত আলি খান লিখেছেন, “আল্লাহ নিজে অদৃশ্য থাকলেও তার গুণরাজির দ্বারা তিনি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ও প্রকাশিত। জেবন্নেসা পর্দার অন্তরালে অদৃশ্য থাকলেও দয়া দানে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ও প্রকাশিত।”
এগুলো সবই মুসলমানদের উদ্ধৃতি তাই অনেকের কাছে গ্রহণীয় নাও হতে পারে। তাই বিখ্যাত হিন্দু লেখক লক্ষ্মীরানায়ণের লেখার উদ্ধৃতি দিচ্ছি-“জেবন্নেসা তৈমুর বংশীয়া উজ্জ্বলতর আলোকবর্তিকা, এ যুগের নারীকূল মুকুটমণি! তার অধ্যবসায়, আরাধনা, কাব্য সাধনা ও ধর্মপ্রবণতা তাকে সুনামের অধিকারিণী করেছে। তার সুখ্যাতি অনেকের কাছে পবিত্র কাবা ঘরের মত। হযরত মহম্মদের পত্নী খাদেজার মত তিনি ছিলেন পাপ ও কলঙ্কশূন্য কুমারী।" জেবন্নেসা সম্পর্কে জানতে হলে বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত লক্ষ্মী নারায়ণ সংকলিত ‘গুলেরানা হস্তলিপি' যথেষ্ট হবে বলা যায়।
ভারতে সাম্প্রদায়িক মৈত্রী-মিলন স্থায়ী হলে গোড়ায় গলদ রেখে বাহ্যিক সমাধান করতে চাইলে তা হবে মূল্যহীন। বাস্তবে মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়তে হলে বিষাক্ত ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার পথ বন্ধ করতে হবে, কারণ ওটাও সাম্প্রদায়িকতার অন্যতম বীজ। আমাদের দেশে ঐতিহাসিক উপন্যাসের যিনি আবিষ্কারক অথবা প্রবর্তক তিনি হচ্ছেন শ্রীভূদেব মুখোপাধ্যায়। তার পরে আমাদের সর্ববরেণ্য সাহিত্য সম্রাট উপাধিপ্রাপ্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ইনিই ১৮৮২ খৃস্টাব্দে ‘রাজসিংহ' লিখে উপন্যাস মার্কা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
‘অঙ্গুরী বিনিময়' বইয়ে শিবাজীকে নায়ক আর ‘রোসিনারাকে নায়িকা করে ভূদেববাবু যা লিখেছেন তার স্রোতে আওরঙ্গজেবের কন্যা ‘রোসিনারা কে একেবারে পশু চরিত্রে নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ আওরঙ্গজেবের ‘রোসিনারা নামে কোন কন্যাই ছিল না। অনেকের ধারণা, ভূদেববাবুর ইতিহাসে প্রকৃত জ্ঞানের অভাবেই এত বড় ভুল হয়েছে। কিন্তু তা নয়, ভূদেববাবুর রচনায় বাচার একটা রাস্তা করা হয়েছে মাত্র। সেটা হচ্ছে এ, যদিও রোসিনারা নামে আওরঙ্গজেবের কোন কন্যা নেই তবুও এটা যে উপন্যাস। উপন্যাসে কল্পনার মিথ্যা পালিশ চড়ালে যেন অপরাধের কিছু নয়।
অতএব ঐতিহাসিক-উপন্যাসিকের মতে, প্রখ্যাত চরিত্রবতী জেবন্নেসাকেও চরিত্রহীনা বললেই বা দোষ হবে কেন? এমনিভাবে ১৯০৯ খৃস্টাব্দে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একটি বই লিখেছেন তার নাম ভারতের বিদূষী'। অবশ্য গঙ্গোপাধ্যায় মশায়ের গ্রন্থে জেবন্নেসা যে স্থান পেয়েছেন এটাই সৌভাগ্য (?) বলতে হবে। তবে তিনিও শিবাজীর প্রেম-প্রণয়ী বলে জেবন্নাসাকে চিত্রিত করেছেন। তেমনই ১৯১৮ খৃস্টাব্দে সুনীতি দেবীর "The Beautiful Princess" নামে একটি পুস্তকেও শিবাজীর প্রণয়িনী বলে জেবন্নেসার চরিত্রে কালিমা নিক্ষেপ হয়েছে। আজকাল নানা পত্র-পত্রিকায় এত বেশি উৎকট ঐতিহাসিক উপন্যাস সৃষ্টি হচ্ছে যে, নিরপেক্ষ পাঠকের সামনে যখন সেগুলো বার বার ফুটে ওঠে তখন অনেকরই মনে হয়, “একটা মিথ্যাকে বারংবার প্রচার করতে করতে তা সত্যে পরিণত হয়।
এছাড়া আমাদের বাংলা ভাষাতেও একটা প্রবাদ আছে, “যা রটে, তার কিছুও ঘটে। কিন্তু আজ প্রমাণিত সত্য হয়ত এটাই যে, “যা না ঘটে, তাও রটে।" প্রকৃতপক্ষে যাঁরা ঐতিহাসিক স্বীকৃতি লাভ করেছেন, যেমন কাফি খাঁ, মনুচি, তাভার্নিয়ের, স্যার যদুনাথ সরকার প্রভৃতি পণ্ডিতদের লিখিত ইতিহাসে এসব অভিযোগ বা অপরাধের ‘অ'ও নেই, বরং প্রশংসার প্রাচুর্য আছে। যদুনাথ সরকারের একটা পুস্তকের নাম শিবাজী' আর একটার নাম ‘ঔরঙ্গজেব'। কিন্তু এগুলোর মধ্যে এসব অলীক গল্পের কোন স্থান নেই। তবে আগামীকাল নতুন সংস্করণের বা নতুন মুদ্রণে কি হবে তা বলার স্পর্ধা আমাদের নেই।
যদুনাথ সরকার ১৯১৭ খৃস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে 'Modem Review' পত্রিকায় যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন তার শিরোনাম 'Love Affairs of Jebannessa'। তাতে তিনি জোরাল ভাষায় গুরু গম্ভীর ভঙ্গিমাতে প্রকাশ করেছেন-“এ সমস্ত কাহিনী একেবারে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।” আর একজন খ্যাতনামা চরিত্রকার শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় তাঁর মোঘল বিদূষী’ পুস্তকে এ সমস্ত প্রেম-কাহিনীকে মিথ্যা এবং কাল্পনিক বলেই শুধু লেখেননি বরং তা প্রমাণ করতেও সক্ষম হয়েছেন।
আওরঙ্গজেব নিজেই পছন্দ করে তার কন্যার নাম রেখেছিলেন জেবন্নেসা, অর্থাৎ ললনাশ্রী'। তিনি যখন কুরআন মুখস্থ করতেন তখন পুরাতন পড়া ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল কারণ তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। হাফেযা হওয়ার পর আরবী, ফারসী ও উর্দুতে তিনি উল্লেখযোগ্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এছাড়া আরও অন্যান্য ভাষায় জেবন্নেসা যথেষ্ট সুদক্ষ ছিলেন।
একবার পারস্যের বাদশা স্বপ্নের মধ্যেই কবিতার একটা ছত্র মুখস্থ করেন-“দুররে আবলাক কাসে কমদিদা মওজুদ'। বাক্যটির অর্থ হল সাদা-কাল মিশ্রিত রঙের মোতির প্রত্যক্ষদর্শী বিরল।' তিনি অনেক কাব্যবিদ ও কবিদের এ বাক্যের সাথে মিলিয়ে অর্থ, ছন্দ ও তাৎপর্যপূর্ণ আর একটি বাক্য তৈরি করতে আহ্বান করেন। অনেকেই করলেন বটে কিন্তু তা বাদশাহের পছন্দ হল না। অবশেষে তিনি সকলের পরামর্শে এ বাক্যটি হিন্দুস্তানে কবি ও কাব্যকারদের জন্য দিল্লির রাজদরবারে পাঠিয়ে দেন। দরবারের সকলেই যখন ইতস্ততঃ করেছেন তখন অন্তঃপুরে ভারত বিখ্যাত বিদূষী জেবন্নেসার কাছে তা পাঠান হল। তিনি একটু চোখ বুলিয়েই এ বাক্যের নিচে আর একটি বাক্য লিখে দিলেন- মাগার আশকে বুতানে সুরমা আলুদ-যার অর্থ হল, কিন্তু সুরমা পরা চোখের অশ্রুবিন্দুতে এ মোতির প্রাচুর্য।'
সাধারণ একটা বাক্যের সাথে জেবন্নেসা রচিত এ অসাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি বিজড়িত উচ্চ শ্রেণীর ছন্দ সৃষ্টিতে ভারতের জ্ঞানী-গুণীরা তো মুগ্ধ হয়েছিলেনই সে সাথে এ কবিতাটি যখন পারস্যে পৌছেছিল তখন পারস্যবাসী এত শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করে যে, তার জ্ঞানমুগ্ধ ও গুণমুগ্ধে অনেকে পুস্তক পুস্তিকায় তা নানাভাবে প্রকাশ করেছিলেন। পারস্যের পণ্ডিতবৃন্দ সুলতানকে অনুরোধ করেন এ বিখ্যাত নারীকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে। তাই তিনি জেবন্নেসাকে বিখ্যাত কবিকে দিয়ে লিখিত কবিতার মাধ্যমে তার মনের কথা জানালেন-তুরা এ্যায় মজেবী বে পরদা দিদান আরজু দারাম'অর্থাৎ হে চন্দ্রাপেক্ষা সুন্দরী, আমাদের ব্যবধান দূরীভূত হোক, পর্দার বাইরে আপনার দর্শনের আশা নিয়ে যেতে চাই।'
উত্তরে গোড়া (?) সম্রাটের গোড়া কন্যা লিখে পাঠালেন-বুয়ে গুলদার বারগে গুল পুশিদাহ আম দর সৌখন বিনাদ মোরা.....', অর্থাৎ পুষ্পের সুঘ্রাণের মত পুষ্পেই আমি লুকিয়ে আছি। আমায় যে কেহ দেখতে চায়, সে আমায় দেখুক আমারই লেখায়। এ রকম পর্দার পক্ষপাতিনী নারী হয়েও জেবন্নেসাকে আজ মর্মান্তিক ও ঘৃণ্য অভিযোগের শিকার হতে হয়েছে। বলাবাহুল্য জেবন্নেসা, রওশনআরা আর জাহানারা প্রভৃতি রমণীগণ পর্দা বজায় রেখে পাণ্ডিত্য অর্জনের যে ইতিহাস রেখে গেছেন তা চাপা দেয়া এবং তাদের পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক নিক্ষেপ করার প্রয়োজন এ জন্যেই যে যদি কোন শিক্ষিত নারী সমাজে প্রয়োজনীয় পর্দার পক্ষাবলম্বন করেন তাহলে উদ্দেশ্য যাদের সফল হবে না তারাই প্রমাণ করতে চান, কুরআন আর হাদীসের শিক্ষাপ্রাপ্ত পর্দায় থাকা রাজকুমারীরা পর্দায় থাকলেও বাস্তবে তাদের পর্দা ছিলনা, তাই যাকে তাকে প্রেম নিবেদন করেছেন।
সুতরাং তাদের মতে, যত দোষ যেন কুরআন আর হাদীসের শিক্ষা। অনেকের ধারণা এ ধরণের উপন্যাসের সৃষ্টি করে অনেকে চাইছেন, মুসলিম নারীকে এমন পর্যায়ে আনতে হবে যাতে তারা কুরআন-হাদীসের শিক্ষা থেকে দূরে সরে থাকেন এবং শরীয়ত প্রথা হতে মুক্তি নিয়ে অপর অসভ্য স্রোতের টানে উলঙ্গ অথবা অর্ধেলঙ্গ স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিণী এবং নকল উন্নতির শেষ সীমায় পৌছে ব্যভিচারিণী হয়ে ওঠেন। অবশ্য এ শ্রেণীর লেখকদের শ্রমের সার্থকতা আজ অনেকাংশে প্রমাণিত।