hadith book logo

চেপে রাখা ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪০

মীর জাফর, জগৎশেঠ, দেবীসিংহ

মীরজাফরঃ প্রচলিত ইতিহাসে শেখান হয়েছে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাই ভারতের স্বাধীনতা অস্তমিত হওয়ার মূল কারণ। কিন্তু আধুনিক যুগের বাস্তববাদী ঐতিহাসিক রতন লাহিড়ী মুর্শিদাবাদ জেলার সত্যিকারের ইতিহাসে লিখেছেন, “ঐতিহাসিকরা যার উপর প্রভূত অন্যায় করেছেন তিনি মীরজাফর আলি খাইনি অধিক বয়সে আফিমের নেশাগ্রস্ত হয়ে

পড়েন এবং দুই নর্তকী বেগমের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকেন। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হিসেবে এর ব্যয় অসম্ভব বেড়ে যায় এবং ক্রমে ইনি জগৎ শেঠদের ক্রীড়ানক হয়ে পড়েন এমতাবস্থায় তরুণ অনভিজ্ঞ নবাব সিরাজদ্দৌরা তাকে তার বিপক্ষে ষড়যন্ত্রকারী বলে আটক করেন। এতে ইনি সম্পূর্ণ সিরাজের বিরোধী পক্ষে চলে যান এবং পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবকে পরাজিত করতে ইংরাজকে সবিশেষ সাহায্য করেন।”

মীরজাফর দোষী কিন্তু মীরজাফরকে যত অপরাধী করে চিহ্নিত করা হয় তিনি তত অপরাধী ছিলেন না এ বেইমানীর ইনাম স্বরূপ ইনি শেষ বয়সে কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত হয়ে মার যান।” (পৃষ্ঠা পরিশিষ্ট ১০-১১)

জগৎশেঠঃ রতন লাহিড়ী বলেন, “সুযোগ সুভিধা, প্রভাব প্রতিপত্তি ও অর্থের জন্য কিছু মানুষ সব ধরনের অপরাধ করতে পারে, যাদের কাছে ন্যয়-নীতি, মান-সম্মান কিছুই নেই, যাদের একটা মাত্র সত্য ‘টাকা, যাদের একটাই ধর্ম ‘টাকা চাই আরও টাকা'-এ সম্প্রদায়ের প্রধান জগৎশেঠ।....এবার বহু পরিশ্রম করে এবং বহু অর্থব্যয় করে দেশকে সাম্রাজ্য বাদীদের হাতে বিক্রয় করে। এদের বাড়ীতেই বেশীর ভাগ ষড়যন্ত্র হয়েছিল।

এরাই অঢেল অর্থ ব্যয় করে নবাব সিরাজুদ্দৌলার প্রতিদ্বন্দীদের শক্তি বৃদ্ধি করে। এরাই কোম্পানীর সাথে ষড়যন্ত্রকারীদের যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এরাই নিজেদের লাভের জন্য স্রেফ নাফা কে নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ইংরাজদের হাতে বিক্রি করে দেন।...মীরজাফর সিংহাসনে বসেই বন্দী সিরাজের প্রাণনাশ করতে চাননি। এ শয়তানরা আর ক্লাইভের অনুরোধে বাধ্য হয়েই মীরজাফর সিরাজকে মীরনের তত্ত্বাবধানে পাঠান। তখন জগৎ শেঠ আর ক্লাইভের পিঠ চাপড়ানিতে মীরন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবকে মারার মত নৃশংস ও জঘণ্য কাজটি সম্পন্ন করেন।" (রতন লাহিড়ীর ঐ পুস্তক, পৃষ্ঠা পরিশিষ্ট বিভাগের ৮৯ ও ১০)

দেবীসিংহঃ রতন লাহিড়ীর ভাষায়, “ভারত বর্ষের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম পাষণ্ড, সব রকম পাপের, অত্যাচারের শ্রেষ্ঠ নায়ক কে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে সকলে এক বাক্যে বলবে দেবীসিংহ। এর নামে বহু গ্রামের অধিবাসী গ্রাম ত্যাগ করে পালাত। বহু স্তুতি উৎকোচ প্রদান করে তৎকালীন নায়েব দেওয়ানরেজা খাঁর কাছ থেকে পূর্ণিয়ার রাজস্ব আদায়-ভার গ্রহণ করেন। এঁর অত্যাচার শুনে ও দেখে স্বয়ং হিষ্টিংস একে বিতাড়িত করেন এবং কোম্পানীর রেকর্ডে এক দুষ্কর্মের বিবরণ লেখেন। কিন্তু কান্তবাবুর প্রচেষ্টায় এবং বিশাল ঘুষের ফলে সে কুখ্যাত দেবীসিংহ আবার মুর্শিবাবাদ জেলার রাজস্ব আদায়ের প্রধান হন।

ইনি ইংরেজ সিভিলিয়ানগণদের দেশীয় নারী ও ফরাসী মদ দিয়ে মুগ্ধ করে রেখে সমস্ত রাজস্বই প্রায় গ্রাস করতেন। পরে আরও উৎকোচ দিয়ে দিনাজপুরের নাবালক রাজার অভিভাবক রূপে রংপুর, দিনাজপুর, ইরাকপুরের ইজারা নিলেন এবং সমস্ত এলাকাটিকে তার চরম অত্যাচারে মূলভুমি করে তুললেন। প্রথমে ছোট ছোট জমিদারের, পরে প্রজাদের সমস্ত সম্পত্তি এমনকি অলঙ্কার কাপড়াদি জমি সব কিছু দখল করতে লাগলেন এবং এ সময়ে একদল সুদখোর মহাজনের সাহায্যে আরও শোষণ শুরু করলেন। এদের দিয়ে...শতকরা বার্ষিক ছয় টাকা সুদ আদায় করাত।' (মুর্শিদ কাহিন, পৃ ৩৪৯ নিখিলনথ কয়') ·

নিখিলনাথ রায়ের ভাষায়, “তাহার পর স্ত্রীলোকদিগের উপর যেরূপ অত্যাচার চলিত, তাহা স্মরণ করিতে গেলেও হৃদয় কাঁপে। যে দেশের কুমারীগণকে বিশ্বজননী ভগবতী বলা হয়, সেই সমস্ত কুমারীদিগকে তাহাদের পবিত্র নিকেতন হইতে বলপূর্বক প্রকাশ্য বিচারালয়ে আনয়ন করিয়া তাহাদের পবিত্রতা বিনষ্ট করা হইল।...স্বামীর নিকট হইতে পত্নীকে কাড়িয়া আনা হত। এ সময়ে কত লোকের যে সতীত্ব বিনষ্ট হইয়াছে তাহা কে বলিতে পারে? সে

সমস্ত স্ত্রী লোকদিগকে সাধারণের সমক্ষে উলঙ্গ করে বেত্রাঘাত করা হইত। তাহার পর সূচাগ্র বংশখণ্ড বক্রভাবে আনত করিয়া যুবতীগণের স্তনবৃন্তে বাঁধিয়া দিত। স্তিতিস্থাপক বংশগুলি স্ত্রীলোকদিগের স্তন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া ঋজু ভাব অবলম্বন করিত। পরে তাহাদের ক্ষতস্থানও গুল ও মশালের আগুনে দগ্ধ করিয়া যন্ত্রণার সীমা বৃদ্ধি করা হইতে। স্ত্রীলোকগণ যখন এরূপ অত্যাচার সহ্য করিয়া গৃহে প্রতিনিবৃত্ত হইতে তখন আত্মীয়স্বজনে তাহাদিগকে গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিত।” (মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ৩৫০-৩৫১),

রতন লাহিড়ী আরও বলেন, “এই শয়তান মুর্শিদাবাদের নসিপুর জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা ১৮০৫ সনে সপ্তদোজখ বা কুম্ভিপাক নরকপথে যাত্রা করেন।” (রতন লাহিড়ী, পরিশিষ্ট ২,৩ ও ৪ পৃষ্ঠা)