hadith book logo

চেপে রাখা ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৯

নবাবদের ইতিহাসে আর একটি সত্য অধ্যায়

নবাব মুর্শিদ কুলি খা থেকে নবাব আলিবর্দী, নবাব সিরাজদৌলা ও মীরকাশিম পর্যন্ত নবাবগণ তাদের চরিত্রের সুদৃঢ়তা বা কোমলতা, যোগ্যতা অথবা, সযোগ্যতার ইতিহাস কিভাবে রেখে গেছেন তা আলোচিত হল ও হচ্ছে। তারপর মীরজাফর থেকে শুরু করে নবাব ওয়ারিশ আলি পর্যন্ত যারাই নবাব হয়েছেন তাঁরা ইংরেজজের হাতের কলের পুতুল ছাড়া কিছু ছিলেন না। শুধু ভারতবাসীকে ধোকা দেয়ার জন্য নবাব মোবারকদ্দৌলাকে বসান হল নবাবী সিংহাসনে এবং ক্ষমতাহীন নবাবের কাছ থেকে ১৭৭০ খৃস্টাব্দের ২১শে মার্চ চিরদিনের জন্য বিনামূল্যে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী ছিনিয়ে নেয়া হল। অথচ জনসাধারণ জানল তিনি স্বেচ্ছায় দিয়েছেন। ১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদের টাকশাল কলকাতায় চলে গেল।

মুর্শিদাবাদ থেকে ১৭৯৩ সনে আদালত উঠিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হল এ খৃষ্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। তারপরে সিংহাসনে বসান হয় তাঁর পুত্র বাবরজঙ্গকে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই পুত্র আলিজাকে নবাব করা হয়। ১৮২৪ সনের ২৪ শে ডিসেম্বর আলিজার মৃত্যুর পর হুমায়ুনজাকে বসান হল। ইতিহাসে তাকে বিলাসী প্রমান করার জন্য তৈরি করান হল হাজারদুয়ারী প্রাসাদ। যার ভিতরে গেলেই পাওয়া যাবে নবাবদের বিলাসিতা ও নগ্ন নোংরামির নির্দশন। বিলাসিতা প্রমাণে ঘোড়া ও অন্যান্য জীব-জন্তু রাখার জন্যে একটা অত্যন্ত লম্বা ও অপ্রয়োজনীয় উঁচু আস্তাবল তৈরি করান হয়। যেটাকে দেখেই ভুল বশতঃ তদানন্তিন গভর্ণর জিজ্ঞেস করেছিলেন, ""Is It Nawab palace?" ১৮৩৮ সনে হুমায়ুনজাকে চুক্তিশর্ত লঙ্গণ করে ইংরেজ জানাল যে, বৃত্তিভোগী নবাব-বেগমদের মৃত্যুর পর তাদের উত্তরাধিকারীরা কোনও রকম বৃত্তি পাবে না।

ক্ষমতাহীন হুমায়ুনজা শোকে মুহামান হলেন। পরে মারাও গেলেন। তারপর তার নাবালক পুত্র ফেরাদুনজাকে বসান হল নবাবীর আসনে। একে একে সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হল। ১৮৬৯ খৃষ্টাব্দে ফেরাদুনজা স্বয়ং ইংল্যাণ্ডের গিয়ে কাতরকণ্ঠে আবেদন রাখলেন। কিন্তু ফল হল উল্টা। কাজ তো হলই না, দশ লক্ষ টাকা দিয়ে বলা হল, “আজ থেকে নবাব এবং নাজিম পদ আপনার রইল না।" ১৮৮৪ সনের ৫ই নভেম্বর ক্ষমতাহীন নবাব অশ্রুপত নয়নে পরলোকে গমন করলেন। এ একই দিনে তার স্ত্রীও শোকাহত হয়ে মারা যান।

তারপর কাঠের পুতুলের মত বসান হল হাসান আলীকে। তার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ওয়াসিফ আলী মির্জা। ওয়াসিফ আলীর মৃত্যুর পর তার পুত্র ওয়ারিশ আলী মির্জাকে বসান হয়। পরে তারও মৃত্যু হয়। উপরোক্ত তথ্যগুলোর প্রমাণ; মুর্শিদাবাদের ইতিহাস; শ্রীপ্রতিবার মৈত্র, পৃষ্ঠা ৭১-৭৬।

প্রচলিত মত অনুসরণ করে আমাদের শেখান হয়েছে, নবাব সিরাজউদ্দৌলা তথা ভারতের পতন হয়েছে তাঁর অযোগ্যতা এবং বিলাসিতার কারণে। এটা দায়ী, নাকি সিরাজদ্দৌলার অসাম্প্রদায়িক উদার রাজনীতি দায়ী? জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ কান্তবাবু, মানিকচাঁদ, রামাদ, দেবীসিংহ, নবকৃষ্ণ, কৃষ্ণকান্ত, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ, মীরজাফর প্রমুখ বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরা বিশ্বাস ভঙ্গ করে দেশকে তুলে দিয়েছেন ইংরেজের হাতে, পরিবর্তে তারা পেয়েছেন পার্থিব সুযোগ সুবিধার প্রাচুর্য।