১
চেপে রাখা ইতিহাস
লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৯
প্রকাশকের কথা
ইতিহাসকে জাতির দর্পণরূপে আখ্যায়িত করা হয়। এ দর্পণে প্রতিবিম্বিত হয় যে কোন একটি জাতির অতীত কর্মময় জীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক কর্মকান্ডের সাফল্য ব্যর্থতা, দোষ-ত্রুটির প্রতিচ্ছবি। এ রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক কর্মতৎপরতা সব সময়ই যে সাফল্যের গৌরবের চিহ্ন বহন করবে এ কথাও সঠিক নয়। এতে থাকতে পারে ত্রুটি-বিচ্যুতির গভীর ক্ষত-চিহ্ন। এতে অনুরণিত হয়ে উঠতে পারে, না-পাওয়ার শত-সহস্র যৌন-বেদনা।
এ সাফল্য ও ব্যর্থতাকে বুকে নিয়েই ইতিহাস কথা বয়ে নিয়ে যায় কাল থেকে কালান্তরে। উত্তরাধিকারীর ইতিহাসের এ রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ঘটনাবলীর চুলচেরা বিশ্লেষণে ভুল-ক্রটি পরিহার করে নতুন যা পথের সন্ধান পায়। এ কারণে ইতিহাসকে একটি জাতির উস ভূমিও বলা যায়। কালের যাত্রাপথে আমাদের ইতিহাস অতি প্রাচীন আর আমরা জাতি হিসেবে গৌরবোজ্জল ঐতিহ্যের অধিকারী। আমাদের ইতিহাসে রয়েছে কিংবদন্তীতুল্য কাহিনী এবং অবদান।
ইতিহাস কেবল অতীতের অন্ধকারে ফেলে আসা ঘটনাবলীর সমাহার নয়। কালের প্রেক্ষিতে অতীতের কোন এক অধ্যায়কে ধারণ করে থাকলেও তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া ও দুর্ণীরীক্ষ বর্তমানকে অতিক্রম করে অনন্ত ভবিষ্যত অবধি কার্যকারণসূত্রে ঘটনা-পরম্পরায় ক্রিয়াশীল থাকে। বলা চলে, কি ব্যক্তি জীবনে, কি সমাজ জীবনে, ইতিহাস পিছন থেকে নির্দেশনা দান করে চলমান ব্যক্তি বা জাতিকে পথের দিশা দিয়ে থাকে।
সমৃদ্ধ ইতিহাসের উজ্জ্বল আলো সঠিক কৌণিক অবস্থান থেকে সম্পাতিত হলে তাতে যেমন অভ্রান্ত পথের সন্ধান মিলে তেমনি ভাবী পথচারিদের পথ-পরিক্রমণও সহজ হয়। এখানেই ইতিহাস ও ইতিহাস সম্বলিত ঐতিহ্যের গুরুত্ব। কোন জাতির ইতিহাস না থাকা দুঃখজনক। কিন্তু ইতিহাস থাকা সত্বেও যে জাতি আপন ইতিহাস জানে না তারা সত্যিই হতভাগ্য। ইতিহাসের সঠিক তথ্য সম্পর্কে তাদের অনেকেই সচেতন নয় বিধায় ইতিহাসে পরিবেশিত বর্ণনা বা তথ্যকে ধ্রুব সত্য বলে মনে করে বিভ্রান্ত হন।
তাই অনুরূপভাবেই কুরআন সুন্নাহর প্রকৃত মর্যাদা ও গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে চান না। তাই সব কিছুকেই একাকার ও সম পর্যায়ের ভেবে ইতিহাস এবং কুরআন সুন্নাহ উভয়ের প্রতি অবিচার করে থাকে। আমরা ভুলে যাই, কোন বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বর্ণনার নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা সম্বন্ধে স্থির নিশ্চিত হতে হবে। বলাবাহুল্য ইতিহাস আমাদিগকে এ নিশ্চয়তা দান করতে পারে না। কেননা ইতিহাস বহুরূপী কখনও একচোখা।
ঐতিহাসিকের দৃষ্টিভঙ্গী এবং মানসিকতার প্রভাব এড়িয়ে চলার সাধ্য ইতিহাসের নেই এ জন্যই আমরা একই ঘটনার পরস্পর বিরোধী বর্ণনা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই, একই চরিত্রের বিভিন্ন চিত্র অংকিত হয় ইতিহাসের তুলিতে। একের তুলিতে যে ব্যক্তিত্ব যে চরিত্র অনন্য সাধারণ, মহিমাময় মহান, অন্যের তুলিতে সে চরিত্র কুৎসিত, কদর্য শয়তানের প্রতিক, এমন দৃশ্য ইতিহাসের বেলায় নিত্য-নৈমিত্তিক সত্য। বন্ধুর তুলিতে অতি কুৎসিত চরিত্রও অনিন্দ সুন্দর আবার শুর তুলিতে অতি সুন্দর চরিত্রও অতি কুৎসিত হয়ে থাকে।
তাই সঠিক ইতিহাসের সত্য তথ্য উদ্ধার করা অতি কঠিন। এজন্য জ্ঞানীরা বলেন, ইতিহাস জানা যত সহজ ইতিহাস বুঝা ততই কঠিন। অনেক সময় আমরা পুস্তকের পাতায় দেখতে পাই ঐতিহাসিকরা একজনকে কখনো ডুবিয়েছে, ভাসিয়েছে, উঠিয়েছে, নামিয়েছে। তাই অনেক সাধ্য, সাধনা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করেও কেহ ইতিহাসের প্রকৃত সত্য যে কি তা সুনিশ্চিত এবং সঠিক
করে বলতে পারেন না। ইতিহাসের এ ছলনা, গোলক ধাঁধায় আটকে তাই অনেকেরই ভরাডুবি হয়েছে। শত সাধ্য করেও ইতিহাসের বর্ণনায় অনেক সময় সন্ধেহাতীত এবং সঠিক বলে এ জন্যই মন্তব্য করা যায় না। মানব জীবনে ইতিহাসের কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই, এমন কথা বলা সঠিক হবে না। শুধু এটুকুই বলা যায় ইতিহাসের পথ বড়ই পিচ্ছিল। মুহূর্তের অসাবধানতায় পদে পদে একবারে বিভ্রান্তির গহীন খাদে পতিত হওয়ার আশংকা রয়েছে, তাই ইতিহাসের সংগীন পথে পথিককে অতি সতর্কতার সাথে চলতে হয়।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, জগতে মানবীয় মর্যাদা ও খ্যাতির সাথে সত্যের ভারসাম্য খুবই সামান্য রক্ষিত হতে দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, যে ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা এবং খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে যত বেশি উন্নত হন, তাকে কেন্দ্র করেই তত বেশী অলীক কল্প-কাহিনীর সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এজন্য ইতিহাস বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনকারী ইবনে খালদুন বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, যে ঘটনা পৃথিবীতে যত বেশী খ্যাতি ও জনপ্রিয় হবে, কল্প-কাহিনীর অলীকতা তত বেশী তাকে আচ্ছন্ন করবে।
পাশ্চাত্যের কবি গ্যাটে এ সত্যটিকে অন্য কথায় বলেন, মানবীয় মর্যাদার সর্বশেষ স্থল হল কল্প-কাহিনীতে রূপান্তর লাভ........। আজ যদি কোন সত্য সন্ধানী কেবলমাত্র ইতিহাসের কষ্টিপাথরে বিচার করে ইতিহাসে বর্ণিত ঘটনা পাঠ করতে চান তাহলে তাকে প্রায়ই নৈরাশ্য বরণ করতে হবে। ....এমনকি ইতিহাসের আবরণে বর্ণনা করা কিছু বিষয়বস্তু যা ইতিহাসের নামে সংকলিত হয়েছে তার অধিকাংশই ইতিহাস নয়। মনগড়া পক্ষপাতিত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুই ইতিহাসের রূপ ধারণ করেছে।
আমাদের আলোচ্য গ্রন্থ চেপে রাখা ইতিহাস এমনই একটি গ্রন্থ যাতে মুসলমানদের ইতিহাসকে যৌক্তিক আলোচনা করে সত্যিকার স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখান হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান, ইংরেজ বিতাড়নে মুসলমানদের ভূমিকা, ইত্যাদি নানান বিষয়। মুসলমানদের ইতিহাস বেশীর ভাগ বিকৃত করা হয়েছে উপমহাদেশে ইংরেজ আগমনের কাল থেকে। এবং এখানে মদদ জুগিয়েছিল বেশীর ভাগ হিন্দুরাই।
ধুরন্ধর ইংরেজ জাতি এ দেশে আগমনের পরেই তারা হিন্দু মুসলমানের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। তারা সফলতার লক্ষ্যে নানানভাবে হিন্দুদের এবং কোথাও মুসলমানদের দ্বারা এ গর্হিত কাজটি সফলতার সাথে করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই নানান পদবী সম্মানজনক সম্মানী প্রদানে তাদের নির্দেশিত ইতিহাস রচনার ফাদে অনেকেই ধরা দিয়েছিল। ইংরেজ জাতি চলে গেলেও সে ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে যা আলোচ্য পুস্তকের পাতায় পাতায় আলোচনা করা হয়েছে।
পলাশী যুদ্ধের পর, ইংরেজ দস্যুদের জুনিয়র পার্টনার সেকালের রাজা মহারাজা গোষ্ঠীর বংশধর কোলকাতায়ী বাবু বুদ্ধিজীবীরা মিলিতকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠেন, “বাঙ্গালার কোন ইতিহাস নেই। সুতরাং সিনিয়র পার্টনার ইংরেজ কর্মচারীদের আত্মপক্ষ সমর্থনে লেখা “সাফাই”-তথ্য অবলম্বনে প্রথম বাঙ্গালার ইতিহাস রচনা করেন হিন্দু জাগরণের বৃটিশপোষ্য পুরোধা পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র, ১৮৪৮ সালে।
বাংলার আসল ইতিহাসকে অস্বীকার করে বানোয়াট ইতিহাস বানানোর যে উদ্যোগ বিদ্যাসাগর মহাশয় গ্রহণ করেন তাকে আরো জোরদার করার লক্ষ্যে হিন্দু পুনর্জাগরণের ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র আহবান জানান বাবু বুদ্ধিজীবীদের কাছে, “বাঙ্গালার কোন ইতিহাস নাই। বাঙ্গালার ইতিহাস লিখিতে হইবে। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব। আমরা সকলে মিলিয়া লিখিব।" সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা লিখেছেনও। বাংলার ধ্বংসপ্রাপ্ত মুসলমান সমাজের বুকের উপর দাঁড়িয়ে তারা এক শতাব্দী
ধরে রাশি রাশি বানোয়াট দলীয় রঙ্গীন সূত্রে রচনা করেছেন ইতিহাসের। এ কাহিনী পূর্ণরুপ লাভ করে চলতি শতকের চল্লিশের দশকে, তৎকালীন কোলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাবু অধ্যাপকদের হাতে। তাই তারা এক দিকে সাড়ে পাঁচ শত বছর ব্যাপী মুসলিম শাসনামলের উজ্জ্বল দিকগুলোকে পাইকারীভাবে বাদ দিয়ে সর্বক্ষেত্রে সাধ্যমতো কলংক লেপন করেছেন এবং অন্যদিকে ইংরেজ শাসনামলে বৃটিশ-বর্ণহিন্দু যৌথ অভিযানে বাংলার মুসলমানদের ধ্বংস করার কাহিনীও গোপন করে গেছেন।
ত্রিশ-চল্লিশ দশকের যে দু-একজন মুসলিম সন্তান তাদের কাছে ইতিহাসের পাঠ গ্রহণের সুযোগ পান তারাও বাধ্য ছিলেন বাবুদের লেখা ইতিহাস মুখস্ত করে পরীক্ষায় ভাল ফল লাভের প্রয়োজনে তাদের মনোরঞ্জন উপযোগী উত্তরপত্র লিখতে। তবু চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকে উচ্চশিক্ষা প্রান্ত কিছু সংখ্যক মুসলমান ঐতিহাসিকের মনে বাবুদের বানোয়াট ইতিহাস প্রতিবাদের ঝড় তোলে। তাদের মধ্যে ড. আবদুর রহীম, ড. মোহর আলী, ড. হাসান জামান, ড. মমতাজুর রহমান তরফদার,
ড.আবদুল করীম, ড, এ, আর, মল্লিক, অধ্যাপিকা লতিফা আখন্দ, ড. সুফিয়া আহমদ, ড. শীরিন আখতার, ড. এনায়েতুর রহমান, ড. মঈনউদ্দিন খান, ড, এম, এফ, ইউ, মোল্লা ড. বজলুর রহমান খান প্রমুখ কয়েকজন কঠিন পরিশ্রম করে বাংলার ইতিহাসের যে তথ্যাবলী তুলে ধরেছেন, তাতে দিকপাল বাবু ঐতিহাসিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক চেহারা অত্যন্ত নগ্ন ও উৎকটভাবে ধরা পড়েছে। কিন্তু বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে এদের উদ্ধার করা তথ্যাবলী এখনো বাংলার মুসলিম তরুণদের হাতে পৌঁছানো হচ্ছে না। সাম্প্রতিক ও সমকালীন রাজনৈতিক ও অন্যবিধ কারণে বাবুদের রচিত বানোয়াট ইতিহাসেরই চর্বিত-চর্বণ এদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে গলধঃকরণ করিয়ে হীনমন্যতার শিকারে পরিণত করা হচ্ছে।
এমন কি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের চলতি শতকের ইতিহাসও বৃটিশ-বর্ণহিন্দু চক্রান্তের দরুণ ব্যাপক বিকৃতির হাত থেকে রেহাই পায়নি। আমি নিজে ইতিহাসের পন্ডিত বা ছাত্রও নই, একজন উৎসাহী পাঠক মাত্র। পাক ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস পড়তে গিয়ে যে প্রশ্নগুলো আমাকে পীড়া দিয়েছে, তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরো কিছু পড়াশোনা করেছি, চিন্তা-ভাবনা করেছি এবং সে চিন্তা-ভাবনাগুলোকে তুলে ধরেছি এ আশায় যে, বাংলার তরুণ সমাজ এ থেকে নিজেদের বর্ণাঢ্য উজ্জ্বল ইতিহাস, পূর্ব পুরুষের সৌর্য-বীর্যে মাহাত্ম্যমন্ডিত পরিচয় এবং নিকট অতীতে পরাক্রান্ত প্রতিবেশীদের মোকাবিলায় নিজেদের অসহায় পিতামহদের মর্মন্তুদ সংগ্রামের বীরত্বপূর্ণ কাহিনীর পরিপূর্ণ চিত্র উদ্ধারের প্রেরণা পাবেন।
এ কাজে বাংলার মাত্র কয়েক ডজন তরুণকেও যদি অনুপ্রাণিত করা সম্ভব হয়, আজকের ষড়যন্ত্রের এ উর্ণাজাল ফুৎকারে মিলিয়ে যাবে, এ বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট অবশ্যই কেটে যাবে। আর তা হলেই আমাদের শ্রম সার্থক হবে। তবে আল্লাহর অসীম রহমতে আশাতীত অল্প সময়েই আমাদের এ অনধিকার চর্চা ফলপ্রসু হবার আলামত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস বিভাগের অনেক শিক্ষক বর্তমানে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এ কাজে যারা অনবদ্য অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে। উল্লেখযোগ্য হলেন ড, মহর আলী। তার রচিত গ্রন্থ History of Muslin Bengal (পৃ, ১-১১১)
এ সমস্ত বায়োট ইতিহাসের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। কিন্তু বইটি ইংরেজি বিধায় বইয়ের তথ্য সম্পর্কে অনেকেই অবগত নয়। এ গ্রন্থটি মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমীর তরফ থেকে বাংলায় রূপান্তর করার ইনশাআল্লাহ ইচ্ছা রয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাস গবেষক ও সমালোচক আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা-তাঁর ইতিহাস বিষয়ক রচিত গ্রন্থ ইতিহাসের ইতিহাস, বজ্র কলম এবং চেপে রাখা ইতিহাস প্রভৃতি গ্রহে অনেক প্রাচীন ফারসী, ইংরেজী, আরবী, উর্দু, বাংলা, হিন্দি, প্রতি গ্রন্থ থেকে বহু পূরাতন দুর্লভ তথ্য উদ্ধার করেছেন, যা এতকাল লোক চোখের অন্তরালে ছিল। আমাদের ইতিহাস অর্থাৎ মুসলমানদের ইতিহাস ইসলাম বিদ্বেষীরা কিভাবে বিকৃত করেছে সে তথ্যই আলোচ্য গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। এতে আশা করা যায় বর্তমান ও আগামী দিনের পাঠক এবং গবেষকরা অনেক সত্য নির্দেশনাই পাবেন এবং তখন তাদের কাছে সত্য অসত্যের দ্বার উন্মোচিত হবে।
এ ব্যাপারে যে সাম্রাজ্যবাদের এ দেশীয় সহায়তাকারীদের রচিত ইতিহাস গ্রন্থে মুসলমানদের ইতিহাসের সঠিক চিত্র মেলেনা।” এখানেও বিভ্রান্তি। বর্তমানকালের গবেষণায় যখন অনেক অজানা তথ্য বের হতে শুরু করছে সেদিন বেশী দূরে নয়, যেদিন বাবুদের বানোয়াট ইতিহাস সৃষ্ট বিভ্রান্তি থেকে জাতি রেহাই পাবে। তাই আমরা এ লেখকের বইগুলো প্রকাশ করে দেশ এবং জাতির সামনে উপস্থাপন করছি।
এতে আশা করা যায় অতীত ইতিহাসের অনেক বানোয়াট কাহিনীর পরিসমাপ্তি হবে। মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমী এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিগত ২০০২ সনের ডিসেম্বরে এ লেখকের গবেষণাধর্মী লেখা চেপে রাখা ইতিহাস' বইটি স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে আল্লামা উপাধি প্রদান করে তার সুদীর্ঘ জীবন ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেছেন এবং তার কাছ থেকে দেশ ও জাতি আরো তথ্যপূর্ণ লেখা পাওয়ার আশা পোষণ করছেন।
বিনীত-
-মোহাম্মদ শামসুজজামান
মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমী
ঢাকা, ১৭-১-২০০৩ ঈসায়ী
এ সাফল্য ও ব্যর্থতাকে বুকে নিয়েই ইতিহাস কথা বয়ে নিয়ে যায় কাল থেকে কালান্তরে। উত্তরাধিকারীর ইতিহাসের এ রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ঘটনাবলীর চুলচেরা বিশ্লেষণে ভুল-ক্রটি পরিহার করে নতুন যা পথের সন্ধান পায়। এ কারণে ইতিহাসকে একটি জাতির উস ভূমিও বলা যায়। কালের যাত্রাপথে আমাদের ইতিহাস অতি প্রাচীন আর আমরা জাতি হিসেবে গৌরবোজ্জল ঐতিহ্যের অধিকারী। আমাদের ইতিহাসে রয়েছে কিংবদন্তীতুল্য কাহিনী এবং অবদান।
ইতিহাস কেবল অতীতের অন্ধকারে ফেলে আসা ঘটনাবলীর সমাহার নয়। কালের প্রেক্ষিতে অতীতের কোন এক অধ্যায়কে ধারণ করে থাকলেও তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া ও দুর্ণীরীক্ষ বর্তমানকে অতিক্রম করে অনন্ত ভবিষ্যত অবধি কার্যকারণসূত্রে ঘটনা-পরম্পরায় ক্রিয়াশীল থাকে। বলা চলে, কি ব্যক্তি জীবনে, কি সমাজ জীবনে, ইতিহাস পিছন থেকে নির্দেশনা দান করে চলমান ব্যক্তি বা জাতিকে পথের দিশা দিয়ে থাকে।
সমৃদ্ধ ইতিহাসের উজ্জ্বল আলো সঠিক কৌণিক অবস্থান থেকে সম্পাতিত হলে তাতে যেমন অভ্রান্ত পথের সন্ধান মিলে তেমনি ভাবী পথচারিদের পথ-পরিক্রমণও সহজ হয়। এখানেই ইতিহাস ও ইতিহাস সম্বলিত ঐতিহ্যের গুরুত্ব। কোন জাতির ইতিহাস না থাকা দুঃখজনক। কিন্তু ইতিহাস থাকা সত্বেও যে জাতি আপন ইতিহাস জানে না তারা সত্যিই হতভাগ্য। ইতিহাসের সঠিক তথ্য সম্পর্কে তাদের অনেকেই সচেতন নয় বিধায় ইতিহাসে পরিবেশিত বর্ণনা বা তথ্যকে ধ্রুব সত্য বলে মনে করে বিভ্রান্ত হন।
তাই অনুরূপভাবেই কুরআন সুন্নাহর প্রকৃত মর্যাদা ও গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে চান না। তাই সব কিছুকেই একাকার ও সম পর্যায়ের ভেবে ইতিহাস এবং কুরআন সুন্নাহ উভয়ের প্রতি অবিচার করে থাকে। আমরা ভুলে যাই, কোন বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বর্ণনার নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা সম্বন্ধে স্থির নিশ্চিত হতে হবে। বলাবাহুল্য ইতিহাস আমাদিগকে এ নিশ্চয়তা দান করতে পারে না। কেননা ইতিহাস বহুরূপী কখনও একচোখা।
ঐতিহাসিকের দৃষ্টিভঙ্গী এবং মানসিকতার প্রভাব এড়িয়ে চলার সাধ্য ইতিহাসের নেই এ জন্যই আমরা একই ঘটনার পরস্পর বিরোধী বর্ণনা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই, একই চরিত্রের বিভিন্ন চিত্র অংকিত হয় ইতিহাসের তুলিতে। একের তুলিতে যে ব্যক্তিত্ব যে চরিত্র অনন্য সাধারণ, মহিমাময় মহান, অন্যের তুলিতে সে চরিত্র কুৎসিত, কদর্য শয়তানের প্রতিক, এমন দৃশ্য ইতিহাসের বেলায় নিত্য-নৈমিত্তিক সত্য। বন্ধুর তুলিতে অতি কুৎসিত চরিত্রও অনিন্দ সুন্দর আবার শুর তুলিতে অতি সুন্দর চরিত্রও অতি কুৎসিত হয়ে থাকে।
তাই সঠিক ইতিহাসের সত্য তথ্য উদ্ধার করা অতি কঠিন। এজন্য জ্ঞানীরা বলেন, ইতিহাস জানা যত সহজ ইতিহাস বুঝা ততই কঠিন। অনেক সময় আমরা পুস্তকের পাতায় দেখতে পাই ঐতিহাসিকরা একজনকে কখনো ডুবিয়েছে, ভাসিয়েছে, উঠিয়েছে, নামিয়েছে। তাই অনেক সাধ্য, সাধনা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করেও কেহ ইতিহাসের প্রকৃত সত্য যে কি তা সুনিশ্চিত এবং সঠিক
করে বলতে পারেন না। ইতিহাসের এ ছলনা, গোলক ধাঁধায় আটকে তাই অনেকেরই ভরাডুবি হয়েছে। শত সাধ্য করেও ইতিহাসের বর্ণনায় অনেক সময় সন্ধেহাতীত এবং সঠিক বলে এ জন্যই মন্তব্য করা যায় না। মানব জীবনে ইতিহাসের কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই, এমন কথা বলা সঠিক হবে না। শুধু এটুকুই বলা যায় ইতিহাসের পথ বড়ই পিচ্ছিল। মুহূর্তের অসাবধানতায় পদে পদে একবারে বিভ্রান্তির গহীন খাদে পতিত হওয়ার আশংকা রয়েছে, তাই ইতিহাসের সংগীন পথে পথিককে অতি সতর্কতার সাথে চলতে হয়।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, জগতে মানবীয় মর্যাদা ও খ্যাতির সাথে সত্যের ভারসাম্য খুবই সামান্য রক্ষিত হতে দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, যে ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা এবং খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে যত বেশি উন্নত হন, তাকে কেন্দ্র করেই তত বেশী অলীক কল্প-কাহিনীর সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এজন্য ইতিহাস বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনকারী ইবনে খালদুন বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, যে ঘটনা পৃথিবীতে যত বেশী খ্যাতি ও জনপ্রিয় হবে, কল্প-কাহিনীর অলীকতা তত বেশী তাকে আচ্ছন্ন করবে।
পাশ্চাত্যের কবি গ্যাটে এ সত্যটিকে অন্য কথায় বলেন, মানবীয় মর্যাদার সর্বশেষ স্থল হল কল্প-কাহিনীতে রূপান্তর লাভ........। আজ যদি কোন সত্য সন্ধানী কেবলমাত্র ইতিহাসের কষ্টিপাথরে বিচার করে ইতিহাসে বর্ণিত ঘটনা পাঠ করতে চান তাহলে তাকে প্রায়ই নৈরাশ্য বরণ করতে হবে। ....এমনকি ইতিহাসের আবরণে বর্ণনা করা কিছু বিষয়বস্তু যা ইতিহাসের নামে সংকলিত হয়েছে তার অধিকাংশই ইতিহাস নয়। মনগড়া পক্ষপাতিত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুই ইতিহাসের রূপ ধারণ করেছে।
আমাদের আলোচ্য গ্রন্থ চেপে রাখা ইতিহাস এমনই একটি গ্রন্থ যাতে মুসলমানদের ইতিহাসকে যৌক্তিক আলোচনা করে সত্যিকার স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখান হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান, ইংরেজ বিতাড়নে মুসলমানদের ভূমিকা, ইত্যাদি নানান বিষয়। মুসলমানদের ইতিহাস বেশীর ভাগ বিকৃত করা হয়েছে উপমহাদেশে ইংরেজ আগমনের কাল থেকে। এবং এখানে মদদ জুগিয়েছিল বেশীর ভাগ হিন্দুরাই।
ধুরন্ধর ইংরেজ জাতি এ দেশে আগমনের পরেই তারা হিন্দু মুসলমানের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। তারা সফলতার লক্ষ্যে নানানভাবে হিন্দুদের এবং কোথাও মুসলমানদের দ্বারা এ গর্হিত কাজটি সফলতার সাথে করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই নানান পদবী সম্মানজনক সম্মানী প্রদানে তাদের নির্দেশিত ইতিহাস রচনার ফাদে অনেকেই ধরা দিয়েছিল। ইংরেজ জাতি চলে গেলেও সে ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে যা আলোচ্য পুস্তকের পাতায় পাতায় আলোচনা করা হয়েছে।
পলাশী যুদ্ধের পর, ইংরেজ দস্যুদের জুনিয়র পার্টনার সেকালের রাজা মহারাজা গোষ্ঠীর বংশধর কোলকাতায়ী বাবু বুদ্ধিজীবীরা মিলিতকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠেন, “বাঙ্গালার কোন ইতিহাস নেই। সুতরাং সিনিয়র পার্টনার ইংরেজ কর্মচারীদের আত্মপক্ষ সমর্থনে লেখা “সাফাই”-তথ্য অবলম্বনে প্রথম বাঙ্গালার ইতিহাস রচনা করেন হিন্দু জাগরণের বৃটিশপোষ্য পুরোধা পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র, ১৮৪৮ সালে।
বাংলার আসল ইতিহাসকে অস্বীকার করে বানোয়াট ইতিহাস বানানোর যে উদ্যোগ বিদ্যাসাগর মহাশয় গ্রহণ করেন তাকে আরো জোরদার করার লক্ষ্যে হিন্দু পুনর্জাগরণের ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র আহবান জানান বাবু বুদ্ধিজীবীদের কাছে, “বাঙ্গালার কোন ইতিহাস নাই। বাঙ্গালার ইতিহাস লিখিতে হইবে। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব। আমরা সকলে মিলিয়া লিখিব।" সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা লিখেছেনও। বাংলার ধ্বংসপ্রাপ্ত মুসলমান সমাজের বুকের উপর দাঁড়িয়ে তারা এক শতাব্দী
ধরে রাশি রাশি বানোয়াট দলীয় রঙ্গীন সূত্রে রচনা করেছেন ইতিহাসের। এ কাহিনী পূর্ণরুপ লাভ করে চলতি শতকের চল্লিশের দশকে, তৎকালীন কোলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাবু অধ্যাপকদের হাতে। তাই তারা এক দিকে সাড়ে পাঁচ শত বছর ব্যাপী মুসলিম শাসনামলের উজ্জ্বল দিকগুলোকে পাইকারীভাবে বাদ দিয়ে সর্বক্ষেত্রে সাধ্যমতো কলংক লেপন করেছেন এবং অন্যদিকে ইংরেজ শাসনামলে বৃটিশ-বর্ণহিন্দু যৌথ অভিযানে বাংলার মুসলমানদের ধ্বংস করার কাহিনীও গোপন করে গেছেন।
ত্রিশ-চল্লিশ দশকের যে দু-একজন মুসলিম সন্তান তাদের কাছে ইতিহাসের পাঠ গ্রহণের সুযোগ পান তারাও বাধ্য ছিলেন বাবুদের লেখা ইতিহাস মুখস্ত করে পরীক্ষায় ভাল ফল লাভের প্রয়োজনে তাদের মনোরঞ্জন উপযোগী উত্তরপত্র লিখতে। তবু চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকে উচ্চশিক্ষা প্রান্ত কিছু সংখ্যক মুসলমান ঐতিহাসিকের মনে বাবুদের বানোয়াট ইতিহাস প্রতিবাদের ঝড় তোলে। তাদের মধ্যে ড. আবদুর রহীম, ড. মোহর আলী, ড. হাসান জামান, ড. মমতাজুর রহমান তরফদার,
ড.আবদুল করীম, ড, এ, আর, মল্লিক, অধ্যাপিকা লতিফা আখন্দ, ড. সুফিয়া আহমদ, ড. শীরিন আখতার, ড. এনায়েতুর রহমান, ড. মঈনউদ্দিন খান, ড, এম, এফ, ইউ, মোল্লা ড. বজলুর রহমান খান প্রমুখ কয়েকজন কঠিন পরিশ্রম করে বাংলার ইতিহাসের যে তথ্যাবলী তুলে ধরেছেন, তাতে দিকপাল বাবু ঐতিহাসিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক চেহারা অত্যন্ত নগ্ন ও উৎকটভাবে ধরা পড়েছে। কিন্তু বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে এদের উদ্ধার করা তথ্যাবলী এখনো বাংলার মুসলিম তরুণদের হাতে পৌঁছানো হচ্ছে না। সাম্প্রতিক ও সমকালীন রাজনৈতিক ও অন্যবিধ কারণে বাবুদের রচিত বানোয়াট ইতিহাসেরই চর্বিত-চর্বণ এদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে গলধঃকরণ করিয়ে হীনমন্যতার শিকারে পরিণত করা হচ্ছে।
এমন কি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের চলতি শতকের ইতিহাসও বৃটিশ-বর্ণহিন্দু চক্রান্তের দরুণ ব্যাপক বিকৃতির হাত থেকে রেহাই পায়নি। আমি নিজে ইতিহাসের পন্ডিত বা ছাত্রও নই, একজন উৎসাহী পাঠক মাত্র। পাক ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস পড়তে গিয়ে যে প্রশ্নগুলো আমাকে পীড়া দিয়েছে, তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরো কিছু পড়াশোনা করেছি, চিন্তা-ভাবনা করেছি এবং সে চিন্তা-ভাবনাগুলোকে তুলে ধরেছি এ আশায় যে, বাংলার তরুণ সমাজ এ থেকে নিজেদের বর্ণাঢ্য উজ্জ্বল ইতিহাস, পূর্ব পুরুষের সৌর্য-বীর্যে মাহাত্ম্যমন্ডিত পরিচয় এবং নিকট অতীতে পরাক্রান্ত প্রতিবেশীদের মোকাবিলায় নিজেদের অসহায় পিতামহদের মর্মন্তুদ সংগ্রামের বীরত্বপূর্ণ কাহিনীর পরিপূর্ণ চিত্র উদ্ধারের প্রেরণা পাবেন।
এ কাজে বাংলার মাত্র কয়েক ডজন তরুণকেও যদি অনুপ্রাণিত করা সম্ভব হয়, আজকের ষড়যন্ত্রের এ উর্ণাজাল ফুৎকারে মিলিয়ে যাবে, এ বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট অবশ্যই কেটে যাবে। আর তা হলেই আমাদের শ্রম সার্থক হবে। তবে আল্লাহর অসীম রহমতে আশাতীত অল্প সময়েই আমাদের এ অনধিকার চর্চা ফলপ্রসু হবার আলামত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস বিভাগের অনেক শিক্ষক বর্তমানে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এ কাজে যারা অনবদ্য অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে। উল্লেখযোগ্য হলেন ড, মহর আলী। তার রচিত গ্রন্থ History of Muslin Bengal (পৃ, ১-১১১)
এ সমস্ত বায়োট ইতিহাসের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। কিন্তু বইটি ইংরেজি বিধায় বইয়ের তথ্য সম্পর্কে অনেকেই অবগত নয়। এ গ্রন্থটি মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমীর তরফ থেকে বাংলায় রূপান্তর করার ইনশাআল্লাহ ইচ্ছা রয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাস গবেষক ও সমালোচক আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা-তাঁর ইতিহাস বিষয়ক রচিত গ্রন্থ ইতিহাসের ইতিহাস, বজ্র কলম এবং চেপে রাখা ইতিহাস প্রভৃতি গ্রহে অনেক প্রাচীন ফারসী, ইংরেজী, আরবী, উর্দু, বাংলা, হিন্দি, প্রতি গ্রন্থ থেকে বহু পূরাতন দুর্লভ তথ্য উদ্ধার করেছেন, যা এতকাল লোক চোখের অন্তরালে ছিল। আমাদের ইতিহাস অর্থাৎ মুসলমানদের ইতিহাস ইসলাম বিদ্বেষীরা কিভাবে বিকৃত করেছে সে তথ্যই আলোচ্য গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। এতে আশা করা যায় বর্তমান ও আগামী দিনের পাঠক এবং গবেষকরা অনেক সত্য নির্দেশনাই পাবেন এবং তখন তাদের কাছে সত্য অসত্যের দ্বার উন্মোচিত হবে।
এ ব্যাপারে যে সাম্রাজ্যবাদের এ দেশীয় সহায়তাকারীদের রচিত ইতিহাস গ্রন্থে মুসলমানদের ইতিহাসের সঠিক চিত্র মেলেনা।” এখানেও বিভ্রান্তি। বর্তমানকালের গবেষণায় যখন অনেক অজানা তথ্য বের হতে শুরু করছে সেদিন বেশী দূরে নয়, যেদিন বাবুদের বানোয়াট ইতিহাস সৃষ্ট বিভ্রান্তি থেকে জাতি রেহাই পাবে। তাই আমরা এ লেখকের বইগুলো প্রকাশ করে দেশ এবং জাতির সামনে উপস্থাপন করছি।
এতে আশা করা যায় অতীত ইতিহাসের অনেক বানোয়াট কাহিনীর পরিসমাপ্তি হবে। মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমী এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিগত ২০০২ সনের ডিসেম্বরে এ লেখকের গবেষণাধর্মী লেখা চেপে রাখা ইতিহাস' বইটি স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে আল্লামা উপাধি প্রদান করে তার সুদীর্ঘ জীবন ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেছেন এবং তার কাছ থেকে দেশ ও জাতি আরো তথ্যপূর্ণ লেখা পাওয়ার আশা পোষণ করছেন।
বিনীত-
-মোহাম্মদ শামসুজজামান
মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমী
ঢাকা, ১৭-১-২০০৩ ঈসায়ী