hadith book logo

আল-গিরাস চিন্তার উন্মেষ ও কর্মবিকাশের অনুশীলন (১ম খন্ড)

লেখকঃ তাওফীক বিন খলফ বিন আবদুল্লাহ বিন আল-রেফায়ী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৮

প্রথমত: খতীবদেরকে সহায়তা প্রদান

ইসলামী বিশ্বের যেখানেই খতীবগণ তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন, মূলত তারা হয়ে আছেন একঘরে, একাকী সৈনিক, সমস্ত লড়াইয়ের দায়ভার একাই তারা বহন করছেন। স্থান-কাল নির্বিশেষে সকলে কেবল পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে তাদের কথা শ্রবণ করে যায়, কোথাও এগিয়ে যায় না। কিংবা ভাল সময় উপস্থিত হলে সাধুবাদ জানিয়ে দায়িত্ববোধের চরম পারাকাষ্ঠা দেখানো হয়েছে ভেবে তৃপ্তি লাভ করে। যারা তাদের পক্ষের বলে নিজেরা দাবী করে, তাদের অধিকাংশই বিষয়টি স্বীকার করে, কর্মে এর কোন বাস্তবতা দেখায় না। সামাজিক জীবনের অনুরূপ উক্ত খতীবের পারিবারিক জীবনেও একই অবস্থা বিরাজ করে, নিরন্তর দারিদ্রে্যর ঘানি টেনে যেতে হয় তাকে, অঢেল ঋণের বোঝা সর্বদা তাকে তটস্থ করে রাখে। সামাজিকভাবে এ বয়কট যাপন ব্যতীত কখনো কখনো তাকে ভোগ করতে হয় কারাগারের নি:সঙ্গ একাকীত্ব, চরম নিগ্রহ, কখনো কখনো তা শারীরিক শাস্তিভোগ ও হত্যা পর্যন্ত গড়ায়। ফলে খতীব তার অনুপস্থিতিতে রেখে যান অসহায় এক পরিবার, সহায়-সম্বলহীন ইয়াতীম সন্তান-সন্ততি, ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে যারা ক্রমাগত ভেঙ্গে পড়তে থাকে, তার স্ত্রীকে দ্বারে দ্বারে ঘুরে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এমন কঠিন অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময় চেপে রাখা ব্যতীত আমাদের কিছুই করার থাকে না। তবে, এত কিছুর পরও সমাজের এমন অনেক লোকের উপস্থিতি আমাদের চোখে পড়ে, যারা সত্যবাদী আলিমদেরকে মান্য করেন সর্বান্তকরণে, যদি তারা নবীর যুগে হত কিংবা নবী তাদের যুগে আসতেন, তবে অবশ্যই তারা তাকে মানত। তারা বিশ্বাস করেন, আলিমগণ নবীগণের উত্তরসূরী। কুরআনে এসেছে :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُونُوا أَنْصَارَ اللهِ كَمَا قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ لِلْحَوَارِيِّينَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللهِ فَآَمَنَتْ طَائِفَةٌ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَكَفَرَتْ طَائِفَةٌ فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آَمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ ﴿14﴾

‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী হও, যেমন মারইয়াম পুত্র ঈসা হাওয়ারীদেরকে বলেছিল, আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে? হাওয়ারীরা বলেছিল, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। অত:পর বনী ইসরাঈলের একদল ঈমান আনল এবং একদল কুফরী করল। তখন যারা ঈমান এনেছিল, তাদের শত্রুদের মুকাবিলায় তাদেরকে শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হল’। [সূরা ছাফ : ১৪]

হাদীসে প্রমাণ পাওয়া যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগতভাবে মানুষের কাছে সহযোগিতা চাইতেন। সুতরাং খতীব যদি তার নিজের জন্য সহযোগিতা কামনা করেন, কিংবা সাহায্য প্রার্থনা করেন অন্যান্য আলিম, খতীবদের জন্য, তবে কী প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা তাকে অসিদ্ধ বলে দাবী করব? বিশেষত: যখন তারা চূড়ান্ত প্রয়োজনগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন এ ধরনের তর্কের কোন মানে হয় না। আমরা কি এ অপেক্ষায় বসে থাকব যে, দেখা যাক উক্ত খতীব বা আলিম একাকী কতটা যেতে সক্ষম হন? সামাজিক এ হীন অবস্থার শিকার আলিম ও খতীব সমাজকে কি আমরা নির্দয় সমাজের হাতে ছেড়ে দিব? কুরআনে এসেছে :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ فَانْفِرُوا ثُبَاتٍ أَوِ انْفِرُوا جَمِيعًا ﴿71﴾ وَإِنَّ مِنْكُمْ لَمَنْ لَيُبَطِّئَنَّ فَإِنْ أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَالَ قَدْ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيَّ إِذْ لَمْ أَكُنْ مَعَهُمْ شَهِيدًا ﴿72﴾

‘হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন কর। অতঃপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল হয়ে বেরিয়ে পড় অথবা একসাথে বের হও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, যে অবশ্যই বিলম্ব করবে। সুতরাং তোমাদের কোন বিপদ আপতিত হলে সে বলবে, ‘আল্লাহ আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে উপস্থিত ছিলাম না’।’। [সূরা নিসা : ৭১-৭২]

অপর স্থানে এসেছে :

وَدَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ تَغْفُلُونَ عَنْ أَسْلِحَتِكُمْ وَأَمْتِعَتِكُمْ فَيَمِيلُونَ عَلَيْكُمْ مَيْلَةً وَاحِدَةً وَلاَ جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنْ كَانَ بِكُمْ أَذًى مِنْ مَطَرٍ أَوْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَنْ تَضَعُوا أَسْلِحَتَكُمْ وَخُذُوا حِذْرَكُمْ إِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا ﴿102﴾

‘কাফিররা কামনা করে যদি তোমরা তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও আসবাব-পত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও তাহলে তারা তোমাদের উপর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর যদি বৃষ্টির কারণে তোমাদের কোন কষ্ট হয় অথবা তোমরা অসুস্থ হও তাহলে অস্ত্র রেখে দেয়াতে তোমাদের কোন দোষ নেই। আর তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন করবে। নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদের জন্য প্রস্ত্তত করেছেন লাঞ্ছনাদায়ক আযাব।’ [সূরা নিসা : ১০২]

আমাদের আলিমদের জীবন ও আমাদের খতীবদের সম্মান ও মর্যাদা আমাদের সহায় সম্পত্তি রক্ষার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- সন্দেহ নেই। যদিও, পৃথিবীব্যাপী দাওয়াত পৌঁছে দেয়া, মানুষের উপর দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার প্রমাণ সাব্যস্ত করা এবং ঘরে ঘরে রিসালাতের বাণী ছড়িয়ে দেয়া এমন এক অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব, সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে সাহায্য না পেলেও তা পালন করে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন :

الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالاَتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلاَ يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلاَّ اللهَ وَكَفَى بِاللهِ حَسِيبًا ﴿39﴾

‘যারা আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয় ও তাঁকে ভয় করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না, [এ বাক্যটি পূর্বোল্লিখিত নবীদের বিশ্লেষণ।] আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আল্লাহই যথেষ্ট’। [সূরা আহযাব : ৩৯]

পাপিষ্ঠ একদল লোকের সামনে লূত আ. যখন চরম একাকীত্বে আক্রান্ত হলেন, তখন তিনি এই বলে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন যে,

لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آَوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ ﴿80﴾

‘সে বলল, ‘তোমাদের প্রতিরোধে যদি আমার কোন শক্তি থাকত অথবা আমি কোন সুদৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় নিতে পারতাম’!’। [সূরা হূদ : ৮০]

লূত ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত নবী। মুসলিম উম্মাহর উপর এটা কি অবশ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য নয় যে, তারা সঙ্গ দেয়ার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরাধীকারদের পাশে দাঁড়াবে?

‘পাশে দাঁড়ানো’, এমনকি, জাহিলী যুগেও একটি সামাজিক নিয়ম হিসেবে পালিত হত। বিশেষত: যখন তাদের কেউ বিপদে নিপতিত হত। আবু দাগনা আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যখন তিনি মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। তিনি তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এ আশ্রয়ে আবু বকর আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করলেন। কাফিরদের অনেকে, এভাবে, মাজলুম সাহাবীদেরকে সাহায্য করেছিলেন।

দুরন্ত সাহসী খালিদ বিন ওয়ালীদ যখন শত্রু ব্যুহে ঢুকে তছনছ করে দিতেন, কিংবা এককভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন, তখনো তিনি বিশেষ প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন এবং তাদেরকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে রাখতেন। যুদ্ধ নায়কদের নিকট এ ছিল যুদ্ধনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সুতরাং, খতীবদের জন্য আমরা একটি সংঘ তৈরি করব, এবং তার মাধ্যমে তাদেরকে সহায়তা করব- এটি নতুন কিছু নয় এবং এতে তাদের জন্য খুব বেশি কিছুও করা হবে না।