hadith book logo

আল-গিরাস চিন্তার উন্মেষ ও কর্মবিকাশের অনুশীলন (১ম খন্ড)

লেখকঃ তাওফীক বিন খলফ বিন আবদুল্লাহ বিন আল-রেফায়ী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮৬

প্রথম প্রকার : বৃহৎ মা’হাদ :-

কাফির এবং মুসলিম দেশগুলোতে খৃষ্টান মিশনারি কাজ করছে- এমন লোকদের উপর খুবই ক্ষিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে আগ্রহী একজনের সাথে আমার সেদিন দেখা হল। তিনি খুবই উত্তেজিত ছিলেন... এমন অনেকের সাথে প্রায়ই দেখা হয়...

মুসলিম দেশে ছড়িয়ে পড়া পাপাচার নিয়ে খুবই শংকিত এবং তা প্রতিরোধের জন্য কাজ করতে আগ্রহী-এমন লোকদের সাথে আমার প্রায় সাক্ষাৎ হয়...

এমন অনেক ছাত্রের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, যারা বলে মসজিদে খুতবার সুযোগ পেলে তারা তাদের আগ্রহ-উদ্দীপনা মানুষের মনে ঢেলে দিত...

এইভাবে এই আগ্রহী-উদ্দীপ্ত ব্যক্তিগুলো নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। তারা পরিকল্পিত কোনো কাজের অংশ হয়ে তাদের মেধা উদ্দীপনাকে কাজে লাগাতে পারছে না।

কিন্তু কতদিন নষ্ট হবে এই সব নিখাদ আবেগ ও বিরল প্রতিভাগুলো?

কতদিন? একটি দীর্ঘ এবং বেদনাদায়ক প্রশ্ন ....

আমাদেরকে এই প্রশ্নের সমাধান বের করতেই হবে, তাদের প্রতিভা ও আবেগকে একটা গঠনমূলক কাজে লাগাতে হবে.. অসঠিক পথে গিয়ে তাকে নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।

ব্যক্তিগতভাবে অনেকে কাফিরদেরকে মুসলমান বানানোর জন্য খুব আগ্রহী হতে পারে এবং আল্লাহর তৌফিক থাকলে তার হাতে অনেক অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করতেও পারে।

ব্যক্তিগতভাবে অনেকে সৎ কজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে।

শরীয়তের বিধানাবলী সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিদের আগ্রহ থাকতেই পারে যে, তারা মিম্বারে চড়ে মানুষদেরকে দীনের কথা শোনাবেন, খতীব হবেন ... !

শরীর চর্চা বিশেষজ্ঞ কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী হয়ে মুসলিম যুবকদের শরীর চর্চায় সময় দিতে পারেন।

কিন্তু এই সব আগ্রহ-উদ্দীপনাগুলো কি অচিরেই ঝিমিয়ে পড়বে না? একদিন নিসেত্মজ হয়ে যাবে না? যদি এই উদ্দীপনাগুলোকে টিকিয়ে রাখা যেত তাহলে কি তা আরো অনেক বেশী ফলদায়ক হত না?

এই সব ব্যক্তিগত প্রতিভা, আগ্রহ ও চিন্তাগুলোকে যদি একটি সঠিক পদ্ধতিঋদ্ধ তৎপরতায় নেওয়া যায়, সংগঠন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদিরূপে আরো বড় পরিসরের কর্মতৎপরতায় জড়ানো যায় তাহলে কি তা আরো অনেক বেশী ফলদায়ক ও স্থায়ী হবে না?

তাই বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মাঝে ইসলাম প্রচার কেন্দ্র, নানা সম্প্রদায়ের দায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নানা সম্প্রদায়ের মাঝে সংলাপ কেন্দ্র কিংবা নানান সম্পদ্রায়ের সংস্কৃতি বিনিময় কেন্দ্র- এই পাঁচটি চিন্তা ও পরিকল্পনার একটি খসড়া নিয়ে আমি এখানে আলোচনা করছি।

কেন্দ্রের লক্ষ্য হবে, অমুসলিম নারী-পুরুষদেরকে ইসলমের দাওয়াত দিতে সক্ষম এক দল দায়ী তৈরি করা।

পাঠকাল : পাঠকাল হবে দুই শিক্ষাবর্ষ। ছয় মাসও হতে পারে। সফলভাবে এই শিক্ষাকাল শেষ করতে পারলে শিক্ষার্থীকে দাওয়াতী প্রশিক্ষণের উপর ডিপ্লোমার সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।

সিলেবাস :

প্রথমত : কুরআন

ছাত্রকে সম্পূর্ণ কুরআনের সঠিক কিরাআত শিক্ষা দেওয়া

সম্ভব হলে শিক্ষার্থীকে ২৮, ২৯, ৩০ এই তিন পারা হিফজ করানো

সূরা বাকারা, আলে ইমরানের তাফসীর এবং যাদের পক্ষে মুখস্ত করা সম্ভব, তাদের জন্য বিভিন্ন ধর্ম, সংলাপ, দাওয়াতের সাথে সম্পর্কিত আয়াতগুলোর তাফসীর এবং সাথে ছাবাবে নুযূলের পাঠ।

দ্বিতীয়ত : আকীদা : অর্থাৎ ইসলামী আকীদার মৌলিক বিষয়গুলো, বিশেষত যে সব ক্ষেত্রে অন্যান্য বিকৃত ধর্মের সাথে ইসলামী আকীদার সংঘাত রয়েছে।

তৃতীয়ত : হাদীস: অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়া ওয়াজিব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী... ইত্যাদি সম্পর্কিত সহীহ হাদীসগুলো বিশদ ব্যাখ্যার সাথে পাঠদান।

চতুর্থত : ফিকাহ : আহলে কিতাব ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি? এই সব বিষয়ে ফিকাহর মূল বিষয়গুলোর পাঠ দান।

পঞ্চমত : দাওয়াতী পদ্ধতির পরিভাষা শিক্ষা দান এবং সাথে প্রেক্টিক্যাল প্রশিক্ষণ।

ষষ্ঠত : নানা ধর্মের সংলাপ নিয়ে লিখিত অমুসলিমদের গ্রন্থগুলো-উদাহরণত: লাকির বাতরছুন ও জোসেফ জারিনী লিখিত ‘উৎসাহী সংলাপ’- গ্রন্থ কিভাবে মুকাবেলা করবে তা শিক্ষা দান।

সপ্তমত : ধর্মের ইতিহাস।

অষ্ঠমত : তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব।

নবম : ‘কেন আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম’ ‘কি বিষয় এই লোকদেরকে, অন্যান্য ধর্ম গ্রহণ না করে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করল?’ ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা।

দশম : কুরআন ও সুন্নার বৈজ্ঞানিকতা।

একাদশতম : ইসলাম সম্পর্কে সংশয় ও তার নিরসন।

দ্বাদশ : অন্যান্য মতাদর্শ ও ধর্মের দুর্বলতার জায়গাগুলো চি ‎‎‎‎ হ্নত করা।

ত্রয়দশ : গ্রাজুয়েশন থিসিস।

চতুর্থদশ : ব্যক্তিগত পর্যায়ে দাওয়াতী তৎপরতা।

পঞ্চদশ : অমুসলিমদের সাধারণ পাঠ দান।

এই মা’হাদের ফলাফল :

প্রথমত : ব্যক্তিগত উদ্দীপনা ও দাওয়াতী তৎপরতাগুলোকে একটি পদ্ধতিসম্মত দাওয়াত বা একটি দাওয়াতী পদ্ধতি ও সমষ্টিগত তৎপরতায় রূপান্তরিত করা। এইভাবে এই ক্ষেত্রে মা’হাদের ভূমিকা অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ পদ্ধতিগত দাওয়াতের ব্যবস্থা না করা গেলে আসলে তেমন ভাল ফলাফল আশা করাও মুশকিল। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা দায়ী মুসলিম ও দাওয়াতকৃত অমুসলিমের মাঝে একটা ব্যক্তিগত ফলাফলহীন বিতর্কই থেকে যায়। ক্ষেত্র বিশেষে তা ঝগড়াঝাটিতেও অবসিত হয়।

কিন্তু দায়ীর যদি অন্যান্য ধর্মের ইতিহাস বিশ্বাস সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকে এবং তিনি সংলাপের মূলনীতি ও পদ্ধতি সম্পর্ক সম্যক অবগত হন তাহলে সংলাপ দ্রুত একটা আশা ব্যাঞ্জক ফলাফল তৈরি করবে। তিনি খুব সহজেই তার হৃদয়ে ও মনের অন্দর মহলে ঢুকে পড়তে পারবেন।

দ্বিতীয়ত : গ্রাজুয়েটদেরকে বাস্তব মাঠে নামানো। এই ক্ষেত্রে অমুসলিম কোম্পানী বা যে সব কোম্পানীগুলোতে অমুসলিম শ্রমিকরা কাজ করে, তার মালিক পক্ষের সাথে একটা চুক্তিতে আসা যেতে পারে কিংবা তাদের সাথে একটা বুঝাবুঝির জায়গায় গিয়ে সেখানে অমুসলিমদের মাঝে কাজ করা যেতে পারে। এইভাবে যখন তারা শ্রমিকদের আচরণ-নৈতিকতায় তাদের দাওয়াতের সুফল দেখতে পাবে তখন তাদের উদ্দীপনা আরো বৃদ্ধি পাবে।

কিংবা দায়ীদেরকে অমুসলিমদের বসবাস অঞ্চলগুলোতে দাওয়াতী সফরে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত : অমুসলিমদের দাওয়াত বিষয়ে সমৃদ্ধ প্রকাশনা তৈরি করা। এই ক্ষেত্রে যে সব প্রকাশনা আছে তা মূলত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল এবং তা অনেকটা প্রতিরক্ষামূলক। কিন্তু আমরা যে প্রকাশনার চিন্তা করছি তা হবে বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন ভাষা ও ধর্মের লোকদের জন্য, তাদের চিন্তাগত স্তরের সাথে সামাঞ্জস্য রেখে। তাছাড়া তার চরিত্র প্রতিরক্ষামূলক না হয়ে হবে সম্প্রসারণমূলক। যেমন কুরআনে এসেছে :

وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا ﴿81﴾.

‘আর বল, ‘হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল’। [সূরা বনী ইসরাইল : ৮১]

এই মা’হাদ পরিকল্পনা মূলত, অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের সবার যে একটা দায়িত্ব আছে, অনেককে সেই দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে।

এভাবে একটি মা’হাদ প্রতিষ্ঠিত হলে তার থেকে এবং তাকে কেন্দ্র করে এই ধরনের আরো অনেক মা’হাদ তৈরি হবে এবং প্রতিটি মাহাদই আমাদেরকে এই দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করবে।

ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার দাওয়াত, খুতবা দানের সাথে এমন পরিকল্পিত দাওয়াতী তৎপরতা, মা’হাদ প্রতিষ্ঠা করে তার একটা স্থায়ী রূপের ব্যবস্থা করার সাথে কোনো তুলনা হয়?