hadith book logo

আল-গিরাস চিন্তার উন্মেষ ও কর্মবিকাশের অনুশীলন (১ম খন্ড)

লেখকঃ তাওফীক বিন খলফ বিন আবদুল্লাহ বিন আল-রেফায়ী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

প্রবেশিকা

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম

বইটির সূচনায় পাঠকের সামনে আমি কয়েকটি প্রশ্ন তুলে ধরতে চাই।

এই বইটি- একটি অভূতপূর্ব চিন্তার প্রবর্তনা কিংবা নতুন প্রস্তাবনার ইশতেহার হিসেবে- নতুন কিছু বহন করছে কি? কিংবা আমাদের লক্ষ্য ও তার উপায়গুলো অনুসন্ধানের ব্যাপারে এর কিছুমাত্র কি ভূমিকা রয়েছে? নাকি তা কেবল বাকপটুত্ব সর্বস্ব জাবরকাটার ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি? না-কি তা এমন কিছু উপস্থাপন করছে, যা ইতিপূর্বেই ইসলামী সাহিত্যের এলাকায় স্থান করে নিয়েছে?

বইটি কি তোমার জীবনের যাবতীয় অনুষঙ্গে, সানুপুঙ্খে, তোমার বিশ্বস্ত সঙ্গী হবে? তোমার গৃহে, আড্ডায় বান্ধব পরিবেষ্টিত অবস্থায় তোমার যাপন-সঙ্গী হবে? কিংবা যখন তুমি প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছ, অথবা কর্মতৎপরতায় মুখর সময় যাপন করছ, মৃত্যু শয্যায় শায়িত অথবা কবরের নি:সীম অন্ধকারে নিমজ্জমান- এমন সব কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে কি বইটি তোমার সঙ্গী হবে?

বইটি কি তোমার আত্মশক্তিতে সঞ্চার করবে এমন এক অভূতপূর্ব মনোবল, ফলে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অনুষঙ্গে, তুমি সক্ষম হবে ইসলামের সজীবতার স্পন্দন ছড়িয়ে দিতে?

বইটি কি তোমার অর্জন-ইন্দ্রিয় জাগিয়ে তুলবে? ফলত তুমি কুরআন ও নববী বাণী এমন এক প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে আয়ত্ব করবে যে, বছর গড়িয়ে-এমনকি কখনো কখনো তাৎক্ষণিক কিছু মুহূর্ত অতিক্রম করে- জন্ম দিবে গঠনমূলক, কল্যাণকর এবং কিয়ামত দিবস অবধি অব্যাহত কিছু কাজের?

জগৎ ও পার্থিবের সঙ্কট তোমাদের উপর যতই চেপে বসুক, অক্টপাস হয়ে ঘিরে ধরুক নিকোষ অন্ধকার, এবং সৌভাগ্য ও সফলতার সকল দরজা বন্ধ হয়ে যাক তোমাদের জন্য- বইটি তারপরও কি তোমাদের জন্য একটি কল্যাণকর বিবর্তন সৃষ্টির মন্ত্রে উজ্জীবিত করবে?

কালের এমন ক্রান্তিকালে বইটি কি তোমার মাঝে এই অভূতপূর্ব বিশ্বাস সঞ্চার করবে যে, দীনের নতুন উপস্থাপনে- কপর্দক ও ন্যুনতম অবস্থান শূন্য হয়েও- তুমি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে?

আমার প্রিয় ভাই ! আমার এ যাত্রায় সঙ্গী হওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত কি তোমার ধৈর্য অব্যাহত থাকবে?

সূচনা বক্তব্যের এই অভাবিত রীতি ও কিছুটা প্রথাবিরোধিতায় তুমি হয়ত অবাক হচ্ছো। সন্দেহ নেই, অন্যান্য গ্রন্থের শুরুতে যে রীতিতে ভূমিকা লিখা হয়, এ তার চেয়ে ব্যতিক্রম। এ কেবল তারই সচেতন ইঙ্গিত যে, বইটি হাজির অন্যান্য বইয়ের তুলনায় রীতিবিরুদ্ধ করে উপস্থাপন করা হবে। এ হচ্ছে বই ও তার লেখকের তাৎক্ষণিক ও কর্মতৎপরতামূলক বিচার-বিশ্লেষণ, এবং ইসলামী গ্রন্থগারে নতুন নতুন যে গবেষণা-প্রকাশনার সংযোজন হচ্ছে এ তার মাঝে মৌলিকত্ব নিয়ে হাজির হবে। জ্ঞানগত চিন্তা-গবেষণা ও কর্মতৎপরতা এবং বিতর্কের মতবাদের এলাকায় বইটি নিজেকে উপস্থাপন করবে একটি সম্পূর্ণ নতুন আবেদন ও আহবান নিয়ে। এবং ইসলামী ধ্যান-ধারণা সমাজের আপামর স্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সঞ্চার-নীতি মালা হতে পাঠক কতটা উপকৃত হচ্ছেন, এটি তারও একটি নিপাট বিচার হবে।

এই উদ্যানের- ইসলামী মূল্যবোধ ও বিশ্বাস সঞ্চারের- প্রতিটি নীতিমালা সানুপুঙ্খে অধ্যয়নের পর, এই ভূমিকা তুমি পুন:অধ্যয়ন করে নিবে। যদি এই অংশের ভূমিকা নামটি যথার্থ হয়ে থাকে, তবে আশা করি, আমার অনুরোধ তুমি ফেলবে না।

আমি সচেতনভাবে তোমাকে জানিয়ে দিতে চাই যে, এই বইটি পাঠ শেষে তোমার কাছ থেকে আমার আকাঙ্ক্ষা কেবল এটুকুই নয় যে, তুমি পরিণত হবে একজন বিশুদ্ধ সংস্কারক ব্যক্তিত্বে, অঢেল দানে তুমি ভরিয়ে দিবে তোমার আশপাশ, কিংবা নিজেকে তুমি উন্নীত করবে তাকওয়ার অতুলনীয় এক উচ্চতায় ; বরং, আল্লাহর কাছে আমাদের কায়মনোবাক্য প্রার্থনা থাকবে যে, এর পাঠ শেষে তুমি পরিণত হবে সকল ইমামদের ইমামে, বরিত হবে মুত্তাকীদের অগ্রগণ্যরূপে।

وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا .

‘আমাদের পরিণত করুন মুত্তাকীগণের ইমামে।’ [সূরা ফুরকান : আয়াত ৭৪]

তুমি এ বইয়ের কোথাও, কোন ছত্রে, এমন কিছু খুঁজে পাবে না, প্রথাগত ভাষায় যাকে বলা হয় অসত্যের সাথে সত্যের বিতর্ক, কিংবা নিরেট বিশুদ্ধ কালচার, নির্জীব চিন্তা ও জ্ঞানের চর্চা ; বরং, এ হচ্ছে সদা কল্যাণে ধাবমান এক জীবনময়তা, কিংবা বলো, জীবনের প্রতিটি পরতে কল্যাণের বিস্তার। অথবা, সদা প্রবাহিত সাদাকায় জীবনকে অনন্ত প্রবাহে বিধৌত করণ। এই বই ও তার আলোচনার- সূচনা হতে সমাপ্তি অবধি- এই হচ্ছে একমাত্রিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। যদিও তোমার বিবেক ও অনুভূতির সীমান্তে তা নাড়া দিবে প্রবলভাবে, মুহুর্মূহ আবেদনে কাঁপিয়ে দিবে তাকে, তবে তার একান্ত লক্ষ্য থাকবে কর্মের এলাকায় চিন্তার সচেতন নিরীক্ষা এবং জীবনের সদা তৎপরতায় কর্মের বিশুদ্ধকরণ।

আমি তো আশা রাখি, তোমার জীবনে তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কথা বলে উঠবে, দিক নির্দেশক উচ্চারণে ভরিয়ে তুলবে তোমার জীবন, তার উচ্চারণ হবে সাদাকায়ে জারিয়ার উচ্চারণ ; যেদিন তুমি তোমার রবের দরবারে হাজির হবে-বিনত হয়ে তার সামনে দন্ডয়মান হবে, সেদিন যেন এগুলো তোমার পক্ষে সাক্ষী হয়ে উচ্চারণ করতে পারে। এমন উচ্চারণ, যা তোমার দু চোখকে শীতল করবে, এক পরম পাওয়ায় তোমার চোখ জুড়িয়ে দিবে।

য়াসীরা নাম্নী জনৈকা মুহাজির নারী বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘তোমাদের দায়িত্ব তাসবীহ, তাহলীল ও আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করা। আর তোমরা আঙ্গুলগুলো বেঁধে রাখ, কারণ, সেগুলোকে প্রশ্ন করা হবে, এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এবং তোমরা গাফিল থেক না, ফলে রহমতের কথা ভুলে বস না।’ [তিরমিযী : ৩৫৮৩]