১
আল-গিরাস চিন্তার উন্মেষ ও কর্মবিকাশের অনুশীলন (১ম খন্ড)
লেখকঃ তাওফীক বিন খলফ বিন আবদুল্লাহ বিন আল-রেফায়ী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৮৩
উনবিংশতিতম বপন: ইসলামী পাঠাগার
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ﴿1﴾
পড়, তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। [সূরা আলাক : ১]
وَمَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ عَلَى بَشَرٍ مِنْ شَيْءٍ قُلْ مَنْ أَنْزَلَ الْكِتَابَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوسَى نُورًا وَهُدًى لِلنَّاسِ تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا وَعُلِّمْتُمْ مَا لَمْ تَعْلَمُوا أَنْتُمْ وَلاَ آَبَاؤُكُمْ قُلِ اللهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ ﴿91﴾
‘আর তারা আল্লাহকে যথার্থ সম্মান দেয়নি, যখন তারা বলছে, আল্লাহ কোন মানুষের উপর কিছুই নাযিল করেননি। বল, ‘কে নাযিল করেছে সে কিতাব, যা মূসা নিয়ে এসেছে মানবজাতির জন্য আলো ও পথনির্দেশস্বরূপ, তোমরা তা বিভিন্ন কাগজে লিখে রাখতে, তোমরা তা প্রকাশ করতে আর অনেক অংশ গোপন রাখতে; আর তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল যা জানতে না তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষ’? বল, ‘আল্লাহ’। তারপর তাদেরকে ছেড়ে দাও, তারা তাদের অযাচিত সমালোচনায় খেলতে থাকুক।’ [সূরা আনআম : ৯১]
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال , قال عليه الصلاة والسلام : اكتبوا لأبي شاه .
‘আবু শাহকে লিখে দাও’। [বুখারী : ২৪৩৪, মুসলিম : ১৩৫৫]
ইসলামী পাঠাগারের বিকাশ-উত্তরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কারণ ইসলামী পাঠাগার হচ্ছে দাওয়াতের মারকায আর দাওয়াত নির্দিষ্ট একটি কর্ম-শৈলী ও পদ্ধতির নাম। অনুরূপ ইসলামী পাঠাগর চলতি বাজারের অংশও বটে। তাই বাজার ধরা ও বাজারজাত করার জন্য পাঠাগার কর্তৃপক্ষের নানা কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এই কালে মানুষ যখন পার্থিবমুখী এবং আখিারাত বিমুখ হচ্ছে তখন ইসলামী পাঠাগার দিয়ে পাঠক ধরা ব্যাপারটা সহজ কোনো কর্ম নয়। তাই ইসলামী পাঠাগার কর্তৃপক্ষকে আরো অনেক বেশী সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে।
পাঠাগার কর্তৃপক্ষ বা যারা পাঠাগার চালান তারা এই সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন- এই ধারণাটা ঠিক না। পাঠাগার ভিজিট করলেই যে কেউই বিষয়টা অতিসহজে টের করতের পারবেন। প্রশ্ন করলেই বুঝতে পারবেন অনেক দিন যাবত পাঠাগারে নতুন কোনো সংযোজন নেই।
তবে আমার মতে আমরা এই সব সমালোচনা করে, নতুন বই দিয়ে, পাঠাগারে শ্রী বৃদ্ধিতে অংশগ্রহণ করে...ইত্যাদি নানাভাবে পাঠাগারে বিকাশ উন্নয়নে সযোগিতা করতে পারি।
ইসলামী চিন্তার প্রচার প্রসার সমাজে বদ্ধমূল করার ক্ষেত্রে ইসলামী পাঠাগারের কোনো বিকল্প নাই। সুতরাং এই বিষয়টি আমলে আনতেই হবে। কোনো অজুহাত দাঁড় করিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
ইসলামী পাঠাগারের জন্য আমরা অনেক কিছুই করতে পারি, তেমনি ইসলামী পাঠাগার আমাদের অনেক কিছুই দিতে পারে। ইসলামী পাঠাগারের সফলতার উপর অনেকটা নির্ভর করে ইসলামী দাওয়াতের সফলতা।
ইসলামী পাঠাগারের বিকাশ-উত্তরণের জন্য আমি এখানে একটা কর্ম তালিকা দিচ্ছি :
ইসলামী আকীদা বিরোধী বই-পুস্ত্তক এবং সিডি থেকে পাঠাগারকে পুত-পবিত্র রাখা।
উম্মাহর পূনর্জাগরণ ও আকীদার উন্মেষ ঘটায়- এমন সাহিত্যকে প্রমোট করা।
ইসলামী শরীয়ার ক্ল্যাসিক ও উদ্ধৃতিমূলক গ্রন্থগুলোর জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগ রাখা এবং সেখান থেকে শর্তসাপেক্ষে বই নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা। এতে আগ্রহী হয়ে ক্লাসিক বড় বড় গ্রন্থগুলো সংগ্রহে অসমর্থ তরুণ গবেষকরা অনেক উপকৃত হবে। এই ক্ষেত্রে ইসলামী পাঠাগার অন্যান্য জেনারেল পাঠাগারের সাথে সহযোগিতা বিনিময় করতে পারে।
এই এলাকার ইসলামী চিন্তাবিদদের প্রমোট করা। সে ক্ষেত্রে পাঠাগার তাদের দিয়ে এই সংক্রান্ত বিষয়ে পাঠ ও কর্মশালার আয়োজন করতে পারে। তাদের লেখা বইপুস্তকগুলো প্রচার করতে পারে। সেগুলো কিনে প্রতীকী একটা মূল্য ধরে তা বিক্রি করতে পারে বা কোনো ডোনার ধরে তাকে দিয়ে খরিদ করিয়ে বিনামূল্যে তাদের বইগুলো বিতরণ করতে পারে।
পাঠাগারের প্রশাসনিক প্যাডে ও সিলসহ পত্রে সময়ের মূল ধারার গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবিদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। তাদের প্রকাশনার খোঁজখবর রাখা। তাদের নতুন কোনো প্রকাশনা প্রমোট করার মত হলে প্রমোট করা কিংবা বিরোধিতা করার মত হলে সেটা করা।
প্রবীণ (অর্থাৎ বাস্তবে প্রবীণ) ও নবীন (অর্থাৎ চিন্তার সৃষ্টি হিসেবে নবীন) বুদ্বিজীবিদের খুঁজে বের করা।
একবার পাকিস্তানের রাওলপিন্ডিতে আমার কিছু আলিমের সাথে পরিচয় ঘটে। তারা সবাই বেশ বিজ্ঞ আলিম। কিন্তু জানা গেল তারা নান গ্রাম বা মফস্বলের অধিবাসী। তাই তাদের কেউ চিনে না, তেমন গুরুত্ব পায় না এবং এক সময় দেখা যাবে এইভাবেই অন্য অনেকের মত তারাও হারিয়ে যাবেন।
আমার বিশ্বাস ইসলামী পাঠাগার এই ধরনের ব্যক্তিত্বদের খুঁজে বের করে তাদের প্রমোট করতে পারে, তাদের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে পারে। দ্বিতীয় খন্ডের শেষের দিকে আমি এই বিষয়ে, স্বতন্ত্র একটি অধ্যায়ে বিশদ আলোচনা করব।
প্রতিভাবান কিছু ছাত্রকে- একজন হলেও- সহযোগিতা করা। পাঠাগার, অর্থ দিয়ে, বইপুস্তক দিয়ে, পড়াশোনার আসবাব কিনে দিয়ে... ইত্যাদি নানানভাবে তাদের সহযোগিতা করতে পারে। পাঠাগার তার মুনাফার অংশ থেকে এই খাতে ব্যয় করবে।
বিদ্যমান দেশের অমুসলিম বুদ্ধিজীবি বিশেষত প্রাচ্যবিদদের মাঝে ইসলাম প্রচার, ইসলামের সঠিক ধারণা পৌঁছানোর জন্য পাঠাগারের বিশেষ একটি বিভাগ থাকতে পারে।
বিষয়টি অনেক বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ হলেও খুব স্বল্প পরিশ্রমে ও ব্যয়ে তা আদায় করা সম্ভব। এই বিভাগটাতে যা যা থাকা জরুরী তা হচ্ছে :
পাঠাগার কর্তৃপক্ষকে অন্যান্য দেশের ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করে ইংরেজীতে দক্ষ গবেষক ও দায়ীদের আনানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ইসলামী দাওয়াতের সাথে সম্পর্কিত গবেষণাধর্মী বইপুস্তক অডিও ভিডিও সিডি সংগ্রহ করা।
পাঠাগারের পাশে বা ভিতরে বা মসজিদ থাকলে মসজিদের কামরায় এই জাতীয় ভিডিওগুলো প্রদর্শনের জন্য একটি অডিটরিয়াম বানানো।
আরব বা অনারব ইসলামী বুদ্ধিজীবি গবেষকদের সাথে যোগাযোগ করা, তাদেরকে সেমিনার, পাঠশালা, কর্মশালা পরিচালনার জন্য দাওয়াত করে আনা।
আমি আশা করি এভাবে এবং এই মানের পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা গেলে ইসলামী দাওয়াতী মিশনে তা অনেক বড় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাই ইসলামী পাঠাগার প্রতিষ্ঠা-বিকাশ-উত্তরণে সবার মনযোগী হওয়া উচিৎ। এই ক্ষেত্রে ডোনারদের এগিয়ে আসা উচিৎ।
সবশেষে আমি এই সংক্রান্ত প্রশ্নের একটা তালিকা দিচ্ছি, যা দ্বারা পরীক্ষা করা যাবে ইসলামী পাঠাগারের বিকাশ-উত্তরণ। প্রশ্নগুলোকে পাঠাগার বিকাশ-উন্নতির পরিমাপ যন্ত্র বলা যায়। :
প্রশ্ন : ইসলামী পাঠাগার কি তার প্রকাশনা প্রচারের ক্ষেত্রে, টেলিভিশন, ইন্টারনেট .. ইত্যাদি আধুনিক উপায়গুলো গ্রহণ করেছে?
প্রশ্ন : ইসলামী দাওয়াতের প্রচার প্রসার ও বানিজ্যিক ক্ষেত্রে ইসলামী পাঠাগারগুলো কি পরস্পর সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার, নার্সারী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্যমাধ্যমিক... সব পর্যায়ের মাদরাসাগুলোয় কাজ করছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার কি কারাগার, মাদকাসাক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র... নারী কারাগার... ইত্যাদি স্থানগুলোতে ঢুকতে পেরেছে? মূলত এই স্থানগুলো হচ্ছে তওবার জায়গা, পড়াশোনা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য খুবই উর্বর স্থান।
প্রশ্ন : পাঠাগার কি বিভিন্ন সম্মেলন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মঞ্চ .. ইত্যাদি জায়গাগুলোয় ঢুকতে পেরেছে? মূলত এই সব জায়গায় ঢুকতে পারা খুব জরুরী
প্রশ্ন : পাঠাগার কি সেনা অনুশীলনকেন্দ্রগুলোতে ঢুকতে পেরেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার কি তার কর্মকান্ড ও গৃহীত দাওয়াতী ও বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলোর নিখুঁত কোনো হিসাব করে রেখেছে? অনুরূপ তার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করা নব্য মুসলিম, হিদায়াত পাওয়া ও তাওবা করা মুসলমানদের কোনো হিসাব, সে অনুসারে তার পরবর্তী দায়িত্বগুলোর কোনো পরিস্যংখ্যান আছে তার কাছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার, যে সব ইসলামী প্রকাশনা বিরল সেখানে শাখা খুলতে পেরেছে, কিংবা প্রত্যক্ষ শাখা খোলা সম্ভব না হলে অন্য কোনো উপায়ে সেখানে ইসলামী প্রকাশনা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার ইন্টারন্যাশনাল যোগাযোগ সংস্থাগুলোর সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার মূল বই বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে শো-রুম নিতে পেরেছে, যাতে ইসলামী প্রকাশনা সর্বস্তরের মানুষের সংগ্রহ-নাগালের মধ্যে থাকে, সর্বস্তরের মানুষের কাছে তা সহজে পৌঁছতে পারে?
প্রশ্ন : পাঠাগার স্থায়ী কোনো বই মার্কেট গড়তে পেরেছে?
আমরা স্বীকার করছি যে ইসলামী পাঠাগারকে সবসময়ে সব স্থানে মূল ধারার মুকাবিলা করে চলতে হয়। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে ইসলামী পাঠাগার যেন কখনোই খরাক্রান্ত না হয়। মুসলিম দেশগুলোতে তো সাধারণত বই অনেক কম পঠিত হয়। বই তেমন গুরুত্ব পায় না। মানুষজন নানান অযথা কাজে সময় নষ্ট করে। অথচ পাশ্চাত্যে দেখা যায় ওয়েটিংরুম, বাসের যাত্রী আসন.. সবস্থানে মানুষ বই হাতে নিয়ে বসে আছে। মুসলিম শিশু অন্য সব উপহার পেলেও খুব কম সময়েই বই উপহার পেয়ে থাকে।
এটা একটি কমন সমস্যা। একাডেমিক ছাত্ররা তাদের একাডেমিক বইপত্র ছাড়া তেমন পড়াশোনা করে না, ডাক্তাররা তাদের পুরানো জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, ইঞ্জিনিয়ার সৃষ্টিশীল এই কালটাতে কোনোভাবেই আন্তরিকভাবে যাপন করতে পারে না এবং ছাত্র-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার জুমার সময় মসজিদে এসেই টের পান যে তাদের খতীবের কাছে দেবার মত নতুন কিছু নাই।
অথচ এই উম্মাহর ধর্মগ্রন্থই কিনা শুরু হয়েছে ‘ইকরা’ ‘পড়’ বাক্য দ্বারা।
তার উৎস ক্ষেত্রের নাম ‘কিতাব’ ‘বই’।
তার রব সর্বজ্ঞানী
তার নবী ‘মানুষকে কল্যাণ শিক্ষাদানকারী’ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
পড়, তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। [সূরা আলাক : ১]
وَمَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِذْ قَالُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ عَلَى بَشَرٍ مِنْ شَيْءٍ قُلْ مَنْ أَنْزَلَ الْكِتَابَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوسَى نُورًا وَهُدًى لِلنَّاسِ تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا وَعُلِّمْتُمْ مَا لَمْ تَعْلَمُوا أَنْتُمْ وَلاَ آَبَاؤُكُمْ قُلِ اللهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ ﴿91﴾
‘আর তারা আল্লাহকে যথার্থ সম্মান দেয়নি, যখন তারা বলছে, আল্লাহ কোন মানুষের উপর কিছুই নাযিল করেননি। বল, ‘কে নাযিল করেছে সে কিতাব, যা মূসা নিয়ে এসেছে মানবজাতির জন্য আলো ও পথনির্দেশস্বরূপ, তোমরা তা বিভিন্ন কাগজে লিখে রাখতে, তোমরা তা প্রকাশ করতে আর অনেক অংশ গোপন রাখতে; আর তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল যা জানতে না তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষ’? বল, ‘আল্লাহ’। তারপর তাদেরকে ছেড়ে দাও, তারা তাদের অযাচিত সমালোচনায় খেলতে থাকুক।’ [সূরা আনআম : ৯১]
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال , قال عليه الصلاة والسلام : اكتبوا لأبي شاه .
‘আবু শাহকে লিখে দাও’। [বুখারী : ২৪৩৪, মুসলিম : ১৩৫৫]
ইসলামী পাঠাগারের বিকাশ-উত্তরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কারণ ইসলামী পাঠাগার হচ্ছে দাওয়াতের মারকায আর দাওয়াত নির্দিষ্ট একটি কর্ম-শৈলী ও পদ্ধতির নাম। অনুরূপ ইসলামী পাঠাগর চলতি বাজারের অংশও বটে। তাই বাজার ধরা ও বাজারজাত করার জন্য পাঠাগার কর্তৃপক্ষের নানা কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এই কালে মানুষ যখন পার্থিবমুখী এবং আখিারাত বিমুখ হচ্ছে তখন ইসলামী পাঠাগার দিয়ে পাঠক ধরা ব্যাপারটা সহজ কোনো কর্ম নয়। তাই ইসলামী পাঠাগার কর্তৃপক্ষকে আরো অনেক বেশী সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে।
পাঠাগার কর্তৃপক্ষ বা যারা পাঠাগার চালান তারা এই সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন- এই ধারণাটা ঠিক না। পাঠাগার ভিজিট করলেই যে কেউই বিষয়টা অতিসহজে টের করতের পারবেন। প্রশ্ন করলেই বুঝতে পারবেন অনেক দিন যাবত পাঠাগারে নতুন কোনো সংযোজন নেই।
তবে আমার মতে আমরা এই সব সমালোচনা করে, নতুন বই দিয়ে, পাঠাগারে শ্রী বৃদ্ধিতে অংশগ্রহণ করে...ইত্যাদি নানাভাবে পাঠাগারে বিকাশ উন্নয়নে সযোগিতা করতে পারি।
ইসলামী চিন্তার প্রচার প্রসার সমাজে বদ্ধমূল করার ক্ষেত্রে ইসলামী পাঠাগারের কোনো বিকল্প নাই। সুতরাং এই বিষয়টি আমলে আনতেই হবে। কোনো অজুহাত দাঁড় করিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
ইসলামী পাঠাগারের জন্য আমরা অনেক কিছুই করতে পারি, তেমনি ইসলামী পাঠাগার আমাদের অনেক কিছুই দিতে পারে। ইসলামী পাঠাগারের সফলতার উপর অনেকটা নির্ভর করে ইসলামী দাওয়াতের সফলতা।
ইসলামী পাঠাগারের বিকাশ-উত্তরণের জন্য আমি এখানে একটা কর্ম তালিকা দিচ্ছি :
ইসলামী আকীদা বিরোধী বই-পুস্ত্তক এবং সিডি থেকে পাঠাগারকে পুত-পবিত্র রাখা।
উম্মাহর পূনর্জাগরণ ও আকীদার উন্মেষ ঘটায়- এমন সাহিত্যকে প্রমোট করা।
ইসলামী শরীয়ার ক্ল্যাসিক ও উদ্ধৃতিমূলক গ্রন্থগুলোর জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগ রাখা এবং সেখান থেকে শর্তসাপেক্ষে বই নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা। এতে আগ্রহী হয়ে ক্লাসিক বড় বড় গ্রন্থগুলো সংগ্রহে অসমর্থ তরুণ গবেষকরা অনেক উপকৃত হবে। এই ক্ষেত্রে ইসলামী পাঠাগার অন্যান্য জেনারেল পাঠাগারের সাথে সহযোগিতা বিনিময় করতে পারে।
এই এলাকার ইসলামী চিন্তাবিদদের প্রমোট করা। সে ক্ষেত্রে পাঠাগার তাদের দিয়ে এই সংক্রান্ত বিষয়ে পাঠ ও কর্মশালার আয়োজন করতে পারে। তাদের লেখা বইপুস্তকগুলো প্রচার করতে পারে। সেগুলো কিনে প্রতীকী একটা মূল্য ধরে তা বিক্রি করতে পারে বা কোনো ডোনার ধরে তাকে দিয়ে খরিদ করিয়ে বিনামূল্যে তাদের বইগুলো বিতরণ করতে পারে।
পাঠাগারের প্রশাসনিক প্যাডে ও সিলসহ পত্রে সময়ের মূল ধারার গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবিদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। তাদের প্রকাশনার খোঁজখবর রাখা। তাদের নতুন কোনো প্রকাশনা প্রমোট করার মত হলে প্রমোট করা কিংবা বিরোধিতা করার মত হলে সেটা করা।
প্রবীণ (অর্থাৎ বাস্তবে প্রবীণ) ও নবীন (অর্থাৎ চিন্তার সৃষ্টি হিসেবে নবীন) বুদ্বিজীবিদের খুঁজে বের করা।
একবার পাকিস্তানের রাওলপিন্ডিতে আমার কিছু আলিমের সাথে পরিচয় ঘটে। তারা সবাই বেশ বিজ্ঞ আলিম। কিন্তু জানা গেল তারা নান গ্রাম বা মফস্বলের অধিবাসী। তাই তাদের কেউ চিনে না, তেমন গুরুত্ব পায় না এবং এক সময় দেখা যাবে এইভাবেই অন্য অনেকের মত তারাও হারিয়ে যাবেন।
আমার বিশ্বাস ইসলামী পাঠাগার এই ধরনের ব্যক্তিত্বদের খুঁজে বের করে তাদের প্রমোট করতে পারে, তাদের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে পারে। দ্বিতীয় খন্ডের শেষের দিকে আমি এই বিষয়ে, স্বতন্ত্র একটি অধ্যায়ে বিশদ আলোচনা করব।
প্রতিভাবান কিছু ছাত্রকে- একজন হলেও- সহযোগিতা করা। পাঠাগার, অর্থ দিয়ে, বইপুস্তক দিয়ে, পড়াশোনার আসবাব কিনে দিয়ে... ইত্যাদি নানানভাবে তাদের সহযোগিতা করতে পারে। পাঠাগার তার মুনাফার অংশ থেকে এই খাতে ব্যয় করবে।
বিদ্যমান দেশের অমুসলিম বুদ্ধিজীবি বিশেষত প্রাচ্যবিদদের মাঝে ইসলাম প্রচার, ইসলামের সঠিক ধারণা পৌঁছানোর জন্য পাঠাগারের বিশেষ একটি বিভাগ থাকতে পারে।
বিষয়টি অনেক বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ হলেও খুব স্বল্প পরিশ্রমে ও ব্যয়ে তা আদায় করা সম্ভব। এই বিভাগটাতে যা যা থাকা জরুরী তা হচ্ছে :
পাঠাগার কর্তৃপক্ষকে অন্যান্য দেশের ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করে ইংরেজীতে দক্ষ গবেষক ও দায়ীদের আনানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ইসলামী দাওয়াতের সাথে সম্পর্কিত গবেষণাধর্মী বইপুস্তক অডিও ভিডিও সিডি সংগ্রহ করা।
পাঠাগারের পাশে বা ভিতরে বা মসজিদ থাকলে মসজিদের কামরায় এই জাতীয় ভিডিওগুলো প্রদর্শনের জন্য একটি অডিটরিয়াম বানানো।
আরব বা অনারব ইসলামী বুদ্ধিজীবি গবেষকদের সাথে যোগাযোগ করা, তাদেরকে সেমিনার, পাঠশালা, কর্মশালা পরিচালনার জন্য দাওয়াত করে আনা।
আমি আশা করি এভাবে এবং এই মানের পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা গেলে ইসলামী দাওয়াতী মিশনে তা অনেক বড় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাই ইসলামী পাঠাগার প্রতিষ্ঠা-বিকাশ-উত্তরণে সবার মনযোগী হওয়া উচিৎ। এই ক্ষেত্রে ডোনারদের এগিয়ে আসা উচিৎ।
সবশেষে আমি এই সংক্রান্ত প্রশ্নের একটা তালিকা দিচ্ছি, যা দ্বারা পরীক্ষা করা যাবে ইসলামী পাঠাগারের বিকাশ-উত্তরণ। প্রশ্নগুলোকে পাঠাগার বিকাশ-উন্নতির পরিমাপ যন্ত্র বলা যায়। :
প্রশ্ন : ইসলামী পাঠাগার কি তার প্রকাশনা প্রচারের ক্ষেত্রে, টেলিভিশন, ইন্টারনেট .. ইত্যাদি আধুনিক উপায়গুলো গ্রহণ করেছে?
প্রশ্ন : ইসলামী দাওয়াতের প্রচার প্রসার ও বানিজ্যিক ক্ষেত্রে ইসলামী পাঠাগারগুলো কি পরস্পর সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার, নার্সারী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্যমাধ্যমিক... সব পর্যায়ের মাদরাসাগুলোয় কাজ করছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার কি কারাগার, মাদকাসাক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র... নারী কারাগার... ইত্যাদি স্থানগুলোতে ঢুকতে পেরেছে? মূলত এই স্থানগুলো হচ্ছে তওবার জায়গা, পড়াশোনা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য খুবই উর্বর স্থান।
প্রশ্ন : পাঠাগার কি বিভিন্ন সম্মেলন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মঞ্চ .. ইত্যাদি জায়গাগুলোয় ঢুকতে পেরেছে? মূলত এই সব জায়গায় ঢুকতে পারা খুব জরুরী
প্রশ্ন : পাঠাগার কি সেনা অনুশীলনকেন্দ্রগুলোতে ঢুকতে পেরেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার কি তার কর্মকান্ড ও গৃহীত দাওয়াতী ও বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলোর নিখুঁত কোনো হিসাব করে রেখেছে? অনুরূপ তার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করা নব্য মুসলিম, হিদায়াত পাওয়া ও তাওবা করা মুসলমানদের কোনো হিসাব, সে অনুসারে তার পরবর্তী দায়িত্বগুলোর কোনো পরিস্যংখ্যান আছে তার কাছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার, যে সব ইসলামী প্রকাশনা বিরল সেখানে শাখা খুলতে পেরেছে, কিংবা প্রত্যক্ষ শাখা খোলা সম্ভব না হলে অন্য কোনো উপায়ে সেখানে ইসলামী প্রকাশনা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার ইন্টারন্যাশনাল যোগাযোগ সংস্থাগুলোর সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে?
প্রশ্ন : পাঠাগার মূল বই বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে শো-রুম নিতে পেরেছে, যাতে ইসলামী প্রকাশনা সর্বস্তরের মানুষের সংগ্রহ-নাগালের মধ্যে থাকে, সর্বস্তরের মানুষের কাছে তা সহজে পৌঁছতে পারে?
প্রশ্ন : পাঠাগার স্থায়ী কোনো বই মার্কেট গড়তে পেরেছে?
আমরা স্বীকার করছি যে ইসলামী পাঠাগারকে সবসময়ে সব স্থানে মূল ধারার মুকাবিলা করে চলতে হয়। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে ইসলামী পাঠাগার যেন কখনোই খরাক্রান্ত না হয়। মুসলিম দেশগুলোতে তো সাধারণত বই অনেক কম পঠিত হয়। বই তেমন গুরুত্ব পায় না। মানুষজন নানান অযথা কাজে সময় নষ্ট করে। অথচ পাশ্চাত্যে দেখা যায় ওয়েটিংরুম, বাসের যাত্রী আসন.. সবস্থানে মানুষ বই হাতে নিয়ে বসে আছে। মুসলিম শিশু অন্য সব উপহার পেলেও খুব কম সময়েই বই উপহার পেয়ে থাকে।
এটা একটি কমন সমস্যা। একাডেমিক ছাত্ররা তাদের একাডেমিক বইপত্র ছাড়া তেমন পড়াশোনা করে না, ডাক্তাররা তাদের পুরানো জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, ইঞ্জিনিয়ার সৃষ্টিশীল এই কালটাতে কোনোভাবেই আন্তরিকভাবে যাপন করতে পারে না এবং ছাত্র-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার জুমার সময় মসজিদে এসেই টের পান যে তাদের খতীবের কাছে দেবার মত নতুন কিছু নাই।
অথচ এই উম্মাহর ধর্মগ্রন্থই কিনা শুরু হয়েছে ‘ইকরা’ ‘পড়’ বাক্য দ্বারা।
তার উৎস ক্ষেত্রের নাম ‘কিতাব’ ‘বই’।
তার রব সর্বজ্ঞানী
তার নবী ‘মানুষকে কল্যাণ শিক্ষাদানকারী’ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।