hadith book logo

অন্য-পথের-কন্যারা

লেখকঃ Mrs. Carol. L. Anway M.S. Ed. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৩

মুসলিম নারীর অধিকার

৭ম শতাব্দীর আরবের পটভূমিতে কন্যা শিশু সন্তানদের হত্যা করা ছিল সাধারণ ব্যাপার- মেয়েদের খুব সামান্যই অধিকার ছিল- আর প্রায়ই তারা নিগৃহীত হতো। কোরআন মেয়েদের সম্পত্তির মালিক হবার অধিকার, উত্তরাধিকারের অধিকার, মোহরের অধিকার, সে কাকে বিয়ে করবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তের অধিকার, স্বামী কর্তৃক ভরণ-পোষণ ও সুরক্ষা লাভ করার অধিকার এবং আরো বহু অধিকার দেয়, যে সবের সংখ্যা তালিকাভুক্তির জন্য বিরাট।

UNIVERSITY OF LOUISVILLE-এর মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ DR. RIFFAT HASSAN বলেন- “আমার মনে আছে আমি যখন প্রথম মেয়েদের ব্যাপারে ইসলামিক আদর্শ ও মুসলিমদের বাস্তব আচরণের ভিতর স্পষ্ট বিরোধিতা দেখতে পাই, তখন কি রকম হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি মনে করেন অন্যান্য দেশের নারীরা এই পার্থক্য সম্বন্ধে বহুলাংশেই অজ্ঞ। যদিও মুহাম্মদের স্ত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, ইসলামিক ঐতিহ্য মূলতঃ দৃঢ়ভাবে পিতৃতান্ত্রিকই রয়ে গেছে.... যা নারীদের জ্ঞান বিকাশ রোধ করেছে, বিশেষত ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে....।”৪ আর তাই স্বাভাবিক পরিণতিতে মুসলিম নারীরা এ ব্যাপারে সচেতন ছিল না যে, কিভাবে তাদের মানব অধিকার পুরুষ শাসিত এবং পুরুষ কেন্দ্রিক সমাজ কর্তৃক লংঘিত হয়েছে..... (তারা এ ব্যাপারে অজ্ঞ) যে ইসলাম অন্য যে কোন ধর্মীয় ঐতিহ্যের চেয়ে নারীকে বেশী অধিকার প্রদান করেছে।

ইসলামে ধর্মান্তরিত আমেরিকান মেয়েরা অবশ্য নারীবাদী নেতৃত্বের কাছ থেকেও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন- যখন তারা কোরআনের মাধ্যমে নারীকে দেয়া অধিকারের ব্যাখ্যা প্রদান করে। আমেরিকান মেয়েরা যারা ইসলামিক সমাজের মাঝে ছিল না, তারা আমেরিকান পটভূমিতে, ইসলামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী নারী অধিকার ও তার বাস্তব প্রয়োগ দেখার এক অভূতপূর্ব সুযোগ লাভ করে। এই সমস্ত ধারণা প্রভাব বিস্তার করছে এবং আশা করা যায় অন্যান্য স্থানে মুসলিম সমাজে যে সমস্ত ভুল প্রথা প্রচলিত আছে, সেগুলোতে পরিবর্তন আনছে। আমাদের আলোচ্য মেয়েরা, মুসলিম সমাজে অর্থাৎ উম্মায় প্রচলিত প্রথা নিয়ে হতাশা এবং কৃতজ্ঞতা দুই-ই ব্যক্ত করেছে।

কখনো কখনো আমি অনুভব করি যে, মুসলিম সমাজে মেয়েদের নিজেদের মতামত অথবা দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশের সুযোগ দেয়া হয় না। তাদের পিছনে রাখা হয় এবং অনেকটা লুকিয়েই রাখা হয়। আমি যখন কোন বক্তৃতা শুনতে যাই মসজিদ ছাড়া অন্যত্র, আমি সামনের দিকে বসতে পছন্দ করি, যেন আমি বক্তাকে দেখতে এবং শুনতে পারি। আমি ইসলামিক মতে পরিধেয় পরেছি যখন তখন কেন আমি পেছনে বসবো- কেবল এ জন্যই যে কেউ মনে করছে যে পুরুষরা নিজেদের সংযত রাখতে পারবে না? পুরুষদের তাদের কর্মকান্ডের দায়-দায়িত্ব নিজেদেরই বহন করা উচিত। তাদের কুচিন্তা থেকে বিরত রাখতে, মেয়েদের সব সময় লুকিয়ে রাখতে হবে- তা তো হয় না। আমরা পোশাকে আশাকে এবং কাজে কর্মে এমনভাবে চলবো যা থেকে তাদের কুচিন্তার উদ্ভব না ঘটে। কিন্তু একই সময়ে আমি একটা খাচার ভিতরে তালাবদ্ধ অবস্থায় জীবন কাটাবো না অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে পিছনের বেঞ্চেও বসবো না। আমি সম্মান এবং মর্যাদা সহকারে আমার জীবন যাপন করতে পারি এবং একই সময়ে একজন মুসলিম নারী হিসেবেও জীবন ধারণ করতে পারি।

একজন মুসলিম মেয়ে হিসেবে আমি মুসলিম মেয়েদের সমাজে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকায় দেখতে পছন্দ করবো- পশ্চিমা সভ্যতা মুসলিম নারীদের যে এক ধরণের নিশ্ৰুপ ছায়া হিসেবে দেখে, তার পরিবর্তে তারা হবে সোচ্চার। ইসলাম মুসলিম মেয়েদের অনেক অধিকার দিয়েছে। হিজাব প্রথার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে, সামাজিক কর্মকান্ডে প্রবেশ করা (অংশগ্রহণ করা)। বাচ্চাদের জন্য আদর্শ হবার ব্যাপারে মুসলিম নারীদের সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা উচিত।

মুসলিম নারীদের অধিকারের স্বীকৃতি আদায় করার প্রচেষ্টা একটা অন্যতম আলোচ্য বিষয়। আর কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নারীরা এই সমস্ত অধিকারের সদ্ব্যবহার করে চলেছে। তারা বিশ্বাস করে ১৪০০ বছর আগে কোরআনের মাধ্যমে আল্লাহ মেয়েদের যে অধিকার নির্ধারণ করেছেন- আধ্যাত্মিক, বুদ্ধি বিকাশ (ক্ষেত্রে), রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোথাও কখনো কোন সময়ে তার দ্বিতীয় কোন দৃষ্টান্ত নেই (বা তার সমকক্ষ কিছু নেই)। এসব অধিকারের অংশ বিশেষ নীচের বর্ণনাগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছেভরণপোষণ ও সদয় ব্যবহার, শিক্ষা ও পেশা এবং আল্লাহর সামনে একজন পুরুষের সমান বলে গণ্য হওয়া, কিন্তু দায়িত্বের দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা নিয়ে এই বিষয়গুলো এসেছে আলোচনায়।

অন্য সব মেয়েদের সব অধিকারই আমারও রয়েছে। আমার শিক্ষার এবং পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা রয়েছে- যদি আমি চাই। আমি মনে করি, মুসলিম মেয়েদের অনেক সম্মানের চোখে দেখা হয়। আমার বিয়ে হয়েছে আজ ১১ বছর, কিন্তু আমার স্বামী কখনো আমাকে অসম্মান করেনি অথবা আমার মতামত বা পছন্দের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা করেনি। আমরা ওসব নিয়ে তর্ক করেছি হয়তো,কিন্তু সে ওসব রোধ করতে চেষ্টা করেনি।

আমার স্বামী আমার প্রতি সদয় ও প্রাণখোলা এবং বাড়িতে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে দিয়ে থাকে। আমি আমার বাড়িকে পরিচ্ছন্ন রাখি এবং আমার মতো করে সাজাই। আমি এটাকে একটা শান্তির ও বিশ্রামের স্থান হিসেবে গড়ে তুলিএকটা স্থান, যেখানে পরিবারের সদস্যরা একটু হাঁফ ছাড়তে পারে এবং তাদের মানসিক যন্ত্রণা প্রশমিত হতে পারে, তারা তাদের বাইরের জগতের দুঃশ্চিন্তা ভুলে থাকতে পারে। আমাদের প্রথম সন্তানের জন্মের আগে, আমি যখন আমার শিক্ষকতার কাজটি ছেড়ে দিতে চাই, সে স্বেচ্ছায় আমার বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে এবং কখনো আমাদের ব্যয়ভার বহন করতে সহায়তা করার জন্য আমাকে কাজ করে যেতে বলেনি।

বিবাহিতা মহিলা হিসেবে, আমার অবস্থানের একটা দিকের জন্য আমি কৃতজ্ঞ বোধ করি- সেটা হচ্ছে যে বড় ও গুরুতর সিদ্ধান্তগুলো অনন্য গ্রহণ করুক, এটাই আমার কাম্য। আমার স্বামী হচ্ছে সংসারের কর্তা, কিন্তু আমি যেমন আমার বাচ্চাদের বলে থাকি, আমি হচ্ছি ভাইস প্রেসিডেন্ট। আর আমাকে যেমন সম্মান দেখানো হয়, তেমনি মর্যাদাও দেয়া হয়। আমার তা ভালো লাগে ।

মুসলিম নারী হিসেবে আমার অধিকার আছে উপাসনা করার, একজন ভালো স্বামী বেছে নেয়ার এবং একটা পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করার। আমার সুরক্ষিত হবার অধিকার রয়েছে এবং নিপীড়িত না হবার অধিকার রয়েছে। যে তার স্ত্রীর কথা প্রথমেই ভাবে, এমন একজন স্বামী পাবার জন্য আমি কৃতজ্ঞ- একজন স্বামী যে আমার মতামত চায় এবং তা সম্মান করে। একজন মুসলিম নারী হিসেবে আমি কোন সত্যিকার অসুবিধা বোধ করি না। বাইরে একটা চাকরি পাওয়াটা হয়তো একমাত্র অসুবিধার হতে পারে। কখনো কাজ পাওয়াটা কঠিন (বিশেষতঃ অমুসলিমদের কাছে)।

পুরুষদের দ্বারা একটা "DATE" বা একান্তে সাক্ষাতের জন্য নাজেহাল হওয়া, অশ্লীল প্রবাদ বাক্য শুনানোর চেষ্টা করা, ইত্যাদি থেকে বেঁচে যাবার অধিকারকে আমি অবশ্যই প্রশংসা করি। পেশা, অর্থ উপার্জন এবং ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে আমার প্রয়োজন অনুযায়ী- অন্যের জন্য নয়- সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকতর স্বাধীনতার স্বাদও পাচ্ছি আমি।

আমার মুসলিম হওয়াটা আমাকে সব অজ্ঞতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার এবং নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বের ভার গ্রহণ করার সাহস যুগিয়েছে। খৃস্টান হিসেবে আমার জীবন সংশয়ের পর সংশয়ে ভরা ছিল- যখন আমি আশা করতাম যে আমার বাবা বা আর কেউ আমাকে উদ্ধার করবে। জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গী, ধর্ম বিশ্বাসের সমান্তরাল ছিল। দুর্ভাগ্যবশতঃ ঐ ধরনের একটা অপরিপক্ক দৃষ্টিভঙ্গী যে শুধু ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠাকেই বাধা দেয় তা নয়। বরং তা আত্মবিশ্বাসের জন্যও ক্ষতিকর। নির্ভয়ে এবং কিভাবে সামলাবো সে ব্যাপারে বিচলিত না হয়ে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেবার মতো আত্মবিশ্বাস এখন আমার আছে যা ইসলাম আমাকে দিয়েছে।

একজন মুসলিমা (মুসলিম নারী) তার ভরণপোষণের জন্য মোটেই দায়ী নয়। স্বামীকে তার ভরণপোষণের সমস্ত দায়িত্ব বহন করতে হয়- পোশাক পরিচ্ছদ এবং ইসলাম শিক্ষার উপকরণসমূহ সহ। কোন নারী যে অর্থই লাত করুক- তা পূর্ববর্তী বিয়ের সন্তান পালনের জন্য, কাজ থেকে, তার মোহর, উত্তরাধিকার বা ঐ ধরণের যে কোন কিছু থেকেই হোক না কেন- তা সম্পূর্ণ রূপে তার নিজের এবং তার ইচ্ছামতো সে তা জমাতে পারে বা খরচ করতে পারে (যতক্ষণ তা ইসলামী নীতি নির্ধারণী হিসেবে হালালের আওতায় পড়ে। তার স্বামী এর কোন কিছুই ছুঁতে পারে না! নারী যদি কাজ করে, তবে সে ইচ্ছা করলে সংসারের খরচ বহনে অংশগ্রহণ করতে পারে। কারণ সে ঘর থেকে সময় নিয়ে বাইরে কাজ করতে যাচ্ছে। বাকীটুকু কেবল তার এবং তার একার। আমার স্বামী বিয়ের সময় ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। আমি যখন তাকে সব ব্যাখ্যা করলাম, সে বললো যে, তাহলে পুরুষরা নিশ্চিতভাবেই লাঠির ছোট মাথাটা ধরে আছে। আর সেটাই সত্যি! আমি যদি কখনো কোনভাবে কয়েকটা ডলার পাই, আমি তা একটা নতুন জামা কিনতে, গয়না কিনতে খরচ করতে পারি আবার জমাতেও পারিকিন্তু আমার স্বামীকে তার নিজের জন্য কিছু খরচ করার আগে সংসারের সমগ্র ব্যয়ভার মিটাতে হবে। পুরুষের এখানে অনেক দায়িত্ব। আমি সংসার নিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু প্রতিমাসে নানা ধরনের বিল পরিশোধ করাটা আমার দায়িত্ব নয়। আমার স্বামী জানে এটা সম্পূর্ণই তার দায়িত্ব।

আমার রয়েছে এমন একটা অধিকার যা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে, আমাকে যে কাজ করতে হয় না এবং আমি আমার মেয়ের কাছে থাকার সুযোগ পাই! সত্যিকার অর্থে না চাইতেই আমার চাহিদার চেয়ে বেশী মাত্রায় আমার স্বামী আমাকে সবকিছু দিয়ে থাকে- এ ব্যাপারটাও খুব সুন্দর। সুন্দর বাড়ি, পোশাক পরিচ্ছদ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং আরো অনেক কিছু। আমি অনুভব করি, বাড়ি হচ্ছে স্ত্রী ও মায়ের জন্য। আর এই ধারণাটা আমার খুব পছন্দের। এই সুযোগ পেয়ে আমি খুব কৃতজ্ঞ। আর বিবাহিত না হলে এমনটি সম্ভব হতো না। মুসলিম নারী হিসেবে এমন কোন ক্ষেত্র নেই, যা আমার জন্য উন্মুক্ত নয়।