hadith book logo

অন্য-পথের-কন্যারা

লেখকঃ Mrs. Carol. L. Anway M.S. Ed. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

অনুবাদকের ভূমিকা

আমি বইখানা কিনেছিলাম THE MUSLIM CONVERTS' ASSOCIATION OF SINGAPORE থেকে। নিজে পড়ার পর পর এক আমেরিকান সহকর্মীকে দিয়েছিলাম পড়তে। তিনি রুদ্ধশ্বাসে বলতে গেলে পড়ে শেষ করলেন। তার পড়া শেষ হলে তার সাথে বইখানা নিয়ে আমার আলোচনা হলো। শ্বেতাঙ্গ ঐ দ্রলোকের স্ত্রী একজন আর্মেনিয়ান। আর সেই সুবাদে সমুদ্রের এপারের আচারআচরণ সম্বন্ধে তার কিছুটা ধারণা রয়েছে। আলোচনাকালে বইখানার মাঝে মেয়েরা যে শূন্যতার পরিবর্তে জীবনের একটা অর্থ খুঁজে পেতে চেয়েছে, তারা কন্তু পূজা পরিত্যাগ করে মানবিক এবং ঈশ্বরের নির্দেশিত পথ খুঁজতে চেয়েছে, ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করতে করতে দেখলাম ভদ্রলোকের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে। এক মুহূর্তের জন্য আমার দ্রলোকের জন্য খুব মায়া হলো, মনে হলো তার নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে হয়তো তার মনে হচ্ছে, কি অর্থহীনভাবেই না তার জীবনের অনেকাংশ কেটে গিয়েছে। আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ ধরনের আরো বইপত্র (ইসলাম সম্বন্ধীয়) কোথায় পাওয়া যাবে। আমি তাকে BARNES & NOBLE-এর নাম বললাম; যা তার দেশে সুপরিচিত।

দেশে ফিরে আমার এক ব্যাংকার ভাইকে বইটি পড়তে দিলাম। তিনি বইখানা ঘেঁটে এক পর্যায়ে বললেন যে, আমাদের দেশের মেয়েদের জন্য বইখানা অনুবাদ করা প্রয়োজন। তিনি এবং আমি, দু’জনে অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারে একমত যে, সমাজ জীবনে অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার অত্যন্ত সহজ একটা উপায় হচ্ছে আদর্শ ‘মা’ তৈরির প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত করা। এই বইয়ে অনেক মেয়েদের বক্তব্যে ঠিক এ কথাটাই প্রতিফলিত হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (দঃ), হযরত আলী থেকে শুরু করে নেপোলিয়ানসহ পৃথিবীর অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিই এ ধরনের কথা বলে গিয়েছেন। আমি আমার ব্যাংকার ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, অনুবাদ না করলেই বা অসুবিধা কোথায়? কারণ, শিক্ষিতা মেয়েরাই এ বইয়ে বেশী আগ্রহী হবার কথা। তিনি আমাকে উত্তর দিলেন যে, শতকরা ৯০% স্নাতকোত্তর মেয়েও এই বইখানা ছুঁয়ে দেখবে না, কেবল এই কারণে যে, তা ইংরেজীতে লেখা। আমার শিক্ষিকা স্ত্রীর সাথে আলাপ করে একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেল। আর তা ছাড়া এতো সময়ই বা এখন মানুষের হাতে কোথায়? ‘এ’ থেকে শুরু করে জেড’ পর্যন্ত সব অক্ষর সম্বলিত স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদৌলতে মায়ের ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে দেখার সময় নেই, স্ত্রীর স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখার সময় নেই- সেখানে বই তো বেশ শুকনো একটা অধ্যায়, তার উপর আবার ধর্ম সংক্রান্ত বই।

আমার আরেকটা উপমা মনে এলো। ধরা যাক আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাবো। রাস্তা চেনা না থাকায় ভুল বশতঃ ময়মনসিংহ রোডে ছুটে চলেছি। আমি যদি পথে দেখি যে, কেউ ময়মনসিংহ পর্যন্ত ভুল করে চলে গিয়েছিল চট্টগ্রাম যাচ্ছে বলে এবং সে ফিরে আসছে ঠিক পথ ধরে চট্টগ্রাম যাবে বলে- তবে আমার সেখান থেকেই যাত্রার মোড় ঘুরিয়ে সঠিক রাস্তা ধরা উচিত। ইংরেজী একটা গান আছে এ বিষয়ে (COUNTRY WESTERN) : THERE IS NO USE RUNNING, WHEN YOU ARE ON THE WRONG ROAD। সভ্যতার যাত্রায় সারা পৃথিবী যাদেরকে আদর্শ করে ছুটে চলেছে, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেয়েরা তথা মানুষজন যদি বুঝতে পারে যে, তারা অর্থহীন এক ভুল পথে যাত্রা করেছিল, তবে আমরা শুধু শুধু আরো শতাব্দীখানেক ভুল পথে চলে তবে ভুল বুঝতে হবে, এমন কোন কথা নেই। আমরা যত শীঘ্র সম্ভব আমাদের পথ পরিবর্তন করতে পারি। ইসলাম আমেরিকায় এখন সবচেয়ে সম্প্রসারণশীল ধর্ম; আর আরো বিশেষভাবে বলতে গেলে শ্বেতাঙ্গ মেয়েদের একটা সংঘবদ্ধ মুসলিম জনসংখ্যা হালে সেখানে গড়ে উঠেছে, যা চোখে পড়ার মতো। সাধারণভাবে আমাদের দেশের আমরা সবাই আর বিশেষভাবে আমাদের দেশের আলোকপ্রাপ্তা মেয়েরা যে জীবনের স্বপ্ন দেখে, ঐ জীবনের সবটুকু পেয়েও এ সমস্ত মেয়েরা সেকেলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে, সমস্ত চাকচিক্য ও বিলাসিতা ত্যাগ করে। ব্যাপারটা ভেবে দেখবার অবকাশ যাদের আছে, তাদের জন্য এ বই অনেক তথ্য উপহার দেবে। তসলিমা নাসরিন আজ যে জরায়ু-স্বাধীনতার কথা বলছেন, তা ঐ দেশে অর্ধ-শতাব্দী আগে বলা হয়েছিল। আর আজ ঐ জরায়ু-স্বাধীনতা ত্যাগ করে ঐ দেশের মেয়েরা নৈতিকতার খোঁজ করছেন, জীবনের উদ্দেশ্যের খোঁজ করছেন।

আমার অনুবাদের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্কউদ্ভূত। আমি পেশাদার লেখক নই। ভুল-ত্রুটিসহ সকল অপূর্ণতার দায়ভার আমার। এই বই পড়ে যদি একজন মেয়েও তার জীবনের পথ পরিবর্তন করে, তবে বুঝবো অনুবাদ-প্রকল্প সার্থক হলো এবং তার কৃতিত্ব আল্লাহ সোবহানাহুতায়ালার।