hadith book logo

অন্য-পথের-কন্যারা

লেখকঃ Mrs. Carol. L. Anway M.S. Ed. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৮

যৌথভাবে অংশগ্রহণকারী বাবা-মা

জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বাবা ও মা উভয়েই ছেলেমেয়ের যত্ন এবং প্রশিক্ষণের সাথে জড়িত ছিল। বাবা-মায়ের কাছ থেকে ছেলেমেয়ের প্রাপ্য এবং ছেলেমেয়ের কাছ থেকে বাবা-মাদের প্রাপ্য অধিকার, এসবের উপর ভিত্তি করে ছেলেমেয়ের এবং বাবা-মায়ের অধিকারের প্রসঙ্গ এসেছে। তারা (জরিপের মেয়েরা) মনে করে, হুজুগের মাথায় যা খুশি তাই করাটা সন্তানদের অধিকারভুক্ত নয়। বাচ্চাদের অধিকার রয়েছে নির্দেশিত পথে বাবা-মায়ের ভালো দিক-নির্দেশনা পেয়ে পরিচালিত হবার এবং তাদের অধিকার রয়েছে নিরাপত্তা, যত্ন ও এমন ব্যবহার লাভ করার যা তাদের ভালো মাপের আত্মবিশ্বাস বজায় রাখতে সহায়তা করবে। অপরদিকে বাবা-মায়ের অধিকার রয়েছে সম্মান ও যত্ন লাভ করার। ঐ সমস্ত অধিকারের রূপরেখায় নিহিত রয়েছে সম্মান, কঠিন পরিশ্রম এবং এক ধরনের কর্তৃত্বের ধারণা যা আমাদের এই গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন- যেখানে ছেলেমেয়েরা তারা কি চায়, সে ব্যাপারে তাদের অধিকার অনেক কম বয়সেই দাবী করে বসে।

একটা হাদীস (নবী মুহাম্মদের কথা, কাজ অনুশীলন) বলে, মায়ের কোল হচ্ছে প্রথম বিদ্যালয়। আমার ধর্মান্তরিত হওয়াতে একমাত্র যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হচ্ছে, আমার বাচ্চাদের অধিকার সম্বন্ধে আমার সচেতনতা। আগে তাদের চুপ করানোটা সহজ ছিল, কিন্তু (এখন আমি বুঝি) তাদের অধিকার রয়েছে, যেন তাদের বক্তব্য শোনা হয়। আগে তাদের পশ্চাদদেশে দুই ঘা লাগিয়ে দেয়াটা সহজ ছিল, এখন মনে হয় আঘাত করাটা কি যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে কিনা? ভিতরে বা বাইরে আপনি ক্ষতচিহ্ন রাখতে পারেন না। আমাকে অবশ্যই প্রতিনিয়ত তাদের অধিকার সম্বন্ধে এবং আমার দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন থাকতে হয় তাদের খাওয়ানো, পরানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও ধর্মীয় উভয় শিক্ষা দেয়া, একদিন আমাকে এসবের জন্য জবাব দিতে হবে।

আমাদের সন্তান প্রতিপালনের কৌশল রক্ষণশীল ও কঠোর, কিন্তু অনেক ভালোবাসা, বুকে জড়িয়ে ধরা (বাচ্চাদের) ও চুমু সমেত। আমার স্বামী সব সময়ই সন্তান লালনের কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেছে। বাচ্চাদের উপর আমার অধিকার, তাদের উপর আমার স্বামীর অধিকারের চেয়ে হয় বেশী নয় সমান সমান তো বটেই। আমার কর্তব্য হচ্ছে তাদের উপযুক্ত পরিবেশ, নিয়মকানুন ও স্নেহমমতা দেয়া যাতে তারা ঠিক-বেঠিকের পরিচ্ছন্ন দৃষ্টি সম্পন্ন সহানুভূতিশীল ও সবদিক দিয়ে পরিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষে পরিণত হতে পারে।

আগে যেমনটি বলা হয়েছে, স্ত্রীর বাইরে কাজ করা বা না করার অথবা তার পড়াশোনার জন্য বাইরে যাবার প্রয়োজন আছে কি নেই তার উপর নির্ভর না করেই স্বামীদের বাচ্চাদের যত্নে সক্রিয় হতে দেখা গেছে প্রায়ই। বাবারা বিশেষতঃ সক্রিয়ভাবে বাচ্চাদের দিক-নির্দেশনা প্রকল্পে জড়িত থাকার প্রয়োজন বোধ করে, যখন তারা এমন একটা দেশে বসবাস করে যার প্রশাসন স্বাভাবিকভাবে ইসলামিক নীতিমালা বাস্তবায়নে সমর্থন প্রদান করে না। বৃহত্তর পরিবার বর্তমান না থাকায়, সক্রিয় অংশগ্রহণ (সন্তান পালনে) আরও প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। মেয়েরা তাদের উত্তরে বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণের সঠিক কারণ চিহ্নিত করেনি। তবে তারা তাদের স্বামীর সন্তান পালনে এবং প্রশিক্ষণে সক্রিয় অংশ গ্রহণকে পছন্দ করে বলেই মনে হয়।

আমি যদি মুসলিম না হতাম, তবে আমাদের বাচ্চারা কি শিখছে এবং কে তাদের পড়াচ্ছে, তা নিয়ে যতটুকু চিন্তিত হতাম, এখন তার চেয়ে অনেক বেশী চিন্তিত ও ভাবিত বোধ করি। বাচ্চাদের সাথে বিকালে সময় কাটানো, খেলা করা, তাদের কিছু পড়ে শোনানো এবং বিভিন্ন ব্যাপারে তাদের শিক্ষা দেয়া- এসবের মাধ্যমে আমার স্বামী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। সে তাদের খাওয়াতে এবং শৌচকর্ম প্রশিক্ষণে সহায়তা করে এবং কখনো তাদের গোসলও করায়। কখনো বাইরে যাবার সময় সে আমাদের ছেলেকে সাথে নিয়ে যায়, যাতে তাদের আরও বেশী একত্রে থাকা হয় এবং আমার কিছুটা অবসর হয়। তাদের সব প্রয়োজন মিটাতে প্রায় ৯৫% সময়েই আমি উপস্থিত থাকি। আমি তাদের সাথে যে কোন যুক্তিযুক্ত আচরণ করতে পারি। আমি যেখানেই যাই, সেখানেই তাদের নিয়ে যাবার ব্যাপারে আমার স্বামীর সার্বক্ষণিক অনুমোদন রয়েছে।

প্রথম দিন থেকেই সন্তান পালনের ব্যাপারে আমার স্বামী খুবই সক্রিয় এবং সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে। বহু বছর ধরে, আমি যখন বাড়ির বাইরে কাজ করি, তখন সে আমাদের মেয়েকে দেখা শোনা করে। সে কখনোই মেয়েকে আঘাত বা বেত্রাঘাত করেনি এবং প্রায়ই তাকে নিয়ে খেলে। আমার প্রায়ই মনে হয়, তার অনেক প্রত্যাশা- কখনো যুক্তি বহির্ভূত পোশাক-আশাক ইত্যাদির ব্যাপারে। তখন আমরা কথা বলি এবং একটা সমঝোতায় পৌছি।

আমার সন্তান পালনের পদ্ধতি, আমার মুসলিম হওয়া দ্বারা প্রভাবিত নয়। আমি এখন যা করি, তার বেশীর ভাগই ধর্মান্তরিত হবার আগেই করতাম। বাচ্চাদের সামলানোর ব্যাপারে আমার ধৈর্যের মাত্রা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু পদ্ধতিতে আমি কোন পরিবর্তন আনিনি। আমার স্বামী যতটুকু সম্ভব, সন্তান পালনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। সে যখন বাড়িতে থাকে তখন কাজকর্ম আমরা প্রায় আধা-আধি ভাগ করে নেই। একদিন অন্তর সে বাচ্চাদের গোসল করায়, তাদের হাত ধুতে এবং দাঁত মাজতে সাহায্য করে, তাদের ঝগড়া-ঝাটি সামলায়, নাস্তা বানিয়ে দেয় এবং কখনো আমাদের রাত্রিকালীন গল্পের আসরের জন্য পড়ে শোনায়। আমার বাচ্চারা ছোট (৬ এবং ৪ বছর)। আমাদের একের প্রতি অপরের (আমার ও সন্তানদের) কর্তব্য ইত্যাদি এখনো খুব প্রাথমিক পর্যায়ের।

সন্তান প্রতিপালনে তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে মেয়েরা যা বলেছে, তাতেই তারা এই ভূমিকাকে কতটুকু গুরুত্ব সহকারে বুঝেছে বা অনুধাবন করেছে তা প্রতিফলিত হয়। যে ধরনের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে তাদের সন্তানরা বড় হয়ে নিজেদের আল্লাহর কাছে সমর্পিত করবে এবং অনুশীলনরত ভালো মুসলিম হবে, ঠিক সেই ধরনের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ সন্তানদের জন্য ব্যবস্থা করার একটা আকুলতা রয়েছে এই সব মেয়েদের মাঝে। আমরা যারা আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় ঐতিহ্যের মাঝে সন্তানদের বড় করেছি, তারাও কামনা করেছি যে, আমরা যেন সন্তান প্রতিপালনের কাজটি ঠিকমতো করতে পারি, যাতে আমাদের সন্তানরা এমন পথে যায়, যা তাদের ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যাবে। আমাদের (লেখিকার ও মেয়েদের) বাসনা কতই না সদৃশ!