১
আলোচিত রাত-দিন
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪৪
শবে বরাত প্রসঙ্গে আলোচিত হাদীসগুলোর পর্যালোচনা
হাদীসে শবে বরাতকে لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রামত্ম হাদীসগুলো পর্যালোচনাসহ উল্লেখ করা হলো :
১ নং হাদীস :
عَنْ أَبِيْ مُوْسَى الْأَشْعَرِيِّ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ قَالَ إِنَّ اللهَ لَيَطَّلِعُ فِيْ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيْعِ خَلْقِه إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ
আবু মূসা আল-আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাতে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর সমসত্ম বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তবে শিরককারী ও হিংসুককে ক্ষমা করেন না। [ইবনে মাজাহ, হা/১৩৯০; জামেউল আহাদীস, হা/৭০৮৫।]
২ নং হাদীস :
عَنْ أَبِيْ ثَعْلَبَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ اِطَّلَعَ اللهُ إِلٰى خَلْقِه فَيَغْفِرُ لِلْمُؤْمِنِيْنَ وَ يُمْلِيْ لِلْكَافِرِيْنَ وَ يَدَعُ أَهْلَ الْحِقْدِ بِحِقْدِهِمْ حَتّٰى يَدَعُوْهُ
আবু সালাবা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত এসে যায়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করেন। অতঃপর তিনি মুমিনদেরকে ক্ষমা করেন, কাফিরদের শাসিত্ম বাড়িয়ে দেন এবং হিংসুকদের অবকাশ দেন, যেন তারা হিংসা ছেড়ে দেয়। [শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৮৩২; জামেউস সগীর, হা/৭৭১।]
পর্যালোচনা :
শাইখ আলবানী (রহ.) উপরোক্ত হাদীস দুটিকে হাসান বলেছেন। তবে এগুলো ছাড়া নির্ভরযোগ্য সূত্রে সনদ ও মতনের শাব্দিক ভিন্নতায় আরো কয়েকটি হাদীস রয়েছে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, এসব হাদীস দ্বারা উক্ত রাত্রির কেবল ফযীলত প্রমাণিত হয়; কিন্তু কোন প্রকার ইবাদাত প্রমাণিত হয় না।
৩ নং হাদীস :
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ فَقَدْتُ رَسُوْلَ اللهِ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَه إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ لِي أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَّحِيْفَ اللهُ عَلَيْكِ وَرَسُوْلُهُ قَالَتْ قُلْتُ ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ فَقَالَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিছানায় না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। অতঃপর আমি তাকে বাকী নামক কবরস্থানে আকাশের দিকে মাথা উত্তোলনরত অবস্থায় পেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশঙ্কা করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার সাথে অন্যায় আচরণ করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মনে করেছি আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের পালিত বকরীর পশমের পরিমাণের চেয়েও অধিক পরিমাণ লোকদেরকে ক্ষমা করে দেন। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০১৮; তিরমিযী, হা/৭৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৩৮৯; মিশকাত, হা/১২৯৯।]
পর্যালোচনা :
এ হাদীসের সনদ সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী (রহ.) বলেন, আয়েশা (রাঃ) এর এই হাদীস আমি হাজ্জাজের এ বর্ণিত সনদ ছাড়া অন্য কোনভাবে জানি না। আমি মুহাম্মাদ (ইমাম বুখারী)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম তিরমিযী (রহ.) আরো বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর উরওয়া থেকে হাদীস শুনেননি। আর ইমাম মুহাম্মাদ (ইমাম বুখারী) বলেন, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর থেকে শুনেননি।
অতএব প্রতীয়মান হয় যে, উপরোক্ত হাদীসটি একেবারেই দুর্বল এবং মুনকাতি। তাছাড়া উক্ত হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হাজ্জাজ ইবনে আরতাহ মুহাদ্দিসীনের নিকট দুর্বল বলে পরিচিত। আর শাইখ আলবানীও হাদীসটিকে যঈফ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সুতরাং এ হাদীসটি কোনভাবেই দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
৪ নং হাদীস :
عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ الْحَارِثِ أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قَامَ رَسُوْلُ اللهِ مِنَ اللَّيْلِ يُصَلِّيْ فَأَطَالَ السُّجُوْدَ حَتّٰى ظَنَنْتُ أَنَّه قَدْ قُبِضَ فَلَمَّا رَأَيْتُ ذٰلِكَ قُمْتُ حَتّٰى حَرَّكْتُ إِبْهَامَه فَتَحَرَّكَ فَرَجَعْتُ فَلَمَّا رَفَعَ رَأْسَه مِنَ السُّجُوْدِ وَ فَرَغَ مِنَ صَلَاتِه قَالَ يَا عَائِشَةُ أَوْ يَا حُمَيْرَاءُ أَظَنَنْتِ أَنَّ النَّبِيَّ قَدْ خَاسَ بِكِ قُلْتُ لَا وَ اللهِ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَ لٰكِنَّنِيْ ظَنَنْتُ أَنَّكَ قُبِضْتَ لِطُوْلِ سُجُوْدِكَ فَقَالَ أَتَدْرِيْنَ أَيَّ لَيْلَةٍ هٰذِه ؟ قُلْتُ : اَللهُ وَ رَسُوْلُه أَعْلَمُ قَالَ هٰذِه لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَ جَلَّ يَطَّلِعُ عَلٰى عِبَادِه فِيْ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِيْنَ وَ يَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِيْنَ وَ يُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ
আলা ইবনে হারিস (রহ.) হতে বর্ণিত। আয়েশা (রাঃ) বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। সে সময় সিজদা এত দীর্ঘ করলেন যে, আমি মনে করলাম, তিনি ইমেত্মকাল করেছেন। আমি এ অবস্থা দেখে দাঁড়িয়ে তার বৃদ্ধাঙ্গুল ধরে নাড়া দিলাম, এতে তা নড়ে উঠল। ফলে আমি চলে এলাম। অতঃপর যখন তিনি সিজদা হতে মাথা উত্তোলন করলেন এবং সালাত শেষ করলেন তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা! অথবা বললেন, হে হুমায়রা! তুমি কি ধারণা করেছ যে, আল্লাহর নবী তোমার সাথে খেয়ানত করেছেন? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল, (আমি এরূপ ধারণা করিনি) বরং আপনার দীর্ঘ সিজদার কারণে আমি ধারণা করেছি যে, আপনি ইমেত্মকাল করেছেন। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন, এটা মধ্য শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোনিবেশ করেন। অতঃপর তিনি ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদেরকে ক্ষমা করেন এবং রহমতপ্রার্থনাকারীদেরকে রহম করেন। আর হিংসুকদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেন। [শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৮৩৫।]
পর্যালোচনা :
এ হাদীসের সনদ সম্পর্কে ইমাম বায়হাকী বলেন, হাদীসটি সম্পূর্ণভাবে মুরসাল। সম্ভাবনা রয়েছে যে, আলা ইবনে হারেস মাহকূল থেকে হাদীসটি গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। তাছাড়া এই অধ্যায়ের অনেক পরিত্যক্ত হাদীস রয়েছে। এসব হাদীসের বর্ণনাকারীরা অপরিচিত ব্যক্তি।
৫ নং হাদীস :
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِيْ طَالِبٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُوْمُوْا لَيْلَهَا وَصُوْمُوْا نَهَارَهَا فَإِنَّ اللهَ يَنْزِلُ فِيْهَا لِغُرُوْبِ الشَّمْسِ إِلٰى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُوْلُ أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِيْ فَأَغْفِرَ لَه أَلَا مُسْتَرْزِقٍ فَأَرْزُقَه أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَه أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا حَتّٰى يَطْلُعَ الْفَجْرُ
আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত্রি আগমন করে, তখন তোমরা সেই রাত্রিতে জাগরণ করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা সেদিনের সূর্য অসত্ম যাওয়ার পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব; কোন রিযিকপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে রিযিক প্রদান করব এবং কোন বিপদগ্রসত্ম ব্যক্তি আছে কি, আমি তাকে উদ্ধার করব। অতঃপর এভাবে তিনি ফজর পর্যমত্ম বলতে থাকেন। [ইবনে মাজাহ, হা/১৩৮৮; সিলসিলা যঈফাহ, হা/২১৩২।]
পর্যালোচনা :
প্রথমত : সনদের দিক দিয়ে হাদীসটি যঈফ। কেননা এ হাদীসের সনদে ইবনে আবু সাবুরাহ নামে বর্ণনাকারী রয়েছে, যাকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস হাদীস জালকারী হিসেবে জানেন। তাছাড়া শাইখ আলবানী (রহ.) এ হাদীসের সনদটিকে মাওযূ হিসেবে গণ্য করেছেন।
দ্বিতীয়ত : অন্য একটি সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষের দিকে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। যেমন,
عَنْ أَبِى ْهُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ - - قَالَ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالٰى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلٰى سَمَآءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقٰى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْاٰخِرُ فَيَقُوْلُ مَنْ يَّدْعُوْنِىْ فَأَسْتَجِيْبَ لَه مَنْ يَّسْأَلُنِىْ فَأُعْطِيَه مَنْ يَّسْتَغْفِرُنِىْ فَأَغْفِرَ لَه
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমাদের প্রতিপালক প্রত্যেক রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন যে, কোন আহবানকারী আছে কি, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে দান করব এবং কোন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। [সহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮০৮; আবু দাউদ, হা/১৩১৭; তিরমিযী, হা/৪৪৬; নাসাঈ, হা/৭৭৬৮; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৯২০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৩১৩; মিশকাত, হা/১২২৩।]
৬ নং হাদীস :
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ عَنِ النَّبِيِّ قَالَ إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَإِذَا مُنَادٍ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَاَغْفِرَ لَه هَلْ مِنْ سَائِلٍ فَأُعْطِيَه فَلَا يَسْأَلُ أَحَدٌ إِلَّا أُعْطِيَ إِلَّا زَانِيَةٌ بِفَرْجِهَا أَوْ مُشْرِكٌ
উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ) এর সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আগমন করে তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন যে, কোন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব; কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে দান করব। অতঃপর মুশরিক ও লজ্জাস্থান দ্বারা ব্যভিচারী ব্যক্তি ব্যতীত সকল প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করা হয়। [শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৮৩৬; সিলসিলা যঈফাহ, হা/৭০০০।]
পর্যালোচনা :
উক্ত হাদীসের সনদ সম্পর্কে শাইখ আলবানী বলেন, এর সনদটি যঈফ।
সুতরাং উপরের হাদীসগুলো দ্বারা এ রাতের কোন বিশেষ আমল প্রমাণ করা ঠিক হবে না। তাই মুসলিমদের উচিত এ রাতটি অন্যান্য রাতের মতই অতিবাহিত করা এবং বিশেষ কোন আয়োজন না করা। কেননা এ রাত উপলক্ষে যদি সত্যিই কোন করণীয় থাকত, তাহলে তা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ অথবা সালফে সালেহীনদের থেকে প্রমাণিত থাকত।
১ নং হাদীস :
عَنْ أَبِيْ مُوْسَى الْأَشْعَرِيِّ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ قَالَ إِنَّ اللهَ لَيَطَّلِعُ فِيْ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيْعِ خَلْقِه إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ
আবু মূসা আল-আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাতে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর সমসত্ম বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তবে শিরককারী ও হিংসুককে ক্ষমা করেন না। [ইবনে মাজাহ, হা/১৩৯০; জামেউল আহাদীস, হা/৭০৮৫।]
২ নং হাদীস :
عَنْ أَبِيْ ثَعْلَبَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ اِطَّلَعَ اللهُ إِلٰى خَلْقِه فَيَغْفِرُ لِلْمُؤْمِنِيْنَ وَ يُمْلِيْ لِلْكَافِرِيْنَ وَ يَدَعُ أَهْلَ الْحِقْدِ بِحِقْدِهِمْ حَتّٰى يَدَعُوْهُ
আবু সালাবা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত এসে যায়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করেন। অতঃপর তিনি মুমিনদেরকে ক্ষমা করেন, কাফিরদের শাসিত্ম বাড়িয়ে দেন এবং হিংসুকদের অবকাশ দেন, যেন তারা হিংসা ছেড়ে দেয়। [শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৮৩২; জামেউস সগীর, হা/৭৭১।]
পর্যালোচনা :
শাইখ আলবানী (রহ.) উপরোক্ত হাদীস দুটিকে হাসান বলেছেন। তবে এগুলো ছাড়া নির্ভরযোগ্য সূত্রে সনদ ও মতনের শাব্দিক ভিন্নতায় আরো কয়েকটি হাদীস রয়েছে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, এসব হাদীস দ্বারা উক্ত রাত্রির কেবল ফযীলত প্রমাণিত হয়; কিন্তু কোন প্রকার ইবাদাত প্রমাণিত হয় না।
৩ নং হাদীস :
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ فَقَدْتُ رَسُوْلَ اللهِ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَه إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ لِي أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَّحِيْفَ اللهُ عَلَيْكِ وَرَسُوْلُهُ قَالَتْ قُلْتُ ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ فَقَالَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিছানায় না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। অতঃপর আমি তাকে বাকী নামক কবরস্থানে আকাশের দিকে মাথা উত্তোলনরত অবস্থায় পেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশঙ্কা করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার সাথে অন্যায় আচরণ করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মনে করেছি আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের পালিত বকরীর পশমের পরিমাণের চেয়েও অধিক পরিমাণ লোকদেরকে ক্ষমা করে দেন। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০১৮; তিরমিযী, হা/৭৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৩৮৯; মিশকাত, হা/১২৯৯।]
পর্যালোচনা :
এ হাদীসের সনদ সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী (রহ.) বলেন, আয়েশা (রাঃ) এর এই হাদীস আমি হাজ্জাজের এ বর্ণিত সনদ ছাড়া অন্য কোনভাবে জানি না। আমি মুহাম্মাদ (ইমাম বুখারী)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম তিরমিযী (রহ.) আরো বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর উরওয়া থেকে হাদীস শুনেননি। আর ইমাম মুহাম্মাদ (ইমাম বুখারী) বলেন, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর থেকে শুনেননি।
অতএব প্রতীয়মান হয় যে, উপরোক্ত হাদীসটি একেবারেই দুর্বল এবং মুনকাতি। তাছাড়া উক্ত হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হাজ্জাজ ইবনে আরতাহ মুহাদ্দিসীনের নিকট দুর্বল বলে পরিচিত। আর শাইখ আলবানীও হাদীসটিকে যঈফ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সুতরাং এ হাদীসটি কোনভাবেই দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
৪ নং হাদীস :
عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ الْحَارِثِ أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قَامَ رَسُوْلُ اللهِ مِنَ اللَّيْلِ يُصَلِّيْ فَأَطَالَ السُّجُوْدَ حَتّٰى ظَنَنْتُ أَنَّه قَدْ قُبِضَ فَلَمَّا رَأَيْتُ ذٰلِكَ قُمْتُ حَتّٰى حَرَّكْتُ إِبْهَامَه فَتَحَرَّكَ فَرَجَعْتُ فَلَمَّا رَفَعَ رَأْسَه مِنَ السُّجُوْدِ وَ فَرَغَ مِنَ صَلَاتِه قَالَ يَا عَائِشَةُ أَوْ يَا حُمَيْرَاءُ أَظَنَنْتِ أَنَّ النَّبِيَّ قَدْ خَاسَ بِكِ قُلْتُ لَا وَ اللهِ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَ لٰكِنَّنِيْ ظَنَنْتُ أَنَّكَ قُبِضْتَ لِطُوْلِ سُجُوْدِكَ فَقَالَ أَتَدْرِيْنَ أَيَّ لَيْلَةٍ هٰذِه ؟ قُلْتُ : اَللهُ وَ رَسُوْلُه أَعْلَمُ قَالَ هٰذِه لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَ جَلَّ يَطَّلِعُ عَلٰى عِبَادِه فِيْ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِيْنَ وَ يَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِيْنَ وَ يُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ
আলা ইবনে হারিস (রহ.) হতে বর্ণিত। আয়েশা (রাঃ) বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। সে সময় সিজদা এত দীর্ঘ করলেন যে, আমি মনে করলাম, তিনি ইমেত্মকাল করেছেন। আমি এ অবস্থা দেখে দাঁড়িয়ে তার বৃদ্ধাঙ্গুল ধরে নাড়া দিলাম, এতে তা নড়ে উঠল। ফলে আমি চলে এলাম। অতঃপর যখন তিনি সিজদা হতে মাথা উত্তোলন করলেন এবং সালাত শেষ করলেন তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা! অথবা বললেন, হে হুমায়রা! তুমি কি ধারণা করেছ যে, আল্লাহর নবী তোমার সাথে খেয়ানত করেছেন? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল, (আমি এরূপ ধারণা করিনি) বরং আপনার দীর্ঘ সিজদার কারণে আমি ধারণা করেছি যে, আপনি ইমেত্মকাল করেছেন। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন, এটা মধ্য শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোনিবেশ করেন। অতঃপর তিনি ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদেরকে ক্ষমা করেন এবং রহমতপ্রার্থনাকারীদেরকে রহম করেন। আর হিংসুকদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেন। [শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৮৩৫।]
পর্যালোচনা :
এ হাদীসের সনদ সম্পর্কে ইমাম বায়হাকী বলেন, হাদীসটি সম্পূর্ণভাবে মুরসাল। সম্ভাবনা রয়েছে যে, আলা ইবনে হারেস মাহকূল থেকে হাদীসটি গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। তাছাড়া এই অধ্যায়ের অনেক পরিত্যক্ত হাদীস রয়েছে। এসব হাদীসের বর্ণনাকারীরা অপরিচিত ব্যক্তি।
৫ নং হাদীস :
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِيْ طَالِبٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُوْمُوْا لَيْلَهَا وَصُوْمُوْا نَهَارَهَا فَإِنَّ اللهَ يَنْزِلُ فِيْهَا لِغُرُوْبِ الشَّمْسِ إِلٰى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُوْلُ أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِيْ فَأَغْفِرَ لَه أَلَا مُسْتَرْزِقٍ فَأَرْزُقَه أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَه أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا حَتّٰى يَطْلُعَ الْفَجْرُ
আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত্রি আগমন করে, তখন তোমরা সেই রাত্রিতে জাগরণ করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা সেদিনের সূর্য অসত্ম যাওয়ার পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব; কোন রিযিকপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে রিযিক প্রদান করব এবং কোন বিপদগ্রসত্ম ব্যক্তি আছে কি, আমি তাকে উদ্ধার করব। অতঃপর এভাবে তিনি ফজর পর্যমত্ম বলতে থাকেন। [ইবনে মাজাহ, হা/১৩৮৮; সিলসিলা যঈফাহ, হা/২১৩২।]
পর্যালোচনা :
প্রথমত : সনদের দিক দিয়ে হাদীসটি যঈফ। কেননা এ হাদীসের সনদে ইবনে আবু সাবুরাহ নামে বর্ণনাকারী রয়েছে, যাকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস হাদীস জালকারী হিসেবে জানেন। তাছাড়া শাইখ আলবানী (রহ.) এ হাদীসের সনদটিকে মাওযূ হিসেবে গণ্য করেছেন।
দ্বিতীয়ত : অন্য একটি সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষের দিকে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। যেমন,
عَنْ أَبِى ْهُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ - - قَالَ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالٰى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلٰى سَمَآءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقٰى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْاٰخِرُ فَيَقُوْلُ مَنْ يَّدْعُوْنِىْ فَأَسْتَجِيْبَ لَه مَنْ يَّسْأَلُنِىْ فَأُعْطِيَه مَنْ يَّسْتَغْفِرُنِىْ فَأَغْفِرَ لَه
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমাদের প্রতিপালক প্রত্যেক রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন যে, কোন আহবানকারী আছে কি, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে দান করব এবং কোন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। [সহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮০৮; আবু দাউদ, হা/১৩১৭; তিরমিযী, হা/৪৪৬; নাসাঈ, হা/৭৭৬৮; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৯২০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৩১৩; মিশকাত, হা/১২২৩।]
৬ নং হাদীস :
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ عَنِ النَّبِيِّ قَالَ إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَإِذَا مُنَادٍ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَاَغْفِرَ لَه هَلْ مِنْ سَائِلٍ فَأُعْطِيَه فَلَا يَسْأَلُ أَحَدٌ إِلَّا أُعْطِيَ إِلَّا زَانِيَةٌ بِفَرْجِهَا أَوْ مُشْرِكٌ
উসমান ইবনে আবুল আস (রাঃ) এর সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আগমন করে তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন যে, কোন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব; কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, আমি তাকে দান করব। অতঃপর মুশরিক ও লজ্জাস্থান দ্বারা ব্যভিচারী ব্যক্তি ব্যতীত সকল প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করা হয়। [শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৮৩৬; সিলসিলা যঈফাহ, হা/৭০০০।]
পর্যালোচনা :
উক্ত হাদীসের সনদ সম্পর্কে শাইখ আলবানী বলেন, এর সনদটি যঈফ।
সুতরাং উপরের হাদীসগুলো দ্বারা এ রাতের কোন বিশেষ আমল প্রমাণ করা ঠিক হবে না। তাই মুসলিমদের উচিত এ রাতটি অন্যান্য রাতের মতই অতিবাহিত করা এবং বিশেষ কোন আয়োজন না করা। কেননা এ রাত উপলক্ষে যদি সত্যিই কোন করণীয় থাকত, তাহলে তা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ অথবা সালফে সালেহীনদের থেকে প্রমাণিত থাকত।