hadith book logo

ইতিহাসের ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪

চতুর্থ অধ্যায় সম্রাট আকবর ও ঔরঙ্গজেব সম্পর্কিত বিকৃত ইতিহাসের পর্যালোচনা

পর্যালোচনা অনেক অখ্যাত বা কুখ্যাত ঐতিহাসিকরা ভারতে মহান দুই জাতি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভেদের বা বিবাদের দেওয়াল রচনার চেষ্টা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা জানতো, হিন্দুধর্মে বহু মত, বহু পথ, বহু দেবদেবী ও বহু কুসংস্কার আছে তাই তাদের ধর্মান্তরিত করে খ্রিস্টান করে নেওয়া অত্যন্ত সহজসাধ্য। যেহেতু অনেককে তারা পূর্ণভাবে অথবা অর্ধভাবে খ্রিস্টান করতে সক্ষম হয়েছিল। এছাড়া তারা আরও লক্ষ্য করেছিল, সহস্র সহস্র নয়; বরং অজস্র হিন্দু-মুসলমান রাজার সময় স্বধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়েছে। কিন্তু মুসলমান দলে দলে খ্রিস্টান হয়েছে কিংবা হিন্দু কিংবা জৈন ও বৌদ্ধ হয়েছে এ দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। অতএব মুসলমান জাতিকে খ্রিস্টান করতে হলে এমন এক জায়গায় ছুরিকাঘাত করতে হবে, যাতে গোটা শরীরটা অচল অবশ হয়ে মৃত্যুর দ্বারদেশে পৌঁছে যায়। সেটা হচ্ছে এই যে, মুসলমানদের মধ্যে যারা ধার্মিক, বিজ্ঞ পণ্ডিত, মাওলানা, হাফিজ প্রমুখ নেতৃস্থানীয় নরপতি তাঁদের চরিত্রে কলঙ্ক সৃষ্টি করে ইতিহাসের পাতায় তাদের চরিত্রহীন, লোভী, হিন্দু বিদ্বেষী, লুণ্ঠনকারী অথবা পাগল ইত্যাদি বলে প্রতিপন্ন করা আর যাঁরা চরম মাত্রায় চরিত্রহীন, ইসলাম ধর্মে উদাসীন মদ্যপায়ী, অদূরদর্শী চক্রান্তকারী ও স্বেচ্ছাচারীরূপে খ্যাত, তাঁদের চরিত্রে প্রশংসার ডাক পিটিয়ে এত বড় ও মহান করে তুলে ধরা, যার ফলে ভবিষ্যতে শিক্ষিত মুসলিম সমাজ যেন সুনাম ও প্রশংসা পাওয়ার জন্য স্বধর্মে অবিশ্বাসী আর স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। তারই জন্য উদার ও মহানুভব আওরঙ্গজেবের চরিত্রকে করা হয়েছে দুর্বিষহ অভিযোগের প্রভাবে কলঙ্কিত আর চরিত্রহীন আকবরকে দেওয়া হয়েছে "The great" উপাধি অর্থাৎ “মহামতি”।

আসল ইতিহাস সমাজের সামনে তুলে ধরতে গেলে আমাদের মধ্যেও সাম্প্রদায়িকতা আছে বলে মনে হবে। কারণ প্রচলিত ইতিহাসের বিরুদ্ধে কিছু বলা বড়ই সুকঠিন। শুধু বিপরীত মতামত পেশ করলেই চলবে না; বরং প্রমাণাদি দিতে হবে প্রামাণ্য ইতিহাস বা দলিল থেকে, তাও আবার সব জায়গায় শুধু নামী-দামী মুসলমান ঐতিহাসিকদের ইতিহাস থেকে উদ্ধৃতি দিলেই চলবে না, কারণ অনেকে মনে করতে পারেন যে, মুসলমান ঐতিহাসিকরা মুসলমান সম্প্রদায়ের পক্ষ টেনে বলতে বা তাদের গোত্রের দুর্নাম ছড়িয়ে যাওয়ার ভয়ে কিছু তথ্য গোপন করতে পারেন। অতএব সেজন্য অনেক মুসলিম ঐতিহাসিক পরিবেশিত তথ্যের পাশে ইংরেজ ঐতিহাসিকদের দলিল এবং ভারতীয় নামকরা শিক্ষিত হিন্দু লেখকদের উদ্ধৃতি দেবার আবশ্যকতা স্বীকার করছি অনেক ক্ষেত্রে।

সুতরাং মুসলমানদের জন্য অনেক কথা লিখতে হচ্ছে ওকালতির জন্য নয় প্রয়োজনেরই প্রয়োজনে। যেমন অনেক দিন থেকে শুনে আসছি ও পড়ে আসছি চাঁদ সুন্দর। চাঁদের এই সৌন্দর্য প্রমাণের জন্য লম্বা কোন দলিলের প্রয়োজন নেই, কিন্তু ‘চাঁদ অসুন্দর’ বললেই প্রমাণ করতে হবে চাদের নৈপুণ্য চাঁদের বৈশিষ্ট্য ও তার আকার উপাদান, পরিবেশ ও বর্তমান পরিস্থিতি- পৃথিবী হতে চাঁদের দূরত্ব বর্তমানের চন্দ্রাভিযাত্রীদের অভিজ্ঞতা প্রভৃতি অনেক আলোচ্য বিষয়বস্তুকে। পরে প্রমাণ হবে, চাঁদের কোন জ্যোতি নেই বা তার কোন আলো নেই- সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়। আসলে চন্দ্র একটা অন্ধকারময় অসমান্তরাল, অস্বাস্থ্যকর, অসুন্দর স্থান ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিক তেমনি আকবরকে আমরা ভারতের স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির আটপৌঁরে আধুনিক ইতিহাস পড়ে জানতে পেরেছি, তিনি নাকি মুসলমান রাজা-বাদশাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহান হতে মহানতম সম্রাট। অপর দিকে আওরঙ্গজেবের ইতিহাস পড়লে মনে হয় এত বড় হিন্দু বিদ্বেষী গোঁড়া ভ্রাতৃহন্তা দুষ্টমতি সংকীর্ণমনা বাদশাহ মুসলমান যুগের কলঙ্ক ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ প্রকৃত ইতিহাস এই সবের বিপরীত।

এখন যদি আকবর আর আওরঙ্গজেবের ইতিহাস সঠিকভাবে আলোচনা করা হয় তাহলে আমরা সাধের ভারতবর্ষের ভাবী বা বর্তমান বংশধর কল্যাণকামী পদক্ষেপে আসল ইতিহাসের পেছনে অনুসন্ধিৎসু হয়ে মৃত ইতিহাসের দেহের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে দিতে পারব বলে বিশ্বাস।