১
ইতিহাসের ইতিহাস
লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৪
শের শাহ
১৫৩৯ খ্রীস্টাব্দ হতে ১৫৪৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সময় শেরশাহ রাজত্ব করেন। মাত্র পাঁচ বছর রাজত্ব করেন তিনি। এই অল্প সময়ের মধ্যেই শুধু যুদ্ধে নয় সর্ববিষয়ে তিনি যে রাজনৈতিক ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন তা চমকপ্রদ। গোটা রাষ্ট্র কতকগুলো প্রদেশে ভাগ করেছিলেন। প্রত্যেক প্রদেশকে কয়েকটি সরকার, প্রত্যেক সরকারকে আবার কয়েকটা পরগনায়, প্রত্যেক পরগনা কতগুলো গ্রাম নিয়ে গঠিত হতো। প্রদেশের শাসককে বলা হতো ‘ইকতেদার’। ইকতেদারের অধীনে ছিল ‘সিকদার-ই-মুনসিফান’। এমনিভাবে মুনসিফ, ফোতাদার, কারকুন, আমিন, দেওয়ান প্রভৃতি প্রচুর পদবিন্যাস করেছিলেন আর সব উপরে ছিলেন শের শাহ স্বয়ং। চারজনই ছিলেন নিজের বিভাগে সুপণ্ডিত এবং সৃজনী শক্তিধর। (১) “দেওয়ান-ই-গুজারত’ বা রাজস্ব মন্ত্রী (২) ‘দেওয়ান-ই-রিসালাত’ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রী (৩) ‘দেওয়ান-ই-আরিজ’ বা সেনা বিভাগের মন্ত্রী (৪) ‘দেওয়ান-ই-ইনসা’ বা দলিল ও ভূ-মন্ত্রী। সমগ্র রাষ্ট্রের জমি জরিপ, প্রজাদের ‘পাট্টা' এবং ‘কবুলিয়াৎ’ দান, শস্য হতে কর প্রদানের সুবিধা এবং ভারতে চিঠিপত্র আদান প্রদান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রথম চালু হয় এই শের শাহের আমলেই। ভারতীয় মুদ্রা তঙ্কাকে রুপেয় নাম তাঁরই দেওয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, শেরশাহ যেভাবে নীচুতলা হতে উপরতলা পর্যন্ত শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন তা আজও শুধু ভারতে নয়, সারা বিশ্বে কোথাও সামগ্রিকভাবে অথবা আংশিকভাবে প্রচলিত রয়েছে এবং শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা এত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ ছিল যে, কাউকে ঘরে খিল বা তালা লাগাবার প্রয়োজন হতো না। রাস্তায় লুটপাট বা ছিনতাই বন্ধ করেছিলেন। ছোট বড় অনেক রাস্তা নির্মাণ করেছিলের। কলকাতা হতে পেশোয়ার পর্যন্ত নির্মিত বিখ্যাত রাস্তাটির ধারে ধারে বরাবর হিন্দু ও মুসলমান প্রজাদের জন্য পৃথক পৃথক সরাইখানা স্থাপন করেছিলেন। সেই রাস্তার ধারে বসেই আমরা ইতিহাসের ইতিহাস লিখছি। এই ঐতিহাসিক রাস্তাটির নাম শেরশাহ রোড না হয়ে ইতিহাসের পাতায় ইংরেজি নাম ‘গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড’ আমরা সংক্ষেপে লিখি জি.টি রোড।
তিনি একবার বলেছিলেন, “যদি আমার হায়াত (আয়ু) আরও আল্লাহ বাকি রাখেন তাহলে আমি এমন একটি রাস্তা তৈরি করতে চাই, যেটা ভারত হতে খাইবার গিরিপথ দিয়ে একেবারে আরব দেশ মক্কা শরীফ পর্যন্ত লম্বা হবে, যেটির উপর দিয়ে আমার ভারতীয় যে কোন বোন বোরকা পরে একা হাঁটতে হাঁটতে হজে যেতে পারেন। কিন্তু তাঁর সে সাধ পূরণ হয়নি, হঠাৎ একদিন বারুদের স্তুপে আগুন লেগে যায় এবং তিনি তাতেই মৃত্যু বরণ করেন। এই মহৎ ও চরিত্রবান বাদশাহের জন্য শ্রীবিনয় ঘোষ ভারতজনের ইতিহাস ৩৯৪ পৃঃ যা লিখেছেন তাতে তাকে মুসলমান ধর্ম অমান্যকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে- “সম্রাট ইহলোকিক ও পারলৌকিক সমস্ত শক্তির আধার ও উৎস। এই রাজ তত্ত্ব শেরশাহও মানিতেন।” উপরোক্ত কথা আদৌ সত্য নয় কোন মুসলমান ঐ রূপ ধারণা রাখতে পারেন না।
হুমায়ুন ও শেরশাহের পর আকবরের আগমন। তাঁর সম্বন্ধে ইতিপূর্বেই এই পুস্তকের এক বিস্তৃত স্থান জুড়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে একটা কথা অবশ্যই তাদের মনে পড়বে, যার আকবরের ইতিহাস ইতিপূর্বে পড়ে ফেলেছে, সেটি হচ্ছে এই যে আকবরের চরিত্রহীনতা, নারী লোলুপতা, মূর্খতা প্রভৃতির প্রাবল্যে মোগল সামাজ্য কয়েক মাসের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেত যদিই সম্রাট শেরশাহ রাজ্য চালানোর পথ প্রস্তত করে না যেতেন। সুতরাং আধুনিক চিন্তাশীলদের কাছে এটা স্পষ্ট যে, আকবরের রাজত্ব ও তার স্থায়ীত্ব পর্দার অন্তরালে শেরশাহের নিকট বিশেষভাবে ঋণী।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, শেরশাহ যেভাবে নীচুতলা হতে উপরতলা পর্যন্ত শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন তা আজও শুধু ভারতে নয়, সারা বিশ্বে কোথাও সামগ্রিকভাবে অথবা আংশিকভাবে প্রচলিত রয়েছে এবং শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা এত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ ছিল যে, কাউকে ঘরে খিল বা তালা লাগাবার প্রয়োজন হতো না। রাস্তায় লুটপাট বা ছিনতাই বন্ধ করেছিলেন। ছোট বড় অনেক রাস্তা নির্মাণ করেছিলের। কলকাতা হতে পেশোয়ার পর্যন্ত নির্মিত বিখ্যাত রাস্তাটির ধারে ধারে বরাবর হিন্দু ও মুসলমান প্রজাদের জন্য পৃথক পৃথক সরাইখানা স্থাপন করেছিলেন। সেই রাস্তার ধারে বসেই আমরা ইতিহাসের ইতিহাস লিখছি। এই ঐতিহাসিক রাস্তাটির নাম শেরশাহ রোড না হয়ে ইতিহাসের পাতায় ইংরেজি নাম ‘গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড’ আমরা সংক্ষেপে লিখি জি.টি রোড।
তিনি একবার বলেছিলেন, “যদি আমার হায়াত (আয়ু) আরও আল্লাহ বাকি রাখেন তাহলে আমি এমন একটি রাস্তা তৈরি করতে চাই, যেটা ভারত হতে খাইবার গিরিপথ দিয়ে একেবারে আরব দেশ মক্কা শরীফ পর্যন্ত লম্বা হবে, যেটির উপর দিয়ে আমার ভারতীয় যে কোন বোন বোরকা পরে একা হাঁটতে হাঁটতে হজে যেতে পারেন। কিন্তু তাঁর সে সাধ পূরণ হয়নি, হঠাৎ একদিন বারুদের স্তুপে আগুন লেগে যায় এবং তিনি তাতেই মৃত্যু বরণ করেন। এই মহৎ ও চরিত্রবান বাদশাহের জন্য শ্রীবিনয় ঘোষ ভারতজনের ইতিহাস ৩৯৪ পৃঃ যা লিখেছেন তাতে তাকে মুসলমান ধর্ম অমান্যকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে- “সম্রাট ইহলোকিক ও পারলৌকিক সমস্ত শক্তির আধার ও উৎস। এই রাজ তত্ত্ব শেরশাহও মানিতেন।” উপরোক্ত কথা আদৌ সত্য নয় কোন মুসলমান ঐ রূপ ধারণা রাখতে পারেন না।
হুমায়ুন ও শেরশাহের পর আকবরের আগমন। তাঁর সম্বন্ধে ইতিপূর্বেই এই পুস্তকের এক বিস্তৃত স্থান জুড়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে একটা কথা অবশ্যই তাদের মনে পড়বে, যার আকবরের ইতিহাস ইতিপূর্বে পড়ে ফেলেছে, সেটি হচ্ছে এই যে আকবরের চরিত্রহীনতা, নারী লোলুপতা, মূর্খতা প্রভৃতির প্রাবল্যে মোগল সামাজ্য কয়েক মাসের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেত যদিই সম্রাট শেরশাহ রাজ্য চালানোর পথ প্রস্তত করে না যেতেন। সুতরাং আধুনিক চিন্তাশীলদের কাছে এটা স্পষ্ট যে, আকবরের রাজত্ব ও তার স্থায়ীত্ব পর্দার অন্তরালে শেরশাহের নিকট বিশেষভাবে ঋণী।