১
ইতিহাসের ইতিহাস
লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৭৩
মাওলানা মুহাম্মদ আলী
মাওলানা মুহাম্মদ আলী বি-আম্মার গর্ভে, মওলুভী আবদুল আলীর ঔরসে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাওলানা শওকত আলীর সহোদর ভ্রাতা। দু’বছর বয়সে পিতৃহারা হন। খেলাধুলায় ও পড়াশোনায় খুবই দক্ষ ছিলেন তিনি। আলিগড় হতে পরীক্ষায় ভালভাবে উত্তীর্ণ হয়ে বিলেতে অক্সফোর্ডে গিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সেই সময়েই বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপকমণ্ডলী এবং ছাত্রছাত্রীরা তাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।
তিনিই ভারতের সর্ব প্রথম অক্সফোর্ড সোসাইটির সেক্রেটারি নির্ধারিত হন।
তিনিই কমরেড পত্রিকার মূল প্রাণ ছিলেন। তাঁর লেখায় সারা বিশ্বের বুদ্ধিজীবীরা চিন্তার খোরাক পেতেন। তাঁর কমরেড পত্রিকার গ্রাহক নানা দেশের রাজকীয় মহলে পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল যেমন জার্মানীর প্রিন্স, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী প্রমুখ। তখন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মিঃ ম্যাকডোনা। তিনিও তাঁর প্রবন্ধ পড়ে বিস্ময় প্রকাশ করতেন।
তিনি দেশে ফিরে এসেও তাঁর রাজনীতি অব্যাহত রাখেন। দুটি পত্রিকার পরিচালনা করতে থাকেন-একটি “কমরেড” অপরটি “হামদার্দ”। সত্যিকারের স্বাধীনতার নায়ক তাঁদের শাসকের পক্ষ হতে অত্যাচারীত হতেই হবে। সেখানে উপাধিপ্রাপ্তি আর ভোজসভায় আমন্ত্রণ আর বিলেতে বেড়াতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ মেলে না। মাওলানা মুহাম্মদ আলীর ওপর বারে বারে জেলদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই কি? তঁার পত্রিকা দুটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রেসটি পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়েছিল। বাড়িতে পুলিশ দিয়ে আসবাবপত্র ভেঙেচুরে তছনছ করা হয়েছিল। বাড়ির শিশু ও নারীদের বাড়ি ছেড়ে প্রাণ ও ইজ্জতের খাতিরে পলায়ন করতে হয়েছিল।
তিনিও উপলব্ধি করেছিলেন মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মার খাওয়ার প্রধান কারণ হিন্দুদের আন্দোলন হতে সরে দাঁড়ানো। তাই তিনি বড় আলেমদের নিয়ে গোপনে পরামর্শ করলেন এবং জানালেন, ভারতে হিন্দু জাতি বিরাট একটা শক্তি, তাকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা আনা যায় না। যদিও তারা দূরে আছেন তবুও তাঁদের কাজে লাগাতে একজন এমন নেতাকে বলে জয় ঢাক বাজাতে হবে, যার ফলে হিন্দু জাতি তার আহ্বানে দলে দলে আসতে পারবে। তিনি জানান, যদি স্বাধীনতার কাম্য তাহলে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ আসনে যদি কাউকে বা হিন্দু নেতাকে বসাতে হয় তাতে হিংসা করা সঠিক হবে না। মুসলমানদের আন্দোলনে হিন্দুদের যোগ না দেওয়ার অন্যতম কারণ, আন্দোলনটি পুরোপুরি ধর্মভিত্তিক ছিল। তাতে বড় ভুল বোধহয় এটিই হয়েছিল হিন্দু ধর্মের সংরক্ষণের বা ধর্মের উন্নতির জন্য তাদের আহ্বান করা হয়নি। শেষে গান্ধীজিকেই বাছাই করা হয়। তাঁকে মহাত্মা উপাধির পোশাক পরানো হয় এবং সারা ভারতে তার নাম প্রচার করে তার অধীনস্তর মত মুসলিম নেতারা সভা সমিতি করে বেড়াতে থাকেন। তখনই সারা ভারতে হিন্দু জনগণ ইংরেজবিরোধী হতে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে, তাই মাওলানা মুহাম্মদ আলীর জন্য লেখক লিখেছেন, কংগ্রেসকে কংগ্রেসে পরিণত করেছেন গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ বানিয়েছেন, দেশে স্বাধীনতার বীজ ফেলেছেন আর সিঞ্চন করেছেন বলিষ্ঠ বিরত্বের রাঙা রক্ত। কঠিন পথের সর্ব বিপদ সহ্য করেছেন, সরকারের সঙ্গে সমান তালে লড়েছেন, কঠিন কারাগারকে জীবন্ত করেছেন জীবনের সর্ব প্রকার আরামকে হারাম করে কষ্টের জীবনই বেছে নিয়েছেন। (দ্রঃ ইফাদাতে মুহাম্মদ আলী পৃঃ ১৪, ১৫, ১৯৪৫ সালে হায়দ্রাবাদে মুদ্রিত)
১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বড় ভাই মাওলানা শওকত আলীই নিজের চাকরি ইচ্ছা করে ছেড়ে দিয়ে জনসাধারণকে জানিয়েছেন সরকারের যারা শত্রু বলে দাবি করে তাদের সরকারি চাকরি করা পার্টির সংগঠনের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। সেই সময়েই আলী ভ্রাতাদের উত্তপ্ত ভাষণে মুগ্ধ হয়ে চিত্তরঞ্জন দাস নিজের স্বাধীন ব্যবসা, ব্যারিস্টারী ছেড়ে দিতে উদ্বুদ্ধ হন, যেহেতু ইংরেজ বিচারপতিদের সম্মুখে "My Lord' আমার প্রভু বাহাদুর বলার ওপর ঘৃণা পোষণ করে। চিত্তরঞ্জন দাস ও বি-আম্মা অর্থাৎ আলী ভ্রাতাদের মাকে “আম্মা” বলে ডাকতেন এবং বি আম্মা বা আবিদা বেগমকে মা-এর মতই শ্রদ্ধা করতেন।
ঐ ১৯১১ সালেই মুসলমানদের ইংরেজের বিরুদ্ধে পূর্বের মত সক্রিয় হওয়ার জন্য একটি সমিতি সৃষ্টি করেন যেটির নাম আঞ্জুমানে খাদেমে কাবা। এটাই হচ্ছে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্যান ইসলামিক প্রতিষ্ঠান (দ্রঃ মুহামলী পত্রিকা, পৌষ, ১৩৪৫ সাল, আঃ হাকিম পৃঃ ২৩০)
“যখন গান্ধীজি ভারতে আইন অমান্য ও সাইমন কমিশন বর্জন আন্দোলন আরম্ভ করলেন তখন আলী ভ্রাতৃদ্বয় মোসলেম সদায়ের গোলটেবিলে যোগদানের জন্য আন্দোলন আরম্ভ করলেন।"... উভয়ে ভারতীয় মোসলেম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরূপে লণ্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের জন্য আহূত হন।” (দ্রঃ পৃঃ ২৩১) কংগ্রেসের ভেতর ব্রাহ্মণ্যবাদের গোঁড়ামি এত বেশি ছিল যার ফলে ভারতে অব্রাহ্মণ সম্প্রদায় নেতাদের ওপর সন্তুষ্ট ছিলে না। মাওলানা মুহাম্মদ আলী সমস্ত অব্রাহ্মণ হিন্দুকেও স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট মদনমোহন মালব্য সম্বন্ধে একটি ঘটনাতে তার পরিচয়ের কিছু প্রমাণ পাওয়া পর ১৯৩৩ সালে যখন তিনি পেশওয়ার গিয়েছিলেন তখন সেখানকার একজন কংগ্রেস সদস্য তাকে খাওয়ানোর জন্য ব্যবস্থা করেন। পণ্ডিত মালবীয়া যেহেতু ব্রাহ্মণ তাই তিনি সেই পাত্র থেকে খেতে পারেন না, যে পাত্রে কখনো মাংস খাওয়া হয়েছে। তাই তাঁর নিমন্ত্রণকারী বাজার থেকে কিনে আনেন সম্পূর্ণ নতুন এক ডিনারসেট আর যেহেতু পণ্ডিতজি ছিলেন নিরামিসাশী তাই তাঁর নিমন্ত্রণকারী বাজার থেকে যোগাড় করলেন সর্বোক্তৃষ্ট ধরনের কলা ও কমলাদি। ডিনার টেবিলে প্রশ্ন উঠলো তখন, তাঁকে প্রদত্ত এই সব ফল বাগান থেকে টেবিলে আসার মাঝখানে কোন মুসলমান বা অচ্ছুত অস্পৃশ্য হিন্দু ছুয়েছে টুয়েছে কিনা?
দূর্ভাগ্যবশত নিমন্ত্রণকারী সেই হিন্দু কংগ্রেস সদস্য পণ্ডিতজিকে সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। ফলে, নিমন্ত্রণকারীকে সাংঘাতিক রকমের বিব্রত করে দিয়ে পণ্ডিত মালবীয়া কিছু না খেয়েই ডিনার টেবিল থেকে উঠে যান। (এসএ সিদ্দিকী বার অ্যাট ল-এর লেখা ভুলে যাওয়া ইতিহাস পৃঃ ৮৪) ১৯৩৩ সালে পর্যন্ত যদি এই মনোভাবের পরিণাম হয় তাহলে সেখানে হিন্দু মুসলমান মিলন সেতু রচনা করা কত কঠিন। ঐ কঠিন কাজ করেছিলেন ভারত সিংহ মাওলানা মুহাম্মদ আলী।
জহরলালকে রাজনীতি মৌলিক শিক্ষার তালিম তিনিই দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে গুরু বলে মেনে নিতে পারেননি। মতিলালের জীবদ্দশায় জহরলাল কলকাতার কংগ্রেসের মিটিং-এ মাওলানা মুহাম্মাদ আলীর পরামর্শে স্বাধীনতার প্রস্তাব করতে চেয়েছিলেন কিন্তু মতিলাল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন। তখন মুহাম্মদ আলী রেগে সিংহ নিনাদে গর্জে উঠেছিলেন। তিনি নেহরুর জন্য বলতেন, “ফারসীতে একটা কথা আছে-কুকুর হয়ো, ছোট ভাই হোয়ো না... জহরলালের বেলায় বলল.. বিড়াল হয়ো, তোমার বাবার পুত্র হয়ো না। কারণ তাঁর পিতাই ১৯২৮ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেচারা জহরলালের কণ্ঠরোধ করে দিয়েছিলেন তখন, যখন পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। তার স্থলে আমি উঠে দাঁড়াই এবং প্রতিবাদ করি ডেমিনিয়ন ষ্টেষ্টাসের সেই ধারায়।” (দ্রঃ ঐ, পৃঃ ১২৬) বারবার মাওলানা মুহাম্মদ আলী হিন্দু-মুসলমানের মিলনের চেষ্টা করেছেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। গান্ধীজিকে মহাত্মা টাইটেল তিনিই দিয়েছিলেন। বিলেতে গোলটেবিল বৈঠকে জহরলাল, গান্ধী, মুহাম্মদ আলী প্রমুখ নেতারা এবং ছয় কোটি হরিজনের নেতা ডঃ বি আর আম্বেদকর একত্রে বসে একটা মিলনের চেষ্টার সিদ্ধান্ত হয়েছিল কিন্তু সেই সভায় গান্ধীজি ও জহরলাল হাজির হননি। মুহাম্মদ আলী বিলেতে গিয়ে তাদের অনুপস্থিতে খুব দুঃখিত হন। ইংরেজরা তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী মুহাম্মদ আলীকে বশ করার চেষ্টা করে, যেন তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি না করেন।
মাওলানা আগে হতেই অসুস্থ ছিলেন। সারা ভারতে হিন্দু-মুসলমানকে এক করার জন্য তাঁকে শহর ও গ্রামে-গঞ্জে অগ্নিময় বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে হয়। তখন হতেই তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে থাকে। হিন্দু-মুসলমান বন্ধু বান্ধব ও ডাক্তারদের পরামর্শে দেশের খাতিরেই তাকে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে উত্তর দেন, “বিশ্রাম নেব স্বাধীনতা পাওয়ার পর।” ঐ অবস্থাতেই লণ্ডনে পৌঁছালেন। ইংরেজদের বুকে বসে ঐ ১৯৩০ সালের ১৯ নভেম্বর যে জ্বালাময়ী বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন তা জাতির জন্য মূল্যবান দলিল। “স্বাধীনতার আসল জিনিস নিয়ে যেতে পারলেই আমি আমার ভারতে ফিরে যেতে চাই অন্যথায় আমি এক গোলামের দেশে ফিরে যেতে চাই না।” (দ্রঃ ঐ) তিনি তাঁর ভাষণে জানিয়েছিলেন, আমাদের হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান করা উচিত ছিল ভারতের মাটিতেই। কিন্তু আমরা যারা গান্ধীজির সঙ্গে সকল অবস্থাতেই দশটি বছর কাজ করেছি আমরা তাঁকে এ জন্য চাপ দিয়েছি। কিন্তু নিজের ও পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর হিন্দু জনপ্রিয়তা সংরক্ষণের মানসে সেই মীমাংসা স্থগিত রেখেছেন। স্যার তেজ বাহাদুর সপ্রু ও সনির্বন্ধ অনুরোধে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর কংগ্রেসে হিন্দু মুসলমানে বিভেদ মীমাংসার জন্য সর্বান্তকরণে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। (দ্রঃ ঐ, পৃঃ ১২১)
গান্ধীজির ওপর অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ও খুশি ছিলেন না। কারণ তাদের নেতা ‘ছোট ঘরের ছেলে’ বলে এত শিক্ষিত হয়েও সম্মান পাননি তাই অনুন্নতদের নেতা। ডক্টর আম্বেদকর ১৯৩১ সালে ১ জানুয়ারি লণ্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, প্রথম যে মন্তব্য রাখতে চাই তা হচ্ছে এই যে, আমরা নির্যাতিত শ্ৰেণীরা আমাদের ও হিন্দুদের মধ্যে সম্পূর্ণ বিভক্তি চাই। এই হচ্ছে প্রথম জিনিস। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য আমাদের বলা হয়েছে হিন্দু। কিন্তু সামাজিকভাবে কখনো হিন্দুদের দ্বারা আমরা তাদের ভাই হিসেবে স্বীকৃত হইনি। (দ্রঃ ঐ, পৃঃ ১২৩) গান্ধীজি আম্বেদকরকে বলেছিলেন, “আমাদের বিশ্বাস করুন, বিশ্বাস করুন বর্ণ হিন্দুদের।” উত্তরে ডক্টর শ্রী আম্বেদকর বলেন, “আমরা আপনাদের বিশ্বাস করব না, কারণ আপনারা আমাদের বংশগত শত্রু।” (দ্রঃ ঐ পৃঃ ১২২) ঐ পরিস্থিতিতে ভারতীয় কোন্দল কলহকে সুযোগ মনে না করে মুহাম্মদ আলী বীরদর্পে অসুস্থ শরীরে বক্তৃতা দিচ্ছেন। আর ইংরেজদের কলিজাতে আগুন ধরিয়ে চলেছেন সেই সময়। যখন ইংরেজের তরফ হতে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ধর্ম, আলাদা ও রাজনীতি আলাদা শিক্ষিত বিশ্ববরেণ্য মানুষরা তো তাই বলেন। আপনার মতামত কী? উত্তরে মুহাম্মদ আলী বলেছিলেন, “ধর্ম সম্বন্ধে আপনাদের যে ধারণা তা ভুল হবে যদি রাজনীতিকে এর বাইরে বাইরে রাখেন। এটা ইসলাম মতবাদের গোঁড়ামি নয়। নয় কোন ধর্মাচরণ পদ্ধতি। আমার মতে ধর্মের অর্থ জীবনের ব্যাখ্যা।... আল্লাহর নির্দেশই আমি প্রথমত একজন মুসলিম দ্বিতীয়ত একজন মুসলিম শেষত একজন মুসলিম এবং একজন মুসলিম ছাড়া আমি অন্য কিছুই নই।... কিন্তু ভারতবর্ষের কথা যেখানে, যেখানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত, জড়িত যেখানে ভারতবর্ষের কল্যাণের প্রশ্ন, সেখানে প্রথমত আমি ভারতীয়, দ্বিতীয়ত আমি ভারতীয়, শেষত আমি একজন ভারতীয় এবং একজন ভারতীয় ছাড়া অন্য কিছু নই।....”
যখন তাঁকে তাঁর অসুস্থতার কথা রক্তক্ষরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় তখনও তিনি বলছেন... “বিদেশেও আমি মৃত্যুকে শ্রেয়তর মনে করব যতক্ষণ সেই বিদেশ থাকবে এক মুক্ত দেশ। আর যদি আপনারা আমাদের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা না দেন তাহলে আপনাদের এখানে দিতে হবে এক কবর।”
সেই বিরাট বক্তৃতা দিতে দিতেই তিনি বুঝতে পারলেন তার মৃত্যু সম্মুখে। তাই তিনি তাঁর মৃতদেহ ভারতে নিয়ে যেতে মৃত্যুর আগেই নিষেধ করেছিলেন। হলও তাই ১৯৩১ সালে ৩ জানুয়ারি ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সিংহ ভ্রাতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী প্রাণ ত্যাগ করলেন। ইন্নাল্লিাহি... রাজিউন।
তাঁর মৃতদেহ আর ভারতে এল না বহু নবীর জন্মস্থান জেরুজালেমে তার কবর হয়। এ সংবাদ ভারতে যখন পৌঁছায় কোটি কোটি ভারতবাসী শোকাহত কান্নায় ভেঙে পড়ে। চিৎকার করে মুহাম্মদ আলী কী জয় স্লোগান দেয়। কংগ্রেসের পোশাক মোটা খদ্দর চোপত পাজামা শেরওয়ানি গলাবন্ধ করা কোটে এই ইসলামী পোশাক আজও মনে করিয়ে দেয় অতীতের মুসলমান নেতাদের পরিচ্ছদের প্রতীকের কথা।
কংগ্রেস ও লীগ সম্বন্ধে যা কিছু বলা হয়েছে তা পুরনো ঘটনার ইতিহাসের ইতিহাস পরে বা আগামীতে তা ভিন্ন প্রকার ভিন্ন দৃশ্যে হয়েছে আরও হবে হয়ত। হয়ত আরও মন্দ কিংবা আরও ভাল।
তিনিই ভারতের সর্ব প্রথম অক্সফোর্ড সোসাইটির সেক্রেটারি নির্ধারিত হন।
তিনিই কমরেড পত্রিকার মূল প্রাণ ছিলেন। তাঁর লেখায় সারা বিশ্বের বুদ্ধিজীবীরা চিন্তার খোরাক পেতেন। তাঁর কমরেড পত্রিকার গ্রাহক নানা দেশের রাজকীয় মহলে পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল যেমন জার্মানীর প্রিন্স, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী প্রমুখ। তখন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মিঃ ম্যাকডোনা। তিনিও তাঁর প্রবন্ধ পড়ে বিস্ময় প্রকাশ করতেন।
তিনি দেশে ফিরে এসেও তাঁর রাজনীতি অব্যাহত রাখেন। দুটি পত্রিকার পরিচালনা করতে থাকেন-একটি “কমরেড” অপরটি “হামদার্দ”। সত্যিকারের স্বাধীনতার নায়ক তাঁদের শাসকের পক্ষ হতে অত্যাচারীত হতেই হবে। সেখানে উপাধিপ্রাপ্তি আর ভোজসভায় আমন্ত্রণ আর বিলেতে বেড়াতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ মেলে না। মাওলানা মুহাম্মদ আলীর ওপর বারে বারে জেলদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই কি? তঁার পত্রিকা দুটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রেসটি পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়েছিল। বাড়িতে পুলিশ দিয়ে আসবাবপত্র ভেঙেচুরে তছনছ করা হয়েছিল। বাড়ির শিশু ও নারীদের বাড়ি ছেড়ে প্রাণ ও ইজ্জতের খাতিরে পলায়ন করতে হয়েছিল।
তিনিও উপলব্ধি করেছিলেন মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মার খাওয়ার প্রধান কারণ হিন্দুদের আন্দোলন হতে সরে দাঁড়ানো। তাই তিনি বড় আলেমদের নিয়ে গোপনে পরামর্শ করলেন এবং জানালেন, ভারতে হিন্দু জাতি বিরাট একটা শক্তি, তাকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা আনা যায় না। যদিও তারা দূরে আছেন তবুও তাঁদের কাজে লাগাতে একজন এমন নেতাকে বলে জয় ঢাক বাজাতে হবে, যার ফলে হিন্দু জাতি তার আহ্বানে দলে দলে আসতে পারবে। তিনি জানান, যদি স্বাধীনতার কাম্য তাহলে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ আসনে যদি কাউকে বা হিন্দু নেতাকে বসাতে হয় তাতে হিংসা করা সঠিক হবে না। মুসলমানদের আন্দোলনে হিন্দুদের যোগ না দেওয়ার অন্যতম কারণ, আন্দোলনটি পুরোপুরি ধর্মভিত্তিক ছিল। তাতে বড় ভুল বোধহয় এটিই হয়েছিল হিন্দু ধর্মের সংরক্ষণের বা ধর্মের উন্নতির জন্য তাদের আহ্বান করা হয়নি। শেষে গান্ধীজিকেই বাছাই করা হয়। তাঁকে মহাত্মা উপাধির পোশাক পরানো হয় এবং সারা ভারতে তার নাম প্রচার করে তার অধীনস্তর মত মুসলিম নেতারা সভা সমিতি করে বেড়াতে থাকেন। তখনই সারা ভারতে হিন্দু জনগণ ইংরেজবিরোধী হতে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে, তাই মাওলানা মুহাম্মদ আলীর জন্য লেখক লিখেছেন, কংগ্রেসকে কংগ্রেসে পরিণত করেছেন গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ বানিয়েছেন, দেশে স্বাধীনতার বীজ ফেলেছেন আর সিঞ্চন করেছেন বলিষ্ঠ বিরত্বের রাঙা রক্ত। কঠিন পথের সর্ব বিপদ সহ্য করেছেন, সরকারের সঙ্গে সমান তালে লড়েছেন, কঠিন কারাগারকে জীবন্ত করেছেন জীবনের সর্ব প্রকার আরামকে হারাম করে কষ্টের জীবনই বেছে নিয়েছেন। (দ্রঃ ইফাদাতে মুহাম্মদ আলী পৃঃ ১৪, ১৫, ১৯৪৫ সালে হায়দ্রাবাদে মুদ্রিত)
১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বড় ভাই মাওলানা শওকত আলীই নিজের চাকরি ইচ্ছা করে ছেড়ে দিয়ে জনসাধারণকে জানিয়েছেন সরকারের যারা শত্রু বলে দাবি করে তাদের সরকারি চাকরি করা পার্টির সংগঠনের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। সেই সময়েই আলী ভ্রাতাদের উত্তপ্ত ভাষণে মুগ্ধ হয়ে চিত্তরঞ্জন দাস নিজের স্বাধীন ব্যবসা, ব্যারিস্টারী ছেড়ে দিতে উদ্বুদ্ধ হন, যেহেতু ইংরেজ বিচারপতিদের সম্মুখে "My Lord' আমার প্রভু বাহাদুর বলার ওপর ঘৃণা পোষণ করে। চিত্তরঞ্জন দাস ও বি-আম্মা অর্থাৎ আলী ভ্রাতাদের মাকে “আম্মা” বলে ডাকতেন এবং বি আম্মা বা আবিদা বেগমকে মা-এর মতই শ্রদ্ধা করতেন।
ঐ ১৯১১ সালেই মুসলমানদের ইংরেজের বিরুদ্ধে পূর্বের মত সক্রিয় হওয়ার জন্য একটি সমিতি সৃষ্টি করেন যেটির নাম আঞ্জুমানে খাদেমে কাবা। এটাই হচ্ছে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্যান ইসলামিক প্রতিষ্ঠান (দ্রঃ মুহামলী পত্রিকা, পৌষ, ১৩৪৫ সাল, আঃ হাকিম পৃঃ ২৩০)
“যখন গান্ধীজি ভারতে আইন অমান্য ও সাইমন কমিশন বর্জন আন্দোলন আরম্ভ করলেন তখন আলী ভ্রাতৃদ্বয় মোসলেম সদায়ের গোলটেবিলে যোগদানের জন্য আন্দোলন আরম্ভ করলেন।"... উভয়ে ভারতীয় মোসলেম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরূপে লণ্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের জন্য আহূত হন।” (দ্রঃ পৃঃ ২৩১) কংগ্রেসের ভেতর ব্রাহ্মণ্যবাদের গোঁড়ামি এত বেশি ছিল যার ফলে ভারতে অব্রাহ্মণ সম্প্রদায় নেতাদের ওপর সন্তুষ্ট ছিলে না। মাওলানা মুহাম্মদ আলী সমস্ত অব্রাহ্মণ হিন্দুকেও স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট মদনমোহন মালব্য সম্বন্ধে একটি ঘটনাতে তার পরিচয়ের কিছু প্রমাণ পাওয়া পর ১৯৩৩ সালে যখন তিনি পেশওয়ার গিয়েছিলেন তখন সেখানকার একজন কংগ্রেস সদস্য তাকে খাওয়ানোর জন্য ব্যবস্থা করেন। পণ্ডিত মালবীয়া যেহেতু ব্রাহ্মণ তাই তিনি সেই পাত্র থেকে খেতে পারেন না, যে পাত্রে কখনো মাংস খাওয়া হয়েছে। তাই তাঁর নিমন্ত্রণকারী বাজার থেকে কিনে আনেন সম্পূর্ণ নতুন এক ডিনারসেট আর যেহেতু পণ্ডিতজি ছিলেন নিরামিসাশী তাই তাঁর নিমন্ত্রণকারী বাজার থেকে যোগাড় করলেন সর্বোক্তৃষ্ট ধরনের কলা ও কমলাদি। ডিনার টেবিলে প্রশ্ন উঠলো তখন, তাঁকে প্রদত্ত এই সব ফল বাগান থেকে টেবিলে আসার মাঝখানে কোন মুসলমান বা অচ্ছুত অস্পৃশ্য হিন্দু ছুয়েছে টুয়েছে কিনা?
দূর্ভাগ্যবশত নিমন্ত্রণকারী সেই হিন্দু কংগ্রেস সদস্য পণ্ডিতজিকে সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। ফলে, নিমন্ত্রণকারীকে সাংঘাতিক রকমের বিব্রত করে দিয়ে পণ্ডিত মালবীয়া কিছু না খেয়েই ডিনার টেবিল থেকে উঠে যান। (এসএ সিদ্দিকী বার অ্যাট ল-এর লেখা ভুলে যাওয়া ইতিহাস পৃঃ ৮৪) ১৯৩৩ সালে পর্যন্ত যদি এই মনোভাবের পরিণাম হয় তাহলে সেখানে হিন্দু মুসলমান মিলন সেতু রচনা করা কত কঠিন। ঐ কঠিন কাজ করেছিলেন ভারত সিংহ মাওলানা মুহাম্মদ আলী।
জহরলালকে রাজনীতি মৌলিক শিক্ষার তালিম তিনিই দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে গুরু বলে মেনে নিতে পারেননি। মতিলালের জীবদ্দশায় জহরলাল কলকাতার কংগ্রেসের মিটিং-এ মাওলানা মুহাম্মাদ আলীর পরামর্শে স্বাধীনতার প্রস্তাব করতে চেয়েছিলেন কিন্তু মতিলাল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন। তখন মুহাম্মদ আলী রেগে সিংহ নিনাদে গর্জে উঠেছিলেন। তিনি নেহরুর জন্য বলতেন, “ফারসীতে একটা কথা আছে-কুকুর হয়ো, ছোট ভাই হোয়ো না... জহরলালের বেলায় বলল.. বিড়াল হয়ো, তোমার বাবার পুত্র হয়ো না। কারণ তাঁর পিতাই ১৯২৮ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেচারা জহরলালের কণ্ঠরোধ করে দিয়েছিলেন তখন, যখন পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। তার স্থলে আমি উঠে দাঁড়াই এবং প্রতিবাদ করি ডেমিনিয়ন ষ্টেষ্টাসের সেই ধারায়।” (দ্রঃ ঐ, পৃঃ ১২৬) বারবার মাওলানা মুহাম্মদ আলী হিন্দু-মুসলমানের মিলনের চেষ্টা করেছেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। গান্ধীজিকে মহাত্মা টাইটেল তিনিই দিয়েছিলেন। বিলেতে গোলটেবিল বৈঠকে জহরলাল, গান্ধী, মুহাম্মদ আলী প্রমুখ নেতারা এবং ছয় কোটি হরিজনের নেতা ডঃ বি আর আম্বেদকর একত্রে বসে একটা মিলনের চেষ্টার সিদ্ধান্ত হয়েছিল কিন্তু সেই সভায় গান্ধীজি ও জহরলাল হাজির হননি। মুহাম্মদ আলী বিলেতে গিয়ে তাদের অনুপস্থিতে খুব দুঃখিত হন। ইংরেজরা তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী মুহাম্মদ আলীকে বশ করার চেষ্টা করে, যেন তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি না করেন।
মাওলানা আগে হতেই অসুস্থ ছিলেন। সারা ভারতে হিন্দু-মুসলমানকে এক করার জন্য তাঁকে শহর ও গ্রামে-গঞ্জে অগ্নিময় বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে হয়। তখন হতেই তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে থাকে। হিন্দু-মুসলমান বন্ধু বান্ধব ও ডাক্তারদের পরামর্শে দেশের খাতিরেই তাকে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে উত্তর দেন, “বিশ্রাম নেব স্বাধীনতা পাওয়ার পর।” ঐ অবস্থাতেই লণ্ডনে পৌঁছালেন। ইংরেজদের বুকে বসে ঐ ১৯৩০ সালের ১৯ নভেম্বর যে জ্বালাময়ী বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন তা জাতির জন্য মূল্যবান দলিল। “স্বাধীনতার আসল জিনিস নিয়ে যেতে পারলেই আমি আমার ভারতে ফিরে যেতে চাই অন্যথায় আমি এক গোলামের দেশে ফিরে যেতে চাই না।” (দ্রঃ ঐ) তিনি তাঁর ভাষণে জানিয়েছিলেন, আমাদের হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান করা উচিত ছিল ভারতের মাটিতেই। কিন্তু আমরা যারা গান্ধীজির সঙ্গে সকল অবস্থাতেই দশটি বছর কাজ করেছি আমরা তাঁকে এ জন্য চাপ দিয়েছি। কিন্তু নিজের ও পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর হিন্দু জনপ্রিয়তা সংরক্ষণের মানসে সেই মীমাংসা স্থগিত রেখেছেন। স্যার তেজ বাহাদুর সপ্রু ও সনির্বন্ধ অনুরোধে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর কংগ্রেসে হিন্দু মুসলমানে বিভেদ মীমাংসার জন্য সর্বান্তকরণে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। (দ্রঃ ঐ, পৃঃ ১২১)
গান্ধীজির ওপর অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ও খুশি ছিলেন না। কারণ তাদের নেতা ‘ছোট ঘরের ছেলে’ বলে এত শিক্ষিত হয়েও সম্মান পাননি তাই অনুন্নতদের নেতা। ডক্টর আম্বেদকর ১৯৩১ সালে ১ জানুয়ারি লণ্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, প্রথম যে মন্তব্য রাখতে চাই তা হচ্ছে এই যে, আমরা নির্যাতিত শ্ৰেণীরা আমাদের ও হিন্দুদের মধ্যে সম্পূর্ণ বিভক্তি চাই। এই হচ্ছে প্রথম জিনিস। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য আমাদের বলা হয়েছে হিন্দু। কিন্তু সামাজিকভাবে কখনো হিন্দুদের দ্বারা আমরা তাদের ভাই হিসেবে স্বীকৃত হইনি। (দ্রঃ ঐ, পৃঃ ১২৩) গান্ধীজি আম্বেদকরকে বলেছিলেন, “আমাদের বিশ্বাস করুন, বিশ্বাস করুন বর্ণ হিন্দুদের।” উত্তরে ডক্টর শ্রী আম্বেদকর বলেন, “আমরা আপনাদের বিশ্বাস করব না, কারণ আপনারা আমাদের বংশগত শত্রু।” (দ্রঃ ঐ পৃঃ ১২২) ঐ পরিস্থিতিতে ভারতীয় কোন্দল কলহকে সুযোগ মনে না করে মুহাম্মদ আলী বীরদর্পে অসুস্থ শরীরে বক্তৃতা দিচ্ছেন। আর ইংরেজদের কলিজাতে আগুন ধরিয়ে চলেছেন সেই সময়। যখন ইংরেজের তরফ হতে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ধর্ম, আলাদা ও রাজনীতি আলাদা শিক্ষিত বিশ্ববরেণ্য মানুষরা তো তাই বলেন। আপনার মতামত কী? উত্তরে মুহাম্মদ আলী বলেছিলেন, “ধর্ম সম্বন্ধে আপনাদের যে ধারণা তা ভুল হবে যদি রাজনীতিকে এর বাইরে বাইরে রাখেন। এটা ইসলাম মতবাদের গোঁড়ামি নয়। নয় কোন ধর্মাচরণ পদ্ধতি। আমার মতে ধর্মের অর্থ জীবনের ব্যাখ্যা।... আল্লাহর নির্দেশই আমি প্রথমত একজন মুসলিম দ্বিতীয়ত একজন মুসলিম শেষত একজন মুসলিম এবং একজন মুসলিম ছাড়া আমি অন্য কিছুই নই।... কিন্তু ভারতবর্ষের কথা যেখানে, যেখানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত, জড়িত যেখানে ভারতবর্ষের কল্যাণের প্রশ্ন, সেখানে প্রথমত আমি ভারতীয়, দ্বিতীয়ত আমি ভারতীয়, শেষত আমি একজন ভারতীয় এবং একজন ভারতীয় ছাড়া অন্য কিছু নই।....”
যখন তাঁকে তাঁর অসুস্থতার কথা রক্তক্ষরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় তখনও তিনি বলছেন... “বিদেশেও আমি মৃত্যুকে শ্রেয়তর মনে করব যতক্ষণ সেই বিদেশ থাকবে এক মুক্ত দেশ। আর যদি আপনারা আমাদের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা না দেন তাহলে আপনাদের এখানে দিতে হবে এক কবর।”
সেই বিরাট বক্তৃতা দিতে দিতেই তিনি বুঝতে পারলেন তার মৃত্যু সম্মুখে। তাই তিনি তাঁর মৃতদেহ ভারতে নিয়ে যেতে মৃত্যুর আগেই নিষেধ করেছিলেন। হলও তাই ১৯৩১ সালে ৩ জানুয়ারি ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সিংহ ভ্রাতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী প্রাণ ত্যাগ করলেন। ইন্নাল্লিাহি... রাজিউন।
তাঁর মৃতদেহ আর ভারতে এল না বহু নবীর জন্মস্থান জেরুজালেমে তার কবর হয়। এ সংবাদ ভারতে যখন পৌঁছায় কোটি কোটি ভারতবাসী শোকাহত কান্নায় ভেঙে পড়ে। চিৎকার করে মুহাম্মদ আলী কী জয় স্লোগান দেয়। কংগ্রেসের পোশাক মোটা খদ্দর চোপত পাজামা শেরওয়ানি গলাবন্ধ করা কোটে এই ইসলামী পোশাক আজও মনে করিয়ে দেয় অতীতের মুসলমান নেতাদের পরিচ্ছদের প্রতীকের কথা।
কংগ্রেস ও লীগ সম্বন্ধে যা কিছু বলা হয়েছে তা পুরনো ঘটনার ইতিহাসের ইতিহাস পরে বা আগামীতে তা ভিন্ন প্রকার ভিন্ন দৃশ্যে হয়েছে আরও হবে হয়ত। হয়ত আরও মন্দ কিংবা আরও ভাল।