hadith book logo

ইতিহাসের ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩০

দ্বাদশ অধ্যায় তুঘলক বংশের আবির্ভাব

গিয়াসুদ্দিন তুঘলক- দোর্দণ্ড প্রতাপ আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরদের মধ্যে সিংহাসনকেন্দ্রিক কোন্দল, চক্রান্ত ও হত্যাকাণ্ডে দেশে অশান্তি দেখা দিলে আমীর ওমরাদের সবিশেষ আবেদন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দীপলপুরের শাসক গাজী মালিক ‘গিয়াসুদ্দিন তুঘলক’ নাম ধারণ করে ১৩২০ খৃস্টাব্দে সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে ‘তুঘলক বংশ’ নামে এক নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩২৩ খৃস্টাব্দে তেলেঙ্গানার কাকতীয়রাজ প্রতাপ রুদ্রের বিরুদ্ধে অভিযান তাঁর প্রধান কীর্তি। ১৩২৫ খৃস্টাব্দে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।

তিনি সুশাসক এবং আল্লাহ ভক্ত ছিলেন। জিয়াউদ্দিন বারণী লিখেছেন, “পাঁচ ওয়াক্তের নামায তিনি জামাতের সঙ্গে আদায় করতেন। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত এশার নামায না পড়তেন হেরেমে প্রবেশ করতেন না।” (তারিখি ফিরোজ শাহী, ৪৪৩ পৃঃ) জুমআ এবং দুই ঈদের নামায তাঁর কখনও ছুটে যেত না। রমযান মাসে রীতিমত তারাবীহ পড়তেন এবং রোযা রাখতেন। অধিকাংশ সময় ওজু অবস্থায় থাকতেন এবং সারারাত এবাদতে নিমগ্ন থাকতেন (তবকাতে আকবরী প্রথম খণ্ড দ্রষ্টব্য) শরীয়ত অনুযায়ী শাসন করার ফলে কাজী, মুফতি প্রমুখের সম্মান যথেষ্ট বেড়ে গিয়েছিল- তারিখি ফিরোজ শাহ, ৪৪১ পৃঃ। তিনি নিজেও মদ খেতেন না আর জনসাধারণকেও মদ খাওয়া থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করতেন।

মুহাম্মদ বিন তুঘলক- গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জুনা খাঁ ‘মুহাম্মদ বিন তুঘলক’ নাম দিয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর রাজত্বকাল ছিল ১৩২৫ থেকে ১৩৫১ খৃঃ পর্যন্ত।

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন ভারতের ইতিহাসে এক অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বাদশাহ। ধর্মের দিক দিয়ে তিনি যেমন স্বচ্ছ জ্ঞানের অনুসারী ছিলেন, তেমনি রাজনীতিতে বৈপ্লবিক চিন্তা-ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ ছিল এবং পূর্ব উল্লিখিত ‘হেদায়া’র মত ফেকাহ শাস্ত্রের কঠিন গ্রন্থও কণ্ঠস্থ ছিল (মাসালিকুল আবসার, পৃঃ ৩৭ দ্রঃ) তিনি উপদেশ দিতে গিয়ে কোরআনের শ্লোক উদ্ধৃত করতেন। বারণী লিখেছেন, যখন আযানের শব্দ তাঁর কানে যেত তিনি লাফিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। ফজরের নামায পড়ার পর অধিক সময় পর্যন্ত অন্যান্য অজিফা (এক বিশেষ প্রাত্যহিক উপাসনা) পড়তেন-(তারিখি ফিরোজ শাহী ৫০৬ পৃঃ দ্রঃ) ঐতিহাসিক ফিরিস্তা সুলতানের নফল এবং মুস্তাহাবে আগ্রহের বর্ণনা দিয়েছেন- (তারিখি ফিরোজ শাহী এবং মাআশার রহিমী ১ম খণ্ড ৩৪৫ পৃঃ দ্রঃ)। তিনি শুধুমাত্র রমযান মাসে নয়, অসুস্থ অবস্থাতে এবং গ্রীষ্মের দারুণ ক্লান্তিতেও মহররম মাসের ১০ তারিখে রোযা রাখতেন। ছোটখাটো ব্যাপারেও ধর্মের অনুশাসন মেনে চলতেন। শরিয়তসম্মতভাবে জবেহ করা হয়নি বলে মনে হলে সেই পশুর মাংস খেতেন না- (আজায়েবুল আসফার, ১৭৬ পৃঃ)। শেইখ আবদুল হক মোহাদ্দেসে দেহলবীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, সিংহাসনে বসার পর তিনি কোন উপাধি ধারণ করেননি। মুহাম্মদ নামই তাঁর কাছে মানব সন্তানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নাম হিসেবে বিবেচিত। তবে তিনি নিজেকে মুহীয়ে সুনান খতামান্নাবিইন, অর্থাৎ শেষ নবীর সুন্নাতকে (জীবন ব্যবস্থা) জীবিত কারক বলে অভিহিত করতেন। ঐতিহাসিক বারণী লিখেছেন, ব্যভিচার ইত্যাদি অবৈধ কাজের দিকে তিনি নজর দিতেন না, অপ্রয়োজনীয়, অশ্লীল এবং কুৎসিত দ্রব্য থেকে যতদূর সম্ভব নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। হেরেমে প্রবেশের সময় না মোহরেম (যাদের বিবাহ করা অবৈধ) মেয়েরা তাঁকে দেখে পর্দা করত এবং তিনিও তাদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া অত্যন্ত দোষের জ্ঞান করতেন। (তারিখি ফিরোজ শাহী ৫০৬ পৃঃ দ্রঃ)

তিনি তাঁর মাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, তাঁর কোন আদেশেরই তিনি বিরোধিতা করতেন না। তিনি মদের ঘোর শত্রু ছিলেন। মদ্যপানের অপরাধে একজন আমীরের তিনি সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। শাহাবুদ্দিন আল আমরী শিবলী বলেন, সে সময় দিল্লীতে প্রকাশ্যে মদ পাওয়া যেত না। তিনি মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামায পড়ার জন্য খুব জোর দিতেন। ইবনে বতুতা লিখেছেন, বাদশাহ মুসলমানদের নামাযের ব্যাপারে খুব জোর দিতেন। জামাতের সাথে নামায না পড়ার অপরাধে তিনি তার একজন নিকট আত্মীয়কেও কঠোর শাস্তি দান করেন। ভারতে ইনিই প্রথম বাদশাহ, যিনি শাসন ব্যবস্থায় নামাযকে অঙ্গীভূত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নাচ-গান করা মেয়েরাও নামাযে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সুলতান মাহমুদ বিন তুঘলক তবলীগের সমর্থক ছিলেন এবং সংস্কৃত ভাষায় পণ্ডিতও ছিলেন। সেই যুগে তিনি সতীদাহ প্রথা তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু ধর্মে বিরোধিতা বা হস্তক্ষেপ হবে বলে বিরত হন।