hadith book logo

ইতিহাসের ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৮

হযরত হামীদ বাঙালি দানেশমন্দ (রহ.)

বাদশাহদের যুগে বিচার করতে নিযুক্ত থাকতেন আলিম সম্প্রদায়। তাই উলামা ও মুফতিদের মধ্যে বাছাই করে যাদের বিচারের আসনে বসানো হতো তাঁদেরই বলা হতো কাজী। কাজীদের নির্বাচনের সময় শুধু তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাই দেখা হত না; বরং তাঁদের বংশগত পরিচয়ের প্রমাণ নেওয়া হতো, অর্থাৎ পিতা, পিতামহ প্রমুখের পরিবেশ ও চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখার নিয়ম ছিল। বঙ্গদেশে বর্তমান জেলায় মঙ্গলকোটে উপরোক্ত সম্ভ্রান্ত কাজী বংশে ১৫৯৮ খৃস্টাব্দে হামিদ সাহেব জন্মগ্রহণ করেন। সম্রাট শাহজাহানের আশীর্বাদ গ্রহণের কথা আগেই বর্ণনা করা হয়েছে। এই মঙ্গলকোটে তার পূর্বেও অনেক সাধু পুরুষ এসেছিলেন তাই আজও মঙ্গলকোটকে আঠার আওলিয়ার গ্রাম বলা হয়।

গ্রামে তিনি তার পিতা কাজী দেলওয়ার হোসেন সাহেব এবং গ্রামের আলেমদের নিকট প্রাথমিক পাঠ্যিয় কোর্স শেষ করে লাহোরে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন এবং খ্যাতনামা একজন আলেম হয়ে প্রকাশিত হন। প্রথমে তিনি পীর বুজুর্গদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস করতেন না, পরে পুর্বোল্লিখিত মোজাদ্দেদ সাহেবের অধিবেশনে গিয়ে তাঁর অলৌকিক প্রভাবে এত প্রভাবিত হন যে তাঁকে বাধ্য হতে হয় তাঁর সঙ্গ গ্রহণ করতে। তিনি তখন আধ্যাত্মিকতা কি তা বুঝলেন এবং ঐ বিভাগের উন্নতি করার জন্য তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। পূর্ণতা লাভ করতে হামিদ সাহেবের অসুবিধা হয়নি। তিনি খেলাফত লাভ করলেন। আর তাঁকে মোজাদ্দেদ সাহেব মঙ্গলকোটে ফিরে গিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করতে লাগলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে সূর্যের মত প্রদীপ্ত হৃদয় গুরু হতে বিদায় নিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত হতে হলো। আসার সময় মোজাদ্দেদ সাহেবের ছেড়া জুতো দুখানি চেয়ে নিয়েছেলেন। কিন্তু মঙ্গলকোটে সে দুটি তিনি কোনদিন পায়ে লাগাননি; বরং খুব যত্ন করে একটি বাক্সে রেখে দিয়েছিলেন। যখন হামিদ সাহেবের মৃত্যু নিকটবর্তী হলো তিনি আদেশ করলেন তাঁর বাড়ির নিকটবর্তী একটি পুকুরে তা ফেলে দিতে। তাই করা হয়েছিল। কিন্তু অতি আশ্চর্যের বিষয়, এই মঙ্গলকোট ছোট হাসপাতাল এবং খ্যাতনামা পাসকরা একাধিক চিকিৎসক তাঁরা বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও ভেবে পাচ্ছেন না প্রতিদিন শত শত মাইল দূর হতে কুকুরে কামড়ানো রোগী বিনা ওষুধ ও ইনজেশনে ঐ পুকুরে স্নান করে আর তার অপরিচ্ছন্ন জল পানে নিষ্কৃতি পাচ্ছে কুকুরের বিষ হতে, কেমনভাবে।

একদিন বাদশাহ শাহজাহান তাঁর নিকট দিল্লীর সিংহাসন পাবার জন্য এসেছিলেন এই গ্রামে, পূর্বে তা উল্লেখ করা হয়েছে। দূর দূরান্ত হতে কত শিক্ষার্থী আসতো বিদ্যা ও জ্ঞান আহরণে। আজ নেই সেই মাদ্রাসা, নেই সেই পরিবেশ। আছে শুধু মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার ন্যায় অট্টালিকা, রাজপ্রাসাদ, মসজিদ, মন্দির আর কবরের ধ্বংসাবশেষ। একদিন ছিল সেখানে বিরাট লাইব্রেরী, যা সারা দেশের গর্ব ছিল আর সেই বইগুলো তারা পড়েছিলেন তাঁদের পবিত্র চক্ষু দিয়ে এবং ধরেছিলেন তাঁদের পবিত্র করকমলে। এছাড়া তাঁর শিষ্য, প্রশিষ্য ও পরশিষ্যগণ যা লিখে গেছেন আরবী ও ফারসীতে তার একটা অংশ মাটির জীর্ণ ঘরে অসতর্কতার সঙ্গে ছিল। বইগুলো যেন মঙ্গলকোটের পূর্বপুরুষদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের পুস্তকরূপী সাক্ষী। বইগুলো যেন আজও হীরা কাঞ্চন প্রসব করতে চায়। কিন্তু বহু যুগ ধরে মনীষী হামিদ বাঙালী বর্ধমানীর (র.) মাতৃভূমিতে সেদিনের মত কোন পাঠকও নেই আর সেই পরিবেশও নেই।

ঐ গুন্থগুলোকে কেন্দ্র করে ভারতের বর্তমান বঙ্গের বিখ্যাত বৃহত্তম ও প্রথমতম দাওরায়ে হাদীস পড়ার পূর্ণাঙ্গ মাদ্রাসায় দেওয়া হয়। তাই বোধহয় হযরত হাদীম বাঙালী (রহ) অমর আত্মার পরিতপ্ত তাই তার স্বপ্নের সার্থকতার সাক্ষীস্বরূপ বর্ধমানের মেমারী টাউনের মদিনা মার্কেটে মহান মাদ্রাসা আজ উচ্চ শিরে দণ্ডায়মান।

অবশেষে আরবী হিজরী ১০৫০ সনে সারা ভারতের উজ্জ্বল রত্ন হযরত হামীদ বাঙালী (রহ.) মহা প্রস্থান করলেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের গৌরব ও প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস যেন আজও মঙ্গলকোটের অণু-পরমাণুতে মিশে রয়েছে! আজও যেন নীরব মাটির বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হয়, ধন্য হামিদ বাঙালী! ধন্য হে অমর মনীষী!!