১
ইতিহাসের ইতিহাস
লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪৫
সিরাজুদৌলার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদৌলা সম্পর্কিত ইতিহাসকে সাহিত্য, নাটক, গ্রামোফোন রেকর্ড ও সিনেমা প্রভৃতিতে প্রচার দ্বারা যেভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে তা অত্যন্ত পরিতাপের।
নবাব নাকি চরিত্রহীন ও মদ্যপায়ী ছিলেন। তিনি নাকি নিষ্ঠুর ছিলেন-এ অপবাদ প্রমাণিত হয় তার অন্ধকূপ হত্যার দ্বারা। দুইশত জন ইংরেজকে ছোট একটি অন্ধকার কক্ষে খাদ্য, পানীয় ও বাতাসের অভাব ঘটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে নিরীহ সিরাজের নামে কলঙ্ক দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আরও বহু অভিযোগ আছে সিরাজের নামে।
আমাদের দেশে ইংরেজদের দালালির দলে যারা যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা আজও সিরাজকে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদের সম্মানে ভূষিত করতে পারেননি। এছাড়া বিশ্বাসঘাতকতা যতটুকু হয়েছিল সিরাজকে ঘিরে তার সবটুকুই যেন চাপানো হয়েছে কুখ্যাত মুসলমান মীরজাফরের ঘাড়ে। কিন্তু আসল ইতিহাস তা বলে না- একথার সত্যতা সম্পর্কে পূর্বাহ্নেই কিছুটা আভাস দেওয়া হয়েছে “সিরাজের ইতিহাসে জগৎশেঠদের ভূমিকা” পর্যালোচনায় এবং আরও পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠবে পরবর্তী আলোচনায়।
সিরাজুদৌলা অল্প বয়সে একবার মদ্যপানের কলঙ্কে কলঙ্কিত হয়েছিলেন। কিন্তু আলিবর্দীর প্রাণপ্রিয় সিরাজকে ডেকে মদ আর কোনও দিন স্পর্শ না করার জন্য কোরান ছুঁয়ে শপথ করতে বলেন। তাতে সিরাজ বলেছিলেন, “নানা, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। সিরাজ জীবনে কোনদিন আর মদ স্পর্শ করবে না। যদি করি তাহলে আমি আপনাদের নাতি নামের কলঙ্ক।” বলা বাহুল্য, সিরাজ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন সারা জীবন।
এতদ্বতীত নারী লোলুপতার যে মিথ্যা অপবাদটি তার ওপর আরোপ করা হয়েছে তাও ভিত্তিহীন বরং ইংরেজ ও তাদের দালালদের কৌশল মাত্র।
গ্রামোফোন রেকর্ডে সিরাজের কণ্ঠে বলা হয়-প্রথমে যৌবনের উন্মাদনায় নারী অনেক চেয়েছি, পেয়েছিও... ইত্যাদি। যখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা তথা ভারতের ভাগ্য নিয়ে যুদ্ধ চলছে, মীর মর্দান নিহত-সৈন্যদের বিশ্বাসঘাকতায় সিরাজের চোখে অশ্রু, তখন রেকর্ডে আমরা শুনি তিনি আলেয়াকে নিয়ে প্রেম-লীলায় মত্ত! এতবড় ভুল বাঙালি হয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে মানুষ কি করতে পারে? তা কি সম্ভব? তবুও কাল যা সম্ভব ছিল না, আজ হয়ত তা সম্ভব এবং আগামীতেও কল্পনা করা আকাশকুসুম নয় যে, আজকের সুধী সমাজ গড়ে তুলবে পূর্ব পুরুষদের মিথ্যা ইতিহাসের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ। শ্রী সুধীর কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “সিরাজ অতিরিক্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি প্রায় নদীতে বন্যার সময় নৌকা হতে আরোহী উল্টায়ে দিয়ে বা ডুবিয়ে দিয়ে এক সঙ্গে এক দুই শত যুবক, যুবতী, স্ত্রী, বৃদ্ধ, শিশু সাঁতার না জেনে জলে নিমজ্জিত হওয়ার নিষ্ঠুর দৃশ্যটি উপভোগ করে আনন্দ লাভ করতেন।”
এই প্রমাণহীন মিথ্যা কাহিনী পড়ে হয়ত অনেকে বলতে পারেন সুধীর বাবু তেমন নামীদামি লোকের মধ্যে গণ্য নন সুতরাং গুরুত্ব না দেওয়াই ভাল। কিন্তু বিখ্যাত কবি, উচ্চ ইংরেজী শিক্ষিত বাঙালি বাবু নবীনচন্দ্র সেন যদি অনুরূপ বা ততোধিক, মারাত্মক কিছু বলে বা লিখে থাকেন তবে সুধীর বাবুরই বলা দোষের হবে কেন? নবীনচন্দ্র সেন শুধু নৌকায় নবাবের নর হত্যার কথা লিখেই ক্ষান্ত হননি; বরং আরও নতুন সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে ‘গর্ভিনীর বক্ষ বিদারণ’ এর ঘটনা অর্থাৎ সিরাজ নাকি জীবন্ত গর্ভবতী নারীর পেট কেটে সন্তান দেখতেন। এমনি আরও কত আজগুবী আর অবান্তর কিংবদন্তীর অবতারণা করে সিরাজের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার জঘন্যতম প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। সিরাজের অন্ধকূপ হত্যার ইতিহাসটিও এরই প্রতিচ্ছবি। যার সত্যতা সম্পর্কে অমর সাক্ষী নাকি কলকাতার ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত কুখ্যাত মনুমেন্ট।
নবাব নাকি চরিত্রহীন ও মদ্যপায়ী ছিলেন। তিনি নাকি নিষ্ঠুর ছিলেন-এ অপবাদ প্রমাণিত হয় তার অন্ধকূপ হত্যার দ্বারা। দুইশত জন ইংরেজকে ছোট একটি অন্ধকার কক্ষে খাদ্য, পানীয় ও বাতাসের অভাব ঘটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে নিরীহ সিরাজের নামে কলঙ্ক দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আরও বহু অভিযোগ আছে সিরাজের নামে।
আমাদের দেশে ইংরেজদের দালালির দলে যারা যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা আজও সিরাজকে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদের সম্মানে ভূষিত করতে পারেননি। এছাড়া বিশ্বাসঘাতকতা যতটুকু হয়েছিল সিরাজকে ঘিরে তার সবটুকুই যেন চাপানো হয়েছে কুখ্যাত মুসলমান মীরজাফরের ঘাড়ে। কিন্তু আসল ইতিহাস তা বলে না- একথার সত্যতা সম্পর্কে পূর্বাহ্নেই কিছুটা আভাস দেওয়া হয়েছে “সিরাজের ইতিহাসে জগৎশেঠদের ভূমিকা” পর্যালোচনায় এবং আরও পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠবে পরবর্তী আলোচনায়।
সিরাজুদৌলা অল্প বয়সে একবার মদ্যপানের কলঙ্কে কলঙ্কিত হয়েছিলেন। কিন্তু আলিবর্দীর প্রাণপ্রিয় সিরাজকে ডেকে মদ আর কোনও দিন স্পর্শ না করার জন্য কোরান ছুঁয়ে শপথ করতে বলেন। তাতে সিরাজ বলেছিলেন, “নানা, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। সিরাজ জীবনে কোনদিন আর মদ স্পর্শ করবে না। যদি করি তাহলে আমি আপনাদের নাতি নামের কলঙ্ক।” বলা বাহুল্য, সিরাজ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন সারা জীবন।
এতদ্বতীত নারী লোলুপতার যে মিথ্যা অপবাদটি তার ওপর আরোপ করা হয়েছে তাও ভিত্তিহীন বরং ইংরেজ ও তাদের দালালদের কৌশল মাত্র।
গ্রামোফোন রেকর্ডে সিরাজের কণ্ঠে বলা হয়-প্রথমে যৌবনের উন্মাদনায় নারী অনেক চেয়েছি, পেয়েছিও... ইত্যাদি। যখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা তথা ভারতের ভাগ্য নিয়ে যুদ্ধ চলছে, মীর মর্দান নিহত-সৈন্যদের বিশ্বাসঘাকতায় সিরাজের চোখে অশ্রু, তখন রেকর্ডে আমরা শুনি তিনি আলেয়াকে নিয়ে প্রেম-লীলায় মত্ত! এতবড় ভুল বাঙালি হয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে মানুষ কি করতে পারে? তা কি সম্ভব? তবুও কাল যা সম্ভব ছিল না, আজ হয়ত তা সম্ভব এবং আগামীতেও কল্পনা করা আকাশকুসুম নয় যে, আজকের সুধী সমাজ গড়ে তুলবে পূর্ব পুরুষদের মিথ্যা ইতিহাসের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ। শ্রী সুধীর কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “সিরাজ অতিরিক্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি প্রায় নদীতে বন্যার সময় নৌকা হতে আরোহী উল্টায়ে দিয়ে বা ডুবিয়ে দিয়ে এক সঙ্গে এক দুই শত যুবক, যুবতী, স্ত্রী, বৃদ্ধ, শিশু সাঁতার না জেনে জলে নিমজ্জিত হওয়ার নিষ্ঠুর দৃশ্যটি উপভোগ করে আনন্দ লাভ করতেন।”
এই প্রমাণহীন মিথ্যা কাহিনী পড়ে হয়ত অনেকে বলতে পারেন সুধীর বাবু তেমন নামীদামি লোকের মধ্যে গণ্য নন সুতরাং গুরুত্ব না দেওয়াই ভাল। কিন্তু বিখ্যাত কবি, উচ্চ ইংরেজী শিক্ষিত বাঙালি বাবু নবীনচন্দ্র সেন যদি অনুরূপ বা ততোধিক, মারাত্মক কিছু বলে বা লিখে থাকেন তবে সুধীর বাবুরই বলা দোষের হবে কেন? নবীনচন্দ্র সেন শুধু নৌকায় নবাবের নর হত্যার কথা লিখেই ক্ষান্ত হননি; বরং আরও নতুন সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে ‘গর্ভিনীর বক্ষ বিদারণ’ এর ঘটনা অর্থাৎ সিরাজ নাকি জীবন্ত গর্ভবতী নারীর পেট কেটে সন্তান দেখতেন। এমনি আরও কত আজগুবী আর অবান্তর কিংবদন্তীর অবতারণা করে সিরাজের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার জঘন্যতম প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। সিরাজের অন্ধকূপ হত্যার ইতিহাসটিও এরই প্রতিচ্ছবি। যার সত্যতা সম্পর্কে অমর সাক্ষী নাকি কলকাতার ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত কুখ্যাত মনুমেন্ট।