১
ইতিহাসের ইতিহাস
লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫২
সিপাহী বিদ্রোহ না স্বাধীনতা বিপ্লব?
১৮৫৭ খৃস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের অনেক কথা সহজলভ্য ইতিহাসে পাওয়া যায়। কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহ নামটি ইংরেজদের দেওয়া। স্বাধীনতার সম্মানীয় বিপ্লবীদের ছোট এবং হেয় করার জন্যই এই বিলেতী বুদ্ধির তেমনিভাবেই ‘ওহাবী যুদ্ধ’ কথাটিও বিলেতী বুদ্ধির বিস্ফোরণ। যাতে সাধারণ মুসলমানরা মনে করে ওহাবীরা হযরত রসূলুল্লাহর (সা.) অভক্ত অথবা শত্রু। তারা নাকি নবী ও সাহাবাদের কবর ভাঙার দল। যাই হোক কার্ল মার্কস কিন্তু প্রমাণ করেছেন, বৃটিশ শাসক শ্রেণীরা অভুত্থানকে কেবল সশস্ত্র সিপাহী বিদ্রোহরূপে দেখতে চায়, তার সঙ্গে যে ভারতীয় জনগণের ব্যাপক অংশ জড়িত তা লুকাতে চায় তারা। (দ্রঃ প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস্ পৃঃ -১০)
“বিদ্রোহের ইতিহাস যারা প্রথমে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাঁদের সকলেই ছিলেন ইংরেজ। বেশির ভাগ লেখক আবার ইংরেজ রাজপুরুষ।” ইংরেজ ঐতিহাসিকরা একে বলেছে সিপাহী বিদ্রোহ। আর ভারতীয়রা একে বলতে চান “ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” (দ্রঃ সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস, মনিবাগচি, প্রথম প্রকাশ, ১ম পাতা)
প্রথমে কলকাতা হতে কিছু দূরে ব্যারাকপুরে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয় বলেই আমাদের মোটামুটি জানা ছিল। কিন্তু তা নয়, সৈন্যদের ইংরেজের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাইরে থেকেই। বিশেষ করে এটা ছিল মৌলবী মাওলানা ও পীর ফকিরদের কাজ আর তার কারণ ছিল ইংরেজের সুকৌশলে ধর্মে হস্তক্ষেপ। আগেই বলা হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার ইংরেজ বিদ্বেষের কথা। মুর্শিদাবাদ জেলায় ১৮৫৭ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি বহরমপুরেই প্রথম সিপাহী বিদ্রোহ হয়। আর তার পরের মাসে মার্চ-এ আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে ব্যারাকপুরে (দ্রঃ কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস পৃঃ ১৯৮) “ব্যারাকপুর হতে একশ মাইল দূরে ভাগীরথীর তীরে এ সেনানিবাস। বিদ্রোহের ডঙ্কা এখানেই প্রথম বেজেছিল।” (সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস পৃঃ ৩২)
কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস মুসলমান মাওলানা পীর ওলীদের সংক্ষেপে নাম ‘ফকীর’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। কোন জায়গায় মৌলুবী শব্দও ব্যবহার করেছেন। পূর্বে যে সমস্ত আলোচনা হয়েছে তাতে যেন প্রমাণ হয় যত বিপ্লব সবই যেন শুধু মুসলমানরাই করেছে আর কেউ কিছু করেনি তা নয়। মুসলমানদের সঙ্গে অমুসলমানদেরও ভূমিকা কিছু কিছু পরিলক্ষিত হয়। যেমন কৃষক বিদ্রোহে অনুন্নত হিন্দুদের সন্ধান মেলে। তাছাড়া ১৮৫৬ তে সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে অনুন্নত অমুসলমানদেরই অবদান বলা যায়। (দ্রঃ মনি বাগচি সিঃ যুঃ ইং)। তবে ফকীর বিদ্রোহের নেতা মজনু শাহ-ই-সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠককে বিদ্রোহে অবতীর্ণ করেন বলে অনেকে মত প্রকাশ করেন। জনাব মজনু ভবানী পাঠকের মধ্যে যে বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তার প্রমাণের অভাব নেই (ক) “ফকীর নেতা মজনুর সঙ্গে সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। (খ) সাঁওতাল বিদ্রোহেও (১৮৫৫-৫৭) স্থানীয় মুসলমান তাঁতীরা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে। (ক ও খ উদ্ধৃতি দুটি ডক্টর মনিরুজ্জামান সাহেবের লেখা হতে নেওয়া হয়েছে; আর তিনি নিয়েছেন নরহরি কবিরাজের লেখা ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম বাংলা’ পুস্তকের ৫৩ ও ৮২ পৃষ্ঠা হতে।)
সৈয়দ আহমেদ ব্রেলবীর শহীদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত মোজাহেদ শহীদ হন। তার মধ্যে বিখ্যাত নেতাদের মধ্যে মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আবদুল হাই প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অবশ্য রনজিৎ শিং যেমন ইংরেজদের প্রকাশ্য পক্ষালম্বনকারী তার ওপর ইংরেজদের চক্রান্তের শিকার হয়েছিল ইয়ার আলী নামক এক বিশ্বাসঘাত। তাই ১৮০৩ খৃঃ বালাকোটের ঐ মর্মান্তিক বিপর্যয়। বিপর্যয়ের পরেই মাওলানা সৈয়দ ওমর আলি সিত্তানায় উপস্থিত হন এবং সর্বসম্মত নির্বাচনক্রমে মাওলানা নাসিরুদ্দীনের বিপ্লবীদের সেনাপতি করা হয়। তারপর মাওলানা এনায়েত আলী, মাওলানা বেলায়েত আলী, মাওলানা জয়নাল আবেদীন প্রমুখ আলেম সারা ভারতে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে জনতাকে ইংরেজদ্রোহী করে তুলতে লাগলেন। জৌনপুরের কেরামত আলী এবং হায়দরাবাদের জয়নুল আবেদীন এমন জ্বালাময়ী ধর্মীয় বক্তৃতা করতেন যে মহিলারা তাদের গয়না খুলে দান করতে চিন্তা করার অবকাশ পেতেন না। আরও সহস্র সহস্র আলেম প্রত্যেকে জিহাদকেই প্রধানতম গুরুতম দায়িত্ব মনে করে দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। তার মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল গফুর, ফারহাদ আলী, মহরম আলী, সৈয়দ আকবর শাহ, সৈয়দ মোবারক শাহ, শাহ মুহাম্মদ হসেন, মুহাম্মদ বাকের আলী, মৌঃ আঃ রহমান, মালদহের আমিরুদ্দীম, মকসুদ আলি, থানেশ্বরের জাফর খান, পাঠনার মৌঃ ইয়াহইয়া আলি, আবদুল গাফফার ১নং, আব্দুল গাফফার ২নং, মঃ শফী, ইলাহী বখশ, পাটনার হসেনি, আবদুর রহিম, আঃ করিম, কাজী মিঞাজান, টংকের নবাব আমির খান, জাহানাবাদের আবদুল মজিদ খাঁ, আল্লাহ বখশ খাঁ, আকবর খাঁ, মঃ বরকাতুল্লাহ প্রমুখ বিপ্লবীদের প্রত্যেকের জীবনী ঐতিহাসিক তথ্য বিজরিত। লিখলে নিসার আলীর মত, শরীয়তুল্লার মত পড়ার ও বোঝার মত সম্পদ সম্ভার হবে। এদের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় এমন কিছু বিপ্লবী আলেম নেতা আছেন, যাঁদের ভূমিকা শুধু ভারতের ছিল না বরং তারা বহির্ভারত তথা সারা বিশ্ব সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতেন। যেমন হাজী ইমদাদুল্লাহ, মাওলানা আহমাদুল্লাহ, মাওলানা ফজলে রহমান খাইরাবাদী, মাঃ আঃ রশীদ গাঙ্গুহী, মাওলানা কাসেম নানুতুবী ও মাওলানা আব্বাস আলী (র. আজ.) প্রমুখ প্রত্যেক ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত ছিলেন। তাঁদের বুদ্ধিমত্তা রাজনীতি ও কূটনীতির ইতিহাস আজ নিষ্ঠুরভাবে অজ্ঞাত ও উপেক্ষিত। নীল চাষ ব্যাপারে ইংরেজরা চাষীদের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছিল ফলে খণ্ড খণ্ডভাবে একাধিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তারও মূলে ছিল ঐ মুসলমান দাড়িওয়ালা ফকীর ও মওলুবীর দল আর তাঁদের ধর্মগত গণও প্রাণভক্ত ও সমর্থক শ্ৰেণী। শ্রী যুক্ত দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘নীলদর্পণ’ পুস্তকে তার প্রমাণ দিয়ে মুসলিম চাষীবীর তোরাব আলীর নাম উল্লেখ করে প্রমাণ রেখেছেন নীল চাষের ব্যাপারে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রধানত মুসলমান চাষীরাই সংগ্রাম করেছেন।
বাইরের বিপ্লবীরা ইংরেজ সৈন্য শ্রেণীতে ভারতীয় সৈন্যদের বিদ্রোহী করার ব্যাপারে মুসলমান সৈন্য আগে হতেই ইংরেজ বিদ্রোহী ছিল কিন্তু হিন্দু সৈন্যদের কোনক্রমেই ইংরেজের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। সে আলোচনা, পরে আসছে। তাই গরু শূকরের চর্বি মিশ্রিত টোটা দাঁতে কাটার ঘটনা একটা কূটনৈতিক অজুহাত মাত্র। আসলে চতুর ইংরেজ এত বোকা ছিল না যে একই টোটায় উভয় জাতির ঘূণীত চর্বি মিশিয়ে উভয় জাতিকেই বিদ্রোহী করে তুলবে। মুসলমান মওলুবী পীর ফকিরের মাঝে এমনিভাবে নানা কিছু রটিয়ে বিদ্রোহের চেষ্টা করতেন যেমন লবণের মধ্যে ‘হাড়ের গুড়ো আছে’ ইত্যাদি অনেক কিছু। ব্যস, অমনি চিন্তা হত মানুষের না কোন জন্তুর হাড়। টোটার ঘটনাও তাই। টোটার মসৃণ কাগজ যার জন্য বলা হয়েছিল চর্বিই মসৃণতার কারণ কিন্তু তা নয়। কাগজ তৈরি হত শ্রী রামপুরে সেখানে হিন্দু কর্মচারী গোড়া হতেই ছিল। যদি গরুর চর্বির কোন ব্যাপার থাকতো তাহলে ওখানেই অশান্তি শুরু হয়ে যেত। ১৭ মার্চ ব্যারাকপুরের সৈন্য ছাউনিতে মিঃ হিয়ার্স যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বা হাতে-কলমে যা প্রমাণ করেছেন তাতে গরু ও শূকরের চর্বির কথা অলীক বলা যেতে পারে। তাই কার্ল মার্কসের মূল্যবান উদ্ধৃতি এখানে স্মরণীয়-“১৮৫৭র গোড়ার দিকে সে মাত্র প্রচলিত শূকর ও গরুর চর্বি মাখানো টোটার প্রবর্তন, ফকীরেরা বলতে লাগল-ইচ্ছা করে করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেক সিপাহী জাত খোয়ায়।” (কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, পূঃ ১৯৮) ঐতিহাসিক দার্শনিক কার্ল মার্কসের লেখায় আরও দেখা যায়, “১৮৫৭তে মার্চ ও এপ্রিলে আম্বালা ও মিরাটের সিপাহীরা বারবার গোপনে নিজেদের ব্যারাতে নিজেরা আগুন লাগাতো। অযোধ্যা ও উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশগুলোতে ইংলন্ডের বিরুদ্ধে লোকদের উসকাতে লাগল ঐ ফকিররা।” (দ্রঃ ঐ পুস্তক ১৯৮ পৃঃ)
ঐ ফকীর কারা? ঐ পীর মওলুবীর দল যারা ইচ্ছাকৃতভাবে মোটাসোটা কাপড় আর তালি দেওয়া ঢিলাঢালা জামা পরতেন আর কাঁধের উপর লাঠিতে ঝোলানো কাপড়ের পুটলী যার ভেতর থাকত লক্ষ লক্ষ টাকা, সোনার টুকরো আর দামি দামি সাঙ্কেতিক চিঠি পত্র! আরও কত কী। ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে মুসলমানেরাই আগে বিদ্রোহী হয়েছিল তারও কিছু কারণ থাকা দরকার। তা হচ্ছে এই, ১৮৫৮ খৃঃ ৭ আগস্ট সর্দার শেখ হেদায়েত আলী ইংরেজ সরকারকে বিদ্রোহের কারণ সম্বন্ধে যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন তাতে সিপাহীদের ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণগুলো বেশ বোঝার ব্যাপার। যথা-
(ক) পাঞ্জাব অধিকার করার পর ইংরেজ সরকার সৈন্যদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে দাড়ি কাটা বাধ্যতামূলক থাকবে না কিন্তু পরে দাড়িওয়ালা সৈন্যদের দাড়ি কাটতে বাধ্য করা হয় এবং অসম্মত সৈন্যদের বরখাস্ত করা হয়।
(খ) ইংরেজ পাদ্রীদের মারাত্মক খ্রিস্টধর্ম প্রচারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তার উপর সাহরানপুরে নতুন হাসপাতালে মহিলাদের জন্য পর্দার ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয় এবং সব জায়গাতে পর্দা সুন্নাতের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয় এবং বিবাহের বিষয়ে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়।
(গ) সৈন্যদের সরকারের প্রয়োজনে যেখানে যত দূরেই থোক যেতে বাধ্য থাকার অঙ্গীকারের সহি হয়। ওশফত গ্রহণ করানো হয়।
(ঘ) সর্বশেষে চর্বি মিশ্রিত টোটার আমদানি প্রভৃতিতে ধারণা হয় সরকারের উদ্দেশ্য সকলকে খৃষ্টান করা।
মুসলমানদের রাঙ্গা রক্ত যেমন আযাদী আন্দোলনে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল তেমনি বিখ্যাত কলমনবীসদের কালির জ্বালাময়ী লেখনীও মুসলমানদের উগ্র চেতনাকে, স্বাধীনতার বাসনাকে বৃদ্ধি করেছিল। মিঃ হান্টার তার লেখায় ইংরেজবিরোধী কিছু বই-এর নাম লিপিবদ্ধ করে গেছেন। যেমন (১) সিরাতুল মুসতাকীম, অর্থাৎ সোজা পথ, তাতে জেহাদকে সোজাপথের মূলবস্তু বলা আছে (২) কাসিদা বা জিহাদমূলক কবিতা গুচ্ছ (৩) সির-ই-ওয়াকেয়া তাতে যোদ্ধাদের বীরত্ব বর্ণনা আর বিধর্মীদের অত্যাচার পরিমাণমত পৌঁছালেই জিহাদ ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য বলে বর্ণনা করা আছে (৪) ভবিষ্যৎ জিহাদের ফলাফল আন্দাজ দেওয়া আছে, যা বিপ্লবীদের উৎসাহ বৃদ্ধির সহায়ক (৫) তওয়ারীখ কায়সারুম কিম্বা মিসবাহুস সারী। আবদুল ওহাবের সত্যতথ্য, হাতে লেখা প্রচারিত পুস্তক। (৬) তাবকিয়াতুল ঈমান বা ধর্মের শক্তি বৃদ্ধিকরণ (৭) তাজকেরুল আখওয়াই বা ভ্রাতৃসুলভ ব্যবহার (৮) নসিহাতুল মুসলেমিন বা মুসলমানদের প্রতি উপদেশ (৯) হেদায়াতুল মুসলেমিন বা মুসলমানদের পথ প্রদর্শনা (১০) চেহেল হাদিস, জিহাদ সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদের (সা.) চল্লিশটি বাণী (১১) তানবিরুল আইনাইন বা চক্ষুদ্বয়ের দৃষ্টি প্রসারিতকরণ (১২) আমবিউল গাফেলিন অর্থাৎ অমনোযোগীদের প্রতি তিরস্কার। (দ্রঃ দি ইণ্ডিয়ান মুসলমানস)।
মুসলমান মৌলভী, মোল্লা, খতিবরা প্রত্যেক গ্রামে বিত্তবান প্রত্যেকের কাছে শতকরা আড়াই টাকা হিসেবে যাকাত কর, একালীন দান তো গ্রহণ করতেনই সেই সঙ্গে প্রত্যেক বাড়িতে প্রতি বেলায় এক মুঠি করে চাল একটা পাত্রে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে মাসে সহস্র সহস্র মণ চাল উঠত এবং আদায়কারী আসতে বিলম্ব হলে মেয়েরা তা বিক্রয় করে তার পয়সা পৃথক করে রেখে দিত। শত প্রয়োজনেও তা খরচ করা হত না। কারণ তারাও বিশ্বাস করতো এই কাজটুকু করলেও তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ করার মত পূণ্য পাওয়া সম্ভব হবে। মিঃ হান্টার এই তথ্যকে বিকৃত করে লিখেছেন, “আগে এজন্য মসজিদে যে সদকা ও ফেতরা আবশ্যিক হিসেবে আদায় হত পূর্বে তা কেবল গরিবদের জন্যই বণ্টন করা হত সেসব অর্থ জিহাদের জন্য গ্রহণ করতে লাগলেন।” “তিনি নির্দেশ দেন প্রতিটি গৃহে প্রত্যেক লোককে প্রতিবেলায় একমুঠি করে চাল পৃথক করে রেখে দিতে হবে”। (মিঃ হান্টারের ঐ পুস্তক দ্রষ্টব্য) মিঃ হান্টার খুব সুদক্ষ চতুর লোক ছিলেন। তাই তিনি অতি কৌশলে তার পুস্তকে জানিয়েছেন পবিত্র জন্তু গরু সম্বন্ধে তার দরদ অথচ সাহেব নিজে একজন ভাল গোমাংসাশী ছিলেন। শুধু মাওলানা শ্ৰেণীই নয় ধনী ও মধ্যবিত্তরাও বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ রাখতেন। চামড়া ব্যবসায়ী প্রায় সকলেই ধনী মুসলমান ছিলেন, মিঃ হান্টার তাই মুচী সম্প্রদায় ও মুসলমান চামড়া ব্যবসায়ীদের একই পর্যায়ে ফেলেছেন। আর ব্যারিস্টারি চাল খাটিয়ে লিখেছেন, “তারা (অর্থাৎ মুসলমান চর্ম ব্যবসায়ীরা) বেশ জানে যদি ব্রাহ্মণরা কখনো ক্ষমতা হাতে পায় তাহলে তারাই হবে তাদের হাতের প্রথম বলী। এই চামড়া ব্যবসায়ীরাই হল ওহাবী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে অর্থশালী ও ধর্মশালী সমর্থক, যে ওহাবীদের মূলমন্ত্র হচ্ছে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।” (দ্রঃ মিঃ হান্টারের ঐ পুস্তক)।
মুসলমান মৌলবী মোল্লাদের সুনিপুণ কৌশলে প্রচারিত হয়েছিল “ময়দাতে হাড়ের গুঁড়ো মেশানো আছে।” এই জনরব কেবল মিরাটেই নয় সমগ্র উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের হিন্দুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। জনরব উঠল মিরাটের খালবারের কলগুলোতে। ইংরেজদের তত্ত্বাবধানে ময়দা তৈরি হচ্ছে এবং সেই সব ময়দার সঙ্গে গরুর হাড়ের গুঁড়ো মেশানো হচ্ছে।” (দ্রঃ সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস) ইংরেজ সরকার মনে করলো ময়দার দাম চড়েছে বলেই এই সব ফাসাদ। তাই ময়দার দর সস্তা করে দেওয়া হল। অমনি ফকীর মৌলবীর দল নতুন কথা রটাতে লাগলো ফলে লোকের মনে দৃঢ় ধারণা হল হাড়ের গুঁড়ো মেশানো ময়দা তাই এত সস্তা। কানপুরের বাজারে কেউই ময়দা কিনল না। সেখানকার সিপাহীরা পর্যন্ত ঐ ময়দা স্পর্শ করল না।” (দ্রঃ ঐ)। যে মাদ্রাজে ভেলোর বিদ্রোহ হয়েছিল ঐ ময়দার ঘটনাও তাতে বিজড়িত ছিল। প্রতিটি বিদ্রোহে এমনি আজগুবী কথা রটানো হয়েছিল, “ইংলণ্ডের রানী ও ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অনুমতিক্রমে বৃটিশ কর্মচারীরা ময়দাতে চিনিতে ও নুনে হাড়ের গুড়ো মিশিয়ে দিচ্ছে, ঘি-এর সঙ্গে মেশানো হচ্ছে জন্তুর চর্বি। কুয়োর জলে গরুর মাংস ও শুয়োরের মাংস ফেলে দিয়ে ঐসব অপবিত্র করা হয়েছে। তখন গুজব আরও রটেছিল যে, কোম্পানীর হুকুমে সকল ভারতবাসীকে বিলিতি রুটি খেতে হবে। পাউরুটিকে তখন লোকে বলত বিলিতি রুটি আর তাদের ধারণা ছিল এই বিলিতি রুটি খেলে জাত যাবে।” (দ্রঃ ঐ)
এসব আলোচনায় বিপ্লবীদের ওপর শ্রদ্ধায় মন ভরে ওঠে আর উলামা মোল্লা ফকীরদের রাজনৈতিক দুরদর্শিতা দেখে অবাক লাগে। তখনকার দিনে জাত যাওয়া রোগটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে খুব বেশি ছিল। আর সেই সময় হিন্দু নেতা বলতে জমিদার তালুকদার সরকারি কর্মচারী সাহিত্যিক কবিরা বেশির ভাগই ইংরেজদের বিরোধিতা করতে পছন্দ করেননি। তাই ঐ সমস্ত কাল্পনিক রটনার সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, ধর্মভীরু মাওলানা ফকীর পীর, আওলিয়া হযরত মুহাম্মদের (দ.) আদর্শে চলতেন যদি মেনে নেওয়া যায় তবে ঐ মিথ্যার প্রশ্রয় নেওয়া কী করে সম্ভব হয়েছিল? তার উত্তরে স্মরণ করা যেতে পারে, হযরত মিথ্যাকে ঘৃণা করতেন আর মিথ্যাতে বিশ্ব বাঁচাতে তিনি ছিলেন দৃঢ়হস্ত। শুধু কয়েকটি স্থানে তা বৈধ করা হয়েছে তার মধ্যে “ফিল হারব” অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র একটি স্থান।
মুসলিম বিপ্লবীরা ভারত জুড়ে সংবাদ সরবরাহ করতে একটি নতুন বৈজ্ঞানিক কৌশল অবলম্বন করেছিল তার নাম ছিল ‘চাপাতি তকসিম’। পাতলা চাপাতি রুটি বাড়িতে বাড়িতে বিপ্লবীদের বাড়িতে সাহায্যকারী ও সহযোগীদের বাড়িতে সেই চাপাতি চলতো, ইংরেজ গুপ্তচর ঠিক করতে পারতো না বিপ্লবীদের মধ্যে এত চাপাতি রুটির আদান প্রদানের প্রাবল্য কেন? কিন্তু প্রত্যেক চাপাতির মধ্যে থাকতো একটা কাগজের পত্র তাতে লেখা থাকতো বিপ্লবীদের শহীদ হওয়ার সংবাদ এবং আগামী সঙ্কেত।
ভারতের হিন্দুজাতি এবং শিখ জাতি এই দুই বৃহত্তম ও বৃহৎ জাতি দুইটির যদি সাহায্য ও সহযোগিতা, সমর্থন আশানুরূপভাবে ইংরেজ না পেত তাহলে হযরত সৈয়দ আহমেদ ব্রেলবীর প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধই শেষ স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত হত আর সহজেই স্বাধীনতা পাওয়া যেত। পাঞ্জাবের মহারাজা ১৮৫৬ খৃস্টাব্দে দীলিপ সিংজাতি ত্যাগ করে খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। (দ্র: কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস পৃঃ ১৯৭)। মিঃ হান্টার শিখদের জন্য তাঁর পুস্তকে ইংরেজদের উত্তরাধিকারী বলেছেন, যা পূর্বেও উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। বৃটিশ বা ইংরেজ তাই ১৮৫৭র বিপ্লবে মুসলমানদের তো বিশ্বাসঘাতক ওহাবীও বিদ্রোহী বলতেই সেই সঙ্গে হিন্দুদেরও বিশ্বাসঘাতক উপাধি দিতে কার্পণ্য করেনি। কারণ সারা ভারতের হিন্দু সৈন্যরাও টোটার চর্বি ময়দায় হাড় গুঁড়ো প্রভৃতির কারণে খেপে উঠেছিল। যেমন ব্যারাকপুরে মঙ্গলপাড়ে রেগে ইংরেজ অফিসারকে তরবারীর চোট দিয়ে আহত করতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু পরে তিনি এত ভীত হন যে নিজের বুকে বন্দুক লাগিয়ে পায়ে করে ফায়ার করেন। অবশ্য মরার চেষ্টা করেও তাক ঠিক ঠিক না হওয়ায় প্রাণ যায়নি তাই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে সুস্থ করা হয়েছিল পরে তাঁর প্রাণদণ্ড হয়েছিল। ইতিহাসে মঙ্গলপাড়ের অবদান অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ইতিহাসের ইতিহাসে আমরা দেখবো প্রকৃত বীর আত্মহত্যা করেন না আত্মহত্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে কাপুরুষতা, ভীরুতা অথবা দুর্বলতা। ইতিহাসে আরও দেখা যায় মুসলমান রাজা বাদশাহ থেকে নিয়ে সামান্য সৈনিক পর্যন্ত আত্মহত্যা করার কলঙ্ক হতে মুক্ত। এর পরে আমরা এমন আরও অনেক শহীদ বীর হিন্দুর কথা বলবো, যাঁদের তিলে তিলে দগ্ধে দগ্ধে মৃত্যু যন্ত্রণা দিয়ে শেষ হত্যা করা হয়েছে তবু তাঁরা স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেননি। অথচ মিথ্যা প্রশংসার মুকুট পরিহিত বীর লর্ড ক্লাইভ কাপুরুষের মত নিজের প্রাণ নিজেই শেষ করেছেন।
যা হোক, শিখ সম্বন্ধে কমিউনিষ্ট নেতা বলেছেন, “বৃটিশ সার্ভিসে প্রায় ১,০০,০০০ শিখ আছে এবং তারা কিরকম উদ্ধত তাও শুনেছি; তারা বলে আজ তারা বৃটিশদের পক্ষে লড়ছে, কিন্তু ভগবান যদি করেন তবে কাল তাদের বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে হতেও পারে।” (দ্রঃ কার্লস ফ্রে: পৃঃ ১৯৫) তারপরে আরও লেখা রয়েছে-“ব্রাহ্মণ তন্ত্রের একটি বিশেষ সম্প্রদায় তারা হিন্দু এবং মুসলমানকেই ঘৃণা করে।” (দ্র ঐ পুস্তক ঐ পৃঃ) ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ। ... প্রকাশ্য বিদ্রোহ প্রায় ঘটতো, কোনক্রমে তার দমন চলতো, রেঙ্গুন আক্রমণে সমুদ্র পাড়ি দিতে সরাসরি অস্বীকার করল বেঙ্গল আর্মি, ফলে তাদের জায়গায় আনতে হয় শিখ রেজিমেন্টগুলোকে।” (কার্ল মার্কস) কার্ল মার্কস আরও লিখেছেন, “কাগলিয়ারি ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখের একটি বৃটিশ ডিসপ্যাচ আমাদের বলছে যে, “দিল্লীর শেষ খবর ১২ আগস্টের। তখনও শহরটা বিদ্রোহীদের দখলে, কিন্তু শিগগিরিই একটা আক্রমণ চালানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কেননা প্রভূত অতিরিক্ত শক্তি নিয়ে জেনারেল নিকলসনের পৌঁছতে আর এক দিনের মার্চ লাগবে।” উইলসন ও নিকলসন তাদের বর্তমান শক্তি নিয়ে আক্রমণ না করা পর্যন্ত যদি দিল্লী দখল না করা হয় তাহলে তার দেয়ালগুলো আপনা থেকেই পড়ে না যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকবে নিকলসনের প্রভূত শক্তির পরিমাণ হল প্রায় ৪,০০০ শিখ-” (কার্ল মার্ক্স পৃঃ ১০৩-১০৪) ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ ৫৭ সালের সৃষ্ট নয়, বহু আগে হতেই তা শুরু হয়েছে। তা আজ আমরা সকলে না জানলেও বা না মানলেও ইংরেজ জানতে ও মানতো তাই আমাদের কল্যাণে নয় তাদের বাঁচার তাগিদে ১৮৫৬ খৃস্টাব্দে প্রথম রেল পথের প্রচলন ও ইলেকট্রিক টেলিগ্রাম নির্মাণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কাজ করতে তারা বাধ্য হয়েছিল। যদি এটুকু না করতো তাহলে যদিও শিখ সৈন্য ও ইংরেজ সৈন্য বিদ্রোহ দমনে প্রাণপণে লড়েছিল তবুও তাদের অবশ্য অবশ্যই পরাজয় বরণ করতে হত আর দেশ সর্বোতভাবে ইংরেজমুক্ত হত ১৯৪৭ -এর পরিবর্তে ১৮৫৭-ই হত স্বাধীনতা দিবস। সত্য কথা যা সচারাচর সহজপ্রাপ্য সংবাদ নয় তা বিশ্বাস করা কঠিন। তাই শিখ জাতির সঙ্গে মারাঠাদের কথাও একটু বলা প্রয়োজন। মারাঠারা ভারতে ইংরেজদের রাজত্ব কায়েম করার পেছনে কত সাংঘাতিকভাবে দায়ী তা এর আগে বলা হয়েছে; এখানে ১৮৫৭-এর মহাবিপ্লবে সেই সত্য তথ্য প্রমাণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়। তদানীন্তন মারাঠাদের দুই বিখ্যাত রাজা যাদের হাতে বিরাট জনতার জনবল বিরাট সুসজ্জিত সৈন্য শ্রেণী তারা এই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেননি। তা না করেও যদি নিরপেক্ষ থাকতেন তাহলেও তাদের চরিত্রে বিশ্বাসঘাতকতার অথবা অদূরদর্শিতার অথবা প্রাচীন ছুতমর্গীয় সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ না দিলেই চলতো। কিন্তু তাঁরা ইংরেজের পক্ষে প্রাণপ্রিয় আত্মীয়ের মত হয়ে ভারতীয় মুসলমান ও হিন্দুদের বুকে বন্দুক মারতে বীরত্ববোধ করেছেন। এখানেও একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি। “দুই মারাঠা রাজা হোলকার ও সিন্ধিয়া কী পথ নেয় তার ওপরেই এ সিদ্ধান্ত। যে ডিসপ্যাচে মহাও, তোস্টুয়ার্টের আগমনের কথা জানানো হয়, তাতেই বলা হয়েছে যে, হোলকার এখনো অটল থাকলেও তার সৈন্যরা বেয়াড়া হয়ে উঠেছে। আর সিন্ধিয়ার কর্মনীতি সম্বন্ধে একটি কথা বলা হয়নি। ইনি যুবক, জনপ্রিয়, তেজী, সমস্ত মারাঠা জাতির স্বাভাবিক নেতা ও সমাবেশ কেন্দ্র বলে তাঁকে ধরা হবে। তাঁর নিজের ১০,০০০ সুশৃঙ্খল সৈন্য আছে। তিনি বৃটিশদের পক্ষ ত্যাগ করলে শুধু মধ্য ভারত তাদের হাতছাড়া হবে তাই নয়, বিপ্লবী সংঘটা পাবে বিপুল শক্তি ও সঙ্গতি।” (দ্রঃ কার্ল মার্ক্স ফ্রেডারিক এঙ্গেলর্স পৃঃ ১০২)।
অতএব পরিষ্কারভাবে পরিচ্ছন্ন ভাষায় প্রমাণ হচ্ছে শিবাজী বংশের মহামান্য বংশধরগণ মারাঠাদের বিখ্যাত রাজা হোলকার ও সিন্ধিয়া ইংরেজদের পক্ষে ভারতীয়দের বিপক্ষে প্রাণপণে লড়াই করেছেন।
নেপালের গুর্খারা ভারতবাসীকে হত্যা করেছে ইংরেজের পক্ষে। এই বিরাট বিষয়ের ছোট্ট কথাটি প্রমাণের জন্য নাম করা সমাজ বিজ্ঞানীর লেখা হতেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি-১৮৫৭ খৃস্টাব্দের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে “সেখানকার বৃটিশ রক্ষী সৈন্যদের এখন একমাত্র আশা ৩০০ গুৰ্খার একটা সৈন্যদল তা তাদের সাহায্যের জন্য জঙ্গবাহাদুর পাঠিয়েছেন নেপাল থেকে।” “জঙ্গবাহাদুর (১৮১৬-১৮৭৭), ১৮৪৬ সাল থেকে নেপালের রাজা ১৮৫৭, ৫৯ সালের ভারতীয় জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সময় ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করেন।” (কার্ল মার্ক্স ফ্রে: এঙ্গেলস্)।
“বিদ্রোহের ইতিহাস যারা প্রথমে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাঁদের সকলেই ছিলেন ইংরেজ। বেশির ভাগ লেখক আবার ইংরেজ রাজপুরুষ।” ইংরেজ ঐতিহাসিকরা একে বলেছে সিপাহী বিদ্রোহ। আর ভারতীয়রা একে বলতে চান “ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” (দ্রঃ সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস, মনিবাগচি, প্রথম প্রকাশ, ১ম পাতা)
প্রথমে কলকাতা হতে কিছু দূরে ব্যারাকপুরে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয় বলেই আমাদের মোটামুটি জানা ছিল। কিন্তু তা নয়, সৈন্যদের ইংরেজের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাইরে থেকেই। বিশেষ করে এটা ছিল মৌলবী মাওলানা ও পীর ফকিরদের কাজ আর তার কারণ ছিল ইংরেজের সুকৌশলে ধর্মে হস্তক্ষেপ। আগেই বলা হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার ইংরেজ বিদ্বেষের কথা। মুর্শিদাবাদ জেলায় ১৮৫৭ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি বহরমপুরেই প্রথম সিপাহী বিদ্রোহ হয়। আর তার পরের মাসে মার্চ-এ আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে ব্যারাকপুরে (দ্রঃ কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস পৃঃ ১৯৮) “ব্যারাকপুর হতে একশ মাইল দূরে ভাগীরথীর তীরে এ সেনানিবাস। বিদ্রোহের ডঙ্কা এখানেই প্রথম বেজেছিল।” (সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস পৃঃ ৩২)
কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস মুসলমান মাওলানা পীর ওলীদের সংক্ষেপে নাম ‘ফকীর’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। কোন জায়গায় মৌলুবী শব্দও ব্যবহার করেছেন। পূর্বে যে সমস্ত আলোচনা হয়েছে তাতে যেন প্রমাণ হয় যত বিপ্লব সবই যেন শুধু মুসলমানরাই করেছে আর কেউ কিছু করেনি তা নয়। মুসলমানদের সঙ্গে অমুসলমানদেরও ভূমিকা কিছু কিছু পরিলক্ষিত হয়। যেমন কৃষক বিদ্রোহে অনুন্নত হিন্দুদের সন্ধান মেলে। তাছাড়া ১৮৫৬ তে সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে অনুন্নত অমুসলমানদেরই অবদান বলা যায়। (দ্রঃ মনি বাগচি সিঃ যুঃ ইং)। তবে ফকীর বিদ্রোহের নেতা মজনু শাহ-ই-সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠককে বিদ্রোহে অবতীর্ণ করেন বলে অনেকে মত প্রকাশ করেন। জনাব মজনু ভবানী পাঠকের মধ্যে যে বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তার প্রমাণের অভাব নেই (ক) “ফকীর নেতা মজনুর সঙ্গে সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। (খ) সাঁওতাল বিদ্রোহেও (১৮৫৫-৫৭) স্থানীয় মুসলমান তাঁতীরা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে। (ক ও খ উদ্ধৃতি দুটি ডক্টর মনিরুজ্জামান সাহেবের লেখা হতে নেওয়া হয়েছে; আর তিনি নিয়েছেন নরহরি কবিরাজের লেখা ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম বাংলা’ পুস্তকের ৫৩ ও ৮২ পৃষ্ঠা হতে।)
সৈয়দ আহমেদ ব্রেলবীর শহীদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত মোজাহেদ শহীদ হন। তার মধ্যে বিখ্যাত নেতাদের মধ্যে মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আবদুল হাই প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অবশ্য রনজিৎ শিং যেমন ইংরেজদের প্রকাশ্য পক্ষালম্বনকারী তার ওপর ইংরেজদের চক্রান্তের শিকার হয়েছিল ইয়ার আলী নামক এক বিশ্বাসঘাত। তাই ১৮০৩ খৃঃ বালাকোটের ঐ মর্মান্তিক বিপর্যয়। বিপর্যয়ের পরেই মাওলানা সৈয়দ ওমর আলি সিত্তানায় উপস্থিত হন এবং সর্বসম্মত নির্বাচনক্রমে মাওলানা নাসিরুদ্দীনের বিপ্লবীদের সেনাপতি করা হয়। তারপর মাওলানা এনায়েত আলী, মাওলানা বেলায়েত আলী, মাওলানা জয়নাল আবেদীন প্রমুখ আলেম সারা ভারতে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে জনতাকে ইংরেজদ্রোহী করে তুলতে লাগলেন। জৌনপুরের কেরামত আলী এবং হায়দরাবাদের জয়নুল আবেদীন এমন জ্বালাময়ী ধর্মীয় বক্তৃতা করতেন যে মহিলারা তাদের গয়না খুলে দান করতে চিন্তা করার অবকাশ পেতেন না। আরও সহস্র সহস্র আলেম প্রত্যেকে জিহাদকেই প্রধানতম গুরুতম দায়িত্ব মনে করে দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। তার মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল গফুর, ফারহাদ আলী, মহরম আলী, সৈয়দ আকবর শাহ, সৈয়দ মোবারক শাহ, শাহ মুহাম্মদ হসেন, মুহাম্মদ বাকের আলী, মৌঃ আঃ রহমান, মালদহের আমিরুদ্দীম, মকসুদ আলি, থানেশ্বরের জাফর খান, পাঠনার মৌঃ ইয়াহইয়া আলি, আবদুল গাফফার ১নং, আব্দুল গাফফার ২নং, মঃ শফী, ইলাহী বখশ, পাটনার হসেনি, আবদুর রহিম, আঃ করিম, কাজী মিঞাজান, টংকের নবাব আমির খান, জাহানাবাদের আবদুল মজিদ খাঁ, আল্লাহ বখশ খাঁ, আকবর খাঁ, মঃ বরকাতুল্লাহ প্রমুখ বিপ্লবীদের প্রত্যেকের জীবনী ঐতিহাসিক তথ্য বিজরিত। লিখলে নিসার আলীর মত, শরীয়তুল্লার মত পড়ার ও বোঝার মত সম্পদ সম্ভার হবে। এদের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় এমন কিছু বিপ্লবী আলেম নেতা আছেন, যাঁদের ভূমিকা শুধু ভারতের ছিল না বরং তারা বহির্ভারত তথা সারা বিশ্ব সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতেন। যেমন হাজী ইমদাদুল্লাহ, মাওলানা আহমাদুল্লাহ, মাওলানা ফজলে রহমান খাইরাবাদী, মাঃ আঃ রশীদ গাঙ্গুহী, মাওলানা কাসেম নানুতুবী ও মাওলানা আব্বাস আলী (র. আজ.) প্রমুখ প্রত্যেক ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত ছিলেন। তাঁদের বুদ্ধিমত্তা রাজনীতি ও কূটনীতির ইতিহাস আজ নিষ্ঠুরভাবে অজ্ঞাত ও উপেক্ষিত। নীল চাষ ব্যাপারে ইংরেজরা চাষীদের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছিল ফলে খণ্ড খণ্ডভাবে একাধিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তারও মূলে ছিল ঐ মুসলমান দাড়িওয়ালা ফকীর ও মওলুবীর দল আর তাঁদের ধর্মগত গণও প্রাণভক্ত ও সমর্থক শ্ৰেণী। শ্রী যুক্ত দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘নীলদর্পণ’ পুস্তকে তার প্রমাণ দিয়ে মুসলিম চাষীবীর তোরাব আলীর নাম উল্লেখ করে প্রমাণ রেখেছেন নীল চাষের ব্যাপারে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রধানত মুসলমান চাষীরাই সংগ্রাম করেছেন।
বাইরের বিপ্লবীরা ইংরেজ সৈন্য শ্রেণীতে ভারতীয় সৈন্যদের বিদ্রোহী করার ব্যাপারে মুসলমান সৈন্য আগে হতেই ইংরেজ বিদ্রোহী ছিল কিন্তু হিন্দু সৈন্যদের কোনক্রমেই ইংরেজের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। সে আলোচনা, পরে আসছে। তাই গরু শূকরের চর্বি মিশ্রিত টোটা দাঁতে কাটার ঘটনা একটা কূটনৈতিক অজুহাত মাত্র। আসলে চতুর ইংরেজ এত বোকা ছিল না যে একই টোটায় উভয় জাতির ঘূণীত চর্বি মিশিয়ে উভয় জাতিকেই বিদ্রোহী করে তুলবে। মুসলমান মওলুবী পীর ফকিরের মাঝে এমনিভাবে নানা কিছু রটিয়ে বিদ্রোহের চেষ্টা করতেন যেমন লবণের মধ্যে ‘হাড়ের গুড়ো আছে’ ইত্যাদি অনেক কিছু। ব্যস, অমনি চিন্তা হত মানুষের না কোন জন্তুর হাড়। টোটার ঘটনাও তাই। টোটার মসৃণ কাগজ যার জন্য বলা হয়েছিল চর্বিই মসৃণতার কারণ কিন্তু তা নয়। কাগজ তৈরি হত শ্রী রামপুরে সেখানে হিন্দু কর্মচারী গোড়া হতেই ছিল। যদি গরুর চর্বির কোন ব্যাপার থাকতো তাহলে ওখানেই অশান্তি শুরু হয়ে যেত। ১৭ মার্চ ব্যারাকপুরের সৈন্য ছাউনিতে মিঃ হিয়ার্স যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বা হাতে-কলমে যা প্রমাণ করেছেন তাতে গরু ও শূকরের চর্বির কথা অলীক বলা যেতে পারে। তাই কার্ল মার্কসের মূল্যবান উদ্ধৃতি এখানে স্মরণীয়-“১৮৫৭র গোড়ার দিকে সে মাত্র প্রচলিত শূকর ও গরুর চর্বি মাখানো টোটার প্রবর্তন, ফকীরেরা বলতে লাগল-ইচ্ছা করে করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেক সিপাহী জাত খোয়ায়।” (কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, পূঃ ১৯৮) ঐতিহাসিক দার্শনিক কার্ল মার্কসের লেখায় আরও দেখা যায়, “১৮৫৭তে মার্চ ও এপ্রিলে আম্বালা ও মিরাটের সিপাহীরা বারবার গোপনে নিজেদের ব্যারাতে নিজেরা আগুন লাগাতো। অযোধ্যা ও উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশগুলোতে ইংলন্ডের বিরুদ্ধে লোকদের উসকাতে লাগল ঐ ফকিররা।” (দ্রঃ ঐ পুস্তক ১৯৮ পৃঃ)
ঐ ফকীর কারা? ঐ পীর মওলুবীর দল যারা ইচ্ছাকৃতভাবে মোটাসোটা কাপড় আর তালি দেওয়া ঢিলাঢালা জামা পরতেন আর কাঁধের উপর লাঠিতে ঝোলানো কাপড়ের পুটলী যার ভেতর থাকত লক্ষ লক্ষ টাকা, সোনার টুকরো আর দামি দামি সাঙ্কেতিক চিঠি পত্র! আরও কত কী। ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে মুসলমানেরাই আগে বিদ্রোহী হয়েছিল তারও কিছু কারণ থাকা দরকার। তা হচ্ছে এই, ১৮৫৮ খৃঃ ৭ আগস্ট সর্দার শেখ হেদায়েত আলী ইংরেজ সরকারকে বিদ্রোহের কারণ সম্বন্ধে যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন তাতে সিপাহীদের ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণগুলো বেশ বোঝার ব্যাপার। যথা-
(ক) পাঞ্জাব অধিকার করার পর ইংরেজ সরকার সৈন্যদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে দাড়ি কাটা বাধ্যতামূলক থাকবে না কিন্তু পরে দাড়িওয়ালা সৈন্যদের দাড়ি কাটতে বাধ্য করা হয় এবং অসম্মত সৈন্যদের বরখাস্ত করা হয়।
(খ) ইংরেজ পাদ্রীদের মারাত্মক খ্রিস্টধর্ম প্রচারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তার উপর সাহরানপুরে নতুন হাসপাতালে মহিলাদের জন্য পর্দার ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয় এবং সব জায়গাতে পর্দা সুন্নাতের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয় এবং বিবাহের বিষয়ে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়।
(গ) সৈন্যদের সরকারের প্রয়োজনে যেখানে যত দূরেই থোক যেতে বাধ্য থাকার অঙ্গীকারের সহি হয়। ওশফত গ্রহণ করানো হয়।
(ঘ) সর্বশেষে চর্বি মিশ্রিত টোটার আমদানি প্রভৃতিতে ধারণা হয় সরকারের উদ্দেশ্য সকলকে খৃষ্টান করা।
মুসলমানদের রাঙ্গা রক্ত যেমন আযাদী আন্দোলনে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল তেমনি বিখ্যাত কলমনবীসদের কালির জ্বালাময়ী লেখনীও মুসলমানদের উগ্র চেতনাকে, স্বাধীনতার বাসনাকে বৃদ্ধি করেছিল। মিঃ হান্টার তার লেখায় ইংরেজবিরোধী কিছু বই-এর নাম লিপিবদ্ধ করে গেছেন। যেমন (১) সিরাতুল মুসতাকীম, অর্থাৎ সোজা পথ, তাতে জেহাদকে সোজাপথের মূলবস্তু বলা আছে (২) কাসিদা বা জিহাদমূলক কবিতা গুচ্ছ (৩) সির-ই-ওয়াকেয়া তাতে যোদ্ধাদের বীরত্ব বর্ণনা আর বিধর্মীদের অত্যাচার পরিমাণমত পৌঁছালেই জিহাদ ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য বলে বর্ণনা করা আছে (৪) ভবিষ্যৎ জিহাদের ফলাফল আন্দাজ দেওয়া আছে, যা বিপ্লবীদের উৎসাহ বৃদ্ধির সহায়ক (৫) তওয়ারীখ কায়সারুম কিম্বা মিসবাহুস সারী। আবদুল ওহাবের সত্যতথ্য, হাতে লেখা প্রচারিত পুস্তক। (৬) তাবকিয়াতুল ঈমান বা ধর্মের শক্তি বৃদ্ধিকরণ (৭) তাজকেরুল আখওয়াই বা ভ্রাতৃসুলভ ব্যবহার (৮) নসিহাতুল মুসলেমিন বা মুসলমানদের প্রতি উপদেশ (৯) হেদায়াতুল মুসলেমিন বা মুসলমানদের পথ প্রদর্শনা (১০) চেহেল হাদিস, জিহাদ সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদের (সা.) চল্লিশটি বাণী (১১) তানবিরুল আইনাইন বা চক্ষুদ্বয়ের দৃষ্টি প্রসারিতকরণ (১২) আমবিউল গাফেলিন অর্থাৎ অমনোযোগীদের প্রতি তিরস্কার। (দ্রঃ দি ইণ্ডিয়ান মুসলমানস)।
মুসলমান মৌলভী, মোল্লা, খতিবরা প্রত্যেক গ্রামে বিত্তবান প্রত্যেকের কাছে শতকরা আড়াই টাকা হিসেবে যাকাত কর, একালীন দান তো গ্রহণ করতেনই সেই সঙ্গে প্রত্যেক বাড়িতে প্রতি বেলায় এক মুঠি করে চাল একটা পাত্রে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে মাসে সহস্র সহস্র মণ চাল উঠত এবং আদায়কারী আসতে বিলম্ব হলে মেয়েরা তা বিক্রয় করে তার পয়সা পৃথক করে রেখে দিত। শত প্রয়োজনেও তা খরচ করা হত না। কারণ তারাও বিশ্বাস করতো এই কাজটুকু করলেও তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ করার মত পূণ্য পাওয়া সম্ভব হবে। মিঃ হান্টার এই তথ্যকে বিকৃত করে লিখেছেন, “আগে এজন্য মসজিদে যে সদকা ও ফেতরা আবশ্যিক হিসেবে আদায় হত পূর্বে তা কেবল গরিবদের জন্যই বণ্টন করা হত সেসব অর্থ জিহাদের জন্য গ্রহণ করতে লাগলেন।” “তিনি নির্দেশ দেন প্রতিটি গৃহে প্রত্যেক লোককে প্রতিবেলায় একমুঠি করে চাল পৃথক করে রেখে দিতে হবে”। (মিঃ হান্টারের ঐ পুস্তক দ্রষ্টব্য) মিঃ হান্টার খুব সুদক্ষ চতুর লোক ছিলেন। তাই তিনি অতি কৌশলে তার পুস্তকে জানিয়েছেন পবিত্র জন্তু গরু সম্বন্ধে তার দরদ অথচ সাহেব নিজে একজন ভাল গোমাংসাশী ছিলেন। শুধু মাওলানা শ্ৰেণীই নয় ধনী ও মধ্যবিত্তরাও বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ রাখতেন। চামড়া ব্যবসায়ী প্রায় সকলেই ধনী মুসলমান ছিলেন, মিঃ হান্টার তাই মুচী সম্প্রদায় ও মুসলমান চামড়া ব্যবসায়ীদের একই পর্যায়ে ফেলেছেন। আর ব্যারিস্টারি চাল খাটিয়ে লিখেছেন, “তারা (অর্থাৎ মুসলমান চর্ম ব্যবসায়ীরা) বেশ জানে যদি ব্রাহ্মণরা কখনো ক্ষমতা হাতে পায় তাহলে তারাই হবে তাদের হাতের প্রথম বলী। এই চামড়া ব্যবসায়ীরাই হল ওহাবী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে অর্থশালী ও ধর্মশালী সমর্থক, যে ওহাবীদের মূলমন্ত্র হচ্ছে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।” (দ্রঃ মিঃ হান্টারের ঐ পুস্তক)।
মুসলমান মৌলবী মোল্লাদের সুনিপুণ কৌশলে প্রচারিত হয়েছিল “ময়দাতে হাড়ের গুঁড়ো মেশানো আছে।” এই জনরব কেবল মিরাটেই নয় সমগ্র উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের হিন্দুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। জনরব উঠল মিরাটের খালবারের কলগুলোতে। ইংরেজদের তত্ত্বাবধানে ময়দা তৈরি হচ্ছে এবং সেই সব ময়দার সঙ্গে গরুর হাড়ের গুঁড়ো মেশানো হচ্ছে।” (দ্রঃ সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস) ইংরেজ সরকার মনে করলো ময়দার দাম চড়েছে বলেই এই সব ফাসাদ। তাই ময়দার দর সস্তা করে দেওয়া হল। অমনি ফকীর মৌলবীর দল নতুন কথা রটাতে লাগলো ফলে লোকের মনে দৃঢ় ধারণা হল হাড়ের গুঁড়ো মেশানো ময়দা তাই এত সস্তা। কানপুরের বাজারে কেউই ময়দা কিনল না। সেখানকার সিপাহীরা পর্যন্ত ঐ ময়দা স্পর্শ করল না।” (দ্রঃ ঐ)। যে মাদ্রাজে ভেলোর বিদ্রোহ হয়েছিল ঐ ময়দার ঘটনাও তাতে বিজড়িত ছিল। প্রতিটি বিদ্রোহে এমনি আজগুবী কথা রটানো হয়েছিল, “ইংলণ্ডের রানী ও ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অনুমতিক্রমে বৃটিশ কর্মচারীরা ময়দাতে চিনিতে ও নুনে হাড়ের গুড়ো মিশিয়ে দিচ্ছে, ঘি-এর সঙ্গে মেশানো হচ্ছে জন্তুর চর্বি। কুয়োর জলে গরুর মাংস ও শুয়োরের মাংস ফেলে দিয়ে ঐসব অপবিত্র করা হয়েছে। তখন গুজব আরও রটেছিল যে, কোম্পানীর হুকুমে সকল ভারতবাসীকে বিলিতি রুটি খেতে হবে। পাউরুটিকে তখন লোকে বলত বিলিতি রুটি আর তাদের ধারণা ছিল এই বিলিতি রুটি খেলে জাত যাবে।” (দ্রঃ ঐ)
এসব আলোচনায় বিপ্লবীদের ওপর শ্রদ্ধায় মন ভরে ওঠে আর উলামা মোল্লা ফকীরদের রাজনৈতিক দুরদর্শিতা দেখে অবাক লাগে। তখনকার দিনে জাত যাওয়া রোগটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে খুব বেশি ছিল। আর সেই সময় হিন্দু নেতা বলতে জমিদার তালুকদার সরকারি কর্মচারী সাহিত্যিক কবিরা বেশির ভাগই ইংরেজদের বিরোধিতা করতে পছন্দ করেননি। তাই ঐ সমস্ত কাল্পনিক রটনার সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, ধর্মভীরু মাওলানা ফকীর পীর, আওলিয়া হযরত মুহাম্মদের (দ.) আদর্শে চলতেন যদি মেনে নেওয়া যায় তবে ঐ মিথ্যার প্রশ্রয় নেওয়া কী করে সম্ভব হয়েছিল? তার উত্তরে স্মরণ করা যেতে পারে, হযরত মিথ্যাকে ঘৃণা করতেন আর মিথ্যাতে বিশ্ব বাঁচাতে তিনি ছিলেন দৃঢ়হস্ত। শুধু কয়েকটি স্থানে তা বৈধ করা হয়েছে তার মধ্যে “ফিল হারব” অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র একটি স্থান।
মুসলিম বিপ্লবীরা ভারত জুড়ে সংবাদ সরবরাহ করতে একটি নতুন বৈজ্ঞানিক কৌশল অবলম্বন করেছিল তার নাম ছিল ‘চাপাতি তকসিম’। পাতলা চাপাতি রুটি বাড়িতে বাড়িতে বিপ্লবীদের বাড়িতে সাহায্যকারী ও সহযোগীদের বাড়িতে সেই চাপাতি চলতো, ইংরেজ গুপ্তচর ঠিক করতে পারতো না বিপ্লবীদের মধ্যে এত চাপাতি রুটির আদান প্রদানের প্রাবল্য কেন? কিন্তু প্রত্যেক চাপাতির মধ্যে থাকতো একটা কাগজের পত্র তাতে লেখা থাকতো বিপ্লবীদের শহীদ হওয়ার সংবাদ এবং আগামী সঙ্কেত।
ভারতের হিন্দুজাতি এবং শিখ জাতি এই দুই বৃহত্তম ও বৃহৎ জাতি দুইটির যদি সাহায্য ও সহযোগিতা, সমর্থন আশানুরূপভাবে ইংরেজ না পেত তাহলে হযরত সৈয়দ আহমেদ ব্রেলবীর প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধই শেষ স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত হত আর সহজেই স্বাধীনতা পাওয়া যেত। পাঞ্জাবের মহারাজা ১৮৫৬ খৃস্টাব্দে দীলিপ সিংজাতি ত্যাগ করে খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। (দ্র: কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস পৃঃ ১৯৭)। মিঃ হান্টার শিখদের জন্য তাঁর পুস্তকে ইংরেজদের উত্তরাধিকারী বলেছেন, যা পূর্বেও উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। বৃটিশ বা ইংরেজ তাই ১৮৫৭র বিপ্লবে মুসলমানদের তো বিশ্বাসঘাতক ওহাবীও বিদ্রোহী বলতেই সেই সঙ্গে হিন্দুদেরও বিশ্বাসঘাতক উপাধি দিতে কার্পণ্য করেনি। কারণ সারা ভারতের হিন্দু সৈন্যরাও টোটার চর্বি ময়দায় হাড় গুঁড়ো প্রভৃতির কারণে খেপে উঠেছিল। যেমন ব্যারাকপুরে মঙ্গলপাড়ে রেগে ইংরেজ অফিসারকে তরবারীর চোট দিয়ে আহত করতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু পরে তিনি এত ভীত হন যে নিজের বুকে বন্দুক লাগিয়ে পায়ে করে ফায়ার করেন। অবশ্য মরার চেষ্টা করেও তাক ঠিক ঠিক না হওয়ায় প্রাণ যায়নি তাই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে সুস্থ করা হয়েছিল পরে তাঁর প্রাণদণ্ড হয়েছিল। ইতিহাসে মঙ্গলপাড়ের অবদান অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ইতিহাসের ইতিহাসে আমরা দেখবো প্রকৃত বীর আত্মহত্যা করেন না আত্মহত্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে কাপুরুষতা, ভীরুতা অথবা দুর্বলতা। ইতিহাসে আরও দেখা যায় মুসলমান রাজা বাদশাহ থেকে নিয়ে সামান্য সৈনিক পর্যন্ত আত্মহত্যা করার কলঙ্ক হতে মুক্ত। এর পরে আমরা এমন আরও অনেক শহীদ বীর হিন্দুর কথা বলবো, যাঁদের তিলে তিলে দগ্ধে দগ্ধে মৃত্যু যন্ত্রণা দিয়ে শেষ হত্যা করা হয়েছে তবু তাঁরা স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেননি। অথচ মিথ্যা প্রশংসার মুকুট পরিহিত বীর লর্ড ক্লাইভ কাপুরুষের মত নিজের প্রাণ নিজেই শেষ করেছেন।
যা হোক, শিখ সম্বন্ধে কমিউনিষ্ট নেতা বলেছেন, “বৃটিশ সার্ভিসে প্রায় ১,০০,০০০ শিখ আছে এবং তারা কিরকম উদ্ধত তাও শুনেছি; তারা বলে আজ তারা বৃটিশদের পক্ষে লড়ছে, কিন্তু ভগবান যদি করেন তবে কাল তাদের বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে হতেও পারে।” (দ্রঃ কার্লস ফ্রে: পৃঃ ১৯৫) তারপরে আরও লেখা রয়েছে-“ব্রাহ্মণ তন্ত্রের একটি বিশেষ সম্প্রদায় তারা হিন্দু এবং মুসলমানকেই ঘৃণা করে।” (দ্র ঐ পুস্তক ঐ পৃঃ) ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ। ... প্রকাশ্য বিদ্রোহ প্রায় ঘটতো, কোনক্রমে তার দমন চলতো, রেঙ্গুন আক্রমণে সমুদ্র পাড়ি দিতে সরাসরি অস্বীকার করল বেঙ্গল আর্মি, ফলে তাদের জায়গায় আনতে হয় শিখ রেজিমেন্টগুলোকে।” (কার্ল মার্কস) কার্ল মার্কস আরও লিখেছেন, “কাগলিয়ারি ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখের একটি বৃটিশ ডিসপ্যাচ আমাদের বলছে যে, “দিল্লীর শেষ খবর ১২ আগস্টের। তখনও শহরটা বিদ্রোহীদের দখলে, কিন্তু শিগগিরিই একটা আক্রমণ চালানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কেননা প্রভূত অতিরিক্ত শক্তি নিয়ে জেনারেল নিকলসনের পৌঁছতে আর এক দিনের মার্চ লাগবে।” উইলসন ও নিকলসন তাদের বর্তমান শক্তি নিয়ে আক্রমণ না করা পর্যন্ত যদি দিল্লী দখল না করা হয় তাহলে তার দেয়ালগুলো আপনা থেকেই পড়ে না যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকবে নিকলসনের প্রভূত শক্তির পরিমাণ হল প্রায় ৪,০০০ শিখ-” (কার্ল মার্ক্স পৃঃ ১০৩-১০৪) ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ ৫৭ সালের সৃষ্ট নয়, বহু আগে হতেই তা শুরু হয়েছে। তা আজ আমরা সকলে না জানলেও বা না মানলেও ইংরেজ জানতে ও মানতো তাই আমাদের কল্যাণে নয় তাদের বাঁচার তাগিদে ১৮৫৬ খৃস্টাব্দে প্রথম রেল পথের প্রচলন ও ইলেকট্রিক টেলিগ্রাম নির্মাণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কাজ করতে তারা বাধ্য হয়েছিল। যদি এটুকু না করতো তাহলে যদিও শিখ সৈন্য ও ইংরেজ সৈন্য বিদ্রোহ দমনে প্রাণপণে লড়েছিল তবুও তাদের অবশ্য অবশ্যই পরাজয় বরণ করতে হত আর দেশ সর্বোতভাবে ইংরেজমুক্ত হত ১৯৪৭ -এর পরিবর্তে ১৮৫৭-ই হত স্বাধীনতা দিবস। সত্য কথা যা সচারাচর সহজপ্রাপ্য সংবাদ নয় তা বিশ্বাস করা কঠিন। তাই শিখ জাতির সঙ্গে মারাঠাদের কথাও একটু বলা প্রয়োজন। মারাঠারা ভারতে ইংরেজদের রাজত্ব কায়েম করার পেছনে কত সাংঘাতিকভাবে দায়ী তা এর আগে বলা হয়েছে; এখানে ১৮৫৭-এর মহাবিপ্লবে সেই সত্য তথ্য প্রমাণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়। তদানীন্তন মারাঠাদের দুই বিখ্যাত রাজা যাদের হাতে বিরাট জনতার জনবল বিরাট সুসজ্জিত সৈন্য শ্রেণী তারা এই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেননি। তা না করেও যদি নিরপেক্ষ থাকতেন তাহলেও তাদের চরিত্রে বিশ্বাসঘাতকতার অথবা অদূরদর্শিতার অথবা প্রাচীন ছুতমর্গীয় সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ না দিলেই চলতো। কিন্তু তাঁরা ইংরেজের পক্ষে প্রাণপ্রিয় আত্মীয়ের মত হয়ে ভারতীয় মুসলমান ও হিন্দুদের বুকে বন্দুক মারতে বীরত্ববোধ করেছেন। এখানেও একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি। “দুই মারাঠা রাজা হোলকার ও সিন্ধিয়া কী পথ নেয় তার ওপরেই এ সিদ্ধান্ত। যে ডিসপ্যাচে মহাও, তোস্টুয়ার্টের আগমনের কথা জানানো হয়, তাতেই বলা হয়েছে যে, হোলকার এখনো অটল থাকলেও তার সৈন্যরা বেয়াড়া হয়ে উঠেছে। আর সিন্ধিয়ার কর্মনীতি সম্বন্ধে একটি কথা বলা হয়নি। ইনি যুবক, জনপ্রিয়, তেজী, সমস্ত মারাঠা জাতির স্বাভাবিক নেতা ও সমাবেশ কেন্দ্র বলে তাঁকে ধরা হবে। তাঁর নিজের ১০,০০০ সুশৃঙ্খল সৈন্য আছে। তিনি বৃটিশদের পক্ষ ত্যাগ করলে শুধু মধ্য ভারত তাদের হাতছাড়া হবে তাই নয়, বিপ্লবী সংঘটা পাবে বিপুল শক্তি ও সঙ্গতি।” (দ্রঃ কার্ল মার্ক্স ফ্রেডারিক এঙ্গেলর্স পৃঃ ১০২)।
অতএব পরিষ্কারভাবে পরিচ্ছন্ন ভাষায় প্রমাণ হচ্ছে শিবাজী বংশের মহামান্য বংশধরগণ মারাঠাদের বিখ্যাত রাজা হোলকার ও সিন্ধিয়া ইংরেজদের পক্ষে ভারতীয়দের বিপক্ষে প্রাণপণে লড়াই করেছেন।
নেপালের গুর্খারা ভারতবাসীকে হত্যা করেছে ইংরেজের পক্ষে। এই বিরাট বিষয়ের ছোট্ট কথাটি প্রমাণের জন্য নাম করা সমাজ বিজ্ঞানীর লেখা হতেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি-১৮৫৭ খৃস্টাব্দের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে “সেখানকার বৃটিশ রক্ষী সৈন্যদের এখন একমাত্র আশা ৩০০ গুৰ্খার একটা সৈন্যদল তা তাদের সাহায্যের জন্য জঙ্গবাহাদুর পাঠিয়েছেন নেপাল থেকে।” “জঙ্গবাহাদুর (১৮১৬-১৮৭৭), ১৮৪৬ সাল থেকে নেপালের রাজা ১৮৫৭, ৫৯ সালের ভারতীয় জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সময় ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করেন।” (কার্ল মার্ক্স ফ্রে: এঙ্গেলস্)।