hadith book logo

ইতিহাসের ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৭

হযরত আহমাদ ফারুকী সারহিন্দী মোজাদ্দেদ আলফেসানী (রহ.)

মোজাদ্দেদ সাহেব সম্বন্ধে পূর্বেই কিছু আলোচনা করা হয়েছে। তবু জানা দরকার যে তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন হযরত উমারের (র.) বংশধর, যিনি হযরত মুহাম্মদের (সা.) খলিফা বা প্রতিনিধি ছিলেন। তাই তাঁকে ফারুকিও বলা হয়। জন্মভূমি নাম সিরহিন্দ। সিরহিন্দের অর্থ বাঘদের জঙ্গল "Sirhind is really Shiarhand, which means the forest of tigers.” ফিরোজ শাহ তুঘলকের সময় একজন মুসলমান ফকির একটা দাগে লাঠি দিয়ে বলেছিলেন, ‘এখানে ভবিষ্যতে একজন মস্তবড় মুজাদ্দেদ জন্ম নেবেন।’ যেহেতু ঐ পণ্ডিত অসাধারণ পণ্ডিত ও বুজুর্গীর অধিকারী ছিলেন। তাই ওখানে, ফিরোজ তুঘলকের আদেশে বাড়ি তৈরি করা হয়েছিল এবং পরে মুজাদ্দেদ সাহেব ওখানেই জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমেই তিনি কোরআনের হাফেজ হয়েছিলেন এবং দিল্লী কলেজে আরবী, ফারসী প্রভৃতি নানা ভাষায় দক্ষতার সঙ্গে জ্ঞান লাভ করে পদক ও পুরস্কার পেয়েছিলেন।

সেই সময় আকবরের রাজত্ব চলছিল। আর ঠিক ঐ সময়ে ফৌজী ও আবুল ফজল যথাক্রমে বাদশার ডানহাত ও বামহাতের মত মূল্য নিয়েও প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আহমদের প্রতিভা ও পণ্ডিত ও গুণাবলি দেখে তারা একে নিজেদের মধ্যে পেতে চাইলেন এবং তাদের আশা ছিল তাঁকে নিয়ে আকবরের দশরত্ন সভা সাফল্য লাভ করবে। কিন্তু ইসলামের আইন অবহেলা যথা- নামায না পড়া এবং পোশাক পরিচ্ছদ বা শরীয়তের তাদের অরুচি দেখে মোজাদ্দেদ সাহেব তাঁদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। আকবরের সঙ্গে হযরত মোজাদ্দেদের লড়াইয়ের বীজ ওখানেই শুরু হয়। তাঁর জীবনে বহু অলৌকিক ঘটনা আছে, সে আলোচনা নিস্প্রয়জন। আসল কথা বিত্তহীন দরিদ্র মোজাদ্দেদ সাহেব আকবর ও জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে হিমশীতল ধর্মীয় লড়াই চালিয়ে কেমনভাবে বিজয়ী হয়েছেন তাই চিন্তার বিষয়।

হযরত মুজাদ্দেদ সাহেবকে জাহাঙ্গীরের বন্দি করার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু জাহাঙ্গীরের কন্যা পিতার মত শরীয়তের বিরোধিতা করতেন না। তিনি একবার নামাজান্তে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে। তিনি জানালেন যদি তার প্রিয় আহমাদ সাহেবকে কারাগার হতে মুক্ত করে না দেওয়া হয় তাহলে জাহাঙ্গীরকে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। রাজকন্যা ঘুম ভাঙার পর পিতাকে এই মারাত্মক স্বপ্নের কথা জানালে জাহাঙ্গীর ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। (দ্রঃ রওজাতুল কাইউমিয়াত)।

যে জাহাঙ্গীর সারা জীবন ইসলাম ধর্মের বিরোধিতা করলেন তিনিই আবার মুজাদ্দেদ সাহেবের বৈদ্যুতিক পরশে ধার্মিক, দয়াল, প্রজাপালক প্রভৃতি গুণে গুণান্বিত হয়ে এক অভিনব চরিত্রে রূপান্তরিত হলেন। এও তাঁর বৃহত্তর অলৌকিকতা সন্দেহ নেই। (দ্রঃ জোবদাতুল মাকামাত)।

হযরত মোজাদ্দেদ সাহেব মহানবী হযরত মুহাম্মদকে (সা.) সর্ব বিষয়ে অনুসরণ ও অনুকরণ করতেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বে একবার তিনি বলেছিলেন, আমি হযরত মুহাম্মদকে (সা.) সর্ব বিষয়ে অনুসরণ করতে চাই, এমনকি তিনি মাত্র ৬৩ বছর পৃথিবীতে ছিলেন, ওখানে আমার কোন হাত নেই, তবে হৃদয় চায় আমায় যেন আল্লাহ ৬৩ বছরই পৃথিবীতে রাখেন। হয়েছিল তাই। আরবী ৯৭১ হিজরীতে জন্মে ১৯৩৪ সালে আরবী সফর মাসে হঠাৎ একদিন রাত্রে স্নান করলেন, ভাল পরিচ্ছদ পোশাক পরলেন, গায়ে সুগন্ধি আতর লাগিয়ে নৈশ্য নামায তাহাজ্জোদ পড়লেন, মোনাজাত করলেন প্রাণভরে, অশ্রুসিক্ত নয়ন নিয়ে উত্তর দক্ষিণে লম্বা হয়ে মক্কা শরীফের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়লেন আর উচ্চারণ করতে লাগলেন ইসলামের মূলমন্ত্র কালেমা। একটু পরেই যেন তন্দ্রা অথবা নিদ্রার আগমন হলো, কিন্তু নিদ্রা নয় এটা ছিল মহা নিদ্রা! মহা মিলন হলো মহান স্রষ্টার সঙ্গে।