hadith book logo

ইতিহাসের ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭০

স্যার সৈয়দ আহমাদ খান

চলতি ইতিহাসে ভেজাল সমালোচনা এই গ্রন্থের বিশেষ অঙ্গ। এই গ্রন্থে মাওলানা সৈয়দ আহমাদ ব্রেলবীর অবদান দেখানো হয়েছে এবং স্বাধীনতার অবদান বিষয় সমীক্ষা করলে সৈয়দ ব্রেলবীর একার অবদান অপরাপর শতাধিক প্রকৃত নেতা অপেক্ষাও বেশি। তার নাম চাপা দেয়ার জন্য দিল্লীর একজন সৈয়দ আহমাদকে শাসক আমদানি করে।

অর্থাৎ ১৮৪৭ খৃস্টাব্দে দিল্লীতে আর এক সৈয়দ আহমাদ জন্মগ্রহণ করেন প্রথমে তিনি মাদরাসায় পড়ে একটি অর্ধ মওলুবীর বিদ্যা অর্জন করেন। সরকার নিঃশব্দে তাকে একটি সরকার পোস্টে সেরেস্তাদারের পদ দিয়ে নিজেদের সেবায় নিয়োজিত করেন। কিছুদিন পরে দয়ালু বৃটিশ সরকার তাঁকে ইংরেজি শেখার পরামর্শ দেয়। শুধু তাই নয়, ভাল শিক্ষক দিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিলিতি কায়দায় যবনিকার অন্তরাল হতে তাকে ইংরেজি শিখিয়ে ফেলার ব্যবস্থা হয়। তার পরেই এক লাফে তিনি মুনসেফের পদ পান। পরের পদক্ষেপেই স্যার সৈয়দ আহমাদ খান সাব জজ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

চারদিকে যখন ইংরেজবিরোধী বিপ্লব তখন নয়া আহমাদ বহু ইংরেজকে বিপ্লবীদের হাত হতে বাঁচান। তাঁকে দেশবাসীর সঙ্গে শঠতা করতে হলেও ইংরেজের সঙ্গে সততা বজায় রাখতে তিনি সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন। ইংরেজের নেমক খেয়ে তিনিও ইংরেজের নেমক হারামি করেননি। সরকার খুব খুশি হয়ে তাকে নাইট উপাধি দান করেন। শুধু তাই নয়, প্রতি মাসে জীবনভর সেই বাজারে দুইশত টাকা করে বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। এবার ইংরেজ মনিবের পরামর্শে তিনি একটি উর্দু বই লিখলেন, যার নামের অর্থ সিপাহী বিদ্রোহের কারণ। ইংরেজের চালে বহু মুসলমান বিভ্রান্ত হয় এবং অনেকের ধারণা মাওলানা, মৌলভী ও বুযুর্গরা সমাজে যে বিপ্লব ঘটিয়েছেন এবং ইংরেজি শিক্ষা নিষেধ করেছেন আর চাকরি বয়কট করেছেন, এ সমস্তই ভুল পদক্ষেপ। আজও অনেক ইংরেজি শিক্ষিত মানুষকে বলতে শুনেছি যে ইংরেজি শিক্ষা হারাম বা নিষেধ বলে দিয়ে মৌলভীরা মুসলমান জাতির প্রগতিকে একশত বছর পিছিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তা নয়। দুধ বড় উপকারী নিন্দ্রা শ্রমের প্রতিষেধক। টাইফয়েড রোগীকে দুধ দেওয়া আর সদ্য সাপে কাটা রোগীকে ঘুমাতে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। ঠিক ইংরেজ তাড়াবার জন্য নন কো-অপারেশনই একমাত্র উপায় ছিল তখন।

১৮৬০ খৃস্টাব্দে নয়া সৈয়দ আহমাদ The Royal Mohammedan মত india নাম দিয়ে একটি পত্রিকা চালাতে লাগলেন। শুধু তাই নয়, সম্মানীয় সমগ্র মৌলভী সমাজকে বোকা ও বেকুফ বানাবার জন্য নানা মতবাদ জাহির করলেন। যথা-কোরআন শরীফ সংক্ষেপ করা ইত্যাদি।

স্যার আহমাদ মনিবদের আদেশ নিষেধ ও পরামর্শমূলক বহু বই ইংরেজি হতে উর্দুতে অনুবাদ করার জন্য অনুবাদ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন।

ইংরেজরা উপযুক্ত লোক চিনতে পারেন। এ প্রশংসা তাদের করলে বোধহয় অবিচার হয় না। এবার নয়া সৈয়দ আহমাদকে ইংলণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ভালভাবে ট্রেনিং দিয়ে আবার ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। ফিরে এসে একটি সোসাইটি তৈরি করলেন, সেটা 'Society for Edueation progress of Indian Muslims' নামে বিখ্যাত। এই সমিতি বিলিতি টাকার গাড়িতে চড়ে প্রচার কাজ চালিয়ে ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে Mohammedan Anglo Oriental আলীগড় কলেজ তৈরি করলেন বা করালেন। আর ঐ কলেজই বিশ্ব বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। এইবার যাচাই করা, বাছাই করা, ভাল ভাল কর্মী এখানে নিয়োগ করা হয়। তারই ফল সব ভিকারুল মূলক, নবাব মহসীনুল মুলক, কাজী আলতাফ হুসাইন আলী, মিঃ নজির আহমদ প্রমুখ নেতা নয়া আহমাদ সাহেবের পাশে এসে দাঁড়ান। ভারতের মুসলমান ১৭৪৭’র পর হতে যে লড়াই চালিয়ে আসছিল এতদিন পর যেন তারা বুঝলেন আর নয় এখন ইংরেজবিদ্বেষী না হয়ে কিছু দিনের জন্য ইংলেজের সঙ্গে হিন্দু নেতাদের মত সহযোগিতা করার প্রয়োজন মেনে নেন।

ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামী মুসলমান জাতি ইংরেজ ভঙ্গ ও ইংরেজবিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়ে জাতীয় ঐতিহ্য শিক্ষা ও সংহতি হারিয়ে ফেলে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই সময়ে ভাটা পড়ার দরুন সংস্কৃতি শিথিল বৃটিশ রাজের ভিত্তি মজবুত হয়। চতুর ইংরেজ চাতুরী দিয়ে ভারতে কেরানী শ্রেণী সৃষ্টির আস্বাদ পায়। অসহযোগী নীতি রাতারাতি বদলে গিয়ে সাম্প্রদায়িকতার দুষ্টক্ষত দ্বিজাতি তত্ত্বের অদৃশ্য ভূমিকার সৃষ্টি হয়। নয়া আহমাদকে নাইট ও খান উপাধি আগেই দেওয়া হয়েছিল। ১৮৭৮ খৃস্টাব্দে তাঁকে তাঁর মনিবরা চরম চাঞ্চলাময় পরম পুরস্কার ‘স্যার’ টাইটেল দান করেন। তার পরের দশ বছর সরকারের সর্ব প্রকার সেবা করে ১৮৯৮ খৃঃ তিনি মারা যান।

ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু বিদ্বেষের বীজ বপনের ব্যবস্থা ও ইংরেজের প্রতি অনুগত্যের তালিমের ওপর বেশ জোর দেওয়া হয়। তারই ফলস্বরূপ ১৯০৬ খৃস্টাব্দে ঐ মহা বিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত নেতারা এবং আলিগড় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দই মুসলিম লীগের জন্ম দেন। আর সেই নবজাতক শিশুকে গড়ে তোলেন মিঃ জিন্নাহ আর ঐ শিশুর খোরাকের ব্যবস্থা করেন কংগ্রেস ও তাঁর প্রধান সাধু নেতা গান্ধীজির দুর্বলতা ও অদুরদর্শিতা।

ঊনবিংশ অধ্যায়