১
ইতিহাসের ইতিহাস
লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪৪
সিরাজের ইতিহাসে জগৎশেঠদের ভূমিকা
পৃথিবীর ইতিহাস সমালোচনা করে জানা যায় ইংরেজরা মুসলমান শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে বারবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরাজিত হয়েছে। তার ফলস্বরূপ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সারা বিশ্বে মুসলমান রাষ্ট্রের সৃষ্টি। ক্রুসেডের যুদ্ধ গুলিতেও মুসলমানদের বীরত্ব অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
ভারতে ব্যবসাদার ইংরেজ রাজা হয়ে বসতে পারতো না যদি তাদের হাতে ভারতের বিশ্বাসঘাতকদের সহযোগিতা না থাকতো। যে বা যাদের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজরা ভারতের মাটিতে তুলাদণ্ডের পরিবর্তে রাজদণ্ড ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল তাঁদের মধ্যে জগৎশেঠদের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ভারতের যোদপুরের একটি দরিদ্র পরিবার অভাবের জ্বালায় হীরানন্দ মাতৃভূমি ত্যাগ করে, বঙ্গদেশের এক গ্রামে একটি পর্ণ কুটীরে মৃত্যু শায়িতা বৃদ্ধার সেবা করার সুযোগ পান। সেই বৃদ্ধার মৃত্যুর পর তার গচ্ছিত কিছু টাকা হীরানন্দের মূলধনে পরিণত হয়। এমনিভাবে ঐ বংশের মানিকচাঁদের সঙ্গে মুর্শিদকুলী খাঁর ভালবাসা হয়। মানিকচাঁদ কাজ গুছিয়ে বেশ উঁচু ধাপে উঠতে থাকেন। ১৭১৫ খৃস্টাব্দে বাদশাহ ফররুখ শাহের নিকট সুপারিশ করে মুর্শিদকুলী খাঁ তাঁকে শেঠ উপাধি দান করেন। হিন্দু-মুসলমান ভালবাসাবাসিরই এক ঐতিহাসিক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই শেঠ উপাধি দান। (রিয়াজুস সানাতিন, Stewarts History of Bengal)
শেঠ বংশের ফতেহচাঁদই প্রথমে জগৎশেঠ উপাধিপ্রাপ্ত হন। আবার রিয়াজুস সানাতিনে ২৭৪ পাতায় পাওয়া যায় মুহাম্মদ শাহও জগৎশেঠ উপাধি দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে মতির মালা এবং কয়েকটি হাতী। সম্রাট মুহাম্মদ শাহকে শেঠজীরা তোষণ ও সেবায় এত মুগ্ধ করেন যে, মুর্শিদকুলী খাঁর ওপর একবার বিরক্ত হয়ে ফতেহচাঁদকেই নবাব করতে চেয়েছিলেন। মুর্শিদকুলী খাঁর মৃত্যুর সময়ে তাঁর টাকা শেঠদের বাড়িতে যা জমা রাখাছিল তার পরিমাণ সে বাজারের সাত কোটি টাকা যা শেঠজীরা কোনও দিন ফেরত দেননি। (মুর্শিদাবাদ কাহিনী, ৫৬ পৃঃ, নিখিল চন্দ্র রায়)।
ঐ অর্থই যত অনর্থের মূল। সারা ভারতে বহু স্থানে শেঠদের গদি ছিল। ইংরেজরা প্রথম শেঠদের হাত করেন এবং শেঠরা যত টাকা প্রয়োজন দিতে প্রতিশ্রুত হন। তারপর জগৎশেঠের বাড়িতে গোপন বৈঠক বসে। সেই সভাতে সাহেবদের সঙ্গে সারা ভারতকে তথা সিরাজকে ধ্বংস করতে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হচ্ছেন জগৎশেঠ, রাজা মহেন্দ্ররায় (দুর্লভ রায়) রাজা রামনারায়ণ, রাজা রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস ও মীরজাফর।
একজন প্রস্তাব করেন যবনকে নবাব না করে হিন্দু নবাব করার। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মুসলমান মীরজাফরের দিকে দৃষ্টি দিয়ে লজ্জিত ও থতমত খেয়ে বললেন মীরজাফরকেই নবাব করে আমরা সিরাজকে সরাতে চাই। উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানগণ খেপে উঠবে না, মুসলমান নবাবের পরিবর্তে মুসলমান নবাব মাত্র। অনেক বাদানুবাদের পর জগৎশেঠ বললেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কথাই যুক্তিসঙ্গত। আমরা কেউ নবাব হলে অন্য বিপদ আছে। সঙ্গে সঙ্গে ঐ মত চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। তাই বলা যায়, ভারতে ইংরেজ রাজ্যই শুধু তাদের গোলাগুলি আর মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাতেই প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং শেঠজীদের বিশ্বাসঘাতকতাই এর পশ্চাতে প্রধানতম সহায়ক। উল্লেখ জাফরের তুলনায় কোন অংশেই কম ছিল না; বরং শেঠজীদের বিপুল অর্থ সাহায্যই ইংরেজদের এমন দুঃসাহসিক অভিযানের গোড়াপত্তন। ইংরেজ ঐতিহাসিকগণও এই বিরাট সত্যকে একেবারে হজম করতে পারেননি, তাই বলেছেন- “The rupees of the Hindu banker, equally with the sword of the English colonel contributed to the overthrough of the Mahammedan power in Bengal:" অর্থাৎ বাংলায় মুসলমান শক্তিকে ধ্বংস করতে (ভারতে পরাধীন করতে) বৃটিশ সেনাপতির তরবারির সাথে হিন্দু ধনপতিদের অর্থ সম্ভারও সমানভাবে সহযোগিতা করেছিল।
শেঠজীরা শুধুমাত্র ইংরেজদের হাতেই অর্থ দেননি, সিরাজের সৈন্যদের পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ সরবরাহ করে ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছেন। আরো দুঃখের কথা, সিরাজকে হত্যা করার প্রস্তাব ইংরেজ সরদারকে ঐ জগৎশেঠই দিয়েছিলেন।
মুর্শিদাবাদ কাহিনীর লেখক নিখিল বাবু বড় দরদ দিয়ে লিখেন হতভাগ্য রাজ্যহারা সর্বাবস্থায় হইয়া অবশেষে প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে বিলুণ্ঠিত হয়েছিল তারা প্রাণদানের পরিবর্তে যদি প্রাণনাশের কেউ সম্মতিও দিয়ে থাকে তাহলে তার ঘৃণিত ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক যে সর্ববথা নিন্দনীয় এ কথা মুক্ত কণ্ঠে বলা যেতে পারে।”
জগৎশেঠের মৃত্যু হয়েছিল উচ্চ পর্বত হতে নিচে নিক্ষিপ্ত হয়ে। পৃথিবীর প্রখ্যাত ধনী বংশ দরিদ্রতর হতে সৃষ্টি হয়ে দরিদ্রতম গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে তাদের ভগ্নস্তুপের পাশে বিচরণ করছে।
ভারতে ব্যবসাদার ইংরেজ রাজা হয়ে বসতে পারতো না যদি তাদের হাতে ভারতের বিশ্বাসঘাতকদের সহযোগিতা না থাকতো। যে বা যাদের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজরা ভারতের মাটিতে তুলাদণ্ডের পরিবর্তে রাজদণ্ড ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল তাঁদের মধ্যে জগৎশেঠদের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ভারতের যোদপুরের একটি দরিদ্র পরিবার অভাবের জ্বালায় হীরানন্দ মাতৃভূমি ত্যাগ করে, বঙ্গদেশের এক গ্রামে একটি পর্ণ কুটীরে মৃত্যু শায়িতা বৃদ্ধার সেবা করার সুযোগ পান। সেই বৃদ্ধার মৃত্যুর পর তার গচ্ছিত কিছু টাকা হীরানন্দের মূলধনে পরিণত হয়। এমনিভাবে ঐ বংশের মানিকচাঁদের সঙ্গে মুর্শিদকুলী খাঁর ভালবাসা হয়। মানিকচাঁদ কাজ গুছিয়ে বেশ উঁচু ধাপে উঠতে থাকেন। ১৭১৫ খৃস্টাব্দে বাদশাহ ফররুখ শাহের নিকট সুপারিশ করে মুর্শিদকুলী খাঁ তাঁকে শেঠ উপাধি দান করেন। হিন্দু-মুসলমান ভালবাসাবাসিরই এক ঐতিহাসিক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই শেঠ উপাধি দান। (রিয়াজুস সানাতিন, Stewarts History of Bengal)
শেঠ বংশের ফতেহচাঁদই প্রথমে জগৎশেঠ উপাধিপ্রাপ্ত হন। আবার রিয়াজুস সানাতিনে ২৭৪ পাতায় পাওয়া যায় মুহাম্মদ শাহও জগৎশেঠ উপাধি দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে মতির মালা এবং কয়েকটি হাতী। সম্রাট মুহাম্মদ শাহকে শেঠজীরা তোষণ ও সেবায় এত মুগ্ধ করেন যে, মুর্শিদকুলী খাঁর ওপর একবার বিরক্ত হয়ে ফতেহচাঁদকেই নবাব করতে চেয়েছিলেন। মুর্শিদকুলী খাঁর মৃত্যুর সময়ে তাঁর টাকা শেঠদের বাড়িতে যা জমা রাখাছিল তার পরিমাণ সে বাজারের সাত কোটি টাকা যা শেঠজীরা কোনও দিন ফেরত দেননি। (মুর্শিদাবাদ কাহিনী, ৫৬ পৃঃ, নিখিল চন্দ্র রায়)।
ঐ অর্থই যত অনর্থের মূল। সারা ভারতে বহু স্থানে শেঠদের গদি ছিল। ইংরেজরা প্রথম শেঠদের হাত করেন এবং শেঠরা যত টাকা প্রয়োজন দিতে প্রতিশ্রুত হন। তারপর জগৎশেঠের বাড়িতে গোপন বৈঠক বসে। সেই সভাতে সাহেবদের সঙ্গে সারা ভারতকে তথা সিরাজকে ধ্বংস করতে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হচ্ছেন জগৎশেঠ, রাজা মহেন্দ্ররায় (দুর্লভ রায়) রাজা রামনারায়ণ, রাজা রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস ও মীরজাফর।
একজন প্রস্তাব করেন যবনকে নবাব না করে হিন্দু নবাব করার। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মুসলমান মীরজাফরের দিকে দৃষ্টি দিয়ে লজ্জিত ও থতমত খেয়ে বললেন মীরজাফরকেই নবাব করে আমরা সিরাজকে সরাতে চাই। উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানগণ খেপে উঠবে না, মুসলমান নবাবের পরিবর্তে মুসলমান নবাব মাত্র। অনেক বাদানুবাদের পর জগৎশেঠ বললেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কথাই যুক্তিসঙ্গত। আমরা কেউ নবাব হলে অন্য বিপদ আছে। সঙ্গে সঙ্গে ঐ মত চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। তাই বলা যায়, ভারতে ইংরেজ রাজ্যই শুধু তাদের গোলাগুলি আর মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাতেই প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং শেঠজীদের বিশ্বাসঘাতকতাই এর পশ্চাতে প্রধানতম সহায়ক। উল্লেখ জাফরের তুলনায় কোন অংশেই কম ছিল না; বরং শেঠজীদের বিপুল অর্থ সাহায্যই ইংরেজদের এমন দুঃসাহসিক অভিযানের গোড়াপত্তন। ইংরেজ ঐতিহাসিকগণও এই বিরাট সত্যকে একেবারে হজম করতে পারেননি, তাই বলেছেন- “The rupees of the Hindu banker, equally with the sword of the English colonel contributed to the overthrough of the Mahammedan power in Bengal:" অর্থাৎ বাংলায় মুসলমান শক্তিকে ধ্বংস করতে (ভারতে পরাধীন করতে) বৃটিশ সেনাপতির তরবারির সাথে হিন্দু ধনপতিদের অর্থ সম্ভারও সমানভাবে সহযোগিতা করেছিল।
শেঠজীরা শুধুমাত্র ইংরেজদের হাতেই অর্থ দেননি, সিরাজের সৈন্যদের পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ সরবরাহ করে ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছেন। আরো দুঃখের কথা, সিরাজকে হত্যা করার প্রস্তাব ইংরেজ সরদারকে ঐ জগৎশেঠই দিয়েছিলেন।
মুর্শিদাবাদ কাহিনীর লেখক নিখিল বাবু বড় দরদ দিয়ে লিখেন হতভাগ্য রাজ্যহারা সর্বাবস্থায় হইয়া অবশেষে প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে বিলুণ্ঠিত হয়েছিল তারা প্রাণদানের পরিবর্তে যদি প্রাণনাশের কেউ সম্মতিও দিয়ে থাকে তাহলে তার ঘৃণিত ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক যে সর্ববথা নিন্দনীয় এ কথা মুক্ত কণ্ঠে বলা যেতে পারে।”
জগৎশেঠের মৃত্যু হয়েছিল উচ্চ পর্বত হতে নিচে নিক্ষিপ্ত হয়ে। পৃথিবীর প্রখ্যাত ধনী বংশ দরিদ্রতর হতে সৃষ্টি হয়ে দরিদ্রতম গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে তাদের ভগ্নস্তুপের পাশে বিচরণ করছে।