hadith book logo

ইতিহাসের ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২২

অষ্টম অধ্যায় সম্রাট বাবর

আমরা আকবর বা আওরঙ্গজেবসহ প্রমুখ ঐতিহাসিক ব্যক্তির আলোচনায় দুটি জিনিস তুলে ধরেছি। একটি হচ্ছে ঐতিহাসিক বিকৃতির ছবি আর দ্বিতীয় যেটি হচ্ছে বিকৃতি করার বৈজ্ঞানিক কারণ। সেই জন্য মুঘল বংশের ধারাবাহিকতা সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা পুনরায় মুঘল শাসনের ধারাবাহিক আলোচনায় ফিরে আসছি।

মুঘলগণ বহুবার ভারত আক্রমণ করেছিল এবং ফিরে গিয়েছিল নিজেদের বাসভূমিতে। তাই তাদের কাজ কর্মে প্রমাণিত হয়েছে তারা বিদেশী বা আক্রমণকারী। কিন্তু ঐ মুঘল বংশীয় অর্থাৎ এশিয়ার বিশ্ব বিখ্যাত দিগবিজয়ী বীর তৈমুরলঙ্গের রক্তের সঙ্গে মাতার দিক দিয়ে চেঙ্গিসখার রক্ত সন্ধিক্ষণে ১৪৮৩ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন বাবর।

মুহাম্মদ বিন তুঘলক সম্বন্ধে ইতিহাসে অনেক মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যার আবরণে আবরিত করা হয়েছে সে সম্বন্ধে আলোচনার অবকাশ রইল। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের মৃত্যুর পর ফিরোজ শাহ তুঘলক বংশের মর্যাদা বা পূর্ব সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সক্ষম হননি। সেই সময় ইব্রাহিম লোদীর সঙ্গে আফগান সামন্তদের বিবাদ কোন্দল খুব জোরালো রূপ ধারণ করে। ঠিক ঐ সময় এগার বছরের এক পিতৃহীন বালক যেন উন্নতি উদয়ের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনিই বাবর। পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ লোদী ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত ও পদচ্যুত করার জন্য বাবরকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি ১২ হাজার সুসজ্জিত সৈন্যসহ এগিয়ে এলেন। ১৫২৬ খৃস্টাব্দে পানিপথে যুদ্ধ হয়। বাবরের সঙ্গে ইব্রাহিম লোদীর। লক্ষাধিক বিপক্ষ সৈন্য থাকা সত্ত্বেও বাবর দারুণভাবে জয়লাভ করেন। ইব্রাহিমের ভরসা ছিল তাঁর সৈন্যাধিক্যের ওপর। কিন্তু বাবর সারারাত নামাজ (আরাধনা উপাসনা) শেষে সৈন্যদের সামনে ভাষণ দান করলেন এবং সার কথা জানালেন জয় পরাজয় সব আল্লাহর হাতে। তবে আমাদের প্রাণপণে লড়তে হবে।

বাবর জানতো তাঁর সৈন্যদের মধ্যে অনেকে মদ্যপান করতেন, যা ধর্মে মহাপাপ। তাই যুদ্ধের পূর্বাহ্নে, মদ্যপানের বিরুদ্ধে তাঁদের জোর করে ক্ষেপিয়ে তুলে ১২ হাজার সৈন্যসহ আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত বা প্রার্থনা করতে হাত উঠিয়ে বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি আমায় ক্ষমা কর, আমি প্রতিজ্ঞা করছি আর জীবনে মদ্য পান করবো না, পূর্ব অপরাধ ক্ষমা কর এবং পরিবর্তে যুদ্ধে ইজ্জত রক্ষা কর।” এত জোরে শিশুর মত কঁদতে লাগলেন যে, সমস্ত সৈন্যের ভাবান্তর হয় ও তাঁদেরও বেশির ভাগের চক্ষু অশ্রত হয়েছিল এবং দলের মধ্যে যারা মধ্যপানে অভ্যস্ত ছিলেন তারা সেদিন হতে মদ্যপান ত্যাগ করেন। এটা বীর বাবরের সুন্দর ধর্মীয় কৌশল বা কঠিন কুটনীতির নিদর্শন। তাই অনেক ঐতিহাসিক বাবরের জন্য লিখেছেন, তিনি মদ্যপায়ী ছিলেন। কিন্তু তা একেবারেই ভুল। বাস্তবিক তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান উপাসক মুসলমান।

তিনি আসলে আধ্যাত্মিক শক্তিরও অধিকারী ছিলেন। প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, তাঁর পুত্র হুমায়ুন যখন কঠিন পীড়াগ্রস্ত হয়ে শয্যাগত হয়েছিলেন, যখন সমস্ত চিকিৎসক জবাব দিলেন তখন বাবর বললেন, “আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘তোমরা নামাযের সঙ্গে ও ধৈর্যের সঙ্গে চাও’। অতএব ডাক্তার জবাব দিয়েছে সত্যি কিন্তু খোদা তো জবাব দেননি। তাই ওজু (নামাযের জন্য হাত, পা, মুখ ধোয়া) করে সন্তানের শয্যার পাশে নামায পড়লেন, তারপর দুই হাত তুলে দোয়া করলেন, “হে খোদা! তুমি সর্ব শক্তিমান, তোমার শক্তি যুগে যুগে মানুষ দেখে এসেছে আমায় তোমার শক্তির আর একটি কণা দেখাও; আমার নিজের প্রাণ তোমার দরবারে সমর্পণ করছি বিনিময়ে হুমায়ুনকে তুমি সুস্থতা ও আয়ু দান কর।” সঙ্গে সঙ্গেই ভোজবাজির মত হুমায়ুন উঠে বসলেন এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন আর বাবর সঙ্গে সঙ্গে পীড়িত হলেন ও সন্তানের শয্যাতেই শয়ন করলেন এবং ঐ শয্যাতেই তাঁর মৃত্যুর ডাক এসেছিল। মহা মিলন হয়েছিল তাঁর মহান স্রষ্টার সাথে ১৫৩০ খৃস্টাব্দ পানি পথের যুদ্ধেও বাবরের জয় শুধু দৈহিক নয় মানসিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকেও অস্বীকার করা যায় না।

বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে নিজের অনেক দোষও বর্ণনা করতে দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি তুর্কি ভাষায় সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক ছিলেন। বাবর সম্বন্ধে ইতিহাসে খুব একটা বেশি বিকৃতি ঘটানো হয়নি। তবে মদ্যপানের ব্যাপারটি বেশ মারাত্মক। অনেকে সহজেই মনে করতে পারেনি মদ্যপান তত দোষের নয়, যদি হতো তাহলে এত বড় সুনাম বিজয় আর অলৌকিকতা পরিলক্ষিত হতো না বাবরের জীবনে। কিন্তু সূক্ষ্ম সমীক্ষকদের মতে তা ঠিক নয়। বাবরের চরিত্র ও চেহারা মুসলমানের মতই নির্ভেজাল ছিল।