hadith book logo

ইতিহাসের ইতিহাস

লেখকঃ গোলাম আহমাদ মোর্তজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৯

কেশবচন্দ্র সেন

কেশবচন্দ্র ব্রাহ্ম সমাজের প্রসিদ্ধ নেতা ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দে কলকাতার কলুটোলা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল প্যারীমোহন সেন। ১৮৪৪ খৃষ্টাব্দে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। রাজনারায়ণ বসু লিখিত ‘বক্তৃতা' নামক একখানি পুস্তক পাঠে মুগ্ধ হয়ে ১৮৫৭ সালে ব্রাক্ষ ধর্ম গ্রহণ করেন। কেশবচন্দ্র ছিলেন রামমোহনের পুরো ভক্ত। তাই তার যোগ্যতা দেখে যদিও তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না তথাপিও ঠাকুর দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে ১৮৬২ সালে ব্রহ্মানন্দ উপাধি দিয়ে আচার্য পদে ভূষিত করেন। কিন্তু নূতন নিয়ম প্রচলনের চেষ্টা করতে তাঁর সঙ্গে বিরোধ উপস্থিত হলে তিনি ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে ১৮৬৯ সালে ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজ' নামে এক নুতন ধর্ম মত প্রচার করতে থাকেন। এবং এরই মুখ্যপত্ররূপে ‘ধর্মতত্ত্ব’ নামক পত্রিকার পত্তন করেন। ১৮৭০ সালে ‘সুলভ সমাচার' নামে এক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ঐ বছরেই তিনি ইংলন্ডে গমন করে ধর্ম সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেন। তারপর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে Indian Reform Association. নৈশ বিদ্যালয় মাদকতা নিবারণ সভা গঠন করেন।

তিনিও বিধবা বিবাহ সমর্থনে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিবাহ অনুষ্ঠানে হিন্দু পৌরাণিক নীতি বর্জনের জোর প্রচারক ছিলেন। কিন্তু লক্ষ্য করার মত বিষয়, তিনি তাঁর নিজের বাচ্চা মেয়ের বিয়ে দিলেন কুচবিহারের মহারাজার ছেলের সাথে। এবং সেই বিয়েতে হিন্দু পুরনো প্রথার সদ্ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বিবাহ ব্যাপার নিয়ে ব্রাহ্ম সমাজে তুমুল কলহের সৃষ্টি হয়। ফলে ঐ সময় তিনি ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজ ত্যাগ করে ‘নববিধান ব্রাহ্মসমাজ’ নামে নূতন এক ধর্মমত গঠন করলেন। এবং ‘নববিধান’ নামক এক পত্রিকার দ্বারা এর প্রচারে উদ্যোগী হলেন। এক কথায় ব্রাহ্ম সমাজ তখন দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল।

সেই সময় রাণী ভিক্টোরিয়া, লর্ড লরেন্স ও একেশ্বরবাদীদের আমন্ত্রণে কেশবচন্দ্র অতি সাগ্রহে বিলেতে যান এবং ভোজসভায় অংশ গ্রহণ করেন।

রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে কেশবচন্দ্রই সমাজে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে সব ধর্মের সমন্বয় সাধনে প্রত্যেক গোত্র বা ধর্ম হতে মেম্বার নিয়ে “ইণ্ডিয়ান রিফর্মস অ্যাসোসিয়েশন” স্থাপন করেন। দেশব্যাপী প্রচারের সুবিধার্থে তিনি একটি প্রচার সভাও সৃষ্টি করেছিলেন। আর কলকাতায় অ্যালবার্ট হল, অ্যালবাট ইনস্টিটিউট তারই প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা বিস্তার ও চিন্তায় আদান-প্রদানের কেন্দ্রস্বরূপ।

সর্ব শেষে তিনি বৈষ্ণব ধর্মের অঙ্গগুলি গানে পরিণত করেন। সহযোগী ছিলেন বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী। বিজ্ঞান চর্চাকে কেশবচন্দ্র যথোচিত গুরুত্ব দিতেন। এবং ধর্মকে বিজ্ঞানমুখী করতে চেয়েছিলেন। হিমালয় ভ্রমণকালে একপত্রে তিনি তার শিষ্য বা সমর্থকদের উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন-“ঈশ্বর বলিয়াছেন, বিজ্ঞান আমাদের ধর্ম হইবে। তোমরা সকলের উপর বিজ্ঞানকে সম্মান করিবে। বেদাপেক্ষা জড় বিজ্ঞানকে, বাইবেলাপেক্ষা আত্ম বিজ্ঞানকে সম্মান করিবে।..............নতুন ধর্ম বিশ্বাসে প্রতি বিষয় বৈজ্ঞানিক, কিছুই অবৈজ্ঞানিক নয়। নিগূঢ় রহস্য দ্বারা তোমাদের মনকে আচ্ছন্ন করিও না, স্বপ্ন বা কল্পনার আশ্রয় দিও না, কিন্তু পরিষ্কৃত দৃষ্টিতে এবং প্রশস্ত বিচারে সকল বিষয় প্রমাণিত কর।” (দ্রঃ কেশবচন্দ্র সেন রচিত ‘পত্রাবলী’ ২৩২-৩৩)

রাজনীতিকে কেশবচন্দ্র ধর্মের অঙ্গ হিসেবে মনে করতেন। সরাসরি রাজনীতি করা তাঁর কাজ ছিল না, ধর্মের সঙ্গে যতটুকু ছিল ততটুকুই। তার বেশি রাজনীতি নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতে চাইতেন না। উদ্দেশ্য কী ছিল তা আলোচনা না করলেও বলা যায় তিনি ইচ্ছা করলে বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা হয়ে নূতন পথের পাথেয় পরিবেশন করতে পারতেন। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির মতে, “তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করলে বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ হতে পারতেন।” (দ্রঃ A Nation in making, by Surendranath, p-131)