hadith book logo

শরয়ী ইলম সংক্রান্ত কিছু জরূরী জ্ঞাতব্য বিষয়

লেখকঃ আবু আব্দিল ইলাহ্ ছালেহ্ বিন মুক্ববিল আল্ উছায়মী আত্ তামীমী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪১

সাবেক আসমানী কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান -বিশ্বাস স্থাপনঃ [তাদের কিতাব গুলি দুই ভাগে বিভক্তঃ১-আল আহদুল ক্বাদীম-তথা পুরাতন যুগঃতারা-ইহুদীরা-দাবী করে থাকে যে এসব কিতাব ঈসার পূর্বে যারা নবী ছিলেন তাঁদের মাধ্যমে তাদের নিকট পৌঁছেছে। আর এই আহদে ক্বাদীম-তথা পুরাতন যুগ বলতে মূসা (আলাইহিস্ সালাম) এর পাঁচটি আসফার তথা ছহীফা গণ্য (সেগুলি হলঃ সিফরুত্ তাকভীন, সিফরুল খুরূজ, সিফরুল আদাদ, সিফরুল্ লাদিইয়ীন, সিফরুত্ তাছনিয়াহ্) এই পাঁচটি কিতাবের সমষ্টির নাম হল ‘তাওরাত’।২-আল্ আহদুল জাদীদ-তথা নতুন যুগঃ খৃষ্টানরা -দাবী করে থাকে এই কিতাব গুলি ইলহাম দ্বারা ‘মাসীহ ঈসা’ এর আকাশে উত্তোলনের পর তার রাসূল-তথা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে লেখা হয়। আর এটা চারটি ইঞ্জিলকে শামিল করে থাকে (ইঞ্জিল গুলি হলঃ ইঞ্জিলে মাত্তা, ইঞ্জিলে লোক্বা, ইঞ্জিলে ইউহান্না, ইঞ্জিলে মরকোস)। ইঞ্জিলের অর্থ হলঃ সুসংবাদ দেওয়া, শিক্ষা দেওয়া। এই চারটি ইঞ্জিল গীর্জা -তথা গীর্জার নেতৃস্থানীয়গণ সেকালীন উপস্থিত ৭০ টি ইঞ্জিলের মধ্য থেকে চয়ন করেছে। ইহা ছিল ঈসা আলাইহিস্ সালামকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়ার অনেক অনেক দিন পরের ঘটনা। এই দুই আহদের কোন একটি সিফর-তথা কিতাবের অবিচ্ছিন্ন সূত্র পাওয়া যায় না।এসব কিতাবাদির বিধানঃ১-কুরআন কারীম ইহুদ ও খৃষ্টানদের কিতাব বিকৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছে। এবং এই মর্মে ইঙ্গিত দিয়েছে যে তাদের কিতাবে উল্লেখিত হওয়া অনেক বিষয়কে তারা গোপন করে দিয়েছে। তদ্রূপ এ দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তাদের মধ্য হতে কিছু লোক নিজে কিতাব লিখে মহান আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করত (বলতঃ ইহা আল্লাহর পক্ষ থেকে)। অনুরূপভাবে তাদের মধ্য থেকে আরও কিছু লোক এমন রয়েছে, যাদেরকে যা দ্বারা ওয়ায-উপদেশ দেওয়া হয়েছে তার বিশেষ একটি অংশ (দুনিয়ার মোহে পড়ে) ভুলে গেছে।এসব কিতাবাদির বাস্তব অবস্থা এই মর্মে সাক্ষ্য দেয় যে, এই কিতাবগুলো বিকৃত করা হয়েছে। আমরা তাদের ‘আহদে ক্বাদীম’ ও ‘আহদে জাদীদ’ তথা পুরাতন ও নতুন যুগের কিতাবাদির বিকৃতির কিছু উদাহরণ পেশ করবঃক) তাদের কিতাব সমূহে মতবিরোধ ও ভুল-ভ্রান্তি বিদ্যমান থাকাঃ যেমন উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে সিফরুত্ তাকবীনের এ স্থানে এসেছে যে আল্লাহ্ নূহ (আলাইহিস্ সালাম) কে তাঁর নৌকায় প্রত্যেক জোড়া থেকে দুটি করে নিতে বলেছেন। অথচ আরেক স্থানে এসেছেঃ ‘তুমি তোমার সাথে সাতজন সাত জন করে নেবে’!খ) ঐসব কিতাবাদির মধ্যে এমন এমন গুণ দ্বারা আল্লাহকে গুনাম্বিত করা যার তাঁর শানে মোটেও প্রযোজ্য নয়ঃযেমনঃ (তাদের এসব কিতাবে পাওয়া যায়) ‘আল্লাহ্ আসমান-কে ছয় দিনে সৃষ্টি করার পর ষষ্ঠ দিনের দিন আরাম (বিরতি) করে ছিলেন’ যেমন উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ‘আদম কে ভালমন্দ পরিচয় এর বৃক্ষ থেকে খেতে নিষেধ করা হয়েছিল যাতে তিনি মৃত্যু বরণ না করেন। এবং তিনি তা ভক্ষণ করার পর লুকিয়ে গিয়ে ছিলেন ফলে আল্লাহ্ তাকে ডাকতে শুরূ করে ছিলেনঃ কোথায় তুমি?গ- তাদের পক্ষ থেকে নবীদের প্রতি দোষারোপ তথা -কালিমা লেপন করাঃযেমন (এসব বাজে কথা বলা যে) লূত (আলাইহিস্ সালাম) এর দুই মেয়ে তাদের পিতার সাথে শয়ন করার সুযোগ গ্রহণ উপলক্ষে তাকে মদ্য পান করিয়ে ছিলেন।’-হারূন (আলাইহিস্ সালাম) ই নাকি ঐবাছুরটি তৈরী করে ছিলেন।-সুলাইমান (আলাইহিস্ সালাম) নাকি তাঁর জীবনের সমাপ্তি করে ছিলেন মূর্তি পূজার মাধ্যমে।তাদের আহদে জাদীদ তথা নতুন যুগের কিতাবাদির বিকৃতিঃ-চারটি ইঞ্জিলের উপস্থিতি অথচ ঈসা (আলাইহিস্ সালাম) এর উপর নাযিল কৃত ইঞ্জিল হল মাত্র একটি।-৭০টি ইঞ্জিলের মধ্য হতে চারটি ইঞ্জিল চয়ন করা। অথচ এসব ইঞ্জিল মাসীহ (আলাইহিস্ সালাম) লিখে যাননি। এবং এমর্মে তাকে অহিও করা হয়নি। বরং এসবকটি ইঞ্জিলই ঈসা (আলাইহিস্ সালাম) এর পরবর্তীতে লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু কথা পাওয়া যায় যার মিথ্যা ও বিকৃত হওয়ার বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কারণ তা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন মাসীহ (আঃ) কে শূলে চড়ানো ও তাঁর মৃত্যু বরণ করার বিষয়টি (এটি সম্পূর্ণরূপে কুরআন বিরোধী। আল কুরআনে ঈসা এর শূলে চড়ানো এবং মৃত্যু বরণ করার বিষয়টি কঠিনভাবে নাকচ করা হয়েছে )।-তাদের কিতাবাদি ইতিহাস বিকৃতি,সংযোজন,বিয়োজন প্রভৃতি দ্বারা ভরপুর। এগুলো সবই তাদের হাতের কারসাজি। এভাবেই মাসীহ (আলাইহিস্ সালাম) এর রেখে যাওয়া ধর্ম আজ দার্শনিক ও মূর্তি পূজারীদের ধর্মের সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে। তারা জাতিকে মূর্তি পূজা থেকে ফটো পূজার দিকে স্থানান্তরিত করেছে। এরপর হালাল করে নিয়েছে শুকর ভক্ষণ করা, শনিবারকেও তারা হালাল করে নিয়েছে। আর খৃষ্টীয় বড় বড় প্রতিষ্ঠান খৃষ্টানদের ধর্ম নিয়ে খেল-তামাশায় মত্ত হয়েছে। যেমনঃ তাদের পক্ষ থেকে ঈসা (আলাইহিস্ সালাম) কে ইলাহ-উপাস্য সাব্যস্ত করণ, এবং তাদের মতের বিরোধী অন্যান্য কিতাবাদি পুড়িয়ে ফেলা স্ববিশেষ উল্লেখ যোগ্য।-তাদের কিতবাদিতে নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আবির্ভাবের সুসংবাদের উপস্থিতি। যেমনঃ(أقيم لهم نبياً من وسط إخوتهم مثلك)‘আমি তাঁদের জন্য নবী দাঁড় করব তাদের ভাইদের মধ্য হতেই তোমার ন্যায়’-প্রতিপালক সায়না পর্বত থেকে এসেছেন, সাঈর থেকে আমাদের জন্য দৃষ্ট হয়েছেন, আর ফারান এর পর্বত থেকে উপরে উঠেছেন।’ ফারানঃ অর্থ মক্কা। এ বিষয়ে আরো অধিক জানার জন্য দেখুনঃ ইবনু তায়মিয়াহ্ প্রণীত ‘মাজমূল ফাতাওয়া’১৩/১০৪,(হাফেয ইবনু হাজার প্রণীত) ‘ফাতহুলবারী’ ১৩/৫২২, ইবনু হাযাম প্রণীত ‘আল্ ফিছাল’ ১/২০১,২/২৭, এবং ইবনু তায়মিয়া প্রণীত ‘আল্ জাওয়াবুছ্ ছহীহ লিমান্ বাদ্দালা দ্বীনাল মাসীহ্২/৩৯৭,৪২০,৩/৯)।]

১-এসব কিতাবাদির সংজ্ঞাঃ

এগুলি হল ঐসব কিতাব যা আল্লাহ্ তদীয় রাসূলদের উপর নাযিল করেছেন এই সৃষ্টিকূলের প্রতি দয়া স্বরূপ এবং তাদের হেদায়াত দানের উদ্দেশ্যে। এই সমস্ত কিতাবেরই অন্তভুর্ক্ত হল যা আল্লাহর রাসূল মূসা, ঈসা, দাঊদ, ইবরাহীম-আলাইহিমুস্ সালাম-প্রমুখের উপর নাযিল করা হয়েছে। কিতাব গুলি হলঃ ১-তাওরাত (যা মূসা নবীর উপর নাযিল হয়েছে) ২-ইঞ্জিল (যা ঈসা নবীর উপর নাযিল হয়েছে, ৩-যাবূর (যা দাঊদ নবীর উপর নাযিল হয়েছে) এবং ‘ছুহুফ্’-ছহীফা (যা ইবরাহীম আলাইহিমু্স্ সালাম এর উপর নাযিল হয়েছে)

২-এসব আসমানী কিতাবাদির উপর ঈমান আনার বিধানঃ

এগুলি কিতাবের উপর ঈমান-বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অন্যতম রুকন। ইহা ব্যতীত কোন মানুষের ঈমান বিশুদ্ধ হবে না।

অতএব,অবশ্যই এই মর্মে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতেই হবে যে মহান আল্লাহ্ কিছু কিতাব নাযিল করেছেন তাঁর রাসূলদের নিকটে সুস্পষ্ট হক সহকারে এবং সুউজ্জল আদর্শের সাথে। এবং আরও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, উহা মহান আল্লাহর বাণী সেটাই যা তিনি বাস্তবেই বলেছেন। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ

( قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى ...)[ البقرة :১৩৬]

তোমরা বল,আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা নাযিল হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা নাযিল হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক্ব, ইয়াকূব এবং তদীয় বংশধরদের প্রতি এবং মূসা ও ঈসাকে যা দান করা হয়েছে... তৎসমূদয়ের উপর (আল্ বাক্বারাহঃ১৩৬)

মহান আল্লাহ্ আরো বলেনঃ

( وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلائِكَةِ )[ البقرة :১৭৭]

বরং বড় সৎ কাজ হল, যে ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, শেষ দিবসের উপর এবং ফেরেশতাদের উপর। (সূরা আল্ বাক্বারাহঃ ১৭৭)

৩-মুসলিম ব্যক্তি উপর ওয়াজিব হল এই বিশ্বাস করা যে এই কিতাবগুলো মানসূখ তথা রহিত হয়ে গেছে।

কারণ, মহান বলেনঃ

( وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقاً لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِناً عَلَيْهِ )[ المائدة :৪৮].

আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয় বস্ত্তর রক্ষণাবেক্ষণকারী। (সূরা আল্ মায়িদাহ্ঃ ৪৮)

অর্থঃ এই কিতাব পূর্বের সকল আসমানী কিতাবসমূহের উপর ফায়ছালাদানকরী। তার উচিত এই বিশ্বাস করা যে, বিদ্যমান পূর্বের আসমানী কিতাবগুলো বিকৃত, পরিবর্তিত হয়েছে। এবং এসব কিতাবের অনুসারীগণ তথা ইহুদী ও খৃষ্টানগণ এই কিতাবগুলির বিনিময়ে অল্প-তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে এগুলোর মৌলিকত্ব নষ্ট করে ফেলেছে। সুতরাং তারা কতই না মন্দ বিষয় খরিদ করেছে! এসব কিতাবের মাঝে বিকৃতি ঘটার নিদর্শন ও প্রমাণ অসংখ্য। তার থেকে নিম্নে কিছু পরিবেশিত হলঃ

১-এই সমস্ত কিতাবাদিতে এমন এমন বিষয় সন্নিবেশিত আছে যা দ্বারা না আল্লাহ্ না তাঁর নবী, না তাঁর অলীগণকে গুনাম্বিত করা জায়েয।

২-এসব কিতাবাদিও সনদ বিচ্ছিন্ন-কর্তিত বরং এগুলোর সনদই নেই।

৩-এগুলো কিতাব অনুবাদক, ঐতিহাসিক ও তাফসীরকারকদের কথার সাথে সংমিশ্রিত হয়ে গেছে।

৪-এসব কিতাবাদির সংবাদ ও বিধি-বিধান প্রভৃতি প্রকাশ্যভাবে স্ববিরোধী যা দ্বারা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এগুলো কিতাব বর্তমান অবস্থায়-আল্লাহর পক্ষ থেকে (নাযিলকৃত) নয়। আর তাদের কিতাবে যা সত্যের অনুকূল এবং বিকৃতি ঘটানো থেকে নিরাপদ রয়েছে সেটিও মহান কুরআন দ্বারা মানসূখ-রহিত হয়ে গেছে।