hadith book logo

শরয়ী ইলম সংক্রান্ত কিছু জরূরী জ্ঞাতব্য বিষয়

লেখকঃ আবু আব্দিল ইলাহ্ ছালেহ্ বিন মুক্ববিল আল্ উছায়মী আত্ তামীমী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৪

ইলমে তাফসীরের ব্যুৎপত্তির ইতিহাসঃ

১-নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় লোক জন ছিল খাঁটি আরবী। তাঁরা কুরআন বুঝতে পারতেন নিজ ভাষাগত যোগ্যতা বলে। তবে কুরআন তাঁর শব্দ, ভাষাগত ও অলংকারগত দিক থেকে অন্যান্ন সকল আরবী ভাষার উর্ধ্বে, আর অর্থগত দিক থেকে তো উর্ধ্বে আছেই। এজন্যই এই কুরআন বুঝার ও আয়ত্ব করার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে (যথেষ্ট) তফাৎ ছিল।

এজন্যই তাদের একজন অপরজনের নিকট আল্ কুরআন থেকে যা দুর্বোধ্য হত তা তাকে ব্যাখ্যা করে বলে দিতেন। তাদের নিকট এর কোন শব্দ বা অর্থ বুঝতে জটিলতা দেখা দিলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করতেন এবং তিনিও তাদেরকে তা ব্যাখ্যা করে বলতেন। কতিপয় আলেম বলেন-যাঁদের অন্যতম হলেন শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ্ [মুক্বাদ্দিমা ফী উছূলিত্ তাফসীর,পৃঃ২১, আমাদের শাইখ মুহাম্মাদ আল্ উছায়মীন উক্ত মুক্বদ্দিমার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে যেয়ে এই অভিমতটিকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। এই মর্মে তিনি মহান আল্লাহর এই বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন-( ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ ) [ القيامة :19]অতঃপর আমার দায়িত্ব হল ইহা বর্ণনা করে দেওয়া-তথা তাফসীর করে দেওয়া (আল্ ক্বিয়ামাহঃ ১৯ ) -শারহুল মুক্বাদ্দিমাহ্,পৃঃ২১)। অবশ্য এ মাসআলায় আলেমদের মাঝে মতবিরোধ আছে যার এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা দেওয়ার অবকাশ নেই। আর আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞানী।]- ইহা জানা আবশ্যক যে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ছাহাবীদের জন্য কুরআনের অর্থ যেমন খুলে বলেছেন তদ্রূপ তার শব্দগুলিও তিনি খুলে বলেছেন। দলীল মহান আল্লাহর বাণীঃ

( لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ )[ النحل :৪৪]

(আপনার নিকটে আমি কুরআন নাযিল করেছি)। যাতে করে তাদের নিকট যা নাযিল হয়েছে তা আপনি তাদেরকে ব্যাখ্যা করে শুনিয়ে দেন। (সূরা আন্ নাহল :৪৪)

২-ছাহাবায়ে কেরামের যুগে তাফসীরঃ

আল্লাহর নবীর যামানার চেয়ে ব্যক্তিক্রম ছিল না কারণ, তারা নবুওয়াতের নিকটবর্তী যুগে ছিলেন। এবং বড় বড় ছাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁদের আলেম গোষ্ঠি উপস্থিত ছিলেন। এজন্যই তাদের তাফসীর এ বিষয়ে অনন্য যে, তাতে ইসরাঈলী বর্ণনা খুবই কম গৃহীত হয়েছে। কারণ তারা তাফসীর বিষয়ে অযথা পরিশ্রম করতেন না। এক্ষেত্রে তাঁরা নিন্দনীয় গভীরতায় যেতেন না। বরং সাধারণ অর্থ দ্বারাই যথেষ্ট মনে করতেন। যার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বড় কোন উপকারিতা নেই সেক্ষেত্র তারা বিস্তারিত ব্যাখ্যাকে অবধারিত করতেন না। এতদসত্ত্বেও তাঁরাই ছিলেন কুরআনের তাফসীর ও তার অর্থ অনুধাবনের বিষয় সর্বাধিক জ্ঞানী মানুষ। আর এ বিষয়ে এত টুকুই যথেষ্ট যে তাঁরা কুরআন নাযিলকরণ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং একই যুগে বাস করেছেন।

৩-তাবেঈনদের যুগে তাফসীরঃ

তাবেঈগণ তাঁদের তাফসীর ছাহাবায়ে কেরাম থেকে গ্রহণ করেছেন। এতদসত্ত্বেও তাঁরা তাফসীর করতে অসুবিধা বোধ করতেন যেভাবে ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) অসুবিধা বোধ করতেন। যেমনঃ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহিমাহুল্লাহ্) তাঁকে কোন আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে চুপ করে থাকতেন যেন তিনি কিছুই শুনেননি। এজন্যই তাদের তাফসীর শুধুমাত্র উদ্ধৃত তাফসীরেই সীমিত থেকেছে।

৪-লিপিবদ্ধ করণ যুগে তাফসীরঃ

এই যুগে তাফসীর বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করেছে। যদিও অধিকাংশ ওলামায়েদ্বীন হাদীছের অধ্যায়ে এই তাফসীর সন্নিবেশিত করতেন। ঐসময় পরিবর্তন ও এলমেলো ভাব প্রকাশ পায় যখন কিছু মুফাস্সির কিছু সনদকে সংক্ষিপ্ত করে এবং সালাফদের থেকে বর্ণিত আছারগুলিকে তাদের মতের দিকে সম্পর্কিত না করেই উদ্ধৃত করার দিকে ধাবিত হন যার ফলে তাঁরা বিশুদ্ধ বর্ণনাকে যঈফ-অশুদ্ধ বর্ণনার সাথে সংমিশ্রিত করে ফেলে। এই ছিদ্র দিয়ে ধর্মের দুশমন, বেদ্বীন ও সঠিক ধর্মচ্যুত ব্যক্তিরা প্রবেশ করে যাতে করে এমন সব কথা তৈরী করে দেয় যা ছহীহ নয়। অবশ্য আল্লাহ্ এমন সকল ওলামা প্রস্ত্তত করে দেন যারা হক উম্মোচন করে দেন ও তা প্রকাশ করে দেন এবং যা বাতিল তা মানুষকে জানিয়ে দেন এবং তার খন্ডন করেন। এই স্তরের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রশংসিত ও অপ্রশংসিত উভয় প্রকার মত দ্বারা তাফসীর প্রকাশ লাভ করে। অনুরূপভাবে কুরআনে আল্লাহর উপর বিনা ইলমে কথা বলার দুঃসাহসিকতা প্রকাশ করে এবং একই আয়াতের তাফসীরে বিভিন্ন রকম উক্তি প্রকাশ পায়। ইসরাঈলী বর্ণনা ব্যাপক আকারে প্রকাশ পায়। তবে আল্লাহর প্রশংসা যে, ইসলামের ইমামদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক ইলমে তাফসীরের গবেষক ব্যক্তি পাওয়া যায়, যাঁরা এই সমস্ত বর্ণনা ও কথাগুলির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নিধারণ করেন কোন্টি কথা বা বর্ণনা গ্রহণীয় এবং কোন্টি বর্জনীয়।