hadith book logo

কিতাবুন নিসা

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

ইসলামের সঠিক আকীদাসমূহ

১. একজন মুসলিম নারীর আকীদা হবে, মহান আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, জীবন দানকারী ও জীবন গ্রহণকারী, পুনরুত্থানকারী, সমসত্ম ভালো ও ক্ষতি করার অধিকারী। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ আমরা মানি না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَا شَرِيْكَ لَهٗۚ وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ﴾

তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি; আর আমিই প্রথম মুসলিম। (সূরা আন‘আম- ১৬৩)

তিনি মহিমান্বিত এবং সুউচচ, তাঁর কোন সাদৃশ্য, পুত্র, অংশীদার বা প্রতিযোগী নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلْ هُوَ اللهُ اَحَدٌ ‐ اَللهُ الصَّمَدُ ‐ - لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ ‐ وَلَمْ يَكُنْ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ﴾

বলো, তিনি আল্লাহ একক। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর থেকে কেউ জন্ম নেয়নি এবং তিনিও কারো থেকে জন্মগ্রহণ করেননি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা ইখলাস)

২. মহান আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কোন কিছুই তাঁর সাথে তুলনীয় নয়। তিনি তাঁর সৃষ্টির কোন কিছুর মতো নন। তিনি অনাদিকাল থেকে অনমত্মকাল বিদ্যমান রয়েছেন। তিনি তাঁর গুণাবলি ও নামসমূহ সহ অনমত্মরূপে বিদ্যমান। তাঁর নাম ও বিশেষণের মধ্যে কোন নতুনত্ব বা পরিবর্তন ঘটেনি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَيْسَ كَمِثْلِهٖ شَيْءٌۚ وَّهُوَ السَّمِيْعُ الْبَصِيْرُ﴾

কোনকিছুই তাঁর সাদৃশ্য নয়, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। (সূরা শূরা- ১১)

৩. মহান আল্লাহর সকল বিশেষণই মাখলুক তথা সৃষ্ট প্রাণীদের বিশেষণের বিপরীত বা ব্যতিক্রম। তিনি জানেন তবে তাঁর জানা আমাদের মতো নয়। তিনি ক্ষমতা রাখেন তবে তাঁর ক্ষমতা আমাদের ক্ষমতার মতো নয়। তিনি দেখেন তবে তাঁর দেখা আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি কথা বলেন তবে তাঁর কথা আমাদের কথার মতো নয়। তিনি শুনেন তবে তাঁর শোনা আমাদের শোনার মতো নয়।

৪. একমাত্র মহান আল্লাহই ইবাদাতের যোগ্য, ভয়, আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণ, সাহায্য ও আরোগ্য, অনুরোধ, নির্ভরতা, উৎসর্গ, সিজদা ও ইবাদাতের অন্যান্য সকল উপায় তাঁর কাছেই সমর্পণ করতে হবে।

৫. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য সিজদা করা যাবে না। যে কেউই এর কোন একটি কাজ সম্পাদন করে, সে শিরকে লিপ্ত হয়।

৬. আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহকে শরীক করা যাবে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন বিধানের কাছে বিচার চাওয়া যাবে না। কারণ আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা, সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই এবং তিনিই বিচার করেন, আদেশ দেন, নিষেধ করেন, রায় দেন এবং আইন প্রণয়ন করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী এবং সর্বজামত্মা। যে কেউই আল্লাহর আইনের উপর আইন প্রণয়ন করে এবং তাঁর আইন অন্য কারো আইন দ্বারা পরিবর্তন করে সে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যায়।

৭. আল্লাহর ঐ সমসত্ম গুণাবলি সমর্থন করতে হবে যা তিনি তাঁর নিজের জন্য ঘোষণা করেছেন এবং মুহাম্মাদ ﷺ স্বীকার করেছেন, যেমন- আল্লাহর হাত আছে, মুখমন্ডল আছে, সত্তা আছে ইত্যাদি। এ কথা বলা যাবে না যে, তাঁর হাত অর্থ ক্ষমতা বা নিয়ামত। এরূপ ব্যাখ্যা করার অর্থ আল্লাহর সিফাত বা বিশেষণ বাতিল করে দেয়া।

৮. এ বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহ আরশের উপর সমাসীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿اَلرَّحْمٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوٰى﴾

দয়াময় (আল্লাহ) আরশের উপর সমাসীন। (সূরা ত্বা-হা- ৫)

সমাসীন হওয়ার বিষয়টি জানা; কিন্তু এর পদ্ধতি বা স্বরূপ অজানা। আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বাড়াবাড়ি এবং বিশ্বাস করা জরুরি।

৯. তাকদীরের ভালো-মন্দ উভয়ই আল্লাহ কর্তৃক গৃহীত হয়। পৃথিবীতে সমসত্ম কিছুই তাঁর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হবে এবং যা ইচ্ছা করেন না তা হবে না এবং আল্লাহ তার বান্দার প্রতি কখনো অন্যায় করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ বিন্দুমাত্রও অত্যাচার করেন না। (সূরা নিসা- ৪০)

১০. আল্লাহ তাই করেন তিনি যা ইচ্ছা করেন এবং যখন যেভাবে ইচ্ছা করেন। কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি আনন্দিত হন, হাসেন, ভালোবাসেন, ঘৃণা করেন, সমর্থন জ্ঞাপন করেন এবং ক্রোধান্বিত হন। তাঁর কর্মে তিনি তাঁর কোন সৃষ্টির সদৃশ নন এবং কীভাবে এসব কর্ম সম্পাদিত হয় তা সকল মাখলুকের অজানা।

১১. ফেরেশতা, নবী এবং রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। রাসূলদের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং ঈমান আনয়নের ক্ষেত্রে রাসূলদের মধ্যে কোন পার্থক্য করা যাবে না।

১২. এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা এবং সর্বশেষ নবী। তিনি আলিমুল গায়েব তথা অদৃশ্যের জ্ঞাতা নন, আল্লাহর নূরের তৈরি নন, অতিমানব বা আল্লাহর কোন অংশও নন। তিনি একজন সাধারণ মানুষ। তবে তার প্রতি অহী নাযিল করা হতো। তাকে সজাগ অবস্থায় এবং স্বশরীরে মক্কার হারাম হতে মসজিদে আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং যতটা উঁচুতে আল্লাহ ইচ্ছা করেছেন ততটা উপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

১৩. কিয়ামতের আলামত বিশ্বাস করতে হবে। দাজ্জাল (মিথ্যা মসীহ) এর আবির্ভাব, চতুর্থ আসমান হতে ঈসা (আঃ) এর অবতরণ, পশ্চিম দিকে সূর্যোদয়, জমিন হতে অদ্ভুত জমত্মুর আবির্ভাব এবং কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য আলামতের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।

১৪. এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কবরে দুই ফেরেশতা মুনকার এবং নাকীর কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। প্রত্যেককে তার রব, তার দ্বীন এবং তার নবী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

১৫. মৃত্যুর পর কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট পুনরুত্থানে বিশ্বাস রাখতে হবে। শেষ বিচারের দিন, আমলনামা পাঠ, মানদন্ড (যার উপর আমল পরিমাপ করা হবে), সীরাত (জাহান্নামের আগুনের উপর স্থাপিত পুল) এবং শাসিত্ম ও পুরস্কারে বিশ্বাস রাখতে হবে।

১৬. কবরের আযাবে বিশ্বাস রাখতে হবে। কবর হয় জান্নাতের একটি সবুজ বাগানস্বরূপ নতুবা জাহান্নামের আগুনের একটি গর্তস্বরূপ এবং প্রতিটি বান্দা তাই পায় সে যার উপযুক্ত।

১৭. হাউযে কাওসারে বিশ্বাস রাখতে হবে, যা আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সম্মানস্বরূপ কিয়ামতের দিন প্রদান করবেন, যাতে করে তার উম্মতগণ পিপাসা মিটাতে পারে।

১৮. এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ই সত্য। সকল জান্নাতবাসী কোন প্রকার পরিবেষ্টন ছাড়া খালি চোখেই তাদের রবের সরাসরি সাক্ষাৎ লাভ করবে। সেদিন কোন কোন মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

১৯. এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তার বান্দাদের অবাধ্য হতে আদেশ দেন না এবং তিনি এরকম ব্যক্তিদের উপর সমত্মুষ্ট নন। তিনি তার বান্দাদের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না।

২০. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবীদেরকে ভালোবাসতে হবে। তারা সকল উম্মতের শ্রেষ্ঠ উম্মত। তাদের প্রতি ভালোবাসা রাখা ঈমানের অংশ। তাদেরকে ঘৃণা করা মুনাফিক এবং অবিশ্বাসীদের কাজ।

২১. আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-কে প্রথম খলীফা হিসেবে সমর্থন করতে হবে। তারপর উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ), তারপর উসমান বিন আফফান (রাঃ), তারপর আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)-কেও সমর্থন করতে হবে। তারা হলেন সত্যের অনুসারী খলীফা এবং ন্যায়পরায়ণ নেতৃবৃন্দ যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমাদেরকে অবশ্যই আমার সুন্নাতের এবং সত্যের অনুসারী খলীফাগণের সুন্নাতের অনুসরণ করতে হবে, এটি শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে। [আবু দাউদ, হা/৪৬০৭; তিরমিযী, হা/২৬৭৬; ইবনে মাজাহ, হা/৪২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৮৪; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৫; মুসনাদুল বাযযার, হা/৪২০১; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৫০২১; মুসত্মাদরাকে হাকেম, হা/৩২৯; সুনানে দারেমী, হা/৯৫; শারহুস সুন্নাহ, হা/১০২; মিশকাত, হা/১৬৫।]