hadith book logo

কিতাবুন নিসা

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩১

সন্তান জন্মের পর করণীয়

১. নবজাতক সন্তানের ডান কানে আযান দেয়া, যাতে সে প্রথমেই তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের কথা শুনতে পায়।

২. সুন্দর নাম রাখা এবং খারাপ অর্থ বহন করে এমন নাম দ্বারা নামকরণ না করা অথবা কাফিরদের নামে নাম না রাখা অথবা শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নামে নামকরণ করা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা।

৩. শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখা এবং মাথার চুল মুন্ডন করা।

৪. মাথার চুলের ওজন পরিমাণ রৌপ্য দ্বারা সাদাকা করা।

৫. সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে আকীকা করা। আর তা হলো, ছেলের পক্ষ থেকে দুটি এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল যবেহ করবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, প্রত্যেক নবজাতক সন্তান স্বীয় আকীকার সাথে আবদ্ধ। তার পক্ষ হতে তা তার জন্মের সপ্তম দিনে যবেহ করতে হবে। সেদিন তার নাম রাখতে হবে এবং তার মাথা মুন্ডন করতে হবে। [তিরমিযী, হা/১৫২২; আবু দাউদ, হা/২৮৩৯; নাসাঈ, হা/৪৫৪৬; ইবনে মাজাহ, হা/৩১৬৫।]

৬. সমত্মান বড় হলে শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া। কেননা শিষ্টাচারই হচ্ছে মানুষের মূল সৌন্দর্য। তাওহীদ তথা একত্ববাদের ভিত্তিতে কথা বলার উপর তাকে অভ্যস্ত করানো এবং তার মনে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বিষয়াদির বীজ বপন করা। বিশেষ করে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যেই তা করতে হবে। গবেষকদের কেউ কেউ উল্লেখ করেন যে, শিশু তার প্রথম বছরগুলোতেই তার পূর্বপুরুষদের অধিকাংশ চিন্তাচেতনার আলোকে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। কারণ ৯০% শিক্ষা বিষয়ক কার্যক্রম তার প্রথম বছরগুলোতেই সম্পন্ন হয়। সুতরাং গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এ সময়কালকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।

৭. সমত্মানকে ভালো কথা বলার অভ্যাসে অভ্যস্ত করানো। যেমন - اَحْسَنْتَ (তুমি সুন্দর করেছ), شُكْرًا (ধন্যবাদ), جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا (আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন) ইত্যাদি।

৮. তাকে গুরুত্বপূর্ণ দু‘আসমূহ শিক্ষাদান করা। যেমন- ঘুমানোর দু‘আ, খাওয়ার আগে ও পরের দু‘আ, ঘর থেকে বের হওয়ার দু‘আ, প্রস্রাব-পায়খানায় প্রবেশ ও বের হওয়ার দু‘আ, শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার দু‘আ, হেদায়াত পাওয়ার দু‘আ, ইলম বৃদ্ধি করার দু‘আ, জান্নাত লাভের দু‘আ এবং জা‎হান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করার দু‘আ ইত্যাদি।

৯. শিশুর মনে আল্লাহর ভালোবাসার বীজ বপন করা।

১০. তার মনে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও তাঁর ভয়ের অপরিহার্যতার বীজ বপন করা।

১১. তার মনে মানুষের উপর আল্লাহর নজরদারী ও খবরদারীর বীজ বপন করা।

১২. শিশুদেরকে আল্লাহর আশ্রয়ে দেয়া, যেমনটি রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইন (রাঃ) এর ব্যাপারে করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের ওসীলায় প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টিসম্পন্ন চোখ থেকে নিরাপদ আশ্রয় চাচ্ছি। [সহীহ বুখারী, হা/৩৩৭১; আবু দাউদ, হা/৪৭৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/৩৫২৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১১২; মুসনাদুল বাযযার, হা/১৪৮৩; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৭৬৭৯; মুসত্মাদরাকে হাকেম, হা/৪৭৮১; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৭৮৪১; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৯৮৭; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৩০১১১; মিশকাত, হা/১৫৩৫।]

১৩. তাকে শুরুতে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব মুখস্থ করাবে এবং তাকে তা শোনাবে। আর অনুরূপভাবে সুন্নাতে নববী তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদীস থেকেও কিছু হাদীস মুখস্থ করাবে। বিশেষ করে ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ হাদীসসমূহ।

১৪. শিশুদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিচ্ছা-কাহিনীসমূহ আলোচনা করবে। বিশেষ করে সীরাতে নববী তথা নবী ﷺ এর জীবনী থেকে ঐ পর্যায়ের বিষয়গুলো আলোচনা করবে, যা তার বয়সের সত্মরের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ ঐ কাহিনীসমূহ তার মধ্যে বড় ধরনের শিক্ষামূলক প্রভাব ফেলবে এবং তার মনে উন্নত ও শক্তিশালী চরিত্রের বীজ বপন করবে। আর সে প্রত্যাশা করবে, সে যেন ঐসব ব্যক্তিবর্গের মতো হতে পারে, যাদের কাহিনী সে শ্রবণ করেছে।

১৫. ছোটকাল থেকেই শিশুদের মধ্যে উন্নতমানের ইচ্ছা বা আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলা। যেমন- সে মনে মনে পরিকল্পনা স্থির করবে যে, সে অমুকের মতো আলেম হবে অথবা অমুকের মতো মানবসেবা করবে ইত্যাদি।

১৬. আল্লাহ তা‘আলা শিশুদেরকে যে মেধা দিয়েছেন তা বিকাশের জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

১৭. সাত বছর বয়সের সময় শিশুর সাথে আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নতুন আরেক ধাপের সূচনা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা নামাযের নির্দেশ দাও- যখন তারা সাত বছর বয়সে উপনীত হয় এবং সেজন্য তাদেরকে প্রহার করো। আর যখন তারা দশ বছর বয়সে উপনীত হয়, তখন তাদের শোয়ার স্থান পৃথক করে দাও। [মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৭৫৬; আবু দাউদ, হা/৪৯৫।]

১৮. শিশুকে নামাযের নির্দেশ প্রদান করা। কেননা এটিই হচ্ছে প্রধান ইবাদাত। সুতরাং একজন মা তার শিশুকে সর্বপ্রথম নামায পড়ার নির্দেশ প্রদান করার মাধ্যমে ইসলামী আইন প্রয়োগ করতে শুরু করবে। অতঃপর এ ব্যাপারে শিশুর গতিবিধি লক্ষ্য করবে। তারপর সে অনুযায়ী তাকে এর প্রতি আগ্রহ বাড়াতে থাকবে এবং উৎসাহ যোগাবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে তাকে নামায পড়াসহ অন্যান্য ইবাদাতেও অভ্যস্ত করে তুলবে।

১৯. দশ বছরে উপনীত হওয়ার পর বার বার নির্দেশ লঙ্ঘন করলে মৃদু প্রহার করা।