hadith book logo

তাকওয়া

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

আত্মার পরিশোধন (Purification of the Soul)

একাজ সহজ হবে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে অর্থ বুঝে, অর্থ হৃদয়ংগম করে আল্লাহর কুরআন ও তাঁর রসূলের হাদীস পাঠ করে নিজ জীবনে তার বাস্তবায়ন করলে। সূরা জুমু'আ (৬২), আয়াত ২-তে আল্লাহ মানুষকে জানিয়েছেন যে - আল্লাহ-ই উম্মী (অজ্ঞ)দের মাঝে তাদেরই মধ্যে থেকে একজন রসূল পাঠিয়েছেন যে তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ (অর্থাৎ কুরআন) পাঠ করে শোনায়, তাদের পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত, (wisdom/ বিচক্ষণতা/ভাল-মন্দ পার্থক্যের জ্ঞান)। ইতিপূর্বে এরাইতো ছিল ঘোর অন্ধকারে । রসূল (ﷺ) আজীবন একাজগুলোই করে গিয়েছেন, তাঁর অনুসারীদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। এসবই তো আল্লাহর ইবাদত। আত্মার পরিশোধন বা আত্মশুদ্ধি (self purification) অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে যেসব কাজ তাহলো

১) আল্লাহর স্মরণে বাধা সৃষ্টিকারী সব কাজ থেকে দূরে থাকা।

২) দৈহিক, জৈবিক আনন্দ লাভে নিষিদ্ধ কাজ ও বস্তু থেকে দূরে থাকা।

৩) সকল প্রকার অর্জিত সাফল্যই আল্লাহর দান বলে স্বীকার করা।

৪) আমি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই মনোভাব পরিত্যাগ করা।

৫) জীবনের সর্বকর্মে ও ব্যাপারে আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই প্রাধান্য দেয়া।

৬) আল্লাহর সৃষ্টিগুলোকে অধ্যয়ন করে নিজের ঈমানকে দৃঢ়তর করা।

৭) সদাসর্বদা মৃত্যুকে স্মরণে রাখা এবং মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত থাকা।

এই নফসে আম্মারাকে দমন করতে পারলেই তাকওয়া অবলম্বনের পথ পরিষ্কার হয়। তবে কাজটা বড় কঠিন, বহু সাধনার দরকার। এজন্যে দরকার লোভমোহ মুক্ত হয়ে অনাড়ম্বর জীবনযাপন। ধনসম্পদের আধিক্য মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ধবংস করে দেয়, দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করে, আখিরাতের কথা, এমনকি মৃত্যুর কথা পর্যন্ত ভুলিয়ে দেয় । অথচ কুরআন-হাদীসে আল্লাহ এবং তাঁর বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মুহাম্মাদ (ﷺ) বারবার মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, দুনিয়ার জীবন নয় আখিরাতের জীবনই উৎকৃষ্ট এবং চিরস্থায়ী। সেই জীবন লাভের জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করাই উত্তম চেষ্টা ।

মনে রাখা দরকার যে তাকওয়া হচ্ছে জান্নাতের জীবনদায়িনী পানীয়; যে তার উৎসের সন্ধান পেয়েছে সে কতইনা ভাগ্যবান!

তাকওয়ার নিদর্শনসমূহ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই নিজের সম্পর্কে অবগত হতে সক্ষম যে, সে তাকওয়াশীল বা আল্লাহভীরু, না-কি তাকওয়াহীন ও এ বিষয়ে উদাসীন-শৈথিল্যপরায়ণ। অনুরূপভাবে অন্যদের পক্ষেও কতিপয় আলামত দেখে এ বিষয়টি জানা সহজ হয়। এখানে সেধরণের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো : মুখের কাজ ও মানুষের মুখের কথাবার্তা ও ভাষায় বোঝা যায় যে, সে তাকওয়াশীল কি-না। কেননা তাকওয়া মানুষকে মিথ্যা কথা, গীবত বা দোষচর্চা, অপবাদ, চোগলখুরী এবং অশ্লীল ও অনর্থক কথাবার্তা বলা থেকে বিরত রাখে । পক্ষান্তরে জিহ্বাকে সর্বদা আল্লাহর যিকর, কুরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনী জ্ঞান চর্চায় লিপ্ত রাখে । অন্তরের কাজ ও তাকওয়াশীল মানুষ অন্তরের কর্মকাণ্ডকে ভয় করে। ফলে তার হৃদয় থেকে শত্রতা, রোধ ও অন্য মুসলিম ভাইয়ের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ দূরীভূত হয়। সেখানে জায়গা করে নেয় মুসলিম ভাইয়ের প্রতি নছীহত ও সদুপদেশ, তার প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা। অপ্রকাশ্য কর্মকাণ্ড ও তাকওয়াশীল মানুষ গোপনে বা লোকচক্ষুর অন্তরালেও উত্তম ও জনকল্যাণকর কাজ ব্যতীত নিন্দিত ও ঘৃণিত কাজ করতে ভয় পায় । অন্যের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি লক্ষ্য না করে নিজে পেট পুরে আহার করে। বরং সে পরিমিত আহার করে এবং প্রতিবেশী অভাবী-দুস্থদের প্রতি খেয়াল রাখে। চোখের কাজ ও চোখ নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকেই ধাবিত হয় । কিন্তু তাকওয়াশীল মানুষ স্বীয় দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে তার চোখকে হারাম থেকে ফিরিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। পক্ষান্তরে উপদেশ গ্রহণ, হালাল বা বৈধ এবং নেকী অর্জনের কাজে লিপ্ত রাখার চেষ্টা করে । তেমনি স্রেফ দুনিয়াবী কাজে নয়, বরং পরকালীন কাজে চোখকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করে। পায়ের কাজ ও পা মানুষকে ভাল-মন্দ সকল কাজে সংশ্লিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। তাকওয়াশীল মানুষ স্বীয় পাকে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপের কাজের দিকে নিয়ে যেতে ভয় করে । বরং সে নেকীর কাজের দিকে স্বীয় পাকে চালিত করতে সচেষ্ট হয় ।

হাতের কাজ ? হাত মানুষের সকল প্রকার ভাল-মন্দ কাজ সম্পাদন করার মাধ্যম। তাকওয়াশীল মানুষ তাই নিজের হাতের কাজকে ভয় করে। সুতরাং সে হারাম ও নিষিদ্ধ কাজের প্রতি স্বীয় হস্তদয়কে কখনও প্রসারিত করে না। বরং আল্লাহর নেকীর কাজের প্রতিই সে তার হাতকে প্রসারিত করে।

আল্লাহর নির্দেশ পালন ও তাকওয়াশীল মানুষ সর্বদা আল্লাহর আদেশনিষেধের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখে। সে নিজেকে সদা আল্লাহর আনুগত্যে নিরত রাখে এবং তাঁর নিষেধ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। লৌকিকতা, লোকদর্শন ও নিফাকী বা কুটিলতা বাদ দিয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ইবাদত করে ও তাঁর আনুগত্যপূর্ণ সকল কাজ সম্পাদন করে। এসব কাজ যারা সঠিকভাবে সম্পাদন করে, তারাই প্রকৃত মুত্তাকী ।