১
তাকওয়া
লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২১
কুরআনে তাকওয়া অবলম্বন করার জন্যেবারবার তাগিদ
আল্লাহর তাওহীদে (অংশীদারবিহীন নিরংকুশ এককত্বে বিশ্বাস যেমন ঈমানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঠিক তেমনি তাঁকে ভয় করা (তাকওয়া)ও ঈমানের অপর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ জানিয়েছেন। যে তাকওয়া অবলম্বনে (আল্লাহকে ভয় করলে) ঈমান বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় [সূরা আনফাল ৮ : ২]।
আবার আল কুরআনে আল্লাহ বারবার যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে তাদের সম্পর্কে বলেন : (মুত্তাকী হবে] –
ক) তারা উন্নতি লাভ করবে (২ : ১৮৯)
খ) তারা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভ করবে (৪৯ : ১০)।
গ) তাদের আল্লাহ সত্য ও মিথ্যা (হাক্ ও বাতিল) নির্ণয়ের বিচক্ষণতা/ক্ষমতা দান করবেন, তাদের গুনাহগুলি মুছে দেবেন, এবং তাদের ক্ষমা করে দেবেন। এবং আল্লাহ অতিশয় মঙ্গলময় (৮ : ২৯)
আল্লাহ আরো জানিয়েছেন যে তিনি মুত্তাকীদের পছন্দ করেন (৯ : ৪, ৭) এবং জান্নাতে তাদের স্থান সুনিশ্চিত (১৫:৪৫)
সমগ্র কুরআনে সর্বাধিক তাগাদা দেয়া হয়েছে সলাত কায়েম করার জন্যে (৯০ বারেরও বেশী), অন্যদিকে তাকওয়া অবলম্বন করার জন্যে তাগিদ এসেছে তার চেয়েও অনেক বেশী । ফাত্তাকুল্লাহ, ওয়াত্তাকুল্লাহ, ইত্তাকুল্লাহ, ওয়াখশাওনী, ওয়া খা-ফুনী ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে ভয় করার নির্দেশ দিয়েছেন মানবজাতিকে । আল্লাহর সন্তোষ লাভের উপায়। হিসেবে ঈমান আনার পরই আল্লাহকে ভয় করার গুরুত্ব যে কত অধিক এত তাগাদার পর সেটা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আল্লাহকে ভয় করার কথা কুরআনে কোথায় কোথায় আছে তা নীচের তালিকাতে দেখি এবং তাকওয়া অবলম্বনে সদা তৎপর থাকি। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেয়ে অধিক কাম্য আর কী হতে পারে বান্দার জীবনে?
আল্লাহর নির্দেশ
আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে না (বাকারা ২: ৪০)
আমাকে ভয় কর, শুধুই আমাকে (বাকারা ২: ৪১)
শুধু আমাকে ভয় করবে (বাকারা ২: ১৫০)
আল্লাহকে ভয় কর যাতে উন্নতি লাভ করতে পার (বাকারা ২: ১৮৯)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ১৯৪)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ১৯৬)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ১৯৭)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২০৩)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২২৩)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৩১)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৩৩)
আল্লাহকে সম্পর্কে সতর্ক/সচেতন থাক/তাকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৩৫)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৭৮)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৮২)
আল্লাহকে ভয় কর (আল ইমরান ৩: ৫০)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর যে রকম ভয় করা উচিৎ, এবং মুসলিম (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না (আল ইমরান ৩: ১০২)
আল্লাহকে ভয় কর (আল ইমরান ৩: ১২৩)
আল্লাহকে ভয় কর (আল ইমরান ৩: ১৩০)
আমাকে ভয় কর যদি তুমি ঈমানদার হও (আল ইমরান ৩: ১৭৫)
আল্লাহকে ভয় কর যাতে তুমি উন্নতি লাভ করতে পার (আল ইমরান ৩: ২০০)
আল্লাহকে ভয় কর (নিসা ৪: ১)
আল্লাহকে ভয় কর (নিসা ৪: ১৩১)
আল্লাহকে ভয় কর, তিনি শাস্তি দানে কঠোর (মায়িদা ৫: ২)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৩)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৪)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৭)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৮)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১১)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৩৫)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৪৪)
আল্লাহকে ভয় কর যদি তুমি ঈমানদার হও (মায়িদা ৫: ৫৭)
আল্লাহকে ভয় কর যার প্রতি ঈমান এনেছ (মায়িদা ৫: ৮৮)
আল্লাহকে ভয় কর যার কাছে তোমাদের সমবেত করা হবে (মায়িদা ৫: ৯৬)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১০০)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১০৮)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১১২)
আল্লাহকে ভয় কর (আনফাল ৮: ১)
আল্লাহকে ভয় কর (আনফাল ৮: ৬৯)
আল্লাহকেই শুধু ভয় করবে যদি তোমরা মুমিন হও (তাওবা ৯: ১৩)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর, এবং সত্যবাদী হও (তাওবা ৯: ১১৯)
আল্লাহকে ভয় কর (হুদ ১১: ৭৮)
আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আমার প্রতি রুযু হও (নাহল ১৬: ২)
আমিই একমাত্র ইলাহ, আমাকে ভয় কর (নাহল ১৬: ৫১)
তারাই মুত্তাকী যারা না দেখেই তাদের রবকে ভয় করে (আমবিয়া ২১: ৪৮, ৪৯)
হে মানবজাতি! তোমাদের রবকে ভয় কর (হাজ্জ ২২: ১)
আমি তোমাদের রব, আমাকে ভয় কর (মু'মিনূন ২৩: ৫২)
যে আল্লাহকে মান্য করে, তার রসূলকে মান্য করে, এবং আল্লাহকে ভয় করে ও তার কর্তব্য করে যায়, সেই সফলকাম হবে (নূর ২৪: ৫২)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী নূহ) (শুআরা ২৬: ১০৮, ১১০)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী হুদ) (শুআরা ২৬: ১২৬, ১৩১)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী সালিহ) (শুআরা ২৬: ১৪৪, ১৫০)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী লূত) (শুআরা ২৬: ১৬২)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী শুআইব) (শুআরা ২৬: ১৭৯)
তাঁকে ভয় কর যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদেরও সৃষ্টি করেছেন (নবী শুআইব) (শুআরা ২৬: ১৮৪)
আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁকে ভয় কর (নবী ইব্রাহিম) (আনকাবুত ২৯: ১৬)
আল্লাহর প্রতি রুযু হও এবং তাঁকে ভয় কর, সালাত কায়েম কর, মুশরিক হয়ো না (রুম ৩০: ৩১)
হে মানবজাতি! তোমাদের রবের প্রতি কর্তব্য পালন কর (লুকমান ৩১: ৩৩)
হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন (আহযাব ৩৩: ১)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর, এবং সঠিক কথা বল (অর্থাৎ সদা সত্য কথা বল) (আহযাব ৩৩: ৭০)
হে আমার দাস (বান্দা)গণ যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের রব (প্রভু)কে ভয় কর (যুমার ৩৯: ১০)
হে আমার দাস (বান্দা)গণ! আমাকে ভয় কর (যুমার ৩৯: ১৬)
তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী ঈসা) (যুখরুফ ৪৩: ৬৩)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর যাতে তার কৃপা লাভ করতে পার (হুজুরাত ৪৯: ১, ১০, ১২)
না দেখে যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে জান্নাত (কাফ ৫০: ৩৩, ৩৪)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর (হাদীদ ৫৭: ২৮)
আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর (হাশর ৫৯: ৭)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর (হাশর ৫৯: ১৮)
যে আল্লাহতে ঈমান এনেছ তাকে ভয় কর (মুমতাহানা ৬০: ১১)
আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় কর (তাগাবুন ৬৪: ১৬)
না দেখে যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রয়েছে (মুলক ৬৭: ১২)
আল্লাহর ইবাদত কর, তাকে ভয় কর, এবং আমাকে মান (নবী নূহ) (নূ-হ ৭১: ৩)
আখিরাতে আল্লাহ সামনে দাড়ানোর ভয় যারা করে এবং পাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকে, জান্নাত হবে তাদের বাসস্থান (নাযিয়াত ৭৯: ৪০, ৪১)
যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের পুরস্কার হলো জান্নাত (বাইয়্যিনা ৯৮: ৮)
তাকওয়া সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন
১. আতিয়া আস-সাদী রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কোন ব্যক্তি পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় যেসব কাজে গুনাহ নেই তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আল্লাহভীরু লোকদের শ্রেণীভুক্ত হতে পারে না। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
ব্যাখ্যা : কখনও কখনও বৈধ কাজ অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কোন মমিনের সামনে কেবল বৈধতার দিকটিই উপস্থিত থাকবে না বরং এই বৈধ কাজ কোথাও যেন হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ার কারণ না হয় সেদিকেও তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে ।
২. ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর নির্ধারিত রিযিক পূর্ণ মাত্রায় লাভ না করা পর্যন্ত কোন লোকই মারা যাবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় কর এবং বৈধ পন্থায় আয় উপার্জনের চেষ্টা কর । রিযিক প্রাপ্তিতে বিলম্ব যেন তোমাদেরকে অবৈধ পন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত করে, কেননা আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে তা কেবল আনুগত্যের মাধ্যমে লাভ করা যায় । (ইবনে মাজাহ)
৩. আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল (ﷺ) বলেছেন : সাবধান! অযথা ধারণা করা থেকে বিরত থাক। কেননা অযথা ধারণা পোষণ করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। মানুষের দোষ অনুসন্ধান করো না, পরস্পরের ক্রটি অনুসন্ধানে লেগে যেয়ো না। পরস্পর হিংসা পোষণ করো, যোগাযোগ বন্ধ করো না। আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে থাকো, যেভাবে তোমাদের হুকুম করা হয়েছে, এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। সে তার উপর যুলুম করতে পারে না, তাকে লাঞ্ছিত করতে পারে না এবং অবজ্ঞা করতে পারে না। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি এখানে (এই বলে তিনি তাঁর আংগুল দিয়ে বুকের দিকে তিন বার ইশারা করলেন)। কোন ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে অবজ্ঞা বা ঘৃণা করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের রক্ত, মানমর্যাদা ও ধন-সম্পদ হরণ করা হারাম। মহান আল্লাহ তোমাদের শরীর ও চেহারার দিকে দৃষ্টি দেবেন না, বরং দৃষ্টি দেবেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। (সহীহ মুসলিম)
৪. আবুযর রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। রসূল (ﷺ) বলেছেন : আমি অদৃশ্য জগতের এমন সব বিষয় দেখতে পাই, যা তোমরা দেখতে পাও না, এমন সব আওয়াজ শুনতে পাই যা তোমরা শুনতে পাও না। আকাশ ‘চড়চড়’ করছে, আর ‘চড়চড় করাই স্বাভাবিক। আমি সেই মহান আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার প্রাণ, আকাশে এমন চার আঙ্গুল প্রশস্ত স্থান নাই যেখানে কোন না কোন ফিরিশতা আল্লাহর উদ্দেশ্যে মাথা রেখে সিজদায় পড়ে নাই। আমি যে সব বিষয় জানি তোমরাও যদি তা জানতে, তবে তোমরা খুব কমই হাসি-তামাশা করতে পারতে; বরং খুব বেশী করে কান্নাকাটি করতে এবং সুখ-শয্যায় স্ত্রীদের সাথে মিলন-স্বাদও গ্রহণ করতে পারতে না। তাছাড়াও তোমরা ভয়ে আল্লাহর দরবারে পরিত্রাণ চেয়ে কাতরভাবে বিলাপ করতে করতে জঙ্গল বা জনমানবশূন্য বালুকাময় মরুভূমির দিকে বের হয়ে যেতে - হাদীস বর্ণনাকারী আবুযর অতঃপর বলেন, হায়! আমি যদি এমন একটি গাছ হতাম যা কেটে ফেলা হত! (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)।
৫. হাসান রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মুখ হতে এই কথা মুখস্ত করে নিয়েছি, যে জিনিস সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় তা পরিত্যাগ কর, যা সন্দেহের ঊর্ধে তা গ্রহণ কর কেননা সততাই শান্তির বাহক এবং মিথ্যাচার সন্দেহ-সংশয়ের উৎস । (তিরমিযী)
৬. আয়িশা রাদিআল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে আয়িশা! ছোটখাট গুনাহর ব্যাপারেও সতর্ক হও, কেননা এ-জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে । (ইবনে মাজাহ)
ব্যাখ্যা : কবীরা গুনাহ যেমন কোন মুসলিমের মুক্তি লাভকে বিপদগ্রস্ত করে দেয়, তেমনি ছোটখাট গুনাহও কম বিপদজনক নয়। ছোটখাট গুনাহ বাহ্যত হালকা বা তুচ্ছ মনে হলেও তা বারবার করার কারণে অন্তরাত্মায়।
মরিচা ধরে যায় এবং কবীরা গুনাহর প্রতি ঘৃণাবোধ নিঃশেষ হয়ে যায় ।
৫ নং এবং ৬ নং হাদীসে সরাসরি তাকওয়া শব্দটির উল্লেখ নেই কিন্তু হাদীস দুটির মুল বিষয় বস্তুই হচ্ছে তাকওয়া। কারণ সন্দেহ থেকে দূরে থাকা তাকওয়ার ব্যাপার আবার ছোটখাট গুনাহ থেকেও দূরে থাকা তাকওয়ার ব্যাপার ।
আবার আল কুরআনে আল্লাহ বারবার যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে তাদের সম্পর্কে বলেন : (মুত্তাকী হবে] –
ক) তারা উন্নতি লাভ করবে (২ : ১৮৯)
খ) তারা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভ করবে (৪৯ : ১০)।
গ) তাদের আল্লাহ সত্য ও মিথ্যা (হাক্ ও বাতিল) নির্ণয়ের বিচক্ষণতা/ক্ষমতা দান করবেন, তাদের গুনাহগুলি মুছে দেবেন, এবং তাদের ক্ষমা করে দেবেন। এবং আল্লাহ অতিশয় মঙ্গলময় (৮ : ২৯)
আল্লাহ আরো জানিয়েছেন যে তিনি মুত্তাকীদের পছন্দ করেন (৯ : ৪, ৭) এবং জান্নাতে তাদের স্থান সুনিশ্চিত (১৫:৪৫)
সমগ্র কুরআনে সর্বাধিক তাগাদা দেয়া হয়েছে সলাত কায়েম করার জন্যে (৯০ বারেরও বেশী), অন্যদিকে তাকওয়া অবলম্বন করার জন্যে তাগিদ এসেছে তার চেয়েও অনেক বেশী । ফাত্তাকুল্লাহ, ওয়াত্তাকুল্লাহ, ইত্তাকুল্লাহ, ওয়াখশাওনী, ওয়া খা-ফুনী ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে ভয় করার নির্দেশ দিয়েছেন মানবজাতিকে । আল্লাহর সন্তোষ লাভের উপায়। হিসেবে ঈমান আনার পরই আল্লাহকে ভয় করার গুরুত্ব যে কত অধিক এত তাগাদার পর সেটা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আল্লাহকে ভয় করার কথা কুরআনে কোথায় কোথায় আছে তা নীচের তালিকাতে দেখি এবং তাকওয়া অবলম্বনে সদা তৎপর থাকি। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেয়ে অধিক কাম্য আর কী হতে পারে বান্দার জীবনে?
আল্লাহর নির্দেশ
আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে না (বাকারা ২: ৪০)
আমাকে ভয় কর, শুধুই আমাকে (বাকারা ২: ৪১)
শুধু আমাকে ভয় করবে (বাকারা ২: ১৫০)
আল্লাহকে ভয় কর যাতে উন্নতি লাভ করতে পার (বাকারা ২: ১৮৯)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ১৯৪)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ১৯৬)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ১৯৭)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২০৩)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২২৩)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৩১)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৩৩)
আল্লাহকে সম্পর্কে সতর্ক/সচেতন থাক/তাকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৩৫)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৭৮)
আল্লাহকে ভয় কর (বাকারা ২: ২৮২)
আল্লাহকে ভয় কর (আল ইমরান ৩: ৫০)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর যে রকম ভয় করা উচিৎ, এবং মুসলিম (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না (আল ইমরান ৩: ১০২)
আল্লাহকে ভয় কর (আল ইমরান ৩: ১২৩)
আল্লাহকে ভয় কর (আল ইমরান ৩: ১৩০)
আমাকে ভয় কর যদি তুমি ঈমানদার হও (আল ইমরান ৩: ১৭৫)
আল্লাহকে ভয় কর যাতে তুমি উন্নতি লাভ করতে পার (আল ইমরান ৩: ২০০)
আল্লাহকে ভয় কর (নিসা ৪: ১)
আল্লাহকে ভয় কর (নিসা ৪: ১৩১)
আল্লাহকে ভয় কর, তিনি শাস্তি দানে কঠোর (মায়িদা ৫: ২)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৩)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৪)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৭)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৮)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১১)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৩৫)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ৪৪)
আল্লাহকে ভয় কর যদি তুমি ঈমানদার হও (মায়িদা ৫: ৫৭)
আল্লাহকে ভয় কর যার প্রতি ঈমান এনেছ (মায়িদা ৫: ৮৮)
আল্লাহকে ভয় কর যার কাছে তোমাদের সমবেত করা হবে (মায়িদা ৫: ৯৬)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১০০)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১০৮)
আল্লাহকে ভয় কর (মায়িদা ৫: ১১২)
আল্লাহকে ভয় কর (আনফাল ৮: ১)
আল্লাহকে ভয় কর (আনফাল ৮: ৬৯)
আল্লাহকেই শুধু ভয় করবে যদি তোমরা মুমিন হও (তাওবা ৯: ১৩)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর, এবং সত্যবাদী হও (তাওবা ৯: ১১৯)
আল্লাহকে ভয় কর (হুদ ১১: ৭৮)
আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আমার প্রতি রুযু হও (নাহল ১৬: ২)
আমিই একমাত্র ইলাহ, আমাকে ভয় কর (নাহল ১৬: ৫১)
তারাই মুত্তাকী যারা না দেখেই তাদের রবকে ভয় করে (আমবিয়া ২১: ৪৮, ৪৯)
হে মানবজাতি! তোমাদের রবকে ভয় কর (হাজ্জ ২২: ১)
আমি তোমাদের রব, আমাকে ভয় কর (মু'মিনূন ২৩: ৫২)
যে আল্লাহকে মান্য করে, তার রসূলকে মান্য করে, এবং আল্লাহকে ভয় করে ও তার কর্তব্য করে যায়, সেই সফলকাম হবে (নূর ২৪: ৫২)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী নূহ) (শুআরা ২৬: ১০৮, ১১০)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী হুদ) (শুআরা ২৬: ১২৬, ১৩১)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী সালিহ) (শুআরা ২৬: ১৪৪, ১৫০)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী লূত) (শুআরা ২৬: ১৬২)
আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী শুআইব) (শুআরা ২৬: ১৭৯)
তাঁকে ভয় কর যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদেরও সৃষ্টি করেছেন (নবী শুআইব) (শুআরা ২৬: ১৮৪)
আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁকে ভয় কর (নবী ইব্রাহিম) (আনকাবুত ২৯: ১৬)
আল্লাহর প্রতি রুযু হও এবং তাঁকে ভয় কর, সালাত কায়েম কর, মুশরিক হয়ো না (রুম ৩০: ৩১)
হে মানবজাতি! তোমাদের রবের প্রতি কর্তব্য পালন কর (লুকমান ৩১: ৩৩)
হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন (আহযাব ৩৩: ১)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর, এবং সঠিক কথা বল (অর্থাৎ সদা সত্য কথা বল) (আহযাব ৩৩: ৭০)
হে আমার দাস (বান্দা)গণ যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের রব (প্রভু)কে ভয় কর (যুমার ৩৯: ১০)
হে আমার দাস (বান্দা)গণ! আমাকে ভয় কর (যুমার ৩৯: ১৬)
তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে মান (নবী ঈসা) (যুখরুফ ৪৩: ৬৩)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর যাতে তার কৃপা লাভ করতে পার (হুজুরাত ৪৯: ১, ১০, ১২)
না দেখে যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে জান্নাত (কাফ ৫০: ৩৩, ৩৪)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর (হাদীদ ৫৭: ২৮)
আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর (হাশর ৫৯: ৭)
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর (হাশর ৫৯: ১৮)
যে আল্লাহতে ঈমান এনেছ তাকে ভয় কর (মুমতাহানা ৬০: ১১)
আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় কর (তাগাবুন ৬৪: ১৬)
না দেখে যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রয়েছে (মুলক ৬৭: ১২)
আল্লাহর ইবাদত কর, তাকে ভয় কর, এবং আমাকে মান (নবী নূহ) (নূ-হ ৭১: ৩)
আখিরাতে আল্লাহ সামনে দাড়ানোর ভয় যারা করে এবং পাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকে, জান্নাত হবে তাদের বাসস্থান (নাযিয়াত ৭৯: ৪০, ৪১)
যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের পুরস্কার হলো জান্নাত (বাইয়্যিনা ৯৮: ৮)
তাকওয়া সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন
১. আতিয়া আস-সাদী রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কোন ব্যক্তি পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় যেসব কাজে গুনাহ নেই তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আল্লাহভীরু লোকদের শ্রেণীভুক্ত হতে পারে না। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
ব্যাখ্যা : কখনও কখনও বৈধ কাজ অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কোন মমিনের সামনে কেবল বৈধতার দিকটিই উপস্থিত থাকবে না বরং এই বৈধ কাজ কোথাও যেন হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ার কারণ না হয় সেদিকেও তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে ।
২. ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর নির্ধারিত রিযিক পূর্ণ মাত্রায় লাভ না করা পর্যন্ত কোন লোকই মারা যাবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় কর এবং বৈধ পন্থায় আয় উপার্জনের চেষ্টা কর । রিযিক প্রাপ্তিতে বিলম্ব যেন তোমাদেরকে অবৈধ পন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত করে, কেননা আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে তা কেবল আনুগত্যের মাধ্যমে লাভ করা যায় । (ইবনে মাজাহ)
৩. আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল (ﷺ) বলেছেন : সাবধান! অযথা ধারণা করা থেকে বিরত থাক। কেননা অযথা ধারণা পোষণ করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। মানুষের দোষ অনুসন্ধান করো না, পরস্পরের ক্রটি অনুসন্ধানে লেগে যেয়ো না। পরস্পর হিংসা পোষণ করো, যোগাযোগ বন্ধ করো না। আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে থাকো, যেভাবে তোমাদের হুকুম করা হয়েছে, এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। সে তার উপর যুলুম করতে পারে না, তাকে লাঞ্ছিত করতে পারে না এবং অবজ্ঞা করতে পারে না। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি এখানে (এই বলে তিনি তাঁর আংগুল দিয়ে বুকের দিকে তিন বার ইশারা করলেন)। কোন ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে অবজ্ঞা বা ঘৃণা করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের রক্ত, মানমর্যাদা ও ধন-সম্পদ হরণ করা হারাম। মহান আল্লাহ তোমাদের শরীর ও চেহারার দিকে দৃষ্টি দেবেন না, বরং দৃষ্টি দেবেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। (সহীহ মুসলিম)
৪. আবুযর রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। রসূল (ﷺ) বলেছেন : আমি অদৃশ্য জগতের এমন সব বিষয় দেখতে পাই, যা তোমরা দেখতে পাও না, এমন সব আওয়াজ শুনতে পাই যা তোমরা শুনতে পাও না। আকাশ ‘চড়চড়’ করছে, আর ‘চড়চড় করাই স্বাভাবিক। আমি সেই মহান আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার প্রাণ, আকাশে এমন চার আঙ্গুল প্রশস্ত স্থান নাই যেখানে কোন না কোন ফিরিশতা আল্লাহর উদ্দেশ্যে মাথা রেখে সিজদায় পড়ে নাই। আমি যে সব বিষয় জানি তোমরাও যদি তা জানতে, তবে তোমরা খুব কমই হাসি-তামাশা করতে পারতে; বরং খুব বেশী করে কান্নাকাটি করতে এবং সুখ-শয্যায় স্ত্রীদের সাথে মিলন-স্বাদও গ্রহণ করতে পারতে না। তাছাড়াও তোমরা ভয়ে আল্লাহর দরবারে পরিত্রাণ চেয়ে কাতরভাবে বিলাপ করতে করতে জঙ্গল বা জনমানবশূন্য বালুকাময় মরুভূমির দিকে বের হয়ে যেতে - হাদীস বর্ণনাকারী আবুযর অতঃপর বলেন, হায়! আমি যদি এমন একটি গাছ হতাম যা কেটে ফেলা হত! (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)।
৫. হাসান রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মুখ হতে এই কথা মুখস্ত করে নিয়েছি, যে জিনিস সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় তা পরিত্যাগ কর, যা সন্দেহের ঊর্ধে তা গ্রহণ কর কেননা সততাই শান্তির বাহক এবং মিথ্যাচার সন্দেহ-সংশয়ের উৎস । (তিরমিযী)
৬. আয়িশা রাদিআল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে আয়িশা! ছোটখাট গুনাহর ব্যাপারেও সতর্ক হও, কেননা এ-জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে । (ইবনে মাজাহ)
ব্যাখ্যা : কবীরা গুনাহ যেমন কোন মুসলিমের মুক্তি লাভকে বিপদগ্রস্ত করে দেয়, তেমনি ছোটখাট গুনাহও কম বিপদজনক নয়। ছোটখাট গুনাহ বাহ্যত হালকা বা তুচ্ছ মনে হলেও তা বারবার করার কারণে অন্তরাত্মায়।
মরিচা ধরে যায় এবং কবীরা গুনাহর প্রতি ঘৃণাবোধ নিঃশেষ হয়ে যায় ।
৫ নং এবং ৬ নং হাদীসে সরাসরি তাকওয়া শব্দটির উল্লেখ নেই কিন্তু হাদীস দুটির মুল বিষয় বস্তুই হচ্ছে তাকওয়া। কারণ সন্দেহ থেকে দূরে থাকা তাকওয়ার ব্যাপার আবার ছোটখাট গুনাহ থেকেও দূরে থাকা তাকওয়ার ব্যাপার ।