hadith book logo

তাকওয়া

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৬

১০ম অধ্যায় : সলাত ও তাকওয়া খুশু ও খুযু (ভয়-বিনয়-আশা-একাগ্রতা)

“এবং আল্লাহর জন্য দাঁড়াও বিনীত হয়ে।” (সূরা বাকারা : ২৩৮)

“আর তোমরা ধৈর্য ও সলাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন। যারা বিশ্বাস করে যে, তারা তাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে এবং তারা তাঁর দিকে ফিরে যাবে।” (সূরা বাকারা : ৪৫-৪৬)

সলাত ইসলামের একটি শরীরিক ইবাদত, বড় রুকন। একাগ্রতা ও বিনয়াবনতা এর প্রাণ, শরীয়তের অমোঘ নির্দেশও। এদিকে অভিশপ্ত ইবলিশ মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট ও বিপদগ্রস্ত করার শপথ নিয়ে অঙ্গীকার করেছে,

“তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না”। (সূরা আরাফ : ১৭)।

কাজেই তার মূল উদ্দেশ্য মানবজাতিকে সলাত হতে অন্য মনস্ক করা। ইবাদতের স্বাদ ও সওয়াবের বিরাট অংশ থেকে বঞ্চিত করার নিমিত্তে সলাতে বিভিন্ন ধরনের প্ররোচনা ও সন্দেহের অনুপ্রবেশ ঘটানো। তবে বাস্তবতা হল, শয়তানের আহবানে মানুষের বিপুল সাড়া, সর্বপ্রথম সলাতের একাগ্রতা পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেয়া এবং শেষ জমানা। এ হিসেবে আমাদের উপর হুজায়ফা (রা.) এর বাণী প্রকটভাবে সত্যতার রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সর্বপ্রথম তোমরা সলাতের একাগ্রতা হারা হবে, সর্ব শেষ হারাবে সলাত। অনেক সলাত আদায়কারীর ভেতর-ই কোনো কল্যাণ বিদ্যমান থাকবে না। হয়তো মসজিদে প্রবেশ করে একজন মাত্র সলাত আদায়কারীকেও সলাতে বিনয়ী-একাগ্রতা সম্পন্ন দেখবে না।' (মাদারিজুস সালিকিন, ইবনুল কায়্যিম) আল্লাহ বলেন,

“মু'মিনগণ সফলকাম, যারা সলাতে মনোযোগী।” (সূরা আল-মু'মিনূন : ১-২) অর্থাৎ আল্লাহ ভীরু এবং সলাতে স্থির।

‘খুশু হল-আল্লাহর ভয় এবং ধ্যান হতে সৃষ্ট স্থিরতা, গাম্ভীর্যতা ও নম্রতা। ('দারআশশুআব প্রকাশিত ইবনে কাসির : ৬/৪১৪)

‘বিনয়াবনত এবং আপাত-মস্তক দীনতাসহ আল্লাহর সমীপে দন্ডায়মান হওয়া। (আল-মাদারেজ : ১/৫২০)

মুজাহিদ বলেন, ‘কুনুতের অর্থ : আল্লাহর ভয় হতে উদ্যেগ স্থিরতা, একাগ্রতা, অবনত দৃষ্টি, সর্বাঙ্গীন আনুগত্য । (তাজিমু কাদরিস সলাত ১/১৮৮)

হুজায়ফা (রা.) বলতেন, ‘নিফাক সর্বস্ব খুশু হতে বিরত থাক। জিজ্ঞাসা করা হল, নিফাক সর্বস্ব খুশু আবার কী? উত্তরে বললেন, শরীর দেখতে একাগ্রতাসম্পন্ন অথচ অন্তর একাগ্রতা শূন্য।

সলাতেই আমার চোখের শান্তি রাখা হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ : ৩/১২৮)

সূরা আহযাবের ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ কুরআনে মনোনীত বান্দাদের আলোচনায় খুশুর সহিত সলাত আদায়কারী নারী-পুরুষের কথা উল্লেখ করেছেন। এবং তাদের জন্য ধার্যকৃত ক্ষমা ও সুমহান প্রতিদানের ঘোষণা করেছেন । খুশু বান্দার উপর সলাতের দায়িত্বটি স্বাভাবিক ও হালকা করে দেয় । আল্লাহ বলেন,

“আর তোমরা ধৈর্য ও সলাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় তা খুশুওয়ালা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের উপর কঠিন । (সূরা বাকারা : ৪৫)

অর্থাৎ সলাতের কষ্ট বড় কঠিন, তবে খুশু ওলাদের জন্য কোন কষ্টই নয়।” (তাফসিরে ইবনে কাসির : (১/১২৫)

খুশু যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমন কঠিন ও দুর্লভ, বিশেষ করে আমাদের এ শেষ জামানায়। রসূল (ﷺ) বলেন, এই উম্মত হতে সর্বপ্রথম সলাতের খুশু উঠিয়ে নেয়া হবে, এমনকি সন্ধান করেও তুমি কোনো খুশু ওয়ালা লোক খুঁজে পাবে না। (তাবরানি)।

খুশু তথা একাগ্রতার হুকুম

“তোমরা ধৈর্য ও সলাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, তবে সলাতে একাগ্রতা বঞ্চিতদের জন্য তা খুব কঠিন।” (সূরা আল-বাকারা : ৪৫)।

এর মাধ্যমে খুশুহীনদের দুর্নাম ও নিন্দা করা হয়েছে। অর্থাৎ খুশু ওয়াজিব। কারণ, ওয়াজিব পরিত্যাগ করা ছাড়া কারো দুর্নাম করা হয় না। অন্যত্র বলেন,

“মু'মিনগণ সফল, যারা সলাতে একাগ্রতা সম্পন্ন...তারাই জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হবে।” (সূরা মুমিনুন : ১-১১)

এ ছাড়া অন্যরা তার অধিকারী হবে না। এর দ্বারাও প্রমাণিত হয়, সলাতে খুশু ওয়াজিব। খুশু হল বিনয় ও একাগ্রতার ভাব ও ভঙ্গি। সুতরাং যে ব্যক্তি কাকের মত মাথা ঠোকরায়, রুকু হতে ঠিক মত মাথা উঁচু করে না, সোজা না হয়ে সিজদাতে চলে যায়, তার খুশু গ্রহণযোগ্য নয়। সে গুনাহগার-অপরাধী। (মাজমুউল ফতওয়া : ২২/৫৫৩-৫৫৮)।

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আল্লাহ তাআলা ফরয করেছেন। যে ভাল করে ওযু করবে, সময় মত সলাত আদায় করবে এবং রুকু-সিজদা ঠিক ঠিক আদায় করবে, আল্লাহর দায়িত্ব, তাকে ক্ষমা করে দেয়া। আর যে এমনটি করবে না, তার প্রতি আল্লাহর কোনো দায়িত্ব নেই। শাস্তিও দিতে পারেন, ক্ষমাও করতে পারেন । (আবু দাউদ)

খুগু ও খুযু (ভয়-বিনয়-আশা ও একাগ্রতা) সৃষ্টি করার কয়েকটি উপায়

এক. খুশু তৈরী ও শক্তিশালী করণের উপায় গ্রহণ করা।

দুই. খুশুতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো পরিহার ও দুর্বল করা। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, খুশুর সহায়ক দুটি জিনিস ।

প্রথমটি হল- ব্যক্তির প্রতিটি কথা, কাজ, তিলাওয়াত, যিকির ও দু’আ গভীর মনোযোগ সহকারে আদায় করা। আল্লাহকে দেখে এসব আদায় করছি এরূপ নিয়ত ও ধ্যান করা। “আল্লাহর ইবাদত কর, তাকে দেখার মত করে। যদি তুমি তাকে না দেখ, সে তো অবশ্যই তোমাকে দেখে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

দ্বিতীয়টি হল- প্রতিবন্ধকতা দূর করা। অন্তরের একাগ্রতা বিনষ্টকারী জিনিস ও চিন্তা-ফিকির পরিত্যাগ করা। যা ব্যক্তি অনুসারে সকলের ভেতর হয়ে থাকে। যার ভেতর প্রবৃত্তি ও দ্বীনের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কিংবা কোনো জিনিসের প্রতি। আসক্তি রয়েছে, তার ভেতর প্ররোচনাও অধিক হবে । (মাজমুউল ফতওয়া)

খুগু ও খুযু শক্তিশালী করণের উপায়সমুহ

এক : সলাতের জন্য প্রস্ততি গ্রহণ ও তৈরী হওয়া। তারপর কাঁধে কাঁধ ও পায়ের টাখনুর সাথে টাখনু মিলে এবং কাতার সোজা করে দাঁড়ানো। কারণ, শয়তান কাতারের মাঝখানে ফাঁকা জায়গাতে আশ্রয় নেয় ।

দুই : স্থিরতা অবলম্বন করা। রসূল (ﷺ) প্রতিটি অঙ্গ স্বীয় স্থানে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। রসূল (ﷺ) বলেছেন, “সলাতে যে চুরি করে, সেই সবচেয়ে নিকৃষ্ট চোর । সে বলল, হে আল্লাহর রসূল সলাতে কীভাবে চুরি করে? তিনি বললেন, রুকু-সিজদা ঠিক ঠিক আদায় করে না।” (আহমাদ ও হাকেম)

তিন : সলাতে মৃত্যুর স্মরণ করা। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তুমি সলাতে মৃত্যুর স্মরণ কর। কারণ, যে সলাতে মৃত্যুর স্মরণ করবে, তার সলাত অবশ্যই সুন্দর হবে। এবং সে ব্যক্তির ন্যায় সলাত পড়, যাকে দেখেই মনে হয়, সে সলাতে আছে।” (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ)।

চার : পঠিত আয়াত ও দু'আ-দুরূদ অর্থসহ বুঝে বুঝে পড়া ও গভীর মনোযোগ দিয়ে তা অনুধাবন করার চেষ্টা করা এবং সাথে সাথে প্রভাবিত হওয়া। কারণ, কুরআন নাযিল হয়েছে মূলতঃ চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করার জন্যই।

পাঁচ: সব কথার মূল হচ্ছে রসূলুল্লাহ (ﷺ) যেভাবে সলাত আদায় করেছেন ঠিক ঐভাবে সলাত আদায় করা। তিনি বলেছেনঃ “তোমরা ঐভাবে সলাত আদায় কর যেভাবে আমাকে আদায় করতে দেখ।' (সহীহ বুখারী)।