hadith book logo

তাকওয়া

লেখকঃ আমির জামান, নাজমা জামান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৮

সুদ ও তাকওয়া

সুদ সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশ

“যারা সুদ খায় তারা (মাথা উঁচু করে) দাঁড়াতে পারবে না, (দাঁড়ালেও) তার দাঁড়ানো হবে সে ব্যক্তির মতো, যাকে শয়তান নিজস্ব পরশ দিয়ে (দুনিয়ার লোভ লালসায়) মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে; এটা এ কারণে, যেহেতু এরা বলে, ব্যবসা বাণিজ্য তো সুদের মতোই।” (সূরা বাকারা : ২৭৫)

“অথচ আল্লাহ তা'আলা ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন, তাই তোমাদের যার যার কাছে তার মালিকের পক্ষ থেকে (সুদ সংক্রান্ত) এ উপদেশ পৌছেছে, সে অতঃপর সুদের কারবার থেকে বিরত থাকবে।” (সূরা বাকারা : ২৭৫)।

“আল্লাহ তা'আলা সুদ নিশ্চিহ্ন করেন, (অপর দিকে) দান সদাকা (-র পবিত্র কাজ)-কে তিনি (উত্তরোত্তর) বৃদ্ধি করেন; আল্লাহ তাআলা (তাঁর নিয়ামতের প্রতি) অকৃতজ্ঞ পাপিষ্ঠ ব্যক্তিদের কখনো পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা : ২৭৬)

“হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা (সুদের ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় করো, আগের (সুদী কারবারের) যে সব বকেয়া আছে তোমরা তা ছেড়ে দাও, যদি সত্যিই তোমরা আল্লাহর ওপর ঈমান আনো।” (সূরা বাকারা : ২৭৮)

“যদি তোমরা এমনটি না করো, তাহলে অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে (তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের (ঘোষণা থাকবে)।” (সূরা বাকারা : ২৭৯)

সুদ সম্পর্কে রসূল (ﷺ) এর নির্দেশ

নিশ্চয়ই আল্লাহর নবী (ﷺ) সুদগ্রহীতা, সুদ প্রদানকারী, সুদী কারবারের সাক্ষী এবং সুদ চুক্তি লিখককে অভিশাপ দিয়েছেন । (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

যে ব্যক্তি জেনে শুনে সুদের একটি টাকা খায়, তার এই অপরাধ ছত্রিশ বার ব্যভিচারের চাইতেও অনেক কঠিন। (আহমদ, বায়হাকী)

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মানবতাবোধ প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ৪০টিরও অধিক হাদীস দ্বারা সুদ নিষিদ্ধ করেছেন। সুতরাং এখানে অবশ্যই বুঝতে হবে এটি কতটা মানবতা বিরোধী একটি জঘন্যতম কাজ। এখন আমি এই মানবতা বিরোধী কাজের সাথে কতোটুকু জড়িত হবো তা নির্ভর করছে আমার তাকওয়ার উপর ।

সুদ একটি সুস্পষ্ট কবীরাহ গুনাহ

আমরা জানি নিঃসন্দেহে সুদ গ্রহণ ও প্রদান বা দেয়া নেয়া একটি কবীরাহ গুনাহ। আমরা অনেকেই সুদী অর্থনীতির সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে আল্লাহর আইন অমান্য করে নিজেদেরকে কবীরাহ গুনাহর সাথে জড়িয়ে ফেলছি এবং আল্লাহ তা'আলার সীমালংঘন এবং নাফরমানী করে ফেলছি। আমরা হয়তো কেউ কেউ বলে থাকি যে এই আধুনিক যুগে সুদ থেকে দুরে থাকা সম্ভব নয়! কিন্তু চৌদ্দশ বছর আগে আল্লাহ ও তার রসূল (ﷺ) বর্তমান আধুনিক যুগ এবং ভবিষ্যৎ যুগের কথাও চিন্তা করে সুদকে হারাম করেছেন। মহান আল্লাহ অবশ্যই জানতেন যে এমন এক যুগ আসবে যখন মানুষ অমুসলিম দেশে বসবাস করবে, এমনকি মুসলিম দেশেও ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা থাকবে না, ইসলামিক ফাইন্যান্স থাকবে না। তাই আল্লাহও এই যুগের কথা মাথায় রেখেই সুদ ভিত্তিক অর্থনীতির একটি রাস্তা বের করে রাখতেন এবং রসূল (ﷺ) -কে দিয়েও তা বাস্তবতার উদাহরণ সৃষ্টি করে রাখতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, যতটুকু আমাদের কল্যাণের জন্য প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই নির্দেশ দিয়েছেন। তাই সুদ সুদই, এটা সবসময়ের জন্য হারাম এবং কবীরাহ গুনাহ। কোনভাবেই এটাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে হালাল করার কোন উপায় নেই। আর আল্লাহর হুকুমের সাথে যুক্তি তর্কেরও কিছু নেই, তিনি যা করেছেন আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেছেন।

সুদ এমন একটি কবীরাহ গুনাহ যা সামাজিক ব্যাধি এবং গোটা সমাজের ক্ষতি করে । যিনাও একটি কবীরাহ গুনাহ যা মানুষ গোপনে একাকী করে থাকে। কিন্তু সুদ একটি প্রকাশ্য কবীরাহ গুনাহ যা মানুষ সকলের সামনে করে থাকে।

শয়তানের প্ররোচনা

আমরা জানি শয়তান নানাভাবে আমাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে থাকে। তবে সে খুব সহজেই দুর্বল ঈমানের অধিকারীদেরকে প্ররোচনা দিতে পারে কিন্তু শক্ত ঈমানদারদের খুব সহজে ধোকা দিতে পারে না, তখন সে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। যেমন : আমি একজন খুবই ভালমানের দ্বায়ী অর্থাৎ দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনকে নিয়োজিত করেছি, দ্বীন কায়েমের জন্য জান-মাল-সময় ব্যয় করছি অর্থাৎ দ্বীন ইসলামকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে। নিয়েছি। কিন্তু দেখা গেল শয়তান আমার মনের মধ্যে এমন চিন্তা ঢুকিয়ে দিল যে - “তুমি তো ইসলামের জন্য অনেক কিছু করেছো, সারাদিন এর জন্যই কাজ করছো, নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছো, এখন তুমি দুই একটা গুনাহ করলে। তেমন কিছু আসে যাবে না, কারণ তোমার ত্যাগের কাছে এই দুই একটা গুনাহ তেমন কিছুই না”। তখন আমরা শয়তানের এই ধরণের ধোকায় পরে মনে করতে পারি যে ঠিকই তো আমি তো সব কিছু করছি দ্বীনের জন্য, আমি সুদ লেন-দেন করছি, সুদে বাড়ি কিনছি, গাড়ি কিনছি তাও দ্বীনের জন্য, এতে দ্বীন উপকৃত হবে, এতে তো দোষের কিছু দেখছি না। এভাবে আস্তে আস্তে আমরা কবীরাহ গুনাহর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছি। মহান আল্লাহ যে সকল নির্দেশ সরাসরি কুরআনে দিয়ে দিয়েছেন তা কোন ভাবেই অমান্য করা যাবে না।

তাকওয়া :সব কিছুর মূলে হচ্ছে তাকওয়া। যে যতো তাকওয়াবান সে ততো দ্রুত আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য সদাজাগ্রত, সে কোন ভাবেই আল্লাহর কোন আইনের ব্যাপারে কোন প্রকার অজুহাত খুঁজবে না, যা শুনবে তাই মনে প্রাণে মেনে নিয়ে পালন করার চেষ্টা করবে। আমরা জানি যার তাকওয়া যতো উন্নতমানের তার ঈমান ততো মজবুত। এখন আমি যদি মনে করি আমার ঈমান খুব মজবুত কিন্তু আমি নিয়মিত সলাত আদায় করি না বা সুদ আদান প্রদান করি বা মিথ্যা কথা বলি! তাহলে এটা কেমন মজবুত ঈমান হলো?