hadith book logo

ঈমান-ইসলামের মূলভিত্তি ও ইসলামী আকীদা বিশ্বাস

লেখকঃ মুহাম্মাদ বিন জামীল যাইনূ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬৩

ইবাদতে শিরকের মাধ্যমে ঈমান নষ্ট

দ্বিতীয় ভাগঃ এতে আছে আল্লাহ তাআলা যে মাবুদ তাকে অস্বীকার করা বা তাঁর ইবাদতে কোন শিরক করা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলোঃ

তারা, যারা সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, গাছগাছালি, শয়তান ও অন্যান্য মাখলুকের ইবাদতকারী। আর তারা, যে আল্লাহ্ এই সমস্ত জিনিসের স্রষ্টা, তাঁর ইবাদত হতে বিরত থাকে। আর এই সমস্ত জিনিস না কারো ভাল করতে পারে আর না পারে ক্ষতি করতে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবি)

আর তার নিদর্শনের মধ্যে আছে রাত্র, দিবস, সূর্য, চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা কর না, চন্দ্রকেও নয়, বরং ঐ আল্লাহর সিজদা কর যিনি এদের সৃষ্টি করেছেন। যদি তোমরা সত্যিকার ভাবে তারই ইবাদত করতে চাও। (সূরা ফুসিসলাত ৩৭)

২। ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা এক আল্লাহর ইবাদত করে এবং তার ইবাদত করার সাথে সাথে অন্য মাখলুকের ও ইবাদত করে থাকে -যেমন আউলিয়াদের ইবাদত করে তাদের ছবি বা কবরকে সামনে রেখে- তারা ইসলামের পূর্বের মুশরিকদের সমতুল্য। কারণ তারাও আল্লাহর ইবাদত করত এবং যখনই প্রচন্ড বিপদে পড়ত একমাত্র তাকেঁই ডাকত। আর সুখের সময় অথবা বিপদ কেটে গেলে অন্যদের ডাকত। তাদের সম্পর্কে

আল্লাহ তাআলা আল-কোরআনে বলেনঃ

(আরবি)

আর যখন তারা কোন নৌকায় আরোহণ করত তখন ইখলাসের সাথে তাঁকে ডাকত। আর যখন তিনি তাদের রক্ষা করে তীরে পৌছিয়ে দিতেন, তখনই তারা তাঁর সাথে শিরক করত। (সূরা আনকাবুত ৬৫)

আল্লাহ তাআলা এদেরকে মুশরিক বলে বর্ণনা করেছেন যদিও তারা যখন নৌকাতে ডুবে যাওয়ার ভয় পেত তখন এক আল্লাহকে মনে প্রাণে ডাকত। কিন্তু তারা এ নীতির উপর সর্বদা চলত না। বরং যখন তিনি তাদের উদ্ধার করতেন তখন তারা অন্যকেও তাঁর সাথে ডাকত।

৩। আল্লাহ তাআলা ইসলামের পূর্বের আরবদের অবস্থা সম্পর্কে রাজী খুশী ছিলেন না, আর বিপদের সময়ে তাঁকে যে তারা ডাকত ঐ ইখলাসকেও গ্রহণ করতে রাজী ছিলেন না। ফলে তাদেরকে তিনি মুশরিক বলে সম্বোধন করেছিলেন। তাহলে বর্তমান যামানার কিছু সংখ্যক মুসলিম নামধারী লোক আজকাল সুখেরও দুঃখের উভয় সময় আউলিয়া বলে কথিত লোকদের কবরে আশ্রয় ও বিপদমুক্তি চায় তাদের সম্বন্ধে আপনাদের কি ধারণা? আর তাদের এমন সব জিনিস চায় যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো দেবার ক্ষমতা নেই। যেমন রোগ মুক্তি, রিযিক চাওয়া, হেদায়াত চাওয়া ও এই জাতীয় অন্যান্য জিনিস। আর তারা এই সমস্ত অলী-আল্লাহদের যিনি স্রষ্টা, তাকে তারা ভুলে থাকে। যিনি হচ্ছেন রোগে সুস্থতা দানকারী, রিযিকদাতা, হেদায়াত দানকারী। ঐ সমস্ত মৃত ব্যক্তিদের হাতে কোন ক্ষমতাই নেই। তার অন্যদের কান্নাকাটি শুনতেই পায় না। যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবি)

আর তোমরা তাকে ছেড়ে অন্যদের যে ডাকছ তারাতো সামান্যতম জিনিসেরও অধিকারী নয়। যদি তাদের কাছে দুআ করো তারাতো তোমার দু’আ শুনতেই পায় না। আর যদি শুনত, কক্ষণই তোমাদের উত্তর দিত না। আর তোমরা যে শিরক করছ তাকে কিয়ামতের দিন তারা পুরাপুরি অস্বীকার করে বসবে। আর আমার মত এইরকম খবরদার ছাড়া অন্য কেহ তোমাকে এইরকম সাবধানও করবে না। (সুরা ফাতির ১৩-১৪)

২। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বুঝিয়েছেন যে, মৃত ব্যক্তিদের যে ডাকা হয় তা তারা শুনতেও পায় না। আর এটাও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তাদের নিকট দু’আ করা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

হয়ত কেহ বলবেনঃ আমরা তো এই ধারণা পোষণ করি না যে, এই সমস্ত আউলিয়া ও নেককারগণ কোন ভাল বা মন্দ করার ক্ষমতা রাখে। বরং তাদেরকে মধ্যস্থতাকারী বা শাফায়াতকারী হিসাবে গ্রহণ করছি যাদের অসিলায় আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করি। তাদের উত্তরে আমরা বলবঃ ইসলামের পূর্বের মুশরিকরাও এই ধারনাই পোষণ করতো। তাদের সম্বন্ধে আল-কোরআন বলেছেঃ

(আরবি)

আর তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের যে ইবাদত করত তাদের না কোন ক্ষতি করতে পারত, আর না ভাল করতে পারত। তারা বলত, এরা হচ্ছে আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট শাফায়াতকারী। হে নবী আপনি বলুনঃ তোমরা কি আল্লাহকে এমন কোন কথা বলতে চাও যা আসমান ও জমিনের কেহ জানে না? সমস্ত পবিত্রতাতো আল্লাহর। আর এরা যে শিরক করেছে তিনি তার অনেক উর্ধ্বে। (সূরা ইউনুস ১৮)

এই আয়াত হতে এটা স্পষ্টই প্রতিয়মান হচ্ছে যে, যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের ইবাদত করে ও দু’আ করে তারা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত। যদি ও তাদের অন্তরে এটা থাকে যে, তারা ভাল বা মন্দ কিছুই করতে পারে না, বরং তারা শুধুমাত্র শাফায়াত করার অধিকারী।

আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের সম্পর্কে বলেনঃ

(আরবি)

আর যারা তাকে ছেড়ে অন্যদের আউলিয়া হিসাবে গ্রহণ করে, তারা বলে যে, আমরাতো তাদের ইবাদত করি এজন্য যে, তারা আমাদের আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করায়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা, তারা যে সমস্ত ব্যাপারে মতাবিরোধ করছে তার বিচার অবশ্যই করবেন। আল্লাহ তাআলা কখনো কোন মিথ্যাবাদী কাফিরদের হেদায়েত দান করবেন না। (সূরা যুমার ৩)

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে এটাই বলা হয়েছে যে, যারা আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের জন্য গাইরুল্লাহর নিকট দু’আ করবে তারা কাফির। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ (নিশ্চয়ই দু’আ হচ্ছে ইবাদত)। (বর্ণনায় তিরমিযি)

৪। ঈমান ভঙ্গকারী আমলের মধ্যে আছে, যদি এই ধারণা পোষণ করা হয় যে, আল্লাহ তাআলা যা অবতীর্ণ করেছেন তার দ্বারা বিচার করা বর্তমান যামানায় সম্ভব নয়। অথবা অন্যান্য যে মানুষের বানানো নিয়ম কানুন আছে তাকে যদি সহীহ মনে করা হয় তাহলেও সে কাফির। কারণ এই হুকুম দেওয়াটা হচ্ছে ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবি)

হুকুম দেওয়ার মালিক ত একমাত্র আল্লাহ। তিনি হুকুম করেছেন তাকে ছাড়া অন্যের ইবাদত করবে না। এটাই হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কিন্তু বেশীর ভাগ লোকেরাই এটা জানে না। (সূরা ইউসূফ ৪০)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবি)

অর্থাৎ আর যারা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নাজিলকৃত আয়াত দ্বারা বিচার করবে না তারাই হচ্ছে কাফির। (সূরা মায়েদা ৪৪)

আর যদি কেহ আল্লাহ্ কর্তৃক নাজিলকৃত কানূন ছাড়া অন্য আইন দ্বারা বিচার করে এই ধারণা করে যে, আল্লাহ প্রদত্ত আইনই সঠিক, কিন্তু মানুষের আইনে বিচার করে নিজের নফসানিয়াত অনুযায়ী অথবা কারো অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য, তবে সে জালিম ও ফাসিক। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর কাওল অনুযায়ী সে কাফির নয়। তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ কোন হুকুমকে অস্বীকার করে সে কাফির। আর যে উহাকে স্বীকার করে অথচ সেই অনুযায়ী বিচার করে না সে জালিম ও ফাসিক। ইহাকে ইবনে জরীর তবারী (রঃ) গ্রহণ করেছেন। আর আতা (রঃ) বলেনঃ (কুফর এর ছোট কুফরিও আছে)।

কিন্তু যদি কেহ আল্লাহর শরীয়তকে বাতিল করে ঐ স্থানে মানুষের বানানো কোন আইন কানুনের প্রচলন করে এই বিশ্বাসে যে, উহা এই যামানার জন্য উৎকৃষ্ট, তাবে সে কাফির হয়ে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। এতে কোন দ্বিমত নেই।

৫। ঈমান নষ্টকারী আমলের মধ্যে আছেঃ আল্লাহ প্রদত্ত বিচারে খুশী না থাকা অথবা এতটুকুও ধারনা করা যে, ঐ বিচার বড়ই সংকীর্ণ ও কষ্টদায়ক। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবি)

না, কখনো নয়, তোমর রবের কসম ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দেয় তাতে তোমাকে বিচারক না করে। তারপর তুমি যে বিচার করবে তাতে তাদের অন্তরে কোন কষ্ট অনুভব করবে না বরং তাকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করে নেবে। (সূরা নিসা ৬৫)

অথবা আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ বিচারকে অপছন্দ করা। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবি)

আর যারা কুফরি করে তাদের জন্য ধ্বংস, আর তাদের আমলসমূহ গোমরাহীতে পরিণত হবে। আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা তারা অপছন্দ করেছে। ফলে তাদের আমলসমূহকে তিনি নষ্ট করে দিয়েছেন। (সূরা মুহাম্মদ ৮-৯)