১
মুমিনের আমল ও চরিত্র যেমন হওয়া উচিত
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫৪
যাদের আমল বিনষ্ট হয়ে যায়
এমনকিছু বিষয় আছে যার কারণে মানুষের নেক আমলগুলো নষ্ট হয়ে যায়। নিচে এ বিষয়ে আলোচনা করা হল :
যারা কাফির তাদের আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
কাফিরদের কোন ভাল কাজ পরকালে কাজে আসবে না এবং আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন-
وَمَنْ يَّكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهٗ وَهُوْ فِي الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ
‘‘কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করলে তার কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং সে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’ (সূরা মায়িদা- ৫)
তিনি আরো বলেন-
اَلَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَصَدُّوْا عَنْ سَبِيْلِ اللهِ أَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ
‘‘যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথে (মানুষকে আসতে) বাধা দিয়েছে, আল্লাহ তাদের সকল আমল বরবাদ করে দিয়েছেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ১)
কাফিরদের আমলের তুলনা মরীচিকার সাথে :
وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ ۢبِقِيْعَةٍ يَّحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتّٰى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا
‘‘যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার মত। পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে তার নিকট উপস্থিত হলে দেখবে তা কিছুই নয় এবং সে সেথায় আল্লাহকে পাবে, অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেবেন। আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।’’ (সূরা নূর- ৩৯)
তাদের আমলের তুলনা ছাইয়ের সাথে :
مَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادِنِ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيْحُ فِيْ يَوْمٍ عَاصِفٍ - لَا يَقْدِرُوْنَ مِمَّا كَسَبُوْا عَلٰى شَيْءٍ ذٰلِكَ هُوْ الضَّلَالُ الْبَعِيْدُ
‘‘যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের আমলসমূহের উপমা হচ্ছে ছাইয়ের মত, যা ঝড়ের দিনের বাতাশ প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাবে না। এটা তো ঘোর বিভ্রামিত্ম।’’ (সূরা ইবরাহীম- ১৮)
তাদের আমলের কোন ওজন থাকবে না :
أُولٰئِكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهٖ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا نُقِيْمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيْامَةِ وَزْنًا
‘‘তারা ঐসকল লোক, যারা অস্বীকার করে তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে তাদের সাক্ষাতের বিষয়। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য ওজনের কোন ব্যবস্থা রাখব না।’’ (সূরা কাহ্ফ- ১০৩-১০৫)
এগুলো ধূলার মতো উড়িয়ে দেয়া হবে :
وَقَدِمْنَا إِلٰى مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنْثُوْرًا
‘‘আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।’’ (সূরা ফুরকান- ২৩)
ইসলামের কোন বিধানকে অপছন্দ করলে আমল নিস্ফল হয়ে যাবে :
وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَتَعْسًا لَّهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُم - ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوْا مَا أَنْزَلَ اللهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
‘‘আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য ধ্বংস এবং আল্লাহ তাদের আমল নিষ্ফল করে দিয়েছেন। কারণ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা তারা অপছন্দ করছে। তাই আল্লাহ তাদের আমল বরবাদ করে দিয়েছেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ৮-৯)
মুহাম্মাদ ﷺ এর আনীত শরঈ বিধানের কোনকিছুর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি কাফির যদিও সে উক্ত বিধানের উপর আমল করে।
আখেরাতকে অস্বীকার করলে আমল বিফলে যাবে :
وَالَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِاٰيَاتِنَا وَلِقَاءِ الْاٰخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
‘‘যারা আমার নিদর্শন ও আখেরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করে তাদের আমল নিষ্ফল হয়। তারা যা করে তদানুযায়ী তাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে। (সূরা আ‘রাফ- ১৪৭)
মুরতাদ (দ্বীনত্যাগী) হয়ে গেলে আমল বাতিল হয়ে যাবে :
وَمَنْ يَّرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِيْنِهٖ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِ وَأُولٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ
‘‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে ত্যাগ করবে, অতঃপর কাফের অবস্থায় মারা যাবে। দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে। আর তারা হবে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’’ (সূরা বাকারা- ২১৭)
সত্যের বিরোধিতা করলে আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَصَدُّوْا عَنْ سَبِيْلِ اللهِ وَشَاقُّوا الرَّسُوْلَ مِنْ ۢبَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدٰى لَنْ يَّضُرُّوا اللهَ شَيْئًا وَّسَيُحْبِطُ أَعْمَالَهُمْ
‘‘যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথে (মানুষকে আসতে) বাধা দিয়েছে এবং হেদায়াতের পথ তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসূলের সাথে ঝগড়া করেছে, তারা বাস্তবে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বরং আল্লাহ তাদের সব আমল বরবাদ করে দেবেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ৩২)
মুনাফিকদের আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
ذٰلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوْا مَا أَسْخَطَ اللهَ وَكَرِهُوْا رِضْوَانَهٗ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
‘‘এটা এ কারণেই হবে যে, তারা (মুনাফিকরা) এমন পথে চলেছে, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করেছে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে তারা অপছন্দ করেছে। তাই তিনি তাদের সব আমলকে বরবাদ করে দিয়েছেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ২৮)
যারা খাঁটি মনে ঈমান এনে মুসলিম হয়েছে বটে কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বা অসচেনতার কারণে কখনো ছোটখাট নিফাকের কাজ করে ফেলে। কিন্তু পরক্ষণেই লজ্জিত হয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় তারা উল্লেখিত আয়াতের বিধানে পড়বে না বরং এ বিধান এমন মুনাফিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা প্রকৃত মুনাফিক। এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল : বাইরে ঈমান প্রকাশ করে ভেতরে কুফরীর ভিত্তি মজবুত করা, ঈমানদারদেরকে সহ্য করতে না পারা, দ্বীন প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করা ইত্যাদি।
সত্য প্রচারকদেরকে হত্যা করলে আমল বরবাদ হবে :
إِنَّ الَّذِيْنَ يَكْفُرُوْنَ بِاٰيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُوْنَ النَّبِيِّيْنَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَّيَقْتُلُوْنَ الَّذِيْنَ يَأْمُرُوْنَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ - أُولٰئِكَ الَّذِيْنَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِ وَمَا لَهُمْ مِّنْ نَّاصِرِيْنَ
‘‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করেছে এবং অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করেছে, আরো হত্যা করেছে তাদেরকে যারা ইনসাফের নির্দেশ দেয়। তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ শুনিয়ে দাও। এরা তো সেই সব লোক দুনিয়া ও আখেরাতে যাদের সকল আমল বরবাদ হয়ে গেছে। তাদের কোন সাহায্যকারীও থাকবে না।’’ (সূরা আলে ইমরান : ২১-২২)
শিরক করলে আমল বরবাদ হবে :
আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা জঘন্য অপরাধ। যে ব্যক্তি ইবাদাতের ক্ষেত্রে বা আল্লাহর গুণাবলী ও ক্ষমতার সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে সে ব্যক্তি মুশরিক বলে গণ্য হবে। এমন ব্যক্তির অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য এবং তার কোন প্রকার সৎকর্মই গ্রহণযোগ্য হবে না।
وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ
‘‘নিশ্চয় তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, তুমি যদি আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন কর তবে নিঃসন্দেহে তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’ (সূরা যুমার- ৬৫)
مَا كَانَ لِلْمُشْرِكِيْنَ أَنْ يَّعْمُرُوْا مَسَاجِدَ اللهِ شَاهِدِيْنَ عَلٰى أَنْفُسِهِمْ بِالْكُفْرِ أُولٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ وَفِي النَّارِ هُمْ خَالِدُوْنَ
‘‘মুশরিকরা যেহেতু নিজেরাই নিজেদের কুফরী স্বীকার করে এমতাবস্থায় তারা আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে- এটা হতে পারে না। তারা এমন লোক যাদের সমস্ত আমল ব্যর্থ হয়ে গেছে এবং তারা জাহান্নামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।’’ (সূরা তওবা- ১৭)
وَلَوْ أَشْرَكُوْا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
‘‘তারা যদি শিরক করত তবে তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হয়ে যেত।’’
(সূরা আন‘আম- ৮৮)
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, আমি শরীকদের থেকে উর্ধ্বে। যে ব্যক্তি কোন নেক আমল করে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করে আমি তার সেই আমলকে শরীকদের জন্য ছেড়ে দেই। (মুসলিম)
নিজের আমল দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির সাথে সৃষ্ট জীবের সন্তুষ্টি অথবা নিজের সুখ্যাতি এমনকি লোকমুখে নিজের প্রশংসা শুনে আমল আরো বাড়িয়ে দেয়া, এটা নিঃসন্দেহে রিয়া ও গোপন শিরক।
লোক দেখানো আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের জন্য যে বিষয়টিকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হল ছোট শিরক। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কী? উত্তরে রাসূল ﷺ বললেন, রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানো আমল।
(আহমাদ, শারহু সুন্নাহ, বায়হাকী, সিলসিলা সহীহা হা: ৯৫১)
আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! এক ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সওয়াব এবং মানুষের কাছে সুনাম অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছে। তার প্রাপ্য কী? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে কিছুই পাবে না। লোকটি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে তিনবার একই প্রশ্ন করলে তিনি তিনবারই বললেন, সে কিছুই পাবে না। অতঃপর রাসূলূল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্যই করা হয় এবং এর মাধ্যমে শুধু তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করা হয়। (সুনান নাসায়ী, সহীহ আত-তরগীব, সিলসিলা সহীহা- হা: ৫)
কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে আমলের প্রতিদান দেবেন, তখন লোকদেখানো আমলকারীদেরকে বলবেন, তোমরা তোমাদের আমলের প্রতিদান নেয়ার জন্য তাদের কাছে যাও যাদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে তোমরা আমল করেছিলে। তারপর দেখ, তোমাদের জন্য কোন প্রতিদান আছে কিনা। (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান)
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি সুখ্যাতি লাভের জন্য সৎকর্ম করবে, আল্লাহ তা‘আলাও তার সাথে এমন ব্যবহার করবেন যার ফলে সে ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত হবে।’’
তাফসীরে কুরতুবীতে আছে, হাসান বসরী (রহ:) কে ইখলাস ও রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, ইখলাস হচ্ছে ভাল কাজের গোপনীয়তা পছন্দ করা এবং মন্দ কাজের গোপনীয়তা পছন্দ না করা। এরপর যদি আল্লাহ তা‘আলা তোমার আমল মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেন, তবে তুমি এ কথা বল, হে আল্লাহ! এটা আপনার অনুগ্রহ ও কৃপা; আমার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফল নয়।
যে আমল খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে এবং লোকমুখে সুখ্যাতি ও প্রশংসার প্রতি কোন ভ্রুÿÿপ থাকে না, সে আমল যদি আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করে লোকের মাঝে প্রসিদ্ধ করে দেন এবং মানুষের মুখ দিয়ে প্রশংসা করিয়ে দেন, তবে রিয়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এটা মুমিনের জন্য (আমল কবুল হওয়ার) অগ্রিম সুসংবাদ।
দান করে খোটা দিলে ঐ দান বিনষ্ট হয়ে যায় :
যদি কেউ কাউকে কিছু দান করার পর খোটা দেয় বা তিরস্কার করে তবে সে ব্যক্তির সে-ই দানটুকু বরবাদ হয়ে যাবে। সে যে সওয়াবটুকু লাভ করেছিল তিরস্কার করার ফলে সে উক্ত সওয়াব হতে বঞ্চিত হবে। এরূপ ব্যক্তির দান সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْاَذٰى كَالَّذِيْ يُنْفِقُ مَالَهٗ رِئَاءَ النَّاسِ
‘‘হে ঈমানদারগণ! খোটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বরবাদ করো না, ঐ ব্যক্তির মত যে লোকদেখানোর জন্য তার মাল খরচ করে।’’
(সূরা বাকারা : ২৬৪)
তবে কেউ কারো বিবেককে জাগ্রত করার জন্য বা সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য কৃত উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তা খোটা বা তিরস্কার হিসেবে গণ্য হবে না। শর্ত হল, এতে নিজের বড়ত্ব প্রকাশ ও অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার মত কোন উদ্দেশ্য থাকবে না।
আসরের নামায ছেড়ে দিলে আমল বরবাদ হয়ে যায় :
রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দিল তার আমল বরবাদ হয়ে গেল।’’ (সহীহুল বুখারী, আহমাদ হা: ২২৯৫৭, ২২৯৫৯)
রাসূল ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব নেয়া হবে। যদি নামাযের হিসাব ভাল হয় তাহলে তার সমস্ত আমল ঠিক থাকবে। আর যদি নামাযের হিসাব নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। (সহীহ আত-তারগীব হা: ৩৬৯)
কিয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম যে হিসাব নেয়া হবে তা হচ্ছে নামায। তার নামাযের দিকে তাকানো হবে; যদি তা ভাল হয় তবে সে সফল হয়ে গেলো আর যদি তা বিনষ্ট হয় তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হল।
(সহীহ আত-তারগীব হা: ৩৭০)
যারা কাফির তাদের আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
কাফিরদের কোন ভাল কাজ পরকালে কাজে আসবে না এবং আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন-
وَمَنْ يَّكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهٗ وَهُوْ فِي الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ
‘‘কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করলে তার কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং সে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’ (সূরা মায়িদা- ৫)
তিনি আরো বলেন-
اَلَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَصَدُّوْا عَنْ سَبِيْلِ اللهِ أَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ
‘‘যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথে (মানুষকে আসতে) বাধা দিয়েছে, আল্লাহ তাদের সকল আমল বরবাদ করে দিয়েছেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ১)
কাফিরদের আমলের তুলনা মরীচিকার সাথে :
وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ ۢبِقِيْعَةٍ يَّحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتّٰى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا
‘‘যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার মত। পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে তার নিকট উপস্থিত হলে দেখবে তা কিছুই নয় এবং সে সেথায় আল্লাহকে পাবে, অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেবেন। আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।’’ (সূরা নূর- ৩৯)
তাদের আমলের তুলনা ছাইয়ের সাথে :
مَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادِنِ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيْحُ فِيْ يَوْمٍ عَاصِفٍ - لَا يَقْدِرُوْنَ مِمَّا كَسَبُوْا عَلٰى شَيْءٍ ذٰلِكَ هُوْ الضَّلَالُ الْبَعِيْدُ
‘‘যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের আমলসমূহের উপমা হচ্ছে ছাইয়ের মত, যা ঝড়ের দিনের বাতাশ প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাবে না। এটা তো ঘোর বিভ্রামিত্ম।’’ (সূরা ইবরাহীম- ১৮)
তাদের আমলের কোন ওজন থাকবে না :
أُولٰئِكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهٖ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا نُقِيْمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيْامَةِ وَزْنًا
‘‘তারা ঐসকল লোক, যারা অস্বীকার করে তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে তাদের সাক্ষাতের বিষয়। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য ওজনের কোন ব্যবস্থা রাখব না।’’ (সূরা কাহ্ফ- ১০৩-১০৫)
এগুলো ধূলার মতো উড়িয়ে দেয়া হবে :
وَقَدِمْنَا إِلٰى مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنْثُوْرًا
‘‘আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।’’ (সূরা ফুরকান- ২৩)
ইসলামের কোন বিধানকে অপছন্দ করলে আমল নিস্ফল হয়ে যাবে :
وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَتَعْسًا لَّهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُم - ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوْا مَا أَنْزَلَ اللهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
‘‘আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য ধ্বংস এবং আল্লাহ তাদের আমল নিষ্ফল করে দিয়েছেন। কারণ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা তারা অপছন্দ করছে। তাই আল্লাহ তাদের আমল বরবাদ করে দিয়েছেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ৮-৯)
মুহাম্মাদ ﷺ এর আনীত শরঈ বিধানের কোনকিছুর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি কাফির যদিও সে উক্ত বিধানের উপর আমল করে।
আখেরাতকে অস্বীকার করলে আমল বিফলে যাবে :
وَالَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِاٰيَاتِنَا وَلِقَاءِ الْاٰخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
‘‘যারা আমার নিদর্শন ও আখেরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করে তাদের আমল নিষ্ফল হয়। তারা যা করে তদানুযায়ী তাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে। (সূরা আ‘রাফ- ১৪৭)
মুরতাদ (দ্বীনত্যাগী) হয়ে গেলে আমল বাতিল হয়ে যাবে :
وَمَنْ يَّرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِيْنِهٖ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِ وَأُولٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ
‘‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে ত্যাগ করবে, অতঃপর কাফের অবস্থায় মারা যাবে। দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে। আর তারা হবে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’’ (সূরা বাকারা- ২১৭)
সত্যের বিরোধিতা করলে আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَصَدُّوْا عَنْ سَبِيْلِ اللهِ وَشَاقُّوا الرَّسُوْلَ مِنْ ۢبَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدٰى لَنْ يَّضُرُّوا اللهَ شَيْئًا وَّسَيُحْبِطُ أَعْمَالَهُمْ
‘‘যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথে (মানুষকে আসতে) বাধা দিয়েছে এবং হেদায়াতের পথ তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসূলের সাথে ঝগড়া করেছে, তারা বাস্তবে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বরং আল্লাহ তাদের সব আমল বরবাদ করে দেবেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ৩২)
মুনাফিকদের আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
ذٰلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوْا مَا أَسْخَطَ اللهَ وَكَرِهُوْا رِضْوَانَهٗ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
‘‘এটা এ কারণেই হবে যে, তারা (মুনাফিকরা) এমন পথে চলেছে, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করেছে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে তারা অপছন্দ করেছে। তাই তিনি তাদের সব আমলকে বরবাদ করে দিয়েছেন।’’ (সূরা মুহাম্মাদ- ২৮)
যারা খাঁটি মনে ঈমান এনে মুসলিম হয়েছে বটে কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বা অসচেনতার কারণে কখনো ছোটখাট নিফাকের কাজ করে ফেলে। কিন্তু পরক্ষণেই লজ্জিত হয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় তারা উল্লেখিত আয়াতের বিধানে পড়বে না বরং এ বিধান এমন মুনাফিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা প্রকৃত মুনাফিক। এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল : বাইরে ঈমান প্রকাশ করে ভেতরে কুফরীর ভিত্তি মজবুত করা, ঈমানদারদেরকে সহ্য করতে না পারা, দ্বীন প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করা ইত্যাদি।
সত্য প্রচারকদেরকে হত্যা করলে আমল বরবাদ হবে :
إِنَّ الَّذِيْنَ يَكْفُرُوْنَ بِاٰيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُوْنَ النَّبِيِّيْنَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَّيَقْتُلُوْنَ الَّذِيْنَ يَأْمُرُوْنَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ - أُولٰئِكَ الَّذِيْنَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِ وَمَا لَهُمْ مِّنْ نَّاصِرِيْنَ
‘‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করেছে এবং অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করেছে, আরো হত্যা করেছে তাদেরকে যারা ইনসাফের নির্দেশ দেয়। তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ শুনিয়ে দাও। এরা তো সেই সব লোক দুনিয়া ও আখেরাতে যাদের সকল আমল বরবাদ হয়ে গেছে। তাদের কোন সাহায্যকারীও থাকবে না।’’ (সূরা আলে ইমরান : ২১-২২)
শিরক করলে আমল বরবাদ হবে :
আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা জঘন্য অপরাধ। যে ব্যক্তি ইবাদাতের ক্ষেত্রে বা আল্লাহর গুণাবলী ও ক্ষমতার সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে সে ব্যক্তি মুশরিক বলে গণ্য হবে। এমন ব্যক্তির অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য এবং তার কোন প্রকার সৎকর্মই গ্রহণযোগ্য হবে না।
وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ
‘‘নিশ্চয় তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, তুমি যদি আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন কর তবে নিঃসন্দেহে তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’ (সূরা যুমার- ৬৫)
مَا كَانَ لِلْمُشْرِكِيْنَ أَنْ يَّعْمُرُوْا مَسَاجِدَ اللهِ شَاهِدِيْنَ عَلٰى أَنْفُسِهِمْ بِالْكُفْرِ أُولٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ وَفِي النَّارِ هُمْ خَالِدُوْنَ
‘‘মুশরিকরা যেহেতু নিজেরাই নিজেদের কুফরী স্বীকার করে এমতাবস্থায় তারা আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে- এটা হতে পারে না। তারা এমন লোক যাদের সমস্ত আমল ব্যর্থ হয়ে গেছে এবং তারা জাহান্নামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।’’ (সূরা তওবা- ১৭)
وَلَوْ أَشْرَكُوْا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
‘‘তারা যদি শিরক করত তবে তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হয়ে যেত।’’
(সূরা আন‘আম- ৮৮)
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, আমি শরীকদের থেকে উর্ধ্বে। যে ব্যক্তি কোন নেক আমল করে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করে আমি তার সেই আমলকে শরীকদের জন্য ছেড়ে দেই। (মুসলিম)
নিজের আমল দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির সাথে সৃষ্ট জীবের সন্তুষ্টি অথবা নিজের সুখ্যাতি এমনকি লোকমুখে নিজের প্রশংসা শুনে আমল আরো বাড়িয়ে দেয়া, এটা নিঃসন্দেহে রিয়া ও গোপন শিরক।
লোক দেখানো আমল বরবাদ হয়ে যাবে :
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের জন্য যে বিষয়টিকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হল ছোট শিরক। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কী? উত্তরে রাসূল ﷺ বললেন, রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানো আমল।
(আহমাদ, শারহু সুন্নাহ, বায়হাকী, সিলসিলা সহীহা হা: ৯৫১)
আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! এক ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সওয়াব এবং মানুষের কাছে সুনাম অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছে। তার প্রাপ্য কী? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে কিছুই পাবে না। লোকটি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে তিনবার একই প্রশ্ন করলে তিনি তিনবারই বললেন, সে কিছুই পাবে না। অতঃপর রাসূলূল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্যই করা হয় এবং এর মাধ্যমে শুধু তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করা হয়। (সুনান নাসায়ী, সহীহ আত-তরগীব, সিলসিলা সহীহা- হা: ৫)
কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে আমলের প্রতিদান দেবেন, তখন লোকদেখানো আমলকারীদেরকে বলবেন, তোমরা তোমাদের আমলের প্রতিদান নেয়ার জন্য তাদের কাছে যাও যাদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে তোমরা আমল করেছিলে। তারপর দেখ, তোমাদের জন্য কোন প্রতিদান আছে কিনা। (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান)
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি সুখ্যাতি লাভের জন্য সৎকর্ম করবে, আল্লাহ তা‘আলাও তার সাথে এমন ব্যবহার করবেন যার ফলে সে ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত হবে।’’
তাফসীরে কুরতুবীতে আছে, হাসান বসরী (রহ:) কে ইখলাস ও রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, ইখলাস হচ্ছে ভাল কাজের গোপনীয়তা পছন্দ করা এবং মন্দ কাজের গোপনীয়তা পছন্দ না করা। এরপর যদি আল্লাহ তা‘আলা তোমার আমল মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেন, তবে তুমি এ কথা বল, হে আল্লাহ! এটা আপনার অনুগ্রহ ও কৃপা; আমার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফল নয়।
যে আমল খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে এবং লোকমুখে সুখ্যাতি ও প্রশংসার প্রতি কোন ভ্রুÿÿপ থাকে না, সে আমল যদি আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করে লোকের মাঝে প্রসিদ্ধ করে দেন এবং মানুষের মুখ দিয়ে প্রশংসা করিয়ে দেন, তবে রিয়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এটা মুমিনের জন্য (আমল কবুল হওয়ার) অগ্রিম সুসংবাদ।
দান করে খোটা দিলে ঐ দান বিনষ্ট হয়ে যায় :
যদি কেউ কাউকে কিছু দান করার পর খোটা দেয় বা তিরস্কার করে তবে সে ব্যক্তির সে-ই দানটুকু বরবাদ হয়ে যাবে। সে যে সওয়াবটুকু লাভ করেছিল তিরস্কার করার ফলে সে উক্ত সওয়াব হতে বঞ্চিত হবে। এরূপ ব্যক্তির দান সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْاَذٰى كَالَّذِيْ يُنْفِقُ مَالَهٗ رِئَاءَ النَّاسِ
‘‘হে ঈমানদারগণ! খোটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বরবাদ করো না, ঐ ব্যক্তির মত যে লোকদেখানোর জন্য তার মাল খরচ করে।’’
(সূরা বাকারা : ২৬৪)
তবে কেউ কারো বিবেককে জাগ্রত করার জন্য বা সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য কৃত উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তা খোটা বা তিরস্কার হিসেবে গণ্য হবে না। শর্ত হল, এতে নিজের বড়ত্ব প্রকাশ ও অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার মত কোন উদ্দেশ্য থাকবে না।
আসরের নামায ছেড়ে দিলে আমল বরবাদ হয়ে যায় :
রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি আসরের নামায ছেড়ে দিল তার আমল বরবাদ হয়ে গেল।’’ (সহীহুল বুখারী, আহমাদ হা: ২২৯৫৭, ২২৯৫৯)
রাসূল ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব নেয়া হবে। যদি নামাযের হিসাব ভাল হয় তাহলে তার সমস্ত আমল ঠিক থাকবে। আর যদি নামাযের হিসাব নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। (সহীহ আত-তারগীব হা: ৩৬৯)
কিয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম যে হিসাব নেয়া হবে তা হচ্ছে নামায। তার নামাযের দিকে তাকানো হবে; যদি তা ভাল হয় তবে সে সফল হয়ে গেলো আর যদি তা বিনষ্ট হয় তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হল।
(সহীহ আত-তারগীব হা: ৩৭০)