১
শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১১
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস
১৯৪৭ সনের প্রথম স্বাধীনতা লাভের পর এতদাঞ্চলের জাতি ও রাষ্ট্র যেসব গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল, তন্মধ্যে এখানকার শিক্ষা-ব্যবস্থাই ছিল প্রধান- যার মৌলিক সমাধান হওয়া অপরিহার্য ছিল সর্বপ্রথম। কেননা একটা আদর্শবাদী দেশ ও রাষ্ট্রের পক্ষে শিক্ষা সমস্যাই হয় জীবন মরণের সমস্যা। বিশেষ করে এ কারনে যে, উত্তরাধিকার সূত্রে এতদাঞ্চলের জনগণ যে শিক্ষা ব্যবস্থা লাভ করেছিল, তার প্রতিষ্ঠাতা ও রূপকার ছিল তাদেরই প্রাক্তন প্রভু সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ। তারা এ দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিল তার স্বরূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করার জন্যে তিনটি কথা মৌলিকভাবে মনে রাখতে হবে। একটি হল এই যে, ইংরেজ ছিল তখন পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতার অগ্রণী। একটি বস্তুবাদী সাম্রাজ্যবাদী জাতি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই বস্তুবাদী চিন্তা ও দর্শনমূলক হবে; নিতান্ত বৈষয়িক ও উপস্থিত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ এবং নীতিহীন ভোগবাদ ও স্বার্থবাদই হবে সে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দৃষ্টিকোণ। এটি খুবই স্বাভাবিক কথা- এর ব্যতিক্রম ধারণামাত্র করা যেতে পারেনা। আর দ্বিতীয় কথা হল, ইংরেজ ছিল এদেশের বিজয়ী প্রভু, মালিক-মুখ্তার। সেই প্রভুরা এতদঞ্চলের অধিবাসীদের জন্যে যে শিক্ষাব্যবস্থা তৈরী করেছিল, তারা ছিল তাদের বিজিত গোলাম। গোলাম জাতির জন্যে এমন শিক্ষাব্যবস্থা তারা স্বভাবতই চালু করতে পারে না, যা এ গোলামদেরকে প্রভু বানিয়ে দিতে পারে কিংবা প্রভু হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারে। অন্য কথায়, গোলাম জাতিকে আরো গোলাম বানানোর উপযোগী শিক্ষাই তারা দিতে চেয়েছে, প্রভু বা স্বাধীন জাতির উপযোগী শিক্ষা নিশ্চয়ই দিতে চায়নি। আর তৃতীয়ত, একথাও উপেক্ষণীয় নয় যে, ইংরেজরা ছিল কট্টর খৃস্টান; তারা এই বিশাল অঞ্চলের রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল মুসলমানদের কাছ থেকে। আর এ রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নেবার সময় তারা প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল কেবলমাত্র মুসলামানদের তরফ থেকেই। এ কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা ছিল চরম মুসলিম বিদ্বেষী এবং মুসলমানদের ঘোরতর দুশমন। তারা স্পষ্টত বুঝতে পেরেছিল, মুসলমানদের জিহাদী শক্তির উৎস যে জীবন-দর্শন ও যে শিক্ষা ব্যবস্থা, তাকে নিঃশেষে খতম না করা পর্যন্ত এই লোকদের ওপর ইংরেজ শাসনের মজবুত বুনিয়াদ কায়েম হতে পারে না।
তাই একথা পরিষ্কার যে, ইংরেজের প্রবর্তিত সে শিক্ষা ব্যবস্থা স্বাধীন দেশ ও জনগণের জন্যে কোন দিক দিয়েই উপযুক্ত ছিল না, দেশ-বিভাগের পর তা এখানে একদিনের তরেও চালু থাকা উচিত ছিল না; বরং অনিতিবিলম্বে সে শিক্ষা ব্যবস্থা বদল করে এদেশের জনগণের উপযোগী একটি আদর্শ-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা একান্ত কর্তব্য ছিল। কিন্তু এ জাতির দুর্ভাগ্য এই যে, এদেশে তা করা হয়নি। পাকিস্তান উত্তর কালে শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা নিশ্চিত ও নিষ্কণ্টক করার জন্যেই দিনরাত ব্যতিব্যস্ত ছিল। মুসলিম জাতির আদর্শিক ভবিষ্যত নির্মাণের জন্যে অপরিহার্য ছিল যে শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, তার প্রতি একবিন্দু দৃষ্টি নিক্ষেপের ফুরসতও তাদের হয়নি কিংবা বলা যায়, ইংরেজের নিকট থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার কোন পরিবর্তন সাধনেরই প্রয়োজন বোধ করেননি তারা এবং তা করতেও চাননি। প্রয়োজন মেনে করেননি এ কারণে যে, শাসনযন্ত্রের সাথে জড়িত সব লোকই ছিল ইংরেজের অনুরূপ জীবন-দর্শন ও জীবন-ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট ও আস্থাবান। ফলে স্বাধীন দেশ ও জনগণের বেলায় যে তার ব্যতিক্রম কিছু হওয়া দরকার, তার চেতনাটুকু তাদের মনে জাগেনি। তারা একাজ করতে চাননি এজন্যে যে, তারা স্পষ্টত বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুসলিম নাগরিকদের উপযোগী এবং তাদের আদর্শিক চেতনার অনুরূপ শিক্ষাব্যবস্থা এদেশে চালু করা হলে তা শাসকদেরই নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলবে। এ কারণে একথা বললে অত্যুক্তি হবেনা যে, তারা ইচ্ছে করেই এ দেশের মুসলিম জনগণকে গোলাম বানানোরে উপযোগী, অধিকতর গোলামী চেতনা সৃষ্টিকারী এবং ইসলামের প্রতি চরম অবিশ্বাস সঞ্চারকারী সম্পূর্ণ গায়র-ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাই বলবত করে রেখেছিলেন। তাই বলতে চাই, এ জাতির ভাগ্য বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল সেই প্রথম দিনই, যেদিন এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তিত করার অপরিহার্য প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তা করা হয়নি।
তাই একথা পরিষ্কার যে, ইংরেজের প্রবর্তিত সে শিক্ষা ব্যবস্থা স্বাধীন দেশ ও জনগণের জন্যে কোন দিক দিয়েই উপযুক্ত ছিল না, দেশ-বিভাগের পর তা এখানে একদিনের তরেও চালু থাকা উচিত ছিল না; বরং অনিতিবিলম্বে সে শিক্ষা ব্যবস্থা বদল করে এদেশের জনগণের উপযোগী একটি আদর্শ-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা একান্ত কর্তব্য ছিল। কিন্তু এ জাতির দুর্ভাগ্য এই যে, এদেশে তা করা হয়নি। পাকিস্তান উত্তর কালে শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা নিশ্চিত ও নিষ্কণ্টক করার জন্যেই দিনরাত ব্যতিব্যস্ত ছিল। মুসলিম জাতির আদর্শিক ভবিষ্যত নির্মাণের জন্যে অপরিহার্য ছিল যে শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, তার প্রতি একবিন্দু দৃষ্টি নিক্ষেপের ফুরসতও তাদের হয়নি কিংবা বলা যায়, ইংরেজের নিকট থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার কোন পরিবর্তন সাধনেরই প্রয়োজন বোধ করেননি তারা এবং তা করতেও চাননি। প্রয়োজন মেনে করেননি এ কারণে যে, শাসনযন্ত্রের সাথে জড়িত সব লোকই ছিল ইংরেজের অনুরূপ জীবন-দর্শন ও জীবন-ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট ও আস্থাবান। ফলে স্বাধীন দেশ ও জনগণের বেলায় যে তার ব্যতিক্রম কিছু হওয়া দরকার, তার চেতনাটুকু তাদের মনে জাগেনি। তারা একাজ করতে চাননি এজন্যে যে, তারা স্পষ্টত বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুসলিম নাগরিকদের উপযোগী এবং তাদের আদর্শিক চেতনার অনুরূপ শিক্ষাব্যবস্থা এদেশে চালু করা হলে তা শাসকদেরই নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলবে। এ কারণে একথা বললে অত্যুক্তি হবেনা যে, তারা ইচ্ছে করেই এ দেশের মুসলিম জনগণকে গোলাম বানানোরে উপযোগী, অধিকতর গোলামী চেতনা সৃষ্টিকারী এবং ইসলামের প্রতি চরম অবিশ্বাস সঞ্চারকারী সম্পূর্ণ গায়র-ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাই বলবত করে রেখেছিলেন। তাই বলতে চাই, এ জাতির ভাগ্য বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল সেই প্রথম দিনই, যেদিন এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তিত করার অপরিহার্য প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তা করা হয়নি।