১
শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৮
কুরআন বিজ্ঞানের মৌলিক উদ্বোধক
একালের মুসলমানদের মধ্যে এই মারাত্মক ভুল ধারণা প্রবল হয়ে আছে যে, কুরআন ও সুন্নাহ নিতান্তই সংকীর্ণ ধর্মীয় শিক্ষার বাহন মাত্র; তা পড়লে ‘মোল্লা’ হওয়া যায়, বিজ্ঞানী হওয়া যায়না। এ ধারণা যে কতবড় ভুল তা একথা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, হার্বার্ট স্পেন্সার-এর ন্যায় বিজ্ঞানী-দার্শনিকও বলেছেনঃ ‘ধর্মই মূলত মানুষকে বস্তুবিজ্ঞান বা প্রকৃতিবিজ্ঞান শিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে’। আর কুরআন মজীদ তো প্রকৃতি বিজ্ঞান শিক্ষা ও অনুধাবনের খোলাখুলি নির্দেশ দিয়েছে। কাজেই কুরআনকে যদি নির্ভুলভাবে ও উপযুক্ত পদ্ধতিতে শিক্ষা দেয়া হয়, তাহলে লব্ধজ্ঞানের বদৌলতে বহু দার্শনিক ও বিজ্ঞানী তৈরী হতে পারে। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা তানতাবীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী কুরআনের আয়াতঃ
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ ثَمَرَاتٍ مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُهَا ۚ وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُود – وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالْأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَٰلِكٌَ
‘‘তুমি কি দেখছ না যে, আল্লাহ উর্ধ্বলোক থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তার সাহায্যে আমরা নানা বর্ণের ফল-মূল উৎপাদন করছিঃ পাহাড়গুলোর মধ্যে রয়েছে সাদা, লাল ও গাঢ় কালো বর্ণ। অনুরূপভাবে মানুষ, জীব-জন্তু ও গৃহপালিত পশুগুলোর বর্ণও নানা রকমের।’’ (সূরা ফাতিরঃ ২৭–২৮)
এর পরই বলা হয়েছেঃ
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
‘‘আসল কথা হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাহদের মধ্য থেকে কেবল জ্ঞানবান লোকেরাই আল্লাহকে ভয় করে।’’ (সূরা ফাতিরঃ ২৮)
বস্তুত প্রকৃতি-জ্ঞানই মানুষকে সত্যিকার বিজ্ঞানী বানায়। এই প্রকৃতি জ্ঞানই মানুষকে পানি, গাছ-পালা, লতা-গুল্ম, ফুল-ফল, পাহাড়, চন্দ্র, সূর্য ও বিভিন্ন বর্ণ ও রঙ সম্পর্কে গভীর ও সূক্ষ্ণভাবে চিন্তা-গবেষণা করার যোগ্য বানায়। আর দ্রব্যগুলো সম্পর্কিত জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহর অসীম কুদরত সম্পর্কে সম্যক অবহিত করতে পারে। স্পেন্সর যে বলেছেন, ‘প্রকৃতিজ্ঞান ও বিজ্ঞান ইবাদত-বিশেষ’ তা একবিন্দু মিথ্যা নয়। এই দ্রব্য-গুণ পরিচিতি লাভ করেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠতে বাধ্য হয়ঃ
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
‘‘হে আমাদের রব্ব! তুমি এগুলোর কিছুই নিরর্থক ও উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করনি। তুমি উদ্দেশ্যহীন কাজের বাতুলতা থেকে পবিত্র। অতএব তুমি আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা কর।’’ (আলে ইমরানঃ ১৯১)
এই প্রেক্ষিতেই নবী করীম (ﷺ) বলেছেনঃ
‘‘(আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে) এক ঘন্টা চিন্তা গবেষণা করা এক বছর বন্দেগী করার চেয়ে উত্তম।’’
একদা তিনি ইরশাদ করেনঃ
‘‘আজ রাত্রে আমার প্রতি এমন একটি আয়াত নাযিল হয়েছে, যে লোক সে আয়াতটি পড়লো কিন্তু তাতে গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করলোনা, সে প্রকৃত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। সে আয়াতটি হচ্ছেঃ
‘‘আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি, রাত্র-দিনের আবর্তন এবং জনকল্যাণমূলক দ্রব্যাদিসহ নদী-সমুদ্রে চলমান নৌকা-জাহাজ (এই সবের মধ্যে মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের প্রমাণ নিহিত)।’’
হার্বার্ট স্পেন্সরের এই কথাও সত্য যে, ‘বিজ্ঞান ধর্মকে শক্তিশালী করে এবং ধর্ম শক্তিশালী করে বিজ্ঞানকে’।
ইমাম গাজ্জালী বলেছেনঃ ধর্ম হচ্ছে সব রোগের ঐষধ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান হচ্ছে খাদ্য। ওষুধ খাদ্য অ-নির্ভর নয়, খাদ্যও নয় ওষুধ অ-নির্ভর।’
কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী ‘হিকমাহ’ শিক্ষা দেয়াও রাসূলে করীমের (ﷺ) এর দাযিত্ব। ইরশাদ হয়েছেঃ
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
‘‘আল্লাহ মুমিন লোকদের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন এভাবে যে, তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের নিকট আল্লাহর নিদর্শনাদি একের পর এক পেশ করছে এবং তাদেরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করছে আর সেই সঙ্গে তাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে কিতাব এবং গভীর ও সূক্ষ্ণ জ্ঞান-যদিও পূর্বে এরা সকলেই সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।’’ (সূরা আলে–ইমরানঃ ১৬৪)
ইমাম রাগেব লিখেছেনঃ
‘‘হিকমত অর্থ বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃত সত্যকে সঠিকভাবে জানা। অতএব আল্লাহর হিকমত বলতে বুঝায় বস্তু সংক্রান্ত সঠিক জ্ঞান ও পরম সুষ্ঠুভাবে দ্রব্যাদির উদ্ভাবন ও উৎপাদন করা। আর মানুষের হিকমত অর্থ, বিশ্বলোকে বিরাজমান দ্রব্যাদি সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান অর্জন এবং সেসবকে কল্যাণময় কাজে প্রয়োগ।’’
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ ثَمَرَاتٍ مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُهَا ۚ وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُود – وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالْأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَٰلِكٌَ
‘‘তুমি কি দেখছ না যে, আল্লাহ উর্ধ্বলোক থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তার সাহায্যে আমরা নানা বর্ণের ফল-মূল উৎপাদন করছিঃ পাহাড়গুলোর মধ্যে রয়েছে সাদা, লাল ও গাঢ় কালো বর্ণ। অনুরূপভাবে মানুষ, জীব-জন্তু ও গৃহপালিত পশুগুলোর বর্ণও নানা রকমের।’’ (সূরা ফাতিরঃ ২৭–২৮)
এর পরই বলা হয়েছেঃ
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
‘‘আসল কথা হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাহদের মধ্য থেকে কেবল জ্ঞানবান লোকেরাই আল্লাহকে ভয় করে।’’ (সূরা ফাতিরঃ ২৮)
বস্তুত প্রকৃতি-জ্ঞানই মানুষকে সত্যিকার বিজ্ঞানী বানায়। এই প্রকৃতি জ্ঞানই মানুষকে পানি, গাছ-পালা, লতা-গুল্ম, ফুল-ফল, পাহাড়, চন্দ্র, সূর্য ও বিভিন্ন বর্ণ ও রঙ সম্পর্কে গভীর ও সূক্ষ্ণভাবে চিন্তা-গবেষণা করার যোগ্য বানায়। আর দ্রব্যগুলো সম্পর্কিত জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহর অসীম কুদরত সম্পর্কে সম্যক অবহিত করতে পারে। স্পেন্সর যে বলেছেন, ‘প্রকৃতিজ্ঞান ও বিজ্ঞান ইবাদত-বিশেষ’ তা একবিন্দু মিথ্যা নয়। এই দ্রব্য-গুণ পরিচিতি লাভ করেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠতে বাধ্য হয়ঃ
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
‘‘হে আমাদের রব্ব! তুমি এগুলোর কিছুই নিরর্থক ও উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করনি। তুমি উদ্দেশ্যহীন কাজের বাতুলতা থেকে পবিত্র। অতএব তুমি আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা কর।’’ (আলে ইমরানঃ ১৯১)
এই প্রেক্ষিতেই নবী করীম (ﷺ) বলেছেনঃ
‘‘(আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে) এক ঘন্টা চিন্তা গবেষণা করা এক বছর বন্দেগী করার চেয়ে উত্তম।’’
একদা তিনি ইরশাদ করেনঃ
‘‘আজ রাত্রে আমার প্রতি এমন একটি আয়াত নাযিল হয়েছে, যে লোক সে আয়াতটি পড়লো কিন্তু তাতে গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করলোনা, সে প্রকৃত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। সে আয়াতটি হচ্ছেঃ
‘‘আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি, রাত্র-দিনের আবর্তন এবং জনকল্যাণমূলক দ্রব্যাদিসহ নদী-সমুদ্রে চলমান নৌকা-জাহাজ (এই সবের মধ্যে মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের প্রমাণ নিহিত)।’’
হার্বার্ট স্পেন্সরের এই কথাও সত্য যে, ‘বিজ্ঞান ধর্মকে শক্তিশালী করে এবং ধর্ম শক্তিশালী করে বিজ্ঞানকে’।
ইমাম গাজ্জালী বলেছেনঃ ধর্ম হচ্ছে সব রোগের ঐষধ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান হচ্ছে খাদ্য। ওষুধ খাদ্য অ-নির্ভর নয়, খাদ্যও নয় ওষুধ অ-নির্ভর।’
কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী ‘হিকমাহ’ শিক্ষা দেয়াও রাসূলে করীমের (ﷺ) এর দাযিত্ব। ইরশাদ হয়েছেঃ
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
‘‘আল্লাহ মুমিন লোকদের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন এভাবে যে, তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের নিকট আল্লাহর নিদর্শনাদি একের পর এক পেশ করছে এবং তাদেরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করছে আর সেই সঙ্গে তাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে কিতাব এবং গভীর ও সূক্ষ্ণ জ্ঞান-যদিও পূর্বে এরা সকলেই সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।’’ (সূরা আলে–ইমরানঃ ১৬৪)
ইমাম রাগেব লিখেছেনঃ
‘‘হিকমত অর্থ বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃত সত্যকে সঠিকভাবে জানা। অতএব আল্লাহর হিকমত বলতে বুঝায় বস্তু সংক্রান্ত সঠিক জ্ঞান ও পরম সুষ্ঠুভাবে দ্রব্যাদির উদ্ভাবন ও উৎপাদন করা। আর মানুষের হিকমত অর্থ, বিশ্বলোকে বিরাজমান দ্রব্যাদি সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান অর্জন এবং সেসবকে কল্যাণময় কাজে প্রয়োগ।’’