hadith book logo

শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২২

শিক্ষায় ধর্মের ভূমিকা

শিক্ষায় ধর্মের ভূমিকা কি? ধর্মের আদৌ কোন ভূমিকা আছে কিনা এবং বাস্তবিকই কোন ভূমিকা থাকতে হবে কিনা, এসব প্রশ্নের জবাব নির্ভর করে এই কথার ওপর যে, ‘শিক্ষা’ এবং ‘ধর্ম’ বলতে আমরা কি বুঝি। ‘শিক্ষা’ ও ‘ধর্ম’ সম্পর্কে বর্তমানে এমন কিছু ধারণা দুনিয়ার এক শ্রেণীর লোকদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে গেছে, যার দৃষ্টিতে এই ধরণের কোন ভূমিকার প্রশ্নই ওঠেনা। সত্যি কথা হচ্ছে, শিক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মের এরূপ কোন ভূমিকা থাকার অপরিহার্যতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার এবং যতটুকু ভূমিকা এখনও রয়েছে তাকেও সম্পূর্ণ নিঃশেষ ও নির্মূল করার উদ্দেশ্যেই শিক্ষা ও ধর্ম সম্পর্কে এরূপ ধারণা বিশেষভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই ধারণাকে যথার্থ ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ করার জন্যে প্রাণপন চেষ্টা করা হচ্ছে এবং যুক্তির পর যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই শ্রেণীর লোকদের মনোভাব হচ্ছে, শিক্ষার অঙ্গন থেকে ধর্মকে সর্ম্পূর্ণ বিতাড়িত করতে হবে, ধর্মের গোঁড়ামী বা কুসংস্কারের জঞ্জাল থেকে শিক্ষাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে, শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ ধর্মবিবর্জিত; কেননা তাদের মতে ধর্মমত শিক্ষাকে একদেশদর্শী, সংকীর্ণচেতা সেকেলে এবং অলৌকিক ও অতি-প্রাকৃত (Super Natural) জগত সংক্রান্ত বিষয়াদি দ্বারা ভারাক্রান্ত করে দেয়। অথচ শিক্ষাকে হতে হবে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ, ব্যবহারিক এবং লৌকিক জীবনের সার্বিক উন্নয়ন ও সুখ-সাচ্ছন্দ্য বিধানে সহায়ক। অলৌকিক বা অতি-প্রাকৃত বিষয়াদির জ্ঞান নিত্য-নিমিত্তিক জীবন সমস্যার সমাধানে মানুষকে কিছুমাত্র পথ দেখাতে পারেনা। কিভাবে মাটির গভীর তলা খুঁড়ে তেল, কয়লা, গ্যাস কিংবা অন্যান্য খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও উত্তোলন করতে হবে, কিভাবে সমুদ্র গর্ভে ডুব দিয়ে মণিমুক্তা আহরণ করতে হবে, কেমন করে চাঁদে বা মঙ্গল গ্রহে গমণের রকেট নির্মাণ করতে হবে, কেমন করে আণবিক বোমা তৈরী করতে হবে এবং শক্তিশালী শত্রু পক্ষকে দমন বা খতম করার জন্যে নতুন নতুন মারণাস্ত্র নির্মাণ করতে হবে, ধর্ম তা মানুষকে শিখাতে পারেনা; বরং অনেক সময় ধর্মমত মানুষকে এইসব কাজ থেকে বিরতই রাখতে চায়। তাহলে ধর্মকে শিক্ষার ক্ষেত্রে টেনে আনাই ভুল; টেনে আনা হলে বরং জীবনের বিকাশ, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে চরম পশ্চাদপদতাকেই মেনে নিতে হবে। অথচ মানব জীবন বিকাশমান, ক্রম-উন্নয়নমুখী ও প্রচণ্ড গতিশীল। ধর্মের প্রভাবমুক্ত শিক্ষাই এই জীবনের সাথে সঙ্গতি ও সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পারে। পক্ষান্তরে ধর্ম প্রভাবিত শিক্ষা মানুষকে নিতান্তই কূপমণ্ডুক বানিয়ে দেয়। আধুনিক গতিশীল জগতে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হওয়া তো দূরের কথা, জীবনে বেঁচে থাকা ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও তা সম্পূর্ণ অসম্ভব করে তোলে। এইরূপ অবস্থা স্বীকার করে নেয়া কোন বুদ্ধিমান জাতির পক্ষেই সমীচীন নয়।

বস্তুত শিক্ষা ও ধর্ম-সম্পর্কিত এই ধারণাই বর্তমান দুনিয়ায় প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা এরূপ ধারণা ও মনোভাবের ওপরই গড়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মের ভূমিকা থাকার কথাই হাস্যকর। একারণেই বর্তমান দুনিযার মুসলিম জাতিকে এই বলে উপহাস করা হয় যে, দুনিয়া কোথা থেকে কোথায় চলে গেল আর এরা এখনও ‘ধর্ম ধর্ম’ করে চিৎকার করে বেড়াচ্ছে। এরা বর্তমান দুনিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলারই অযোগ্য। আজ হোক আর কাল হোক এরা দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

এক কথায় বলা চলে, এই যা কিছু বললাম তা পুরোপুরি বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই কথা। বর্তমান দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ এই বস্তুবাদেই বিশ্বাসী। তারা শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনের কোন ক্ষেত্রেই ধর্মকে বরদাশ্‌ত করতে প্রস্তুত নয়। অবশ্য বস্তুবাদী এই দৃষ্টিকোণ ও মনোভঙ্গি আজকের নতুন ব্যাপার নয়। প্রায় ৮-৯ শত বৎসর পূর্বেই এই দৃষ্টিকোণ জেগে উঠেছে এবং বিগত শতাব্দীসমূহের মধ্যে সারা বিশ্বাব্যাপী এর ব্যাপক প্রচার, প্রসার ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। বর্তমান কালের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূলে রয়েছে এই দৃষ্টিকোণ। কাজেই শিক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মের কোন ভূমিকা থাকা উচিত কিনা, সে বিষয় বিচার-বিবেচনার পূর্বে এই মৌলিক দৃষ্টিকোণটির পর্যালোচনা এবং সুস্থ চিন্তার মানদণ্ডে এর যাচাই-পরখ হওয়া একান্তই আবশ্যক। এই বিচার-বিবেচনা ও যাচাই-পরখে যদি এ দৃষ্টিকোণ ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলেই শিক্ষা তথা জীবন-পরিসরে ধর্মের ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা সুস্পষ্ট করে বলা সম্ভব হতে পারে।