১
শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৩
বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণের পর্যালেচনা
বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণের মর্মমূলে নিহিত রয়েছে বিশ্বলোক ও মানুষ সম্পর্কিত বস্তুবাদী ধারণা। দুনিয়ার মানুষের জেগে ওঠা সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিশ্বলোক কি স্বয়ম্ভূ, না এর কোন সৃষ্টিকর্তা রয়েছে? এরই আনুসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, এ বিশ্বলোক কি কোন স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণাধীনে পরিচালিত না আপনা-আপনি চলমান? মানুষ কি ‘বস্তুর’ই ক্রমবিকাশের ফসল, না তার সৃষ্টিকর্তা কেউ আছেন এবং মানুষ তাঁর আনুগত্য করে চলতে বাধ্য?
বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নের দু’রকম জবাব দেয়া হয়েছে। একটি জবাবে আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হয়েছে। তাতে আল্লাহর প্রয়োজনীয়তাকেই উড়িয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, বস্তুর ক্রমবিকাশের ফসলই এই বিশ্ব-চরাচর এবং এর মধ্যকার সব সৃষ্টবস্তু উদ্ভিদ, জীব-জন্তু, প্রাণীকুল ও মানুষ স্বতঃই অস্তিত্বমান হয়ে উঠেছে। এই বিশ্বলোকের পরিচালক কেউ নেই-কাউকে তেমন থাকতে হবে, তাও নিষ্প্রয়োজন। কাজেই মানুষকে এখানে স্বীয় বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী জীবন যাপন করতে হবে। কোন স্রষ্টা নেই বলে কাউকে মেনে চলারও কোন প্রশ্ন ওঠেনা। মানুষের পরিণতি বলতে বুঝায় তার জীবন অবসান অর্থাৎ মৃত্যু। মৃত্যুর পর আর কিছু নেই। অতএব এই জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নতি-সমৃদ্ধি অর্জনই দুনিয়ায় মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে পূর্ণ সাফল্যের সাথে উত্তরণ যে শিক্ষার সহায়তায় সম্ভব, এখানে মানুষের জন্য তা-ই হতে পারে একমাত্র কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা।
শিক্ষা সম্পর্কে এই সিদ্ধান্ত বস্তুবাদী দর্শনের যৌক্তিক পরিণতি; কিন্তু অনাবিল দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে বিচার করলে এই দর্শনটাই সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়।
আধুনিক বিজ্ঞান ‘বস্তু’র যে বিশ্লেষণ দিয়েছে, তাতে সে তার ‘বস্তুত্ব’ই হারিয়ে ফেলেছে। এ কালে বস্তুর প্রাক্কালীন রূপ হচ্ছে ‘শক্তি (Energy)। আর এই ‘শক্তি’র যে পরিচিতি সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে জানা গেছে, তা হচ্ছে এমন শক্তি, যার সঠিক পরিচয় কুরআন মাজীদে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহর নামে। তাই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়েই বলতে চাই, আল্লাহতে অবিশ্বাসীরাও নিজেদেরই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়েছে আল্লাহর শক্তিকে স্বীকার করে নিতে। বস্তুত এই বিশ্বলোক যে স্বয়ম্ভূ নয়, আল্লাহর সৃষ্টি, তারই নিয়ন্ত্রণাধীন এবং মানুষ মহান স্রষ্টার এক বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি- এখানে তাঁরই আনুগত্য করে চলাই তার একমাত্র কর্তব্য, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এই সত্য ভাস্বর হয়ে উঠেছে। তাতে কুরআনের এ ঘোষণারই বাস্তবতা প্রমাণিত হয়েছেঃ ‘‘আর আসমান ও যমিনে যাকিছু আছে, তারা সবাই তাঁরই আনুগত্য করে চলেছে’’। যদিও এদের মন-মগজ থেকে আল্লাহ-অস্বীকৃতির ভাবধারা এবং আল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ এখনও একবিন্দু কমে যায়নি।
এই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণে একথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, শুধু শিক্ষাই নয়, মানব জীবনের কোন একটি ব্যাপারেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে না। আর আল্লাহকে স্বীকার করে নেয়ার পর যে শিক্ষা-দর্শন তৈরী করা যেতে পারে তা হল সেই শিক্ষা, যার মাধ্যমে গভীর, সূক্ষ্ণ ও বিস্তারিতভাবে অনুধাবন করা যাবে মহান আল্লাহর সীমাহীন কুদরত, কুরআনে বিধৃত তাঁর সুমহান গুণাবলীর বাস্তব রূপ, তাঁর মৌলিক সৃষ্টি-উদ্দেশ্য, তার সৃষ্টি বস্তু ও মানুষের জীবন-লক্ষ্য, দায়-দায়িত্ব ও ব্যবহারিক গুণাবলী; সেই সঙ্গে জানা যাবে কোন্ ধরণের জীবন যাপনে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ ও অকল্যাণ নিহিত। যে শিক্ষা আদতেই মানুষকে মৌলিক বিষয়ে সুশিক্ষিত ও পুরোপুরি ওযাকিফহাল বানায় না, সে শিক্ষা জন্তুর জন্যে গ্রহণীয় হলেও মানুষের জন্যে নয় কিংবা সে শিক্ষা জন্তু বানানোর জন্যে উপযোগী হলেও মানুষ বানানোর জন্যে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেননা স্রষ্টার সৃষ্টি-কৌশলের দরুণ জন্তু ও মানুষ একই প্রজাতিভুক্ত নয়; একই রকমের জীবন-লক্ষ্য, দায়-দায়িত্ব ও পরিণাম-পরিণতিও নয় উভয়ের। এই দুই সৃষ্টির শিক্ষা দশর্ন ও শিক্ষণীয় বিষয় কখনও এক ও অভিন্ন হতে পারে না। অথচ মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মনুষ্যত্ব রক্ষার জন্যে শিক্ষা একান্তই অপরিহার্য এবং সে শিক্ষা তাকে বাইরে থেকেই অর্জন করতে হবে। বতর্মান কালে মানুষের জন্যে যে শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, তাতে মানুষকে একটা জীবমাত্র ধরে নেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র জীব হিসেবে সফল জীবন যাপনের উপযুক্ত বানানোই বতর্মান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রচলিত শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য। [Huxley: Man in The Modern World দ্রষ্টব্য]
বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নের দু’রকম জবাব দেয়া হয়েছে। একটি জবাবে আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হয়েছে। তাতে আল্লাহর প্রয়োজনীয়তাকেই উড়িয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, বস্তুর ক্রমবিকাশের ফসলই এই বিশ্ব-চরাচর এবং এর মধ্যকার সব সৃষ্টবস্তু উদ্ভিদ, জীব-জন্তু, প্রাণীকুল ও মানুষ স্বতঃই অস্তিত্বমান হয়ে উঠেছে। এই বিশ্বলোকের পরিচালক কেউ নেই-কাউকে তেমন থাকতে হবে, তাও নিষ্প্রয়োজন। কাজেই মানুষকে এখানে স্বীয় বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী জীবন যাপন করতে হবে। কোন স্রষ্টা নেই বলে কাউকে মেনে চলারও কোন প্রশ্ন ওঠেনা। মানুষের পরিণতি বলতে বুঝায় তার জীবন অবসান অর্থাৎ মৃত্যু। মৃত্যুর পর আর কিছু নেই। অতএব এই জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নতি-সমৃদ্ধি অর্জনই দুনিয়ায় মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে পূর্ণ সাফল্যের সাথে উত্তরণ যে শিক্ষার সহায়তায় সম্ভব, এখানে মানুষের জন্য তা-ই হতে পারে একমাত্র কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা।
শিক্ষা সম্পর্কে এই সিদ্ধান্ত বস্তুবাদী দর্শনের যৌক্তিক পরিণতি; কিন্তু অনাবিল দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে বিচার করলে এই দর্শনটাই সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়।
আধুনিক বিজ্ঞান ‘বস্তু’র যে বিশ্লেষণ দিয়েছে, তাতে সে তার ‘বস্তুত্ব’ই হারিয়ে ফেলেছে। এ কালে বস্তুর প্রাক্কালীন রূপ হচ্ছে ‘শক্তি (Energy)। আর এই ‘শক্তি’র যে পরিচিতি সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে জানা গেছে, তা হচ্ছে এমন শক্তি, যার সঠিক পরিচয় কুরআন মাজীদে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহর নামে। তাই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়েই বলতে চাই, আল্লাহতে অবিশ্বাসীরাও নিজেদেরই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়েছে আল্লাহর শক্তিকে স্বীকার করে নিতে। বস্তুত এই বিশ্বলোক যে স্বয়ম্ভূ নয়, আল্লাহর সৃষ্টি, তারই নিয়ন্ত্রণাধীন এবং মানুষ মহান স্রষ্টার এক বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি- এখানে তাঁরই আনুগত্য করে চলাই তার একমাত্র কর্তব্য, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এই সত্য ভাস্বর হয়ে উঠেছে। তাতে কুরআনের এ ঘোষণারই বাস্তবতা প্রমাণিত হয়েছেঃ ‘‘আর আসমান ও যমিনে যাকিছু আছে, তারা সবাই তাঁরই আনুগত্য করে চলেছে’’। যদিও এদের মন-মগজ থেকে আল্লাহ-অস্বীকৃতির ভাবধারা এবং আল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ এখনও একবিন্দু কমে যায়নি।
এই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণে একথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, শুধু শিক্ষাই নয়, মানব জীবনের কোন একটি ব্যাপারেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে না। আর আল্লাহকে স্বীকার করে নেয়ার পর যে শিক্ষা-দর্শন তৈরী করা যেতে পারে তা হল সেই শিক্ষা, যার মাধ্যমে গভীর, সূক্ষ্ণ ও বিস্তারিতভাবে অনুধাবন করা যাবে মহান আল্লাহর সীমাহীন কুদরত, কুরআনে বিধৃত তাঁর সুমহান গুণাবলীর বাস্তব রূপ, তাঁর মৌলিক সৃষ্টি-উদ্দেশ্য, তার সৃষ্টি বস্তু ও মানুষের জীবন-লক্ষ্য, দায়-দায়িত্ব ও ব্যবহারিক গুণাবলী; সেই সঙ্গে জানা যাবে কোন্ ধরণের জীবন যাপনে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ ও অকল্যাণ নিহিত। যে শিক্ষা আদতেই মানুষকে মৌলিক বিষয়ে সুশিক্ষিত ও পুরোপুরি ওযাকিফহাল বানায় না, সে শিক্ষা জন্তুর জন্যে গ্রহণীয় হলেও মানুষের জন্যে নয় কিংবা সে শিক্ষা জন্তু বানানোর জন্যে উপযোগী হলেও মানুষ বানানোর জন্যে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেননা স্রষ্টার সৃষ্টি-কৌশলের দরুণ জন্তু ও মানুষ একই প্রজাতিভুক্ত নয়; একই রকমের জীবন-লক্ষ্য, দায়-দায়িত্ব ও পরিণাম-পরিণতিও নয় উভয়ের। এই দুই সৃষ্টির শিক্ষা দশর্ন ও শিক্ষণীয় বিষয় কখনও এক ও অভিন্ন হতে পারে না। অথচ মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মনুষ্যত্ব রক্ষার জন্যে শিক্ষা একান্তই অপরিহার্য এবং সে শিক্ষা তাকে বাইরে থেকেই অর্জন করতে হবে। বতর্মান কালে মানুষের জন্যে যে শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, তাতে মানুষকে একটা জীবমাত্র ধরে নেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র জীব হিসেবে সফল জীবন যাপনের উপযুক্ত বানানোই বতর্মান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রচলিত শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য। [Huxley: Man in The Modern World দ্রষ্টব্য]