১
শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪
শিক্ষার মূল্যায়ন
শিক্ষা সম্পর্কে একটা ধারণা হচ্ছে, তা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিসমূহের বিকাশ সাধন করে। তাই সূক্ষ্ণ ও সুকোমল হৃদয়াবেগ পরিমার্জিতকরণের উদ্দেশ্যেই শিক্ষা অর্জন করতে হবে। কিন্তু অধুনা এই ধারণা নিতান্তই পুরাতন এবং অনেক সেকেলে-আগের বলে বিবেচিত। আধুনিক কালের প্রবণতা হল শিক্ষাকে ব্যবহারোপযোগী বানাতে হবে; ব্যবহারিক মূল্যের দৃষ্টিতে অধিকতর মূল্যবান, এমন শিক্ষা অর্জনই হবে লক্ষ্য। শিক্ষার আলোয় হৃদয়লোককে উজ্জ্বল, উদ্ভাসিত ও জ্ঞান-সমৃদ্ধ করে তোলা আজ আর লক্ষ্যরূপে নির্দিষ্ট থাকেনি। অথচ আজকের দুনিয়ায়ও আমাদের সর্বাধিক প্রয়োজন হচ্ছে এমন শিক্ষা ব্যবস্থার যা আমাদের মনকে সর্বপ্রকার কলুষ থেকে মুক্ত করবে, মানসিক রোগের জীবাণু বিনষ্ট করে দেবে এবং মানবতার সকল দুঃখ-দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনা ও লুণ্ঠন বন্ধ করে দেবে; সেই সঙ্গে তা মানবীয় প্রয়োজন পূরণার্থে প্রাকৃতিক উপায়-উপকরণ পূর্ণ মাত্রায় প্রয়োগ করার, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্যে প্রয়োজনীয় খোরাক-পোশাক ও বাসস্থানের ইনসাফপূর্ণ বন্টনের ব্যবস্থা করার, সকল প্রকার প্রকৃতিক বিপর্যয়, ঝড়-তুফান ও বন্যা-প্লাবনের মাত্রা ক্রমাগত হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং সকল শ্রেণীল মানুষের জন্যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ-স্ফূর্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি করার যোগ্য হবে। এগুলো একান্তই জরুরী। যে শিক্ষার মাধ্যমে এ কাজগুলো সম্ভব তা যে মানবতার পক্ষে খুবই কল্যাণকর, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটু গভীর চিন্তা-বিবেচনা করলে যে কেউই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বাধ্য হবেন যে, মানব-প্রকৃতি নিহিত কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য ইত্যাদি স্বভাবজাত রিপুসমূহের কল্যাণময় ও ভারসাম্যপূর্ণ চরিতার্থতাই লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব করে দেবে। এর কোন একটিকেও নির্মূল করার প্রবণতা কারোর মধ্যেই জাগবে না। কাজেই উচ্চতর শিক্ষার চরম লক্ষ্য যদি শুধু এটুকুই হয়, তাহলে এ শিক্ষা তার আসল তাৎপর্যই হারিয়ে ফেলবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, মানবীয় উন্নতি বিধানে যারা উপস্থিত, তাৎক্ষণিক ও দ্রুত সুফল লাভের উদ্দেশ্যে শ্রম করেছে তাদের তুলনায় যারা জ্ঞানার্জনের জন্যে নিজেদের সম্পূর্ণূরূপে সমর্পিত করে দিয়েছে তারা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছে- এদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন। কাজেই পূর্বোক্ত ধরণের শিক্ষাই মানুষের কাম্য আর তা কেবলমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে পাওয়া জ্ঞান-উৎস কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই যে, মানুষের জ্ঞানগত পরিধি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সমস্যা ততই জটিল হতে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বস্তুগত অগ্রগতি যত বেশী লাভ করছে, নিত্য-নতুন কামনা-বাসনা, নতুন নতুন সমস্যা ও জটিলতা এবং নানারূপ নৈরাশ্য ও বঞ্চনার হাহাকার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অধুনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি ধ্বংস ও বিনাশের এমন সব হাতিয়ার উদ্ভাবনের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যার দরুন মানবতার অস্তিত্বই কঠিন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এটা যে কতবড় মারাত্মক ব্যাপার তা বলে শেষ করা যায় না। পরন্তু একটিকে মানুষ মানবীয় সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি বিধানের চেষ্টায় নিয়োজিত, অপরদিকে সে অত্যন্ত তীব্র গতিতে ভিত্তিহীন ধারণা-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। ফলে মানুষ এক স্থায়ী অশান্তি, দুঃখবোধ ও মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। মানুষ যত তীব্রতা ও আন্তরিকতার সাথে বিশ্ব-প্রকৃতিকে জয় করতে শুরু করেছে, তা আমাদেরকে প্রায় ততটাই ভুলিয়েই দিয়েছে যে, আসলে আমরা কেবল দৈহিক কামনা-বাসনারই অধিকারী, ‘‘আত্মা’’ বলতেও একটি জিনিস আমাদের রয়েছে। দেহের জীবন এবং ক্রমবৃদ্ধির জন্যে যেমন খাদ্য অপরিহার্য,মনের পরিশুদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা বিধানের জন্যে যেমন প্রয়োজন শিক্ষার, তেমনি আত্মার উন্নতি সাধনের জন্যে দরকার ঈমানের আর ঈমান হচ্ছে কতকগুলো মৌলিক সত্যের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যয়, যে প্রত্যয় শত প্রতিকূল ঝঞ্ঝাবাত্যার আঘাতেও বিন্দুমাত্র নষ্ট বা দুর্বল হবে না। বস্তুত ঈমান বিনষ্ট হওয়া কঠিনতম দৈহিক রোগ অপেক্ষাও অধিক মারাত্মক ও বিপজ্জনক। প্রাচীন মানুষের ইতিহাস-বিশেষজ্ঞগণ একথা মেনে নিতে আমাদের বাধ্য করেন যে, বহুসংখ্যক প্রাচীন জাতি ও গোত্র কেবলমাত্র এ জন্যেই পৃথিবীর বুক থেকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যে, তারা তাদের নিজস্ব জীবন পদ্ধতির প্রতি ঈমান ও প্রত্যয় হারিয়ে ফেলেছিল। ইতিহাসের এ এমন এক শিক্ষা যা কোন সময়ই এবং কারোরই ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এরূপ ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি সংঘটিত হওয়া প্রত্যেকটি জাতির জন্যেই অবাঞ্ছনীয়। আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় সত্ত্বার স্থিতি আমাদের কাম্য হলে মূল মানবীয় মূল্যমান ও মূল্যবোধের ওপর নিজেদের প্রত্যয়কে পুনরুজ্জীবিত ও দুঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে শিক্ষা শুধু আমাদের দৈহিক ও বৈষয়িক জীবন রক্ষা ও উন্নতি বিধানের পথ-প্রদর্শন করে ও উপায়-উপকরণ সংগ্রহের প্রযুক্তি শিখায়-কেবলমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষই যার একমাত্র অবদান, সে শিক্ষা আমাদের জন্যে কল্যাণকর হতে পারে না। তাই জাতীয় শিক্ষাকে আমাদের একান্ত নিজস্ব মানবীয় মূল্যমানের প্রতি ঈমানদার বানাতে হবে। কেননা শুধু ঈমানই আমাদের আত্মাকে সুস্থ, সবল, স্বচ্ছ ও সফল করতে সক্ষম।
বর্তমানে আমরা এক নবতর সামষ্টিক ব্যবস্থার রূপায়নে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ সামষ্টিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কি রূপ পরিগ্রহ করবে? এ প্রশ্নের জবাব এই যে, আমরা আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের মধ্যে কোন্ সব মূল্যমান ও মূল্যবোধের চেতনা জাগাতে চাই, তারই ওপর আমাদের বর্তমান সামষ্টিক ব্যবস্থার রূপ-সৌন্দর্য একান্তভাবে নির্ভরশীল। আমরা কি ধরণের মানুষ তৈরী করছি, তারই ওপর শিক্ষার দিক দিয়ে আমাদের ভবিষ্যত জাতীয় লক্ষ্য ও জাতীয় ভবিষ্যত নির্ভর করে। আমাদের সামষ্টিক সংহতি, সামাজিক সুবিচার ও ন্যায়পরায়নতা এবং ব্যক্তির পরম সাফল্য ও সার্থকতাই হচ্ছে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য। আমরা চাই সকল প্রকার দুর্নীতি, শোষণ ও চরিত্রহীনতামুক্ত এক আদর্শ সমাজ গড়তে-এমন এক সমাজ গড়তে, যেখানে মানুষের মানুষ হিংসা-দ্বেষ, হানাহানি, মারামারি, লুঠতরাজ ইত্যাদি অমানবিক ও অসামাজিক আচার-আচরণ থাকবে না; যেখানে মানুষ তার মানবিক মর্যাদা ও অধিকার পেয়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হতে হলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষাস্তর পর্যন্ত এমন এক পাঠক্রম ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-সূচী রচনা করতে হবে, যা শুধু ভাল ভাল জ্ঞান-তথ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের মন-মগজ ভরে দেবে না, বরং সেই সঙ্গে আমাদের বালক-বালিকা ও তরুণ-তরুণীদের দেবে বিশ্বলোক, জীবন ও সমাজ সম্পর্কে সুস্থ, সঠিক ও নির্ভুল চিন্তা-বিশ্বাস, স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিকোণ, সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, কঠোর শ্রমশীলতা ও সুসংগঠিত বিশ্বস্ততার গুণাবলী। তা এমন সব উচ্চতর মানবীয় মূল্যমানের নির্ভুল চেতনা জাগিয়ে দেবে, যা শুধু ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষাই চরিতার্থ করবেনা, ব্যাপকভাবে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষারও বাস্তব রূপায়নের নিয়ামক হবে। একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর সর্বশেষ রাসূলের (ﷺ) প্রতি আমাদের যে ঈমান তা-ই হচ্ছে আমাদের ব্যক্তির ও জাতীয় চেতনার মৌলিক কেন্দ্র-বিন্দু। এ কথা আজ নতুন করে উপলব্ধি করলেও একে সিদ্ধান্তরূপে গ্রহণ করতে হবে। এই কেন্দ্রবিন্দুকে উপেক্ষা করে যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি রচিত, তা আল্লাহ-রাসূল তথা ইসলাম-বিশ্বাসীদের পক্ষে কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং তার দ্বারা আদর্শ ও সুনাগরিকও গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে না।
ব্যক্তির মন-মানস ও মেধার উৎকর্ষ সাধনের উদ্দেশ্যে শুধু অনুশীলন ও চর্চার নামই শিক্ষা নয়- শিক্ষার উদ্দেশ্যও নয় তা। শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যক্তির নিজ সত্তার সংকীর্ণ পারিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেননা ব্যক্তি কোন জনসমষ্টি বা জাতির অংশ হয়েই বাঁচতে পারে। সমাজ ও সমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির অস্তিত্ব কল্পনাতীত। যে শিক্ষা ব্যক্তিকে প্রত্যয় ও আদর্শবাদের দিক দিয়ে তার বংশ-পরিবার ও সমাজ-পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তা শিক্ষা নামে অভিহিত হওয়ার অযোগ্য; তা নিছক বন্যতা, অসভ্যতা ও পশুত্ব মাত্র। প্রতিষ্ঠিত সমাজ-সমষ্টির ভিত্তিমূল চূর্ণ বা শিথিল করে যে শিক্ষা, তাকে শিক্ষা না বলে ‘‘ডিনামাইট’’ বলাই যথার্থ। ব্যক্তিকে সমাজ-সমষ্টির একজন উত্তম সদস্যরূপে গড়ে তুলতে হলে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবশ্যই জাতীয় মতাদর্শ তথা ঈমান, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতিবিম্ব রূপে গড়ে তুলতে হবে।
আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা একটি শিল্পোন্নত সমাজ ও জাতির প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে রচিত। সে শিক্ষার বৈষয়িক জীবন সত্ত্বার স্থিতি, সুখ-সম্ভোগ ও চাকচিক্যই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তার মূলে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও যোগ্যতমের উর্ধ্বতন (Survival of the fittest) লাভের ভাবধারা অত্যন্ত উৎকটভাবে নিহিত। কিন্তু এতদাঞ্চলের চিন্তাবিদগণ তাকে কখনও মনেপ্রাণে গ্রহণ করেননি। ইউরোপ থেকে আমদানী করা জিনিসের প্রতি প্রথম দৃষ্টিতে আকর্ষণ জেগে ওঠলেও, তার চাকচিক্য চোখকে ঝলসিয়ে দিলেও এবং প্রথম দিকে জনমনে একটা প্রবল মাদকতার সৃষ্টি করলেও এতদ্দেশীয় চিন্তাশীল ও সমাজদরদীদের ভুল ভাঙতে কিছুমাত্র বিলম্ব হয়নি। ইংরেজদের তৈরী শিক্ষাব্যবস্থার মারাত্মক বিষক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ হতে অন্তত মুসলমানদের খুব বেশী সময় লাগেনি। এমন কি কবি রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সমর্থক হয়েও স্পষ্টত অনুভব করেছিলেন যে, এ শিক্ষা ব্যবস্থা এতদ্দেশীয় পরিবেশের সাথে সম্পর্কহীন। তাই পাশ্চাত্য নিয়ম-নীতির প্রতি দাসসুলভ মনোভাব গ্রহণকে আকণ্ঠ বিষপান তুল্য মনে করতে হবে। শিক্ষা যাদের জন্যে, শিক্ষাকে তাদেরই ঈমান, বিশ্বাস, মন-মানস, মূল্যমান, মূল্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও রুচিবোধ এবং সামাজিক ও আত্মিক জীবনের সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অতএব শিক্ষা তা-ই গ্রহণযোগ্য, যা নিজেদের দ্বীন ও ঈমান এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বশেষ তথ্য ও মূলনীতি সমন্বিত ভাবধারার ভিত্তিতে রচিত।
শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও সমৃদ্ধি সাধন। যে ব্যক্তি তার সমাজ-সংস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন, সে কার্যত অস্তিত্বহীন। ব্যক্তি কেবল তখনই প্রকৃত অস্তিত্বের অধিকারী হতে পারে, যখন সে সমাজ-সমষ্টির উদ্দেশ্যাবলীকে নিজের মধ্যে রূপায়িত করবে এবং নিজের সত্তা দিয়ে তার বাস্তব রূপায়ন ঘটাবে। এই জন্যে ব্যক্তির মন-মানসকে সামষ্টিক ও সামগ্রিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণে সমুদ্ভাসিত করে তুলতে হবে। যে সব মতাদর্শ ও দৃষ্টিকোণ ব্যক্তি ও সমষ্টির দৃষ্টিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা শিক্ষার্থীর মনে ও চরিত্রে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তার মূল্যায়ন করে জানা যেতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থা তার ক্ষেত্রে কতটা সাফল্য লাভ করেছে। বৈষয়িক জীবনে কে কতটা সাফল্য লাভ করেছে কিংবা কে কতটা উচ্চতর চাকুরী লাভ করতে ও কতবেশী অর্থোপার্জন করতে সক্ষম হয়েছে, তা কোন শিক্ষা ব্যবস্থারই সফলতা প্রমাণের মানদণ্ড হতে পারে না। কেননা এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পশুজগতেই শোভন- মানব জগতে নয়।
কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই যে, মানুষের জ্ঞানগত পরিধি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সমস্যা ততই জটিল হতে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বস্তুগত অগ্রগতি যত বেশী লাভ করছে, নিত্য-নতুন কামনা-বাসনা, নতুন নতুন সমস্যা ও জটিলতা এবং নানারূপ নৈরাশ্য ও বঞ্চনার হাহাকার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অধুনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি ধ্বংস ও বিনাশের এমন সব হাতিয়ার উদ্ভাবনের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যার দরুন মানবতার অস্তিত্বই কঠিন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এটা যে কতবড় মারাত্মক ব্যাপার তা বলে শেষ করা যায় না। পরন্তু একটিকে মানুষ মানবীয় সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি বিধানের চেষ্টায় নিয়োজিত, অপরদিকে সে অত্যন্ত তীব্র গতিতে ভিত্তিহীন ধারণা-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। ফলে মানুষ এক স্থায়ী অশান্তি, দুঃখবোধ ও মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। মানুষ যত তীব্রতা ও আন্তরিকতার সাথে বিশ্ব-প্রকৃতিকে জয় করতে শুরু করেছে, তা আমাদেরকে প্রায় ততটাই ভুলিয়েই দিয়েছে যে, আসলে আমরা কেবল দৈহিক কামনা-বাসনারই অধিকারী, ‘‘আত্মা’’ বলতেও একটি জিনিস আমাদের রয়েছে। দেহের জীবন এবং ক্রমবৃদ্ধির জন্যে যেমন খাদ্য অপরিহার্য,মনের পরিশুদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা বিধানের জন্যে যেমন প্রয়োজন শিক্ষার, তেমনি আত্মার উন্নতি সাধনের জন্যে দরকার ঈমানের আর ঈমান হচ্ছে কতকগুলো মৌলিক সত্যের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যয়, যে প্রত্যয় শত প্রতিকূল ঝঞ্ঝাবাত্যার আঘাতেও বিন্দুমাত্র নষ্ট বা দুর্বল হবে না। বস্তুত ঈমান বিনষ্ট হওয়া কঠিনতম দৈহিক রোগ অপেক্ষাও অধিক মারাত্মক ও বিপজ্জনক। প্রাচীন মানুষের ইতিহাস-বিশেষজ্ঞগণ একথা মেনে নিতে আমাদের বাধ্য করেন যে, বহুসংখ্যক প্রাচীন জাতি ও গোত্র কেবলমাত্র এ জন্যেই পৃথিবীর বুক থেকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যে, তারা তাদের নিজস্ব জীবন পদ্ধতির প্রতি ঈমান ও প্রত্যয় হারিয়ে ফেলেছিল। ইতিহাসের এ এমন এক শিক্ষা যা কোন সময়ই এবং কারোরই ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এরূপ ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি সংঘটিত হওয়া প্রত্যেকটি জাতির জন্যেই অবাঞ্ছনীয়। আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় সত্ত্বার স্থিতি আমাদের কাম্য হলে মূল মানবীয় মূল্যমান ও মূল্যবোধের ওপর নিজেদের প্রত্যয়কে পুনরুজ্জীবিত ও দুঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে শিক্ষা শুধু আমাদের দৈহিক ও বৈষয়িক জীবন রক্ষা ও উন্নতি বিধানের পথ-প্রদর্শন করে ও উপায়-উপকরণ সংগ্রহের প্রযুক্তি শিখায়-কেবলমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষই যার একমাত্র অবদান, সে শিক্ষা আমাদের জন্যে কল্যাণকর হতে পারে না। তাই জাতীয় শিক্ষাকে আমাদের একান্ত নিজস্ব মানবীয় মূল্যমানের প্রতি ঈমানদার বানাতে হবে। কেননা শুধু ঈমানই আমাদের আত্মাকে সুস্থ, সবল, স্বচ্ছ ও সফল করতে সক্ষম।
বর্তমানে আমরা এক নবতর সামষ্টিক ব্যবস্থার রূপায়নে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ সামষ্টিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কি রূপ পরিগ্রহ করবে? এ প্রশ্নের জবাব এই যে, আমরা আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের মধ্যে কোন্ সব মূল্যমান ও মূল্যবোধের চেতনা জাগাতে চাই, তারই ওপর আমাদের বর্তমান সামষ্টিক ব্যবস্থার রূপ-সৌন্দর্য একান্তভাবে নির্ভরশীল। আমরা কি ধরণের মানুষ তৈরী করছি, তারই ওপর শিক্ষার দিক দিয়ে আমাদের ভবিষ্যত জাতীয় লক্ষ্য ও জাতীয় ভবিষ্যত নির্ভর করে। আমাদের সামষ্টিক সংহতি, সামাজিক সুবিচার ও ন্যায়পরায়নতা এবং ব্যক্তির পরম সাফল্য ও সার্থকতাই হচ্ছে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য। আমরা চাই সকল প্রকার দুর্নীতি, শোষণ ও চরিত্রহীনতামুক্ত এক আদর্শ সমাজ গড়তে-এমন এক সমাজ গড়তে, যেখানে মানুষের মানুষ হিংসা-দ্বেষ, হানাহানি, মারামারি, লুঠতরাজ ইত্যাদি অমানবিক ও অসামাজিক আচার-আচরণ থাকবে না; যেখানে মানুষ তার মানবিক মর্যাদা ও অধিকার পেয়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হতে হলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষাস্তর পর্যন্ত এমন এক পাঠক্রম ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-সূচী রচনা করতে হবে, যা শুধু ভাল ভাল জ্ঞান-তথ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের মন-মগজ ভরে দেবে না, বরং সেই সঙ্গে আমাদের বালক-বালিকা ও তরুণ-তরুণীদের দেবে বিশ্বলোক, জীবন ও সমাজ সম্পর্কে সুস্থ, সঠিক ও নির্ভুল চিন্তা-বিশ্বাস, স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিকোণ, সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, কঠোর শ্রমশীলতা ও সুসংগঠিত বিশ্বস্ততার গুণাবলী। তা এমন সব উচ্চতর মানবীয় মূল্যমানের নির্ভুল চেতনা জাগিয়ে দেবে, যা শুধু ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষাই চরিতার্থ করবেনা, ব্যাপকভাবে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষারও বাস্তব রূপায়নের নিয়ামক হবে। একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর সর্বশেষ রাসূলের (ﷺ) প্রতি আমাদের যে ঈমান তা-ই হচ্ছে আমাদের ব্যক্তির ও জাতীয় চেতনার মৌলিক কেন্দ্র-বিন্দু। এ কথা আজ নতুন করে উপলব্ধি করলেও একে সিদ্ধান্তরূপে গ্রহণ করতে হবে। এই কেন্দ্রবিন্দুকে উপেক্ষা করে যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি রচিত, তা আল্লাহ-রাসূল তথা ইসলাম-বিশ্বাসীদের পক্ষে কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং তার দ্বারা আদর্শ ও সুনাগরিকও গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে না।
ব্যক্তির মন-মানস ও মেধার উৎকর্ষ সাধনের উদ্দেশ্যে শুধু অনুশীলন ও চর্চার নামই শিক্ষা নয়- শিক্ষার উদ্দেশ্যও নয় তা। শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যক্তির নিজ সত্তার সংকীর্ণ পারিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেননা ব্যক্তি কোন জনসমষ্টি বা জাতির অংশ হয়েই বাঁচতে পারে। সমাজ ও সমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির অস্তিত্ব কল্পনাতীত। যে শিক্ষা ব্যক্তিকে প্রত্যয় ও আদর্শবাদের দিক দিয়ে তার বংশ-পরিবার ও সমাজ-পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তা শিক্ষা নামে অভিহিত হওয়ার অযোগ্য; তা নিছক বন্যতা, অসভ্যতা ও পশুত্ব মাত্র। প্রতিষ্ঠিত সমাজ-সমষ্টির ভিত্তিমূল চূর্ণ বা শিথিল করে যে শিক্ষা, তাকে শিক্ষা না বলে ‘‘ডিনামাইট’’ বলাই যথার্থ। ব্যক্তিকে সমাজ-সমষ্টির একজন উত্তম সদস্যরূপে গড়ে তুলতে হলে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবশ্যই জাতীয় মতাদর্শ তথা ঈমান, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতিবিম্ব রূপে গড়ে তুলতে হবে।
আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা একটি শিল্পোন্নত সমাজ ও জাতির প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে রচিত। সে শিক্ষার বৈষয়িক জীবন সত্ত্বার স্থিতি, সুখ-সম্ভোগ ও চাকচিক্যই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তার মূলে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও যোগ্যতমের উর্ধ্বতন (Survival of the fittest) লাভের ভাবধারা অত্যন্ত উৎকটভাবে নিহিত। কিন্তু এতদাঞ্চলের চিন্তাবিদগণ তাকে কখনও মনেপ্রাণে গ্রহণ করেননি। ইউরোপ থেকে আমদানী করা জিনিসের প্রতি প্রথম দৃষ্টিতে আকর্ষণ জেগে ওঠলেও, তার চাকচিক্য চোখকে ঝলসিয়ে দিলেও এবং প্রথম দিকে জনমনে একটা প্রবল মাদকতার সৃষ্টি করলেও এতদ্দেশীয় চিন্তাশীল ও সমাজদরদীদের ভুল ভাঙতে কিছুমাত্র বিলম্ব হয়নি। ইংরেজদের তৈরী শিক্ষাব্যবস্থার মারাত্মক বিষক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ হতে অন্তত মুসলমানদের খুব বেশী সময় লাগেনি। এমন কি কবি রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সমর্থক হয়েও স্পষ্টত অনুভব করেছিলেন যে, এ শিক্ষা ব্যবস্থা এতদ্দেশীয় পরিবেশের সাথে সম্পর্কহীন। তাই পাশ্চাত্য নিয়ম-নীতির প্রতি দাসসুলভ মনোভাব গ্রহণকে আকণ্ঠ বিষপান তুল্য মনে করতে হবে। শিক্ষা যাদের জন্যে, শিক্ষাকে তাদেরই ঈমান, বিশ্বাস, মন-মানস, মূল্যমান, মূল্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও রুচিবোধ এবং সামাজিক ও আত্মিক জীবনের সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অতএব শিক্ষা তা-ই গ্রহণযোগ্য, যা নিজেদের দ্বীন ও ঈমান এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বশেষ তথ্য ও মূলনীতি সমন্বিত ভাবধারার ভিত্তিতে রচিত।
শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও সমৃদ্ধি সাধন। যে ব্যক্তি তার সমাজ-সংস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন, সে কার্যত অস্তিত্বহীন। ব্যক্তি কেবল তখনই প্রকৃত অস্তিত্বের অধিকারী হতে পারে, যখন সে সমাজ-সমষ্টির উদ্দেশ্যাবলীকে নিজের মধ্যে রূপায়িত করবে এবং নিজের সত্তা দিয়ে তার বাস্তব রূপায়ন ঘটাবে। এই জন্যে ব্যক্তির মন-মানসকে সামষ্টিক ও সামগ্রিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণে সমুদ্ভাসিত করে তুলতে হবে। যে সব মতাদর্শ ও দৃষ্টিকোণ ব্যক্তি ও সমষ্টির দৃষ্টিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা শিক্ষার্থীর মনে ও চরিত্রে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তার মূল্যায়ন করে জানা যেতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থা তার ক্ষেত্রে কতটা সাফল্য লাভ করেছে। বৈষয়িক জীবনে কে কতটা সাফল্য লাভ করেছে কিংবা কে কতটা উচ্চতর চাকুরী লাভ করতে ও কতবেশী অর্থোপার্জন করতে সক্ষম হয়েছে, তা কোন শিক্ষা ব্যবস্থারই সফলতা প্রমাণের মানদণ্ড হতে পারে না। কেননা এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পশুজগতেই শোভন- মানব জগতে নয়।