১
শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৭০
শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
শিক্ষার একটা উদ্দেশ্য থাকা একান্তই আবশ্যক। অর্থাৎ শিক্ষা কেন-শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কি অর্জন করব? কিংবা শিক্ষা না হলে ক্ষতি কি? সে ক্ষতির কারণই বা কি? এ বিষয়গুলো আমাদের সামনে পরিষ্কার থাকা দরকার।
আগেই বলেছি, মানুষের জন্যে শিক্ষার একান্তই প্রয়োজন। এর অর্থ, শিক্ষা না হলে মানুষ ‘মানুষ’ পদবাচ্য হতে পারে না। মানুষ যেহেতু নিতান্ত জীব নয়, জীবেরও বহু ঊর্ধ্বে তার স্থান, তাই প্রতিটি মানুষের স্বকীয় মর্যাদা নিয়ে আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে এবং নিজের উজ্জ্বল সুখময় ভবিষ্যত নিশ্চিত করে জীবন যাপন করা একান্ত অপরিহার্য। আর এজন্যে তার এমন শিক্ষার দরকার যে শিক্ষা তাকে উপরোক্ত তিনটি কাজ সম্পাদনে সাহায্য করবে, তাকে যোগ্য বানাবে। ফলে তার পক্ষে একাকী জীবনযাপন করার নয়, বরং একটি জনসমষ্টি এবং আধুনিক ভাষায় একটা জাতি হিসেবে জীবন যাপন করার সম্ভব হবে।
বস্তুত মানুষের জন্যে শিক্ষা অপরিহার্য। এ ব্যাপারে দুনিয়ার সর্বকালের জ্ঞানী-গুণী ও চিন্তাবিদদের পূর্ণ ঐক্যমত্য রয়েছে। এ বিষয়ে কখনো কোন মত-পার্থক্য হয়নি; কখনই কোন লোক বলেনি যে, মানুষের জন্যে শিক্ষার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু মানুষের জন্যে কি ধরণের শিক্ষার প্রয়োজন, কোন্ ধরণের শিক্ষা দ্বারা মানুষের উপরিউক্ত তিনটি দিক সার্থক হতে পারে? ….অর্থাৎ মানুষের মর্যাদা, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন ও মানুষের উজ্জ্বল সুখময় ভবিষ্যত নিশ্চিতকরণ সম্ভব হতে পারে, এ নিয়ে চিন্তাবিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।
এ মতভেদের কারণ হচ্ছে, প্রধানত মানব সত্তা ও মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে ধারণার বিভিন্নতা।
কারো কারো মতে মানুষ কোন স্বতন্ত্র বা উন্নত ধরণের জীব নয়। মানুষে সাধারণ জীব পর্যায়েরই একটি সত্তা (Beings)- জীবেরই বংশধর। তাই তাদের মতে মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য বা ভবিষ্যত ঠিক তা-ই যা সাধারণ জীবের।
কারো কারোর মতে মানুষ জীব পর্যায়েরই সত্তা, তবে পার্থক্য এই যে, মানুষ উন্নত ও ক্রমবিকাশপ্রাপ্ত জীব (Evolued Animal); অতএব মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য ও ভবিষ্যতও সেই অনুপাতে উন্নত ও বিকাশপ্রাপ্ত মান অনুযায়ী হবে।
এর কারণ স্বরূপ বলা হয়েছে, মানুষ একটা Rational Animal বা বুদ্ধিমান জীবন। মানুষের বুদ্ধি-বিবেক আছে, সাধারণ জীব-জন্তুর তা নেই; এই যা পার্থক্য। অতএব, সাধারণ জীব-জন্তুর তুলনায় মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য ও ভবিষ্যত শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক বা যুক্তিভিত্তিক হবে মাত্র। তাদের জীবন একান্তভাবে বুদ্ধি-নির্ভর। আর বুদ্ধি-নির্ভর বলেই তারা আল্লাহকেও অস্বীকার করেছে, তাকে অমান্য করে চলেছে। আল্লাহর নিকট থেকে কোন বিধান আসার প্রয়োজন বোধও তারা হারিয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য জগত-তা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী সমাজ হোক বা ধর্মহীন স্বৈরতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ-সর্বত্র মানুষ সম্পর্কে উপরিউক্ত ধারণা প্রকটভাবে বিরাজমান। ফলে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মোটামুটি জীবতাত্ত্বিক পর্যায়ের। সে শিক্ষার ফলে উন্নতমানের যোগ্যতাসম্পন্ন জীবনই তৈরী হচ্ছে এবং তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিও নিতান্তই পাশব প্রকৃতির। অন্যকথায়, বুদ্ধিমান ও উন্নত মানের পশুরাই এসব সমাজের নাগরিক, রাষ্ট্রনায়ক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক এবং সেনাধ্যক্ষ ও সাধারণ যোদ্ধা।
এ সমাজের সাধারণ ব্যক্তিরা এই চেতনারই ধারক। ফলে তাদের সমন্বয়ে যে জাতি গঠিত, সে জাতিও পাশবিকতার মধ্যেই নিমজ্জিত। আর একারণেই তাদের তৈরী দর্শন ও বিজ্ঞান পাশবিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। তাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি- সর্বক্ষেত্রে পাশবিকতারেই প্রকাশ। পশু জগতে যা স্বভাবতঃই আচরি, তাদের জগতে তা-ই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অনুসৃত। মৌলিককতার দিক দিয়ে এ দু’য়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। ফলে তাদের শিক্ষায় শকুনীর মতো উড্ডয়নশীল, কুমীরের মতো শিকারী, শৃগালের মতো ধূর্ত, ব্যাঘ্রের মতো হিংস্র প্রাণী গড়ে উঠছে। প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী ও মানবিক গুণ-সম্পন্ন মানুষ গড়ে ওঠেনি।
আগেই বলেছি, মানুষের জন্যে শিক্ষার একান্তই প্রয়োজন। এর অর্থ, শিক্ষা না হলে মানুষ ‘মানুষ’ পদবাচ্য হতে পারে না। মানুষ যেহেতু নিতান্ত জীব নয়, জীবেরও বহু ঊর্ধ্বে তার স্থান, তাই প্রতিটি মানুষের স্বকীয় মর্যাদা নিয়ে আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে এবং নিজের উজ্জ্বল সুখময় ভবিষ্যত নিশ্চিত করে জীবন যাপন করা একান্ত অপরিহার্য। আর এজন্যে তার এমন শিক্ষার দরকার যে শিক্ষা তাকে উপরোক্ত তিনটি কাজ সম্পাদনে সাহায্য করবে, তাকে যোগ্য বানাবে। ফলে তার পক্ষে একাকী জীবনযাপন করার নয়, বরং একটি জনসমষ্টি এবং আধুনিক ভাষায় একটা জাতি হিসেবে জীবন যাপন করার সম্ভব হবে।
বস্তুত মানুষের জন্যে শিক্ষা অপরিহার্য। এ ব্যাপারে দুনিয়ার সর্বকালের জ্ঞানী-গুণী ও চিন্তাবিদদের পূর্ণ ঐক্যমত্য রয়েছে। এ বিষয়ে কখনো কোন মত-পার্থক্য হয়নি; কখনই কোন লোক বলেনি যে, মানুষের জন্যে শিক্ষার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু মানুষের জন্যে কি ধরণের শিক্ষার প্রয়োজন, কোন্ ধরণের শিক্ষা দ্বারা মানুষের উপরিউক্ত তিনটি দিক সার্থক হতে পারে? ….অর্থাৎ মানুষের মর্যাদা, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন ও মানুষের উজ্জ্বল সুখময় ভবিষ্যত নিশ্চিতকরণ সম্ভব হতে পারে, এ নিয়ে চিন্তাবিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।
এ মতভেদের কারণ হচ্ছে, প্রধানত মানব সত্তা ও মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে ধারণার বিভিন্নতা।
কারো কারো মতে মানুষ কোন স্বতন্ত্র বা উন্নত ধরণের জীব নয়। মানুষে সাধারণ জীব পর্যায়েরই একটি সত্তা (Beings)- জীবেরই বংশধর। তাই তাদের মতে মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য বা ভবিষ্যত ঠিক তা-ই যা সাধারণ জীবের।
কারো কারোর মতে মানুষ জীব পর্যায়েরই সত্তা, তবে পার্থক্য এই যে, মানুষ উন্নত ও ক্রমবিকাশপ্রাপ্ত জীব (Evolued Animal); অতএব মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য ও ভবিষ্যতও সেই অনুপাতে উন্নত ও বিকাশপ্রাপ্ত মান অনুযায়ী হবে।
এর কারণ স্বরূপ বলা হয়েছে, মানুষ একটা Rational Animal বা বুদ্ধিমান জীবন। মানুষের বুদ্ধি-বিবেক আছে, সাধারণ জীব-জন্তুর তা নেই; এই যা পার্থক্য। অতএব, সাধারণ জীব-জন্তুর তুলনায় মানুষের মর্যাদা, কর্তব্য ও ভবিষ্যত শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক বা যুক্তিভিত্তিক হবে মাত্র। তাদের জীবন একান্তভাবে বুদ্ধি-নির্ভর। আর বুদ্ধি-নির্ভর বলেই তারা আল্লাহকেও অস্বীকার করেছে, তাকে অমান্য করে চলেছে। আল্লাহর নিকট থেকে কোন বিধান আসার প্রয়োজন বোধও তারা হারিয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য জগত-তা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী সমাজ হোক বা ধর্মহীন স্বৈরতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ-সর্বত্র মানুষ সম্পর্কে উপরিউক্ত ধারণা প্রকটভাবে বিরাজমান। ফলে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মোটামুটি জীবতাত্ত্বিক পর্যায়ের। সে শিক্ষার ফলে উন্নতমানের যোগ্যতাসম্পন্ন জীবনই তৈরী হচ্ছে এবং তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিও নিতান্তই পাশব প্রকৃতির। অন্যকথায়, বুদ্ধিমান ও উন্নত মানের পশুরাই এসব সমাজের নাগরিক, রাষ্ট্রনায়ক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক এবং সেনাধ্যক্ষ ও সাধারণ যোদ্ধা।
এ সমাজের সাধারণ ব্যক্তিরা এই চেতনারই ধারক। ফলে তাদের সমন্বয়ে যে জাতি গঠিত, সে জাতিও পাশবিকতার মধ্যেই নিমজ্জিত। আর একারণেই তাদের তৈরী দর্শন ও বিজ্ঞান পাশবিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। তাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি- সর্বক্ষেত্রে পাশবিকতারেই প্রকাশ। পশু জগতে যা স্বভাবতঃই আচরি, তাদের জগতে তা-ই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অনুসৃত। মৌলিককতার দিক দিয়ে এ দু’য়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। ফলে তাদের শিক্ষায় শকুনীর মতো উড্ডয়নশীল, কুমীরের মতো শিকারী, শৃগালের মতো ধূর্ত, ব্যাঘ্রের মতো হিংস্র প্রাণী গড়ে উঠছে। প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী ও মানবিক গুণ-সম্পন্ন মানুষ গড়ে ওঠেনি।