hadith book logo

শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪১

অখণ্ড মানবতা ও ইসলাম

বিশ্বলোকের অন্তর্নিহিত সত্য ও বাস্তবতা, বিশ্বলোকে মানবজাতির প্রকৃত স্থান ও মর্যাদা (Position) দেহ ও আত্মার পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্ক, ইহকাল-পরকালের অবিচ্ছিন্নতা ও অখণ্ডতা এবং বৈষয়িক দুনিয়ার নশ্বরতা ও পরকালীন জীবনের চিরন্তনতা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও মতবাদ ওপরে সংক্ষিপ্তভাবে বিবৃত হয়েছে। সেই সঙ্গে ইসলামের বিশ্ব-মানবতা সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণও অবশ্যই বিবেচ্য। তাহলেই ইসলামের সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা-দর্শন ও শিক্ষানীতি আরো সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার সন্তোষ বিধানই মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। কুরআনের ঘোষণাঃ ‘তোমার আল্লাহর দিকেই চূড়ান্ত পরিণতি’।

কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ হলঃ

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

‘‘বল, আমার নামায, আমার ইবাদত-বন্দেগী, আমার কুরবানী, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু-সব কিছুই সারে জাহানের রব্ব্ আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত।’’ (সূরা আন’আমঃ ১৬২)

বলা বাহুল্য যে, এই চেতনার পূর্ণ বাস্তবায়ন পরকালেই সম্ভব হবে। কেননা, পরকালীন কল্যাণ মানুষের জন্যে শেষ মনযিল রূপে নির্দিষ্ট হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে যে অপরিমেয় সম্পদ ও নেয়ামতের দিকে মানবীয় চিন্তা ও কর্মকে আমন্ত্রিত করা হয়েছে, তাও অসীম-অশেষ। মানুষের মাঝে স্বাভাবিকভাবে যে অসীমতার আকাঙ্ক্ষা প্রবল, তারও পূর্ণ চরিতার্থতার ব্যবস্থা রয়েছে এতে। আর এই লক্ষ্যেই ‘বিশ্ব-মানবতা’র পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতার পুরোপুরি ব্যবস্থাও গৃহীত হয়েছে। উদ্দেশ্য ও আদর্শের এই সুস্পষ্ট ঐক্য ও বিশাল-বিস্তৃত ভাবধারার দরুন মানুষের বিভিন্ন বংশ-গোত্র ও দেশভিত্তিক জাতীয়তার সংকীর্ণতা স্বতঃই নিঃশেষিত হয়ে গেছে। এ কারণেই ইসলাম সংকীর্ণ বস্তুগত ভিত্তিতে মানব জাতির বিভক্তি-বিভাজন নীতির তীব্র প্রতিবাদ করেছে; বরং এতে সমস্ত মানুষকে একটি বৃহত্তর লক্ষ্যবিন্দুর দিকে চালিত করতে চেষ্টা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ইসলাম পারস্পরিক সম্বন্ধ-সম্পর্ককে অধিকতর দৃঢ় করে তোলার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। মানব-জাতির এই আদর্শিক ঐক্য ও অভিন্নতার কোন দৃষ্টান্ত দুনিয়ার অন্য কোন ধর্মে বা মতাদর্শে দেখতে পাওয়া যায় না।

বস্তুত ইসলামী ঐক্য-চেতনা ও সামষ্টিক সাম্যবাদের ভিত্তি আধ্যাত্মিক ও আন্তরিক একাত্মতার ওপর স্থাপিত। কোন বাহ্যিক বা বস্তুগত পার্থক্য এখানে মোটেই বিবেচ্য নয়। অতএব, পাশ্চাত্য সমাজ-দর্শনে নিহিত বর্ণ-ভাষা, ভৌগোলিকতা, দেশমাতৃকা, ধন-সম্পদের পরিমাণ-পার্থক্য এবং বিভিন্ন লৌকিক সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সাহিত্য-শিল্পের মনগড়া ঐক্যবন্ধন কি করে ইসলামের মানে উত্তীর্ণ হতে পারে?

পাশ্চাত্য উদ্ভাবিত আধুনিক শিক্ষা জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা বা ‘জাতিসংঘে’র যে-ধারণা পেশ করেছে, তার ভিত্তি নিতান্তই দুর্বল ও ক্ষণভংগুর। যে সমাজে সত্য, ন্যায়, সুবিচার, সদাচরণ, দানশীলতা, সহযোগিতা, যুদ্ধ ও সন্ধি এবং অগ্রাধিকার দানের ভিত্তি হচ্ছে মানুষের গায়ের বর্ণ, মাতভাষা ও ভৌগোলিক আঞ্চলিকতা, ইসলামের দৃষ্টিতে তা মানুষের উপযোগী নীতিমালা নয়। এ নীতি মানব সমাজে সম্পূর্ণ অচল, অমানবিক এবং নিতান্তই অবিচারমূলক।