hadith book logo

শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

পাকিস্তান–উত্তরকালে শিক্ষা–সংস্কার প্রচেষ্টা

পাকিস্তান-উত্তর যুগে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্যে যে কোন চেষ্টাই হয়নি, তা অবশ্য বলা হচ্ছেনা। এ পর্যায়ে যা চেষ্টা হয়েছে, সংক্ষেপে তা এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে। ১৯৪৭ সনের নভেম্বর মাসে সর্বপ্রথম একটি নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান কায়েমের চার বছর পর ১৯৫১ সনের ডিসেম্বর মাসে নিখিল পাকিস্তান-ভিত্তিক এ শিক্ষা-পরিকল্পনা রচনার প্রয়োজন অনুভূত হয়। এই সময় এ্যাড্ভাইজারী বোর্ড, কাউন্সিল অব টেকনিকাল এডুকেশন এবং ইন্টার ইউনিভার্সিটি বোর্ড-এর এক যুক্ত অধিবেশন হয়। এরপর ’৫২ সনের জানুয়ারী মাসে কমার্শিয়াল এডুকেশন কমিটির রিপোর্ট পেশ করা হয়। ’৫৫ সনে প্রথম রচিত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিক্ষা সম্পর্কেও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ’৫৬ সনে লাহোরে সেকেণ্ডারী এডুকেশন বোর্ড একটি কমিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবাদি পেশ করে। ’৫৭ সনের জানুয়ারী মাসে তৎকালীন পূর্বপাক (বর্তমান বাংলাদেশ) সরকার শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যে একটি কমিশন গঠন করেন ও তার রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ’৫৯ সনে তৎকালীন সামরিক সরকার সমগ্র দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পর্যালোচনা করে দেশ ও জাতির প্রয়োজনের দৃষ্টিতে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা রচনার লক্ষ্যে একটি ‘শিক্ষা কমিশন’ নিয়োগ করেন। এ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এসব চেষ্টা-প্রচেষ্টা সম্পর্কে একটি কথা বলাই যথেষ্ট এবং তা এই যে, ১৯৪৭ সনের স্বাধীনতা-উত্তর যুগের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় গতানুগতিকতার প্রবল প্রাধান্য অপরিবর্তিতই রয়েছে। ইংরেজের স্থলাভিষিক্ত শাসকরা কেবল বিদেশী প্রভুদের পদাংকই অনুসরণ করেছে হরফে হরফে। একবিন্দু এদিক ওদিক তাকানোকেও তারা বিদেশী প্রভুর আনুগত্য ও অন্ধ অনুসরণের ব্যতিক্রম বলে ধরে নিয়েছে। বস্তুত এরূপ কূপমণ্ডুকতা নিতান্ত গোলামদের পক্ষেই সম্ভবপর হয়ে থাকে।

এ পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষানীতি যা কুদরতে খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট থেকে প্রমাণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে আমার সুস্পষ্ট কথা এই যে, তা পূর্বাপেক্ষা অধিক মারাত্মক রূপে দেখা দিয়েছে এ জাতির পক্ষে। দ্বীন-ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতের দৃষ্টিতে এ রিপোর্ট হচ্ছে চরম কলঙ্কজনক ও নৈরাশ্যব্যঞ্জক। মুসলিম জাতির নিষ্পাপ শিশু-সন্তানদেরকে ইসলামী ঈমান-আকীদার প্রতি অবিশ্বাসী, ইসলামী আমল ও আখলাকের প্রতি বিদ্রোহী এবং তাদের জীবনকে উৎকট ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির ধারক-বাহক বানিয়ে দেবার জন্যে এর মতো বড় হাতিয়ার স্বয়ং বিদেশী ইংরেজও প্রয়োগ করেনি- প্রয়োগ করতে সাহস পায়নি, যা করেছে আমাদের এই স্বজাতীয় লোকেরা। যেখানে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই ইসলামী জীবন দর্শন ও জীবন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করার দায়িত্ব ছিল, সেখানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা ঘোষণা করেই দাবি করা হল যে, আদর্শ জাতি গঠনই এ সরকারের লক্ষ্য। অথচ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ধর্ম শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা-ও আদৌ যথার্থ নয়। তার পরিবর্তে বরং নাচ-গান শিক্ষা করাকেই কার্যত অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মতো ধোঁকাবাজি ইতিহাসে কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নেই।