১
শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৬
পাশ্চাত্য শিক্ষার সমাজদৃষ্টি
দুনিয়ার সমস্ত মানুষ একই পিতামাতার সন্তান, সকলে একই বংশোদ্ভূত, সকলের ধমনীতে একই মা-বাবার রক্ত প্রবাহমান। রক্ত-বর্ণেল দৃষ্টিতে তাদের মাঝে কোনরূপ ভেদাভেদ থাকতে পারে না। কিন্তু মানব জাতির এ স্বাভাবিক একত্বতা ও অভিন্নতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন সাংঘর্ষিক দল-উপদলে বিভক্ত করে দেয়াও পাশ্চাত্য সভ্যতার সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ জীবন-দৃষ্টিরই অনিবার্য পরিণতি। কেননা দুনিয়ার বস্তুগত উপায়-উপকরণ, ধন-সম্পদ, আরাম-আয়েশের সামগ্রী খুবই সীমাবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান শিক্ষা এগুলোকেই মানুষের একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। অথচ মানুষের জৈবিক লোক-লালসা অন্তহীন-সীমালঙ্ঘনকারী। শুধু ব্যক্তিগত চিন্তাই নয়, জাতীয় ও সামষ্টিক মতাদর্শের ভিত্তিও এ সব বস্তুগত জিনিসের ওপর সংস্থাপিত। পাশ্চাত্য জাতিসমূহের সমাজ ও জাতি সংক্রান্ত ধারণা (Concept of Society and Nation) বর্ণ-গোত্র ও দেশমাতৃকার সীমাভিত্তিক এবং তা নিতান্তই বস্তুগত নিগড়ে আষ্টে-পৃষ্ঠে বাঁধা। পাশ্চাত্য জাতি-দর্শনে দেশমাতৃকা বা ভূগোল-সীমার মধ্যে বসবাসকারী এক নির্দিষ্ট বর্ণের বা গোত্রের লোক বা এক ভাষাভাষী লোকেরা এক-একটা জাতি। এ জাতি অন্যান্য সব মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন ও সর্বতোভাবে স্বতন্ত্র। এই বস্তুগত বা অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাই এক পর্যায়ে মানুষের মধ্যে শ্রেণী-চেতনা তীব্রতর করে তোলে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’, ‘দুনিয়ার মালিকরা এক হও’ প্রভৃতি শ্লোগান ও পাল্টা শ্লোগান এ সংকীর্ণ ও বিষাক্ত শ্রেণী চেতনারই ফসল। বর্তমান দুনিয়ায় মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে, বর্ণে গোত্রে ও ভাষায় ভাষায় যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ প্রচণ্ড রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং হিংসা-বিদ্বেষের যে আগুন চারিদিকে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে গোটা মানব সভ্যতাকে ছারখার করে দিতে চাইছে, তা বর্তমান বিশ্বব্যাপী প্রচলিত বস্তুবাদী শিক্ষা-প্রশিক্ষণের অনিবার্য পরিণতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন কি জাতিসংঘ (U.N.O) থেকে বিশ্ব-মানবতার সংরক্ষণ, কল্যাণ সাধন ও উন্নতি বিধানের লক্ষ্যে বড় বড় দাবি সহকারে যে সব বই-পুস্তক প্রচার করা হয়, দুঃখের বিষয়, তাও এই ধরণের অতীব সংকীর্ণ দ্বান্দ্বিক ও সাংঘর্ষিক ভাবধারা ও বিদ্বেষাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভরপুর।
এটা হচ্ছে আধুনিক সভ্যতা ও তার প্রধান গার্জিয়ান পাশ্চাত্য প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা সৃষ্ট জীবন-দৃষ্টি ও তার জ্ঞানগত মানের পরিধি। এ জীবন-দর্শন ও জ্ঞানগত মান অর্জন এবং তা বিতরণের জন্যেই এসব দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ সদাব্যস্ত ও প্রচণ্ডভাবে কর্মতৎপর। আমরা প্রাচ্যবাসীরাও অন্ধভাবে তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে এ ধরণেরই জীবন-দৃষ্টি ও মানস প্রস্তুতি গ্রহণে সর্বশক্তি নিযুক্ত করেছি। এ পথে চলার মধ্যেই জীবন ও জন্মের চরম সার্থকতা নিহিত বলে দৃঢ় প্রত্যয় রাখি। পাশ্চাত্যের চাকচিক্যময় সভ্যতা যে আমাদের চোখকেই ঝলসে দিয়েছে এবং দৃষ্টিশক্তিকে হরণ করেছে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই।
এটা হচ্ছে আধুনিক সভ্যতা ও তার প্রধান গার্জিয়ান পাশ্চাত্য প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা সৃষ্ট জীবন-দৃষ্টি ও তার জ্ঞানগত মানের পরিধি। এ জীবন-দর্শন ও জ্ঞানগত মান অর্জন এবং তা বিতরণের জন্যেই এসব দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ সদাব্যস্ত ও প্রচণ্ডভাবে কর্মতৎপর। আমরা প্রাচ্যবাসীরাও অন্ধভাবে তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে এ ধরণেরই জীবন-দৃষ্টি ও মানস প্রস্তুতি গ্রহণে সর্বশক্তি নিযুক্ত করেছি। এ পথে চলার মধ্যেই জীবন ও জন্মের চরম সার্থকতা নিহিত বলে দৃঢ় প্রত্যয় রাখি। পাশ্চাত্যের চাকচিক্যময় সভ্যতা যে আমাদের চোখকেই ঝলসে দিয়েছে এবং দৃষ্টিশক্তিকে হরণ করেছে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই।